ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা বৃহস্পতিবার ১৭ জুন ২০২১ ৩ আষাঢ় ১৪২৮
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ১৭ জুন ২০২১

করোনা দুর্যোগে ৫০তম বাজেট বাস্তবায়নে পর্যালোচনা
প্রফেসর ড. প্রিয় ব্রত পাল
প্রকাশ: শুক্রবার, ১১ জুন, ২০২১, ৮:৫০ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 56

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল করোনা দুর্যোগের কারণে এবারের দেশের ৫০তম বাজেটকে জীবন-জীবিকার বাজেট হিসেবে ঘোষণা করেছেন। বাজেটের আকার প্রাক্কলন করেছেন ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। রাজস্ব প্রাপ্তি প্রাক্কলন করেছেন ৩ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। যা বরাবরের মতো আহরণের দুর্বলতার কারণে অর্জন হবে না। অথচ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর চেয়ে বেশি রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করা সম্ভব। ১৭ কোটি জনসংখ্যার দেশে মাত্র ২৫ লাখ করদাতা কর দেন। কর হয়রানি বন্ধ করে কর ফাঁকি রোধ এবং কর আওতা বৃদ্ধি করার মাধ্যমে রাজস্ব আয়ের মাত্রা বৃদ্ধি করা সম্ভব। আমাদের দেশের কর জিডিপির অনুপাত ১০ শতাংশের মতো। 

অথচ উন্নত বিশ্বে ৩০ শতাংশের অধিক প্রত্যক্ষ কর থেকে আসে। অন্যদিকে বহুদিন ধরে চলে এসেছে কর বিভাগের হয়রানি ও চরম দুর্নীতি। যে কারণে প্রতিটি বছর সরকার কাক্সিক্ষত রাজস্ব আহরণ করতে পারছে না। সরকারের এ দিকে বেশি নজর দেওয়া অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে। কেননা রাজস্ব আয় না বাড়লে সম্প্রসারণ বাজেট প্রকাশ করা যাবে না এবং ঘাটতি বাজেটের চিত্রও পাল্টে যাবে। বাজেটের ঘাটতি মেটাতে সহজ শর্তে ও স্বল্পসুদে বৈদেশিক ঋণ পাওয়া যায় এবং তা যদি উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ করে কর্মসংস্থান ও উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করা যায় তাহলে দেশের জন্য মঙ্গলজনক। কিন্তু তা যেন কোনোভাবে অনুৎপাদন খাতে ব্যয় করা না হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে।

আবার করদাতাদের নিরুৎসাহিত করার জন্য কালো টাকাকে সাদা করার সুযোগ রয়েছে মাত্র ১০ শতাংশ কর প্রদানের মাধ্যমে। অথচ এই হার সাধারণ করদাতাদের থেকে বেশি হওয়া উচিত।
স্বাভাবিক কারণে এ বছর করোনা দুর্যোগ মোকাবিলায় স্বাস্থ্য খাতে নজর দেওয়া হবে। সে কারণে করোনা মোকাবিলার জন্য ১০ হাজার কোটি টাকা আলাদা বরাদ্দ দেওয়া আছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে ভারত থেকে চুক্তিকৃত যে পরিমাণ টিকা পাওয়ার কথা ছিল ভারত নিজের দেশের স্বাস্থ্য খাতের বিপর্যয়ের কারণে তা সরবরাহ করতে পারছে না। ফলে বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারকে চীন রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য থেকে টিকা সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এর জন্য অতিরিক্ত অর্থের বরাদ্দ প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, প্রচলিত তত্ত্ব ‘এক ঝুড়িতে সব ডিম রাখা উচিত নয়’ বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন ছিল। আমরা যদি বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন উৎস থেকে টিকা আমদানির পরিকল্পনা করতাম আজকের এই টিকার সমস্যায় পড়তে হতো না। তবে আশাব্যঞ্জক হলো বিদেশি দাতা সংস্থা ও দাতা দেশগুলো সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।

শিক্ষিত বেকারদের কীভাবে কৃষিতে, মৎস্য শিল্পে, ক্ষুদ্র শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে নিয়োজিত করা যায় তার একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনা একান্ত প্রয়োজন। বয়স্ক ভাতাসহ বিভিন্ন ভাতা যেন প্রত্যেকে পায় সেটি নিশ্চিত করতে হবে তার জন্য প্রয়োজন হবে ডাটাবেজ।

স্বাস্থ্য খাতের পাশাপাশি যোগাযোগ খাতে রাস্তাঘাট নির্মাণ এ ব্রিজ নির্মাণে মারাত্মক দুর্নীতি বিরাজমান। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহে মারাত্মক দুর্নীতি দেখা যায়। একইভাবে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো খাতেও একই চিত্র দেখা যায়। বহুদাবিভক্ত শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। ইংরেজি মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীরা ও মাদ্রাসার ছাত্রছাত্রীরা অঙ্ক বিজ্ঞানসহ মূল বিষয়ে দুর্বল। তারা কর্মসংস্থানে যোগদান করতে না পারার কারণে হতাশায় ভুগছে। এ ছাড়াও দেশের অর্থনীতিতে চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষা খাত থেকে মানবসম্পদ জোগান দেওয়া হচ্ছে না প্রকৃত পরিকল্পনার অভাবে। তাই দেশের কৃষি শিল্পসহ বিভিন্ন খাতের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষা খাত থেকে প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ সরবরাহ করতে হবে। আয়-ব্যয়ের ব্যবধান বা ঘাটতি এ বছর অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব। যেহেতু আমাদের বৈদেশিক আয় ও রিজার্ভ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ব্যাংক তারল্য বিদ্যমান। সঞ্চয়পত্র হতে ঋণ নিলে খরচ বেশি বৃদ্ধি পাবে। এ বছর অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার চেয়ে বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়া যথার্থ হবে। কারণ করোনার কারণে বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা থেকে বিশেষ সহজ শর্তে ঋণ পাওয়া যাবে।

এ বাজেটের তৃতীয় লিঙ্গের মানুষকে চাকরি দিলে ৫ শতাংশ কর রেয়াত, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক সম্মানী ১২ থেকে ২০ হাজার টাকা বৃদ্ধি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর শতকরা ১৫ ভাগ কর যুক্তিসঙ্গত নয়। বিশেষ করে এই করোনা বছর প্রতিটি বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয় আর্থিক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। করোনা সুরক্ষা সামগ্রীর ভ্যাট-ট্যাক্স মওকুফ ও টিকা ক্রয়ে ১৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রশংসনীয়। তবে ভ্যাকসিন উৎপাদনের উদ্যোগ আগে নেওয়া প্রয়োজন ছিল। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মতামত দিয়েছিলেন। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদফতর গুরুত্ব দেয়নি। তাহলে বর্তমান সঙ্কটে পড়তে হতো না বরং বাংলাদেশের ভাবমূর্তি অনেক বৃদ্ধি পেত। কারণ আমাদের উৎপাদন সেক্টরের সে উৎপাদন ক্ষমতা আছে এবং আগ্রহ প্রকাশ করেছিল।

বাজেটে উপকূল এলাকাবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা সাধনের উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যাখ্যা নেই। প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় এদের পারিবারিক সামাজিক অবস্থার করুণ চিত্র আমরা দেখতে পাই। বিদেশিদের করের আওতায় আনার বেলায় অপারগতা থেকে যাচ্ছে। বিদেশিরা গড়ে ৭-৮ বিলিয়ন রেমিট্যান্স নিয়ে যাচ্ছে। এই বাজেটে দেশীয় উদ্যোক্তাদের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য প্রণোদনা দেওয়া এবং একই জাতীয় পণ্য আমদানিতে কর বৃদ্ধি প্রশংসনীয়।

করপোরেট কর কমানোর ফলে কোম্পানির আয়, মুনাফা বৃদ্ধি পাবে এবং কর্মসংস্থানও বৃদ্ধি পাচ্ছে কি না তদারকি করতে হবে। সরকারের প্রস্তাবিত ৫ দশমিক ৩ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব যদি প্রস্তাবিত প্রণোদনাগুলো সঠিকভাবে তদারকি করেন। বিশেষ করে পণ্যের বাজারে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণ করা।

৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রস্তাবিত প্রবৃদ্ধি অর্জনে সরকারকে বরাদ্দের পরিবর্তে সুষ্ঠু পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে নতুবা প্রতিবারের মতো বাস্তবায়ন হবে না। বিশেষ করে রাজস্ব আয় করের আওতা বৃদ্ধি ও দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। বর্তমান করোনা দুর্যোগে নতুন বড় প্রকল্প আপাতত বন্ধ রাখা এবং চলমান প্রকল্প বিদ্যমান রাখা যথার্থ হবে। এই উদ্বৃত্ত টাকা স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করা সমীচীন হবে। এ বাজেটে বয়স্ক ভাতায় নতুন যুক্ত হবেন ৮ লাখ লোক যা প্রশংসনীয় এবং সামাজিক নিরাপত্তায় ১ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দ ঘোষণা করা হয়েছে যার সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। করোনার দীর্ঘতর প্রভাবে অর্থনীতিতে শ্লথগতি বিদ্যমান। এর উত্তরণে কোনো দিকনির্দেশনা নেই।

এই অর্থবছরে সুদ বাবদ পরিশোধ করতে হবে ৬৮ হাজার কোটি টাকা তার মধ্যে ৩৮ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে সঞ্চয়পত্র বাবদ। অতএব আমাদের সঞ্চয়পত্রের পরিবর্তে অন্য উৎসের পরিকল্পনা নিতে হবে। এক কথায় বাজেটে সব খাতের উন্নয়নের এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে।

অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]