ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা  বুধবার ১৬ জুন ২০২১ ১ আষাঢ় ১৪২৮
ই-পেপার  বুধবার ১৬ জুন ২০২১

বাস্তবায়নের ওপর নির্ভরশীল বাজেটের সুফল
প্রফেসর ড. মো. সেলিম উদ্দিন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১০ জুন, ২০২১, ১:১১ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 42

বিশ্বব্যাপী মহামারি কোভিড-১৯-এর প্রভাবে বিগত বছর থেকে আমাদের জীবন তথা স্বাস্থ্য এবং জীবিকা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে এক অস্বাভাবিক, অস্থির, অনিশ্চিত, বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। যেটি এখনও অনেকটা চলমান। বিদ্যমান এই পরিস্থিতিতে ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটটি জীবনকে সুরক্ষা অর্থাৎ স্বাস্থ্যঝুঁকিকে ন্যূনতম রাখার কৌশল গ্রহণের মাধ্যমে জীবিকা তথা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি সঞ্চারের উদ্দেশ্যকে প্রাধান্য দিয়ে প্রণয়ন ও ঘোষিত হয়েছে।

সার্বিক পর্যালোচনায় বলা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটটিতে জীবন ও জীবিকার মধ্যে অত্যন্ত চমৎকার সমন্বয়ের বিভিন্ন দিক প্রতিফলিত হয়েছে। যেমন- স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনয়ন, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি ইত্যাদির জন্য বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি, কর অবকাশসহ নানা ধরনের কর ছাড় ও কর মওকুফের বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পেয়েছে। কিন্তু বিগত বছরগুলোর বাজেট বাস্তবায়ন পর্যালোচনা করলে এই ধারণা স্পষ্ট, বাজেট পুরোপুরি বাস্তবায়িত হচ্ছে না এবং প্রস্তাবিত ব্যয় বরাদ্দ অব্যয়িত থেকে যাচ্ছে। যার কারণে প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা এবং অবকাঠামোসহ অন্যান্য বরাদ্দের আওতায় পরিকল্পিত কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পাদিত হচ্ছে না। ফলে প্রস্তাবিত বাজেটে বরাদ্দকৃত মোট ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা ব্যয়ের ফলে যে পরিমাণ সামাজিক কল্যাণ, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, অবকাঠামোগত ব্যয়ের ধনাত্মক ফলাফল যেমন- মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব ও অনুকূল বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন পাওয়ার বা হওয়ার অঙ্গীকার থাকে তা অর্জিত হয় না। তাই প্রস্তাবিত বাজেটের সুফল এবং সফলতা বাস্তবায়নের ওপর নির্ভরশীল। ব্যয় পরিকল্পনা মাসিকভিত্তিক বা ত্রৈমাসিকভিত্তিক আনুপাতিক হওয়া বাঞ্চনীয় নতুবা গুণগত মান এবং কাজের প্রাপ্ত ফলাফল পেতে অনিশ্চয়তা থাকে। উদাহরণ স্বরূপ চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে সংশোধিত এডিপিতে প্রায় ১৩ হাজার ৮৬৫ কোটি টাকার বরাদ্দের অনুকূলে জুলাই ২০২০ থেকে এপ্রিল ২০২১, ১০ মাসে ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার কোটি টাকার মতো যেটি বরাদ্দের ২৯ শতাংশ। এই পরিস্থিতিতে করোনাকালীন এই দ্বিতীয় বাজেটটিতে স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, অর্থনীতিতে গতিসঞ্চার, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে ঘোষিত বরাদ্দ, রাজস্ব প্রণোদনা, নতুন পলিসিসহ অবকাঠামোগত মেগা প্রকল্পের ব্যয় বরাদ্দগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন এবং প্রয়োগের সব ব্যবস্থা নিশ্চিতপূর্বক রাজস্ব আদায় এবং ঘাটতি অর্থ সংস্থানে গতিশীল নেতৃত্বের সমাবেশ ঘটাতে পারলে ঘোষিত বাজেটের ফলাফল ফলপ্রসূ এবং ইতিবাচক হবে।

চলতি বছরের (২০২০-২১) এবং প্রস্তাবিত বাজেট ২০২১-২২ দুটি করোনাকালীন বাজেটে করোনা মোকাবিলা এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ঘোষিত বিভিন্ন নীতি, কৌশল, প্রণোদনাগুলো কার্যকর বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন সময়ে গৃহীত সরকারের মৌলিক অঙ্গীকারগুলো যেমন- প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক ঘোষিত ২৩টি প্যাকেজের প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা প্রণোদনার সময় বৃদ্ধি, সরকারি ব্যয়ে কর্মসৃজনকে প্রাধান্য, বিলাসী ব্যয় হ্রাস ও নিরুৎসাহিত করা, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পের জন্য স্বল্প সুদে ঋণ প্রবর্তনের সুবিধা চালু রাখা, সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতাধীন এবং বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধি যাবতীয় কার্যক্রম চালু রাখাসহ সুষ্ঠু বাস্তবায়নে অধিক কঠোরতা প্রত্যাশা করছি। উদাহরণ স্বরূপ ২৩টি প্যাকেজের বিশাল প্রণোদনা এখনও কুটির, অতি ক্ষুদ্র, অতি ছোট, মাঝারি, অনানুষ্ঠানিক সেক্টরে নিয়োজিত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ও সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে কৃষিভিত্তিক এবং রফতানিমুখী শিল্পগুলো বিভিন্ন কারণে প্রত্যাশিত প্রণোদনার অর্থ ছাড় হয়নি।

যথাযথ পদ্ধতি প্রবর্তনপূর্বক সিএমএসএমই খাতে প্রণোদনার অর্থ ছাড়করণসহ অধিক সহায়তা দিলে কর্মসংস্থান, গ্রামীণ অর্থনীতি তেজিকরণ এবং চাহিদা বৃদ্ধি ইত্যাদিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে।

এই বাজেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক সুরক্ষা খাতে মোট ১,০৭,৬১৪ কোটি টাকার বরাদ্দ যেটি বাজেটের ১৭.৮৩ শতাংশ এবং জিডিপির ৩.১১ শতাংশ। এই সরকার ২০০৮-২০০৯ অর্থবছরে ১৩,৮৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল যেটি চলতি বাজেট ২০২০-২১-এ প্রায় ৭ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ৯৫,৫৭৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। বয়স্ক ভাতার সংখ্যা বৃদ্ধি, মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বৃদ্ধি, প্রতিবন্ধীদের জন্য পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন, নগদ সহায়তাসহ প্রায় ১৩০টির ওপরে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে।

কুটির, অতি ক্ষুদ্র, অতি ছোট, মাঝারি (সিএমএসএমই)-এর সহায়তা, স্বাস্থ্য খাতে নানা কর্মসূচি, কৃষিতে গুরুত্ব এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাজেটে অতি দরিদ্রের হার ১২.৩ শতাংশ থেকে ২০২৩-২৪-এর মধ্যে ৪-৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। এই চিন্তা-চেতনা বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য দিক বলে আমি মনে করি। বিশ্ব মহামারি কোভিড-১৯ বিগত কয়েক মাসে বিধ্বস্ত ও বিপর্যস্ত বিশ্বকে একটি শিক্ষা স্পষ্ট করে দিয়েছে, তা হলো- অদূর ভবিষ্যতে বা নিকট ভবিষ্যতে, অস্পষ্ট-স্পষ্ট এবং অজানা চ্যালেঞ্জ এবং বিপদ যেকোনো সময় দেখা দিতে পারে যেটি অর্থনীতি পুনর্গঠনে ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারে। স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে যা অবশ্যই বৈচিত্র্যময় ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিশ্চিত ঘটনাবলির সঙ্গে দ্রুত তাল মিলিয়ে পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জনের ব্যবস্থা রেখেই অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পূর্বপ্রস্তুতি থাকতে হবে।

লেখক : বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফিন্যান্স করপোরেশন ও ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান

/এসএ/


আরও সংবাদ   বিষয়:  বাজেট  




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]