ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা  বুধবার ১৬ জুন ২০২১ ১ আষাঢ় ১৪২৮
ই-পেপার  বুধবার ১৬ জুন ২০২১

সিয়ামের কান্না
প্রকাশ: শনিবার, ১২ জুন, ২০২১, ১১:১০ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 5

ষ জুয়েল আশরাফ
সিয়াম যখন নানাবাড়িতে পৌঁছল তখন সন্ধ্যা। নানাদের উঠানে এসে দাঁড়াতেই কোত্থেকে একটা কুকুর এসে তার শরীর চাটতে লাগল। এগারো বছরের সিয়াম ভয়ে চিৎকার দিয়ে সরে গেল। ছোটমামা হেসে বলল, ভয় পাস নে সিয়াম, এটা আমাদের কুকুর। যাকে পছন্দ করে তারই শরীর চেটে দেয়।
কিন্তু কুকুরে সিয়ামের সব সময়ই ভয়। বাড়ির কুকুর হোক, পথ ঘাটের কুকুর হোক, কুকুর দেখলেই সে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে। তার নানাবাড়ির কুকুরটা আকারে বিশাল। গা ভর্তি লোম। অচেনা লোক দেখলেই জিভ বের করে হাঁসফাঁস করে, গোঙানির মতো শব্দ করে। চোখ দুটি ভয়ঙ্কর। দেখলেই মনে হবে এখনই ছুটে এসে কামড়ে ছিঁড়ে খেয়ে নেবে। কিন্তু এই কুকুরটাকে দেখতে যত পাজি মনে হয়েছিল আচরণে সেরকম মনে হলো না। সিয়াম দেখল গা চেটে দিয়েই লেজ নাড়িয়ে কুকুরটা আনন্দ প্রকাশ করতে লাগল।
মাগরিবের নামাজ পড়ে সিয়ামের নানাজান মসজিদ থেকে বাড়িতে এলো। কুকুর দেখে ভয় পেয়েছে শুনে সিয়ামকে কাছে ডাকল। নানাজান বলল, কুকুর দেখে ভয় করবি না। নিজেকে বীর মনে করবি সবসময়। নানাজান একটা দোয়া শেখিয়ে দিল। বলল, হঠাৎ কুকুর আক্রমণ করলে এই দোয়া পাঠ করবি, ইনশা আল্লাহ কুকুর চুপ হয়ে চলে যাবে। মনে থাকবে তো?
সিয়াম হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।
কুকুরের ভয়ের দোয়াটা সে নানার কাছ থেকে কাগজে লিখে নিয়েছে। যে কদিন তারা নানাবাড়িতে ছিল কুকুরটাকে দেখলেই দোয়াটা পড়ত। কাগজে লেখা দোয়া সবসময় তার পকেটেই থাকত। তৃতীয় দিনে কাগজ দেখে দোয়া পড়ার আর দরকার হয়নি, তার মুখস্থ হয়ে গেছে।
নানাবাড়ি থেকে বিদায় নেওয়ার দিন দেখা গেল কুকুরটা আশপাশে নেই। সিয়াম আনন্দে স্বস্তির শ^^াস ফেলল। মাহিয়া আপা বিরক্ত মুখে বলল, কী ছেলে রে তুই! কুকুরের ভয়ে গা ঘেঁষে থাকিস। সরে দাঁড়া, গরম লাগে।
বাসস্ট্যান্ডে এসে তারা সবাই বাসের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। বাস এসে কাছাকাছি থামতেই ছোট্ট একটা কাণ্ড ঘটল। নানাবাড়ির কুকুরটা তার দিকে দৌড়ে ছুটে আসছে। সে ভয় ও আতঙ্কে চিৎকার দিয়ে বাসভর্তি লোকের পিলে চমকে দিল। মাহিয়া আপা এবার রাগ আর লজ্জায় মাকে বলল, মা, ওকে সামলাও, নইলে কিন্তু ফুটবলের মতো লাথি মেরে জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দেব।
সিয়াম বাবাকে জাপটে ধরে ছিল। মা আশ^^স্ত করতে বলল, কী রে সিয়াম! ভয় পাচ্ছিস কেন বাবা? কুকুরটা তো তোকে বন্ধু ভাবছে। এই কটা দিন দুজনে একই বাড়িতে ছিলি, বিদায়ের সময় ওকে বলে আসিসনি, তাই তোকে বিদায়ের শুভেচ্ছা জানাতে এসেছে।
সে মায়ের কথা যাচাইয়ের জন্য জানালার বাইরে তাকাল। সত্যি সত্যিই কুকুরটা কেমন বিদায় বিরহ চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। এই প্রথম একটি প্রাণীর জন্য তার মায়া হলো। গাড়ি ততক্ষণে ছেড়ে দিয়েছে। সে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে, গাড়ি চলছে। আর কুকুরটা ছুটছে গাড়ির পিছু পিছু।
আধ ঘণ্টা বাদেই গাড়ি এসে থামল গন্তব্যস্থানে। সিয়াম বাস থেকে নেমেই চারপাশে তাকাল। কুকুরটাকে দেখতে পেল না। বাড়িতে এসে পরনের কাপড় পাল্টাবে এমন সময় মা বলল, সিয়াম আয়, কে এসেছে দেখবি।
বাইরে এসে সিয়াম অবাক। নানাবাড়ির কুকুরটা তাদের বারান্দায় দুই হাত সামনে বিছিয়ে বসে আছে। তার ভীষণ মায়া হতে লাগল। সে কুকুরটার দিকে চেয়ে আছে। কুকুরটাও তার দিকে চেয়ে আছে। জিভ বের করে হাঁফাচ্ছে।
রাতে কুকুরটাকে খেতে দিয়ে নরম একটা বস্তা বিছিয়ে দিল সিয়াম বারান্দায়। তার হাতের স্পর্শ পেয়ে কুকুরটা চোখ বুজে ঘুমিয়ে পড়ল। সিয়াম নিজের বিছানায় এসে শুয়ে শুয়ে সিদ্ধান্ত নিল নানাবাড়ির কুকুরটাকে আর যেতে দেবে না। তাদের বাড়িতেই রাখবে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই বারান্দায় এসে দেখা গেল কুকুরটা নেই। মা জানাল, রহিম চাচাকে দিয়ে নানাবাড়িতে কুকুরটাকে পাঠিয়ে দিয়েছে। সে মন খারাপ নিয়ে আবার বিছানায় এসে শুয়ে পড়ল।
দিন সাতেক পর স্কুল থেকে এসে শুনল মা বলছে, সিয়াম, কুকুরটা আমাদের বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার পর অসুখে পড়ে। কাল বিকেলে মারা গেছে।
সে স্কুলব্যাগ মেঝেতে ফেলে দিয়েই মাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে উঠল। মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, কী হলো? কাঁদছিস কেন?
সিয়াম কেন কাঁদছে জানে না। তার শুধু মনে পড়ল, কুকুরটার নির্বাক চোখের অদ্ভুত চাহনি।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]