ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা বৃহস্পতিবার ১৭ জুন ২০২১ ৩ আষাঢ় ১৪২৮
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ১৭ জুন ২০২১

কোন টিকা কতটা কার্যকর
বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত পাঁচটি করোনা-প্রতিরোধী টিকা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো- অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা, স্পুটনিক ভি, সিনোফার্মা, ফাইজারের টিকা ও সিনোভ্যাক
শাহেরীন আরাফাত
প্রকাশ: সোমবার, ৭ জুন, ২০২১, ৬:০৯ পিএম আপডেট: ০৭.০৬.২০২১ ৬:২৭ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 83

বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনা মহামারির এই পর্যায়ে এসে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো টিকা। আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি বড় অংশই এ সময়ে আবর্তিত হচ্ছে এই টিকাকে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত পাঁচটি করোনা-প্রতিরোধী টিকা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো- অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা, স্পুটনিক ভি, সিনোফার্মা, ফাইজারের টিকা ও সিনোভ্যাক।

কোন টিকা কোন ভ্যারিয়েন্টের ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর, সেই গবেষণা এখনও চলমান। এখন জেনে নেওয়া যাক প্রথম সারির টিকাগুলোর বিশেষত্ব ও বৈশিষ্ট্য।


ফাইজার-বায়োএনটেক
২০১৯ সালের শেষের দিকে করোনা চীনের উহান থেকে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার এক বছরের মধ্যেই টিকা আবিষ্কার করাটা বিশ্ব ইতিহাসে নতুন রেকর্ড। ২০২০ সালের ১১ ডিসেম্বর করোনার প্রথম টিকা হিসেবে ফাইজারের টিকা মার্কিন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অথরিটির (এফডিএ) অনুমোদন পায়। পরে ইউরোপীয় ইউনিয়নও এটি জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন দেয়। গত মাসে টিকাটি ১২ বছরের বেশি যে কারও শরীরে ব্যবহারের অনুমোদন দেয় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের কর্তৃপক্ষ।

ফাইজারের টিকাটি দুই ডোজের। প্রথম ডোজের ২১ দিন বা তিন সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ নিতে হয়। এ টিকায় তেমন কোনো বড় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয় না। শরীরব্যথা, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, ক্লান্তিবোধের মতো সামান্য কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে, যা দুয়েক দিনের মধ্যেই সেরে যায়।

তৃতীয় পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে টিকাটি ৯৫ শতাংশ কার্যকর বলে জানা যায়। গত মার্চের শেষের দিকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) পক্ষ থেকে ৩ হাজার ৯৫০ জন ফ্রন্টলাইনারের মধ্যে চালানো গবেষণায় দেখা যায়, ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে এটি কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। এটি যুক্তরাজ্য ও দক্ষিণ আফ্রিকার মিউট্যান্ট ভ্যারিয়েন্টের ক্ষেত্রেও ৯৫ শতাংশ কার্যকর বলে ইয়ালে ইউনিভার্সিটির গবেষণায় দেখা যায়।

তবে এ টিকার কার্যকারিতায় সবচেয়ে কঠিন শর্ত হলো এর সংরক্ষণ প্রক্রিয়া। এটি মাইনাস ৭০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হয়।

মডার্না
ফাইজারের টিকা অনুমোদনের এক সপ্তাহ পর ২০২০ সালের ১৮ ডিসেম্বর মডার্নার টিকার অনুমোদন দেয় মার্কিন কর্তৃপক্ষ। পরে ইউরোপীয় ইউনিয়নও টিকাটি জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন দেয়। ১৮ বছরের বেশি বয়সিদের ক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য এটি অনুমোদিত।

ফাইজারের মতোই এ টিকাতেও আরএনএ ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এই টিকা সাধারণ রেফ্রিজারেটরে ৩০ দিন পর্যন্ত কার্যকর অবস্থায় সংরক্ষণ করা যায়। ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সি মানুষের ক্ষেত্রে এই টিকার কার্যকারিতা প্রায় ৮৬ শতাংশ।

এই টিকাটি দুই ডোজের। প্রথম ডোজের ২১ দিন বা তিন সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ নিতে হয়। শরীরব্যথা, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, ক্লান্তিবোধের মতো সামান্য কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে, যা দুয়েক দিনের মধ্যেই ভালো হয়ে যায়। সাধারণত ফাইজারের টিকার মতো এতেও তেমন কোনো বড় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয় না।

গত মার্চে সিডিসির পক্ষ থেকে ৩ হাজার ৯৫০ জন ফ্রন্টলাইনারের মধ্যে চালানো গবেষণায় দেখা যায়, ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে এটি কার্যকর। অনেক গবেষকের মতে, এ টিকা যুক্তরাজ্য ও দক্ষিণ আফ্রিকার মিউট্যান্ট ভ্যারিয়েন্টের ক্ষেত্রেও কার্যকর। তবে এ নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে।

জনসন অ্যান্ড জনসন
২০২১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি জনসন অ্যান্ড জনসনের টিকার অনুমোদন দেয় মার্কিন কর্তৃপক্ষ। পরে ইউরোপীয় ইউনিয়নও টিকাটি জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন দেয়। শরীরব্যথা, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, ক্লান্তিবোধের মতো সামান্য কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে, যা মডার্না ও ফাইজারের টিকা থেকেও কম মাত্রার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।

ফাইজার বা মডার্নার চেয়ে এই টিকার ব্যবহার অনেক সহজ। এটি সাধারণ রেফ্রিজারেটরে সংরক্ষণ করা হয়। এক ডোজের এই টিকা ১৮ বছরের বেশি বয়সিদের ক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত। তবে সম্প্রতি জনসন অ্যান্ড জনসন তাদের টিকার দুই ডোজের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরুর ঘোষণা দিয়েছে। প্রথম ডোজের দুই মাস পর দ্বিতীয় ডোজ নিতে হবে।

এই টিকার মোট কার্যকারিতা ৭২ শতাংশ। আর আগে আক্রান্ত হননি এমন মানুষের ক্ষেত্রে এটি ৮৪ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে এফডিএ বিশ্লেষণে দেখা যায়, যুক্তরাজ্য ও দক্ষিণ আফ্রিকার মিউট্যান্ট ভ্যারিয়েন্টের ক্ষেত্রে এটি যথাক্রমে ৬৪ ও ৮২ শতাংশ কার্যকর।

অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকা
অন্যান্য টিকার চেয়ে অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা দামে কম, সংরক্ষণও সহজ। সাধারণ রেফ্রিজারেটরে প্রায় ছয় মাস এটির কার্যকারিতা ঠিক থাকে। যুক্তরাষ্ট্রে এ টিকা প্রয়োগ করা হয় না। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে এটি অনুমোদিত। বহুল ব্যবহৃত।

১৮ বা তার বেশি বয়সিদের ক্ষেত্রে এ টিকা প্রয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

এই টিকাটি দুই ডোজের। প্রথম ডোজের ৪-১২ সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজ নিতে হয়। শরীরব্যথা, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, ক্লান্তিবোধের মতো সামান্য কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে, যা দুয়েক দিনের মধ্যেই সেরে যায়।

গত মার্চে তিনটি ভিন্ন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের বিশ্লেষণ করে অ্যাস্ট্রাজেনেকা জানিয়েছে, দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পর লক্ষণগত আক্রান্তের ক্ষেত্রে এটি ৭৬ শতাংশ এবং গুরুতর আক্রান্তের ক্ষেত্রে এটি ১০০ শতাংশ কার্যকর। ৬৫ বা তদূর্ধ্ব মানুষের ক্ষেত্রে এটি ৮৫ শতাংশ কার্যকর।

ইংল্যান্ডের পাবলিক হেলথ বিভাগ থেকে করা এক গবেষণায় দেখা যায়, এ টিকা যুক্তরাজ্যের ভ্যারিয়েন্টের ক্ষেত্রে ৬৬ শতাংশ ও ভারতীয় ভ্যারিয়েন্টের ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ কার্যকর। তবে দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্টের ক্ষেত্রে এ টিকা খুব বেশি কার্যকর নয় বলে জানা যায়।

রুশ স্পুটনিক ভি
গত নভেম্বরে রাশিয়ার গামালেয়া ন্যাশনাল সেন্টার জানায়, তাদের টিকা করোনা মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম। তারা আরও জানায়, ২০ হাজার স্বেচ্ছাসেবীর মধ্যে চালানো ট্রায়ালে এ টিকার কার্যকারিতা ছিল ৯২ শতাংশ।

এই টিকাটি দুই ডোজের। প্রথম ডোজের ২১ দিন বা তিন সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ নিতে হয়। বিশ্বখ্যাত জার্নাল ল্যানসেটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে গবেষকরা জানান, এ টিকা নিরাপদ, এটির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া খুবই সামান্য। এটা সাধারণ রেফ্রিজারেটরে সংরক্ষণ করা যায়।

বর্তমানে রাশিয়া, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ইরান ও চীনে এই টিকা গণহারে প্রয়োগ করা হচ্ছে। গামালেয়া ন্যাশনাল সেন্টার বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে টিকা উৎপাদনেও যুক্ত রয়েছে।
গত মে মাসে রুশ সরকার একটি এক ডোজের টিকাও অনুমোদন দিয়েছে। এটি করোনা মোকাবিলায় ৭৯ দশমিক ৪ শতাংশ কার্যকর। ৩ জুন রুশ মিডিয়া মস্কো টাইমস জানায়, রাশিয়ায় এক হাজারেরও বেশি মিউট্যান্ট করোনা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ যুক্তরাজ্যের, ২৪ শতাংশ ভারতীয় এবং ৬ শতাংশ দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্ট। রুশ কর্তৃপক্ষের দাবি, তাদের টিকাটি এসব মিউট্যান্ট ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম। যদিও তারা এখনও এ বিষয়ে কোনো গবেষণা প্রকাশ করেনি।

সিনোফার্ম
চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত ফার্মাসিউক্যাল কোম্পানি সিনোফার্ম ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালিয়েছে ৩১ হাজার স্বেচ্ছাসেবীর মধ্যে। এর কার্যকারিতা ৮০ শতাংশ। ইতোমধ্যে শতাধিক দেশ থেকে এ টিকার জন্য অর্ডার এসেছে।

মে মাসের প্রথমদিকে এ টিকার জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এরপরই সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন এ টিকার অনুমোদন দিয়ে ব্যবহার শুরু করে। এই টিকাটি দুই ডোজের। প্রথম ডোজের চার বা আট সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ নিতে হয়। সাধারণ রেফ্রিজারেটরে সংরক্ষণ করা যায়।

মে মাসের ২৫ তারিখ মার্কিন জার্নাল দ্য আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন এই চীনা টিকার কার্যকারিতার স্বীকৃতি দেয়। মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন এবং জর্ডানে ৪০ হাজার স্বেচ্ছাসেবীর মধ্যে চালানো ওই গবেষণায় দেখা যায়, করোনার বিরুদ্ধে এটি ৭২.৮ থেকে ৭৮.১ শতাংশ কার্যকর।

সিনোভ্যাক
চীনের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সিনোভ্যাকের টিকার নাম করোনাভ্যাক। তুরস্ক, চিলি, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন এবং ব্রাজিলে তৃতীয় পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে, এটি করোনার বিরুদ্ধে ৬৫ শতাংশ কার্যকর।

সিনোফার্মের টিকার মতোই এটি দুই ডোজের। প্রথম ডোজের চার বা আট সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ নিতে হয়। সাধারণ রেফ্রিজারেটরে সংরক্ষণ করা যায়। জুনের ১ তারিখ এ টিকার অনুমোদন দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সিনোফার্মের পর এটি চীনের দ্বিতীয় বৈশ্বিকভাবে অনুমোদিত টিকা।

মে মাসের শেষে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণা অনুসারে, কোভিড-১৯ প্রতিরোধে করোনাভ্যাক ৬৫ শতাংশ কার্যকর এবং মৃত্যু ঝুঁকি কমাতে ৮৬ শতাংশ কার্যকর। ব্রাজিলে সিনোভ্যাক ব্যবহার করে করোনা প্রতিরোধ করা গেছে ৭৫ শতাংশ এবং সেখানে ৯৫ শতাংশ মৃত্যুহার কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।

গত ৩১ মে চীনা কর্তৃপক্ষ ন্যাশনাল হেলথ কমিশনের মুখপাত্র মি ফেং দাবি করেন, যেসব মিউট্যান্ট ভ্যারিয়েন্ট এখন পর্যন্ত সামনে এসেছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে চীনা দুই টিকা কার্যকর। নতুন ভ্যারিয়েন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, তবে চীনা টিকা ব্যবহারে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

/জেড-ও/


আরও সংবাদ   বিষয়:  করোনাভাইরাস   টিকা   অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা   স্পুটনিক ভি   সিনোফার্মা   ফাইজার   সিনোভ্যাক  




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]