ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শনিবার ২৪ জুলাই ২০২১ ৯ শ্রাবণ ১৪২৮
ই-পেপার শনিবার ২৪ জুলাই ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসন প্রয়োজন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৫ জুন, ২০২১, ১১:২০ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 34

মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ
বিগত বছরগুলোতে রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতার চিত্র পর্যবেক্ষণে লক্ষ করা যায়, ঘণ্টায় মাত্র ১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতেই রাজধানীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জায়গা তলিয়ে যায়। বৃষ্টির স্থায়িত্ব বেশি হলে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় দেখা দেয় স্থায়ী জলাবদ্ধতা। এখন আষাঢ়ের শুরু, ভরা বর্ষা মৌসুম। এবার বর্ষাকালের শুরুতে খানিকটা বেশি বৃষ্টিúাত হওয়ায় রাজধানীর জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি ভয়াবহ। পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত জলমগ্ন রাজধানীর চিত্র সত্যি বিস্ময়কর। স্বাধীনতার এত বছরে কত দালানকোঠা, রাস্তাঘাট নির্মিত হলো এই শহরে। বদলে গেল পুরো ঢাকা মহানগরীর চেহারা। সামান্য বৃষ্টিতেই রাজধানী শহরের প্রধান সড়কগুলো তলিয়ে যায়। ঘরবাড়ি, দোকানপাটে পানি ঢুকে পড়ে। সড়কে রিকশা, ভ্যান ডুবে গেলে চলতে শুরু করে নৌকা। কখনও সচিবালয় এলাকাকেও জলমগ্ন হতে দেখা যায়। টানা বর্ষণে রাজধানী ও আশপাশের নিম্নাঞ্চল তলিয়ে লাখ লাখ মানুষের জীবনে নেমে আসে চরম দুর্দশা। ঢাকার মতো রাজধানী শহরে এ ধরনের জলাবদ্ধতা শুধু জনজীবনে ভোগান্তি সৃষ্টি করে না যানজটে মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ায় বছরে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়।
অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা প্রায় ২ কোটি মানুষের বসবাসের মহানগরী ঢাকায় খাল, নিচু জায়গাগুলো ভরাট করে পরিকল্পনাহীনভাবে বাড়িঘর, রাস্তাঘাটসহ নানা ধরনের স্থাপনা, নগর অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সড়কে উন্নয়ন কাজে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়িতে ছোট-বড় গর্তের সৃষ্টি হয়। এসব গর্তে পানি জমে যানবাহন চলাচল অনুপযোগী হয়ে পড়ে। পর্যাপ্ত ড্রেনেজ না রেখে অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে রাজধানীর বেশিরভাগ এলাকার পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ছোটবড় নালা-নর্দমা সারা বছর ধরে ময়লা-আবর্জনায় পরিপূর্ণ থাকায় বৃষ্টির অতিরিক্ত পানি ধারণ করতে পারে না। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীর অনেক এলাকা পানিতে ডুবে যায়। ঢাকা শহরে কঠিন বর্জ্য অপসারণের জন্য নেই পর্যাপ্ত সংখ্যক উপযুক্ত ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ডাস্টবিন ও কন্টেইনার। যা আছে তাও কর্তৃপক্ষ নিয়মিত পরিষ্কার করতে সক্ষম নয় বলে ময়লা উপচে রাস্তার পাশে উন্মুক্ত ড্রেনে গিয়ে পড়ে এবং ড্রেনে সিউয়েজ প্রবাহ বন্ধ করে দেয়। উপরন্তু ঢাকা অপেক্ষাকৃত কম ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রেনে বৃষ্টির অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের পথ না থাকায় বর্জ্যমিশ্রিত বৃষ্টির পানি ড্রেন উপচিয়ে রাস্তাঘাট তলিয়ে দেয়। জলাবদ্ধ পানি পচে পরিবেশকে করে তোলে বিষময়, বাড়ে পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব।
মাঝ জ্যৈষ্ঠে বেশ কদিন ধরে থেমে থেমে বৃষ্টিপাত হওয়ায় এবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি প্রকট আকার ধারণ করে। ১ জুনের ৩ ঘণ্টার ৮৫ মিলিমিটার বৃষ্টিতে ঢাকা মহানগরীর কোনো কোনো এলাকা জলমগ্ন জনপদে রূপ নেয়। কোথাও দেখা যায় হাঁটুপানি। বনানী, গুলশানের প্রধান সড়কগুলোতেও দেখা দেয় যানজট। বাণিজ্যিক এলাকার অনেক মানুষকে দোকানপাট বন্ধ রেখে ফিরতে হয়েছে বাড়িতে। বিগত বছরগুলোতে রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতার চিত্র পর্যবেক্ষনে লক্ষ করা যায়, ঘণ্টায় মাত্র ১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতেই শহরের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জায়গা তলিয়ে যায়। বৃষ্টির স্থায়িত্ব বেশি হলে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় দেখা দেয় স্থায়ী জলাবদ্ধতা। আর বর্ষণ মানেই রাজধানীবাসীর জন্য চরম ভোগান্তি, সীমাহীন বিড়ম্বনা। খানাখন্দে ভরা রাস্তায় জমে থাকা বৃষ্টির পানিতে কাত হয়ে পড়ে যাত্রীবাহী বাস, জলে ডোবা গর্তে পড়ে আহত হয় নগরবাসী। নিম্নমানের রাস্তার ওপর অল্প সময় পানি জমে থাকলে সড়ক কাঠামো নড়বড়ে হয়ে যায়। সড়কের উপরিতলের বিটুমিন, খোয়া, ইট-সুরকি উঠে গিয়ে ছোট-বড় গর্ত তৈরি হয়। রাস্তা হয়ে পড়ে যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী। কর্মজীবী মানুষের নিত্য যাতায়াতের সঙ্গী রিকশা স্কুটারের ভাড়া বেড়ে যায় দ্বিগুণ, তিনগুণ। বিভিন্ন সড়ক, ঘরবাড়ি, দোকানপাটে পানি ঢুকে পড়ে। সড়কে রিকশা, ভ্যান ডুবে গেলে চলতে শুরু করে নৌকা। গাড়ির ইঞ্জিনে পানি ঢুকে অচল হয়ে পড়ে। দেখা দেয় যানজট। টানা বর্ষণে রাজধানী ও আশেপাশের নিচু এলাকা তলিয়ে লাখ লাখ পানিবন্দি মানুষের জীবনে নেমে আসে চরম দুর্দশা। দিনমজুর, খেটে খাওয়া নিম্নআয়ের মানুষের রুটিরুজিতে টান পড়ে। ব্যবসা-বাণিজ্যে ভাটা পড়ে। দেখা দেয় খাবার পানির তীব্র সঙ্কট। ঢাকার মতো রাজধানী শহরে এ ধরনের জলাবদ্ধতা দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
রাজধানীর জলাবদ্ধতা অনেক দিনের পুরনো। অতীতে এই শহরে ৬৫টি খাল, ২ হাজার পুকুর এবং আড়াই হাজার ক্যাচপিট ছিল। এসব দিয়ে সহজে রাজধানীর প্রশস্ত খালগুলোতে পানি নিষ্কাশিত হতো। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, ধলেশ^রী, শীতলক্ষ্যা পানি নিষ্কাশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতো। কিন্তু বর্তমানে ঢাকার আশপাশের নদী, খাল-নালাসহ প্রাকৃতিক জলাধারগুলো ভরাট ও অবৈধ দখলদারের হাতে চলে যাওয়ায় আজ তা অস্তিত্বহীন। বিলুপ্তপ্রায় এসব খালের সঙ্গে আজ আর নদীর কোনো সংযোগ নেই। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে তৈরি প্রয়োজনের চেয়ে সরু বক্স কালভার্টগুলো বৃষ্টির পানি অপসারণে তেমন কাজে আসে না। অনেকক্ষেত্রে এসব কালভার্টে পলিথিনের মতো অপচনশীল কঠিন বর্জ্য আটকে বৃষ্টির পানি নির্গমন পথ বন্ধ হয়ে যায়। রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজে নিয়োজিত ডিসিসি এবং ওয়াসা পানি নিষ্কাশনের দায়িত্ব পালন করে। বক্স-কালভার্ট ও স্টর্ম-সিউয়ারগুলো সময়মতো পরিষ্কার না হওয়ায় রাজধানীর জলাবদ্ধতা দূরীকরণের জন্য ব্যয়কৃত অর্থ তেমন কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেনি। ঢাকা মহানগরীর ড্রেনেজ ও সøুইস গেটের অব্যবস্থাপনা জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ। ড্রেনের পানি সøুইস গেটের মাধ্যমে ঢাকার চারপাশের নদীতে ফেলা হয়। কিন্তু বৃষ্টির সময় কখনও সøুইস গেট বন্ধ থাকায় অল্প বৃষ্টিতেই ঢাকার প্রাণকেন্দ্রসহ অন্যান্য এলাকা ডুবে যায়। আবার কোথাও ড্রেনেজের মুখ ছোট হওয়ায় এবং আবর্জনায় প্রবেশমুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে পারছে না। ঢাকাবাসীর নাগরিক সেবা দান একক কোনো সংস্থার অধীনে নয়। মহানগরীর জলাবদ্ধতার মতো প্রকট সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব অনেকগুলো অধিশাখার ওপর ন্যস্ত। একসময় ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনের দায়িত্ব ছিল জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের ওপর। ১৯৮৯ সালে তা ওয়াসার ওপর ন্যস্ত হয়। এরপর ৩৬০ কিলোমিটার পানি নিষ্কাশনের বড় নালা তৈরি করে ওয়াসা। এ ছাড়া সংস্থাটির আওতাধীন রয়েছে মোট ৭৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে ২৬টি খাল ও ১০ কিলোমিটার বক্স-কালভার্ট। এসবের রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন গবেষণার জন্য সংস্থাও রয়েছে। কিন্তু নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ লক্ষ করা যাচ্ছে না।
রাজধানীতে বছরজুড়ে নানা উন্নয়নমূলক কাজে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি চলে। সাধারণত বর্ষায় বার্ষিক বাজেট শেষ হওয়ায় রাস্তা খোঁড়ার কাজ বেড়ে যায়। সেই রাস্তা যথাযথভাবে মেরামতের জন্য নির্দিষ্ট সংস্থাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। কখনও সিটি করপোরেশন, কখনও ওয়াসা, আবার কখনও অন্যান্য সেবামূলক সংস্থার উন্নয়ন কাজে রাস্তা খুঁড়ে জলাবদ্ধতাকে বাড়িয়ে তোলে। এসব সংস্থার মধ্যে কাজের সমন্বয়সাধন করেই জলাবদ্ধতার মতো একটি সমস্যার সমাধান করতে হবে। আর তা না হলে হাজার হাজার কোটি টাকার নানা প্রকল্প গ্রহণের কোনো উদ্যোগই কাজে আসবে না। মহানগরীর হারিয়ে যাওয়া নদী ও খালগুলোকে দখলমুক্ত করে যথাযথ সংস্কার করা ছাড়া কখনই জলাবদ্ধতা দূর করা যাবে না। আগামীতে নগরায়ণ প্রক্রিয়াকে একটি পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনতে হবে। বৃষ্টির পানি সহজে সরে যেতে না পারলে জলাবদ্ধতা ঠেকানো সম্ভব হবে না। এ ছাড়া বর্ষা মৌসুমের আগেই ভরাট হয়ে যাওয়া খাল-নদী খনন, খালের তলদেশে জমাকৃত বর্জ্য অপসারণ করে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সচল রাখতে পারলে তা আগামীতে রাজধানীর জলাবদ্ধতা প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। ঢাকা মহানগরীর জলাবদ্ধতার জন্য দায় রয়েছে সব সেবাদানকারী সংস্থার। জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য অনেক আগে থেকে প্রস্তুতি থাকা দরকার। বর্ষা শুরুর আগেই খাল ও নর্দমাগুলো ওয়াসার পরিষ্কার করে ফেলতে হবে। আর সিটি করপোরেশনকেও রাস্তা মেরামতের সব কাজ বর্ষা শুরুর আগেই শেষ করতে হবে। কেননা এসব সংস্কারমূলক কাজ বর্ষার সময় সূচারুরূপে সমাধা করা সম্ভব হয় না। উপরন্তু বৃষ্টিপাতের সময় নগর উন্নয়ন ও সংস্কারমূলক কাজ জলাবদ্ধতাকে বাড়িয়ে তোলে। একের দায় অন্যের ওপর না চাপিয়ে নাগরিক সেবাদানকারী সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণই হতে পারে জলাবদ্ধতার মতো একটি প্রকট সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ।

ষ সাবেক প্রকৌশলী ও শিক্ষক








সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]