ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা বৃহস্পতিবার ১৭ জুন ২০২১ ৩ আষাঢ় ১৪২৮
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ১৭ জুন ২০২১

প্রবাস ফেরত শ্রমিকদের প্রণোদনা বঞ্চনা
৭০০ কোটির মধ্যে পড়ে আছে ৫০০ কোটি টাকাই
এসএম আলমগীর
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১০ জুন, ২০২১, ৯:৩৭ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 142

করোনা মহামারি দুর্বিষহ করে তুলেছে দেশের প্রবাস ফেরত শ্রমিকদের। গত বছরের মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ২০ লাখ শ্রমিক দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। এদের অনেককেই একেবারে রিক্ত-নিঃস্ব হাতে ফিরতে হয়েছে পরিবারের কাছে। দেশে এসেই মহাবিপাকে পড়েছেন তারা। এতদিন বিদেশ-বিভুঁইয়ে হাজার হাজার টাকা আয় করলেও দেশে এসে বেকার জীবন কাটাতে হচ্ছে।

সরকার এরকম প্রবাস ফেরত শ্রমিকদের প্রতিষ্ঠিত বা স্বাবলম্বী করতে দুই দফায় ৭০০ কোটি টাকার প্রণোদনা দিয়েছে। কিন্তু প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের দুর্বলতা ও প্রণোদনার ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে নানা ঝক্কি-ঝামেলার কারণে প্রবাস ফেরতরা এ টাকা নিতে পারছেন না। ফলে এখনও পড়ে আছে ৫০০ কোটি টাকা। অথচ টাকা চেয়ে ব্যাংকের দ্বারে দ্বারে মাসের পর মাস ঘুরছেন শ্রমিকরা।

প্রবাস থেকে ফেরত আসা কর্মীদের সহায়তার জন্য তাদের সহজ শর্তে ঋণ দিতেই মূলত এই প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে সরকার। যাতে করে এই টাকা দিয়ে তারা দেশে কিছু একটা করতে পারেন। প্রথম পর্যায়ে ২ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার কথা। এই ঋণের সুদ হবে ২ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে। শুধু তাই নয়, ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে কোনো জামানত লাগবে না বলেও জানানো হয় প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে।

তবে বাস্তবতা হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রেই ঋণ নিতে যাওয়া শ্রমিকদের কাছ থেকে জামানত চাওয়া হচ্ছে, কোথাও কোথাও ঋণের একটি অংশ ঘুষ হিসেবে চাওয়া হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা ঋণ না পেলেও প্রভাবশালী অনেকেই এই ঋণের টাকা তুলে নিচ্ছেন। এমন অভিযোগ সময়ের আলোর কাছে করেছেন বেশ কয়েকজন প্রবাস ফেরত শ্রমিক।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ বাংলাদেশি কাজ করতেন। এদের মধ্যে বর্তমানে প্রায় ২০ লাখের মতো কর্মী করোনাভাইরাসের প্রভাবে সঙ্কটে পড়ে দেশে ফিরে এসেছেন। মূলত তাদের জন্যই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বছরের এপ্রিলে প্রথমে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে ২০০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেন। পরে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে প্রবাস ফেরত শ্রমিকদের জন্য আরও ৫০০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ রাখা হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক বিভাগ থেকে এ অর্থ ছাড় দেওয়ার কথা। সব মিলিয়ে ৭০০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়া হয় তাদের জন্য।

একই সময়ে প্রণোদনা দেওয়ার জন্য আরও তিন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানকেও ৫০০ কোটি টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হলে সেসব প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যেই সব অর্থ বিতরণ সম্পন্ন করেছে। কিন্তু ব্যর্থ শুধু প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক। কোভিড পরিস্থিতিতে কর্মহীন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, দেশ-বিদেশে কর্মহীন হওয়া শ্রমিক ও গ্রামের দরিদ্রদের মধ্যে ঋণ বিতরণের মাধ্যমে মূলধন জোগান দিয়ে তাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক ও বাংলাদেশ পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) অনুকূলে ৫০০ কোটি টাকা করে মোট ২০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করে সরকার।

গত বছরের আগস্টে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ২৫০ কোটি টাকা করে ছাড় দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। তিনটি প্রতিষ্ঠান বরাদ্দের অর্থ বিতরণ শেষ করায় তাদের অবশিষ্ট ২৫০ কোটি টাকা করে ছাড় করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। কিন্তু প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক এখন পর্যন্ত সব ঋণ বিতরণ করতে পারেনি।

প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ দেওয়া ৫০০ কোটি টাকার মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক হাতে পেয়েছে ২৫০ কোটি টাকা। ৩১ মে পর্যন্ত এখান থেকে ঋণ দেওয়া হয়েছে ১৪৮ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এ ঋণ নিয়েছেন ৬ হাজার ৭২৯ জন প্রবাস ফেরত শ্রমিক। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ২০০ কোটি টাকার মধ্যে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক এখন পর্যন্ত হাতে পেয়েছে ৬০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩১ মে পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হয়েছে ৬৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এ খাত থেকে ঋণ নিয়েছেন ২ হাজার ৭১৮ জন। দুই খাত থেকে এখন পর্যন্ত প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে ঋণ নিয়েছেন ৯ হাজার ৪৪৭ জন। আর মোট ঋণের পরিমাণ ২১৫ কোটি টাকা।

এখন পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার হার এত কম কেন জানতে চাইলে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ঋণ এবং অগ্রিম বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে যেভাবে আমাদের অর্থ ছাড় দেওয়া হচ্ছে আমরা সেভাবে ঋণ বিতরণ করছি। অর্থ ছাড় বেশি না হওয়ায় ঋণও বেশি দেওয়া যাচ্ছে না। তবে ঋণ বিতরণ কার্যক্রম শুরুর দিকে কিছুটা সমস্যা হয়েছিল। তা ছাড়া জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ঋণ বিতরণ সংক্রান্ত যে কমিটি করে দেওয়া হয়েছে সে কমিটির কারণেও কিছুটা জটিলতা হয়েছে। অবশ্য ইদানীং ঋণ বিতরণের হার বেড়েছে।

২০১১ সালে যাত্রা শুরু করা প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক ৭১টি শাখার মাধ্যমে বিদেশ ফেরত ও বিদেশে যেতে আগ্রহী শ্রমিকদের ঋণ সুবিধা দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত মাত্র ৪২ হাজার বিদেশগামী কর্মীকে ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকটি। সরকার ঘোষিত প্রণোদনার ৫০০ কোটি টাকা বিতরণেও বরাবরের মতোই নির্জীব প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক। ফলে তহবিল পাওয়ার পরের ৬ মাসে মাত্র ১ হাজার ৬০৬ জনকে ঋণ দিতে পেরেছে ব্যাংকটি। গত জানুয়ারির পর যেসব প্রবাসী দেশে ফিরেছেন, তাদের ৪ শতাংশ সুদে এবং বাকিদের ৭ থেকে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার কথা ব্যাংকটির।

ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, তাদের জনবল খুবই কম। তা ছাড়া করোনার কারণে তারা বিদেশ ফেরত ও বিদেশগামী কর্মীদের ঋণের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে পারেননি। তবে যারা নিজ উদ্যোগে ঋণের জন্য শাখায় এসেছেন, তাদের কাউকে ফেরত দেওয়া হয়নি। তিন লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণ দেওয়া হচ্ছে।
প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জনবল সঙ্কট ও করোনা পরিস্থিতির কারণে প্রণোদনার টাকা বিতরণে কাক্সিক্ষত সফলতা আসেনি। আমাদের কাছে যারা আবেদন করেছেন, তাদের সবাইকে ঋণ দেওয়া হয়েছে। আশা করি, দ্রুতই বাকি টাকা বিতরণ হয়ে যাবে।

এ বিষয়ে রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) চেয়ারপারসন অধ্যাপক তাসনীম সিদ্দিকী বলেন, সরকার প্রণোদনা ঘোষণা করেই ক্ষান্ত, কিন্তু এই প্রণোদনার অর্থ প্রবাস ফেরত শ্রমিকরা ঠিকমতো পাচ্ছেন কি না সেটি আর কেউ খোঁজ নিচ্ছেন না। আসলে যে প্রতিষ্ঠানকে এই ঋণ দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে- সেই প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করছে না। আমার কাছে অনেক অভিযোগ আসে, প্রবাস ফেরতরা প্রণোদনার অর্থ নিতে গেলে তাদের কাছ থেকে ঘুষ চাওয়া হয়। উপরি না দিলে ঋণ মিলছে না, যারা উপরি দিচ্ছেন না তাদের ঘোরানো হচ্ছে মাসের পর মাস, হয়রানি করা হচ্ছে নানাভাবে।

তা ছাড়া এই ঋণ জামানতবিহীন হিসেবে দেওয়ার কথা, কিন্তু অনেক ব্রাঞ্চেই জামানত চাওয়া হচ্ছে। আসলে এগুলো হয়রানির জন্যই করা হচ্ছে। সরকারের এ দিকটিতে নজর দেওয়া দরকার। কারণ প্রবাস ফেরত শ্রমিকরা আসলেই খুব মানবেতর জীবনযাপন করছে। অনেকেই এখন বিদেশ থেকে খালি হাতে এসে পরিবারের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছেন, অনেকেই চরম হতাশায় ভুগছেন। সরকারের দেওয়া এই প্রণোদনা থেকে অর্থ পেলে তারা অন্তত একটি মুদি দোকান দিয়েও ব্যবসা করে সংসার চালাতে পারবেন। সুতরাং সরকারকে তাদের কথা ভাবতে হবে- তারা যাতে ঋণ পান সে জন্য সার্বিক ব্যবস্থা আরও সহজ করতে হবে।

এর আগে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে বিদেশ থেকে ফেরত আসা কর্মী এবং মৃত কর্মীর পরিবারের জন্য পুনর্বাসন ঋণ বিতরণের নীতিমালা প্রকাশ করে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। প্রকাশিত নীতিমালায় বলা হয়, প্রথম দফায় সরকার ঘোষিত প্রণোদনার ২০০ কোটি টাকা ৪ শতাংশ সুদে ঋণ হিসেবে বিতরণ করবে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক। কোভিড-১৯-এর কারণে গত বছরের ১ মার্চের পর থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দেশে ফেরত আসা অভিবাসী কর্মীরা পাবেন এ ঋণ। অন্যদিকে বিদেশে যে প্রবাসী কর্মী মারা গেছেন, তার পরিবারের একজন সদস্য এ ঋণ পাওয়ার যোগ্য হবেন।

বিশেষ করে কৃষিখামার, মাঝারি ধরনের কৃষিনির্ভর শিল্প, মুরগির খামার, মৎস্য চাষ, বায়োগ্যাস প্লান্ট, সৌর জ্বালানি, তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ, একটি বাড়ি একটি খামার, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প, গরু মোটাতাজাকরণ ও দুগ্ধ উৎপাদনকারী খামার প্রকল্পে ঋণ দেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমেদ সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসী কর্মীদের টেকসই পুনর্বাসনের লক্ষ্যে স্বল্প ও সরল সুদে এই ঋণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেকেই টাকা পেয়েছেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে শ্রমিকদের ঋণ পেতে ঝামেলা হচ্ছে। বিষয়টি মন্ত্রণালয় নজরদারি করছে।

/এসএ/


আরও সংবাদ   বিষয়:  প্রবাসী শ্রমিক  




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]