ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শনিবার ২৪ জুলাই ২০২১ ৯ শ্রাবণ ১৪২৮
ই-পেপার শনিবার ২৪ জুলাই ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

মসজিদের দেশ
মোস্তফা কামাল
প্রকাশ: রোববার, ১৩ জুন, ২০২১, ৯:১০ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 84

মসজিদ নগরী কোনটি? একসময় এমন একটি সাধারণ বা এমসিকিউ প্রশ্ন থাকত বিভিন্ন পরীক্ষায়। বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই নির্দ্বিধায় ‘ঢাকা’ লিখতেন বা টিক দিতেন। ঢাকার অলি-গলি থেকে শুরু করে বড় রাস্তার পাশেও মসজিদের ছড়াছড়ি। তা নিয়ে দ্বিমত নেই কারও। আবার ঢাকায় মসজিদের মোট সংখ্যা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্যও নেই। মূলত মোগল আমল থেকেই মসজিদের শহরে পরিণত হয় ঢাকা। বর্তমানে নতুন অনেক মসজিদ নির্মাণ হলেও প্রাচীন মসজিদের সৌন্দর্যের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেনি।

সেই ঢাকার হাল পরিচয় মসজিদকে ঘিরে আর আবর্তিত নয়। ‘রাজধানী ঢাকা’ আর ‘নাগরিক সমস্যা’ সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছে বহু আগেই। গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন জার্নালে ঢাকা গুরুত্ব পাচ্ছে বাসযোগ্য শহরের তালিকার তলানিতে থাকা নিয়ে। বিশ্বে বাসযোগ্য শহরের তালিকায় এবারও একদম লেজে অবস্থান করছে আমাদের রাজধানী ঢাকা। নিচের দিক থেকে ফোর্থ পজিশনে। লন্ডনভিত্তিক ম্যাগাজিন দ্য ইকোনমিস্টের ইন্টেলিজেন্স ইউনিট-ইআইইউর বাসযোগ্যতার দিক থেকে বিশ্বের ১৪০ শহরের এই তালিকায় ঢাকা ১৩৭তম অবস্থানে। তালিকার সর্বশেষ ১৪০তম অবস্থানে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক। ১৩৯তম অবস্থানে নাইজেরিয়ার লাগোস এবং ১৩৮তম অবস্থানে পাপুয়া নিউগিনির পোর্ট মোরেসবির অবস্থান। অন্যদিকে বাসযোগ্য শহরের তালিকার টপ ওয়ানে নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড। দ্বিতীয় জাপানের ওসাকা। আর তৃতীয় অবস্থানে অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড।

করোনা মহামারিসহ নানা কারণে ২০২১ সালের তালিকায় বেশ পরিবর্তন এসেছে। অধিক জনসংখ্যার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশদূষণ, অপরিকল্পিত অবকাঠামো তৈরি, জলাবদ্ধতা, অনুন্নত পয়ঃনিষ্কাশন ইত্যাদি কারণে ঢাকার পজিশন নড়বড়ে হয়ে আসছে অনেক বছর থেকেই। আগেরবার ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে। এবার কিঞ্চিত উন্নতিতে নিচের দিক থেকে চতুর্থতে উঠে এসেছে। ঢাকা পরিকল্পিত নগরী গড়তে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার গলদে ধুঁকছে টানা অনেক বছর থেকেই। এলাকাভিত্তিক মানুষের ভারসাম্য না থাকা ঢাকাকে আরও নাজুক পরিস্থিতিতে ফেলেছে। করোনা মহামারি সেখানে আরও ছোবল মেরেছে। করোনার কারণে ঢাকার শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মাজা আরও ভেঙে দিয়েছে। এর উত্তরণ ঘটাতে না পারলে ভবিষ্যতে বাস অযোগ্য নগরীর তালিকায় সিরিয়ার দামেস্ককে টপকে ঢাকার এক নম্বরে ঢুকে পড়া কারও পক্ষ রোখা সম্ভব নাও হতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশে আসা বিনিয়োগকারীদের ঢাকার আবাসন ব্যবস্থা, পরিবহন খাত, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার ঘাটতি সম্পর্কিত তথ্য নানা তথ্যের নেগেটিভ প্রচার ভবিষ্যতের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে। তা দীর্ঘমেয়াদি সবর্নাশ ডেকে আনবে।

মসজিদের ঢাকার এ দশার মধ্যে বাংলাদেশে ঘটে চলছে আরেক ঘটনা। শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা দুনিয়ায় একসঙ্গে শত শত দৃষ্টিনন্দন মসজিদ নির্মাণের এক নজির বাস্তবায়ন হতে চলছে। তাও সরকারি আয়োজনে। সেই ইতিহাসের ভিত্তি গড়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া, ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণসহ শত শত প্রশংসনীয় কাজের মধ্যে মসজিদ তৈরির এ রোশনাই অনেকের কাছে ধারণাতীত। দেশজুড়ে ৫৬০টি মডেল মসজিদ নির্মাণ করে তাক লাগিয়ে দিলেন। তাও যেনতেন মসজিদ নয়, একসঙ্গে মডেল মসজিদ ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।

একসঙ্গে ৫৬০টি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার এ এক বিরল ঘটনা। প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় একটি করে মোট ৫৬০টি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপন করছেন। এর মধ্যে চলতি মুজিব বর্ষে ১০০টি মসজিদ উদ্বোধন করা হবে। প্রথম লটে ৫০টি দৃষ্টিনন্দন মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের উদ্বোধন হয়ে গেছে। মসজিদগুলোতে নারী ও পুরুষের জন্য অজু ও নামাজের পৃথক কক্ষ, ইমাম প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, হেফজখানা, গণশিক্ষা কেন্দ্র, গবেষণা কেন্দ্র, পাঠাগার, মৃতদেহ গোসলের ব্যবস্থা, জানাজার ব্যবস্থা, হজযাত্রীদের নিবন্ধন, অটিজম কর্নার, ই-কর্নারসহ আরও কত কী! এগুলোতে ইমাম-মুয়াজ্জিনের আবাসনসহ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য অফিসের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বিদেশি পর্যটকদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থাও আছে। প্রতিটি মসজিদে একসঙ্গে ১ হাজার ২০০ জন মানুষ জামাতে নামাজ আদায় করতে পারবেন। সব মসজিদ তৈরি হলে ৪ লাখ ৪০ হাজার ৪৪০ জন পুরুষ এবং ৩১ হাজার ৪০০ জন নারী একসঙ্গে নামাজ আদায়ের সুযোগ পাবেন। এসব মসজিদের লাইব্রেরিতে ৩৪ হাজার পাঠক বসে বই পড়তে পারবেন। একসঙ্গে গবেষণার সুযোগ পাবেন ৬ হাজার ৮০০ জন। দৈনিক ৫৬ হাজার মুসল্লি দাওয়াতি কার্যক্রম, প্রতিবছর ১৪ হাজার শিক্ষার্থীর হেফজ পড়া, ১৬ হাজার ৮০০ শিক্ষার্থীর প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা, ২ হাজার ২৪০ জন অতিথির আবাসনের সুবিধা থাকবে।

এই প্রকল্প বিশ্বদরবারে বাংলাদেশকে নিয়ে যাবে ভিন্ন পরিচিতিতে। নিঃসন্দেহে এই কীর্তি মুসলিম ও ইসলামের ইতিহাসে লেখা হয়ে থাকবে। ইসলামের প্রচার ও প্রসার এবং মসজিদকে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় দ্যুতি ছড়াবে এই মডেল মসজিদগুলো। আন্তর্জাতিক মানের এতগুলো মসজিদ নির্মাণ তাজ্জব করে দিয়েছে সরকারবিরোধী মহলকেও। দেশে ধর্মীয় উগ্রবাদ নির্মূলে তা ভূমিকা রাখতে পারে বলে ভাবা যায়! শেখ হাসিনার ২০১৪ সালের নির্বাচনি ইশতেহারে ইসলামী মূল্যবোধের উন্নয়ন এবং ইসলামী সাংস্কৃতি বিকাশের উদ্দেশে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় একটি করে মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণের প্রতিশ্রুতি ছিল। অনেকে তা ভুলেও গেছেন। আবার মনে রাখলেও অনেকের কাছে ছিল একেবারেই অবান্তর প্রায়, যা নির্বাচনি ওয়াদায় আকাশকুসুম দফার মতো। আট বছরের ব্যবধানে সেটিই বাস্তব হতে চলেছে। বিশে^র ইতিহাসে এই প্রথম কোনো সরকারের একসঙ্গে ৫৬০টি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ যা-তা ঘটনা নয়। কেউ কেউ বলতে চান সৌদি শেখ বাদশাহরাও এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেননি। যা শেখ হাসিনা করলেন।

 মুসলিম সমাজ আবর্তিত হয় মসজিদকে কেন্দ্র করে। ইবাদত-বন্দেগি ছাড়াও শিক্ষা, বিভিন্ন তথ্য বিতরণ এবং সামাজিক বিরোধ নিষ্পত্তির কাজও হয় মসজিদগুলোতে। মুসলমানদের কাছে সবচেয়ে সম্মানিত মসজিদ- মসজিদে হারাম, মসজিদে নববি এবং মসজিদে আকসা। এর বাইরে দৃষ্টিনন্দন মসজিদের জন্য মুসলিম বিশ্বের কোনো কোনো দেশ বাড়তি পরিচিতি পেয়েছে। তুরস্কের বিশালাকার সেলিমিয়ে মসজিদের কারণে দেশটির বাড়তি পরিচয় রয়েছে। মুসলিম বিশ্বে অটোমান সাম্রাজ্যের অন্যতম সেরা স্থাপনা এই সেলিমিয়ে মসজিদ। আকারে বিশাল এই মসজিদটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে একে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ ঘোষণা করেছে। বহু মুসলিম পর্যটক যান এই মসজিদে নামাজ পড়তে। ১৫৬৮ সালে শুরু হয়ে ১৫৭৫ সালে শেষ হওয়া মসজিদটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে।

 ৫০ হিজরিতে তিউনিশিয়ার কাইরুয়ান নগরীতে প্রতিষ্ঠিত কাইরুয়ান জামে মসজিদও এমন আরেক স্থাপত্য। ৫০ হিজরি সালে আফ্রিকা মহাদেশের প্রাচীন মসজিদটি স্থাপন করেন হজরত উকবা বিন নাফি। তাই মসজিদটি উকবা মসজিদ নামেও ব্যাপক পরিচিত। মসজিদের বিস্তৃতি প্রায় ৯ হাজার বর্গমিটার এলাকাজুড়ে এবং এটি মুসলিম বিশ্বের প্রাচীনতম মসজিদ হিসেবে পরিচিত। পরবর্তীকালে অন্যান্য মসজিদের মডেল হিসেবে গণ্য হয়। স্পেনের আলহাম্বরা, মরক্কোতে নীল আকাশ আর মহাসাগরের কোলে বাদশাহ দ্বিতীয় হাসান মসজিদ, ইরানের শিরাজ শহরের নাসির-উল-মুলক মসজিদ, দুবাইর বুর্জ আল আরব মসজিদ, আবুধাবির শেখ জায়েদ মসজিদের মতো আদল ও আয়োজনে তৈরি দেশের নানা প্রান্তরে গড়তে থাকা মসজিদগুলো বাংলাদেশকে ভিন্ন পরিচয় দেবে, তা অবলীলায় বলা যায়। বাকিটা ভবিষ্যৎ।

বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]