ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শনিবার ২৪ জুলাই ২০২১ ৯ শ্রাবণ ১৪২৮
ই-পেপার শনিবার ২৪ জুলাই ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

ভ্যাকসিন নিয়ে ব্যবসা
বাধন অধিকারী
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৭ জুন, ২০২১, ১০:৫৬ পিএম আপডেট: ১৭.০৬.২০২১ ১২:২৪ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 65

করোনা প্রতিরোধের লড়াইকে বিশ^জুড়েই ‘কোভিডের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ নামে অভিহিত করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ-পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রথম বিশ^যুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ আর ভিয়েতনাম যুদ্ধ মিলে সে দেশের যত মৃত্যু হয়েছে, তার চেয়ে বেশি আমেরিকান মারা গেছে করোনায়। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার পাশাপাশি স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সবাই বলছেন, করোনা মোকাবিলার শেষ অস্ত্র ভ্যাকসিন। প্রশ্ন হলোÑ দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের সময় যেখানে সব শিল্পকে যুদ্ধাস্ত্র তৈরিতে লাগানো হয়েছিল, এখন কেন করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে এত সঙ্কট? বিশ্লেষকরা বলছেন, কারণটা বাণিজ্যিক। ধনী দেশগুলোর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ভ্যাকসিনের মেধাস্বত্ব আটকে রেখে কিছু ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিকে একচেটিয়া ব্যবসার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এতে অনেক দেশের প্রযুক্তি সক্ষমতা থাকলেও ভ্যাকসিন উৎপাদন করতে পারছে না।
জন্স হপকিন্স বিশ^বিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য ও জননীতি বিষয়ের অধ্যাপক ভিসেন্ট ন্যাভারো। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সের ব্লগসাইটে তিনি লিখেছেন, ভ্যাকসিন সঙ্কট একটা ‘ফালতু’ কথা। কেবল ধনী দেশ নয়, অনেক দরিদ্র দেশেরও ভ্যাকসিন তৈরির সক্ষমতা রয়েছে। প্রশ্ন হলোÑ সক্ষমতা থাকার পরও তা ব্যবহার করা যাচ্ছে না কেন? অধ্যাপক ভিসেন্ট ন্যাভারো বলছেন, ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পথে প্রধান ও মৌলিক উপাদান হলো জ্ঞান। সেই জ্ঞান ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর নয়, জনগণের করের টাকায় পরিচালিত সরকারি উদ্যোগের গবেষণার মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়। ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো কেবল সেই জ্ঞানকে ব্যবহার করে নিজস্ব প্রযুক্তির মাধ্যমে।
অধ্যাপক ন্যাভারো যা বলছেন, তাতে শতভাগ সাই দিয়েছেন ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্সের মহাপরিচালক থমাস কুনি। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে তিনি নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, এটা খুবই সত্য যে ইউএস বায়োমেডিকেল অ্যাডভান্সড রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অথরিটি কিংবা জার্মান ফেডারেল মিনিস্ট্রি অব এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর পাবলিক ফান্ড ছাড়া কোনোভাবেই ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর পক্ষে এত দ্রুত ভ্যাকসিন উদ্ভাবন ও প্রয়োগের ব্যবস্থা করা সম্ভব হতো না। অধ্যাপক ভিসেন্ট ন্যাভারো বলছেন, থমাস কুনি যা বলেননি, তা হলোÑ জনগণের অর্থে পরিচালিত গবেষণার মধ্য দিয়ে উদ্ভাবিত টিকা নিয়ে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোকে মনোপলি ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে; সুযোগ দেওয়া হচ্ছে বিপুল পরিমাণ মুনাফারও।
সে কারণেই করোনার ভ্যাকসিন যতটা না মহামারি মোকাবিলার, তার চেয়েও বড় অস্ত্র মুনাফার। ২০ মে তারিখে দ্য পিপলস ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স জানায়, করোনার শুরুর পর থেকে অন্তত ৯ জন নতুন বিলিয়নারির জন্ম হয়েছে। তারা যে পরিমাণ মুনাফা করেছেন, তা দিয়ে দরিদ্র দেশগুলোর সব মানুষকে ১ দশমিক ৩ বার টিকা দেওয়া সম্ভব। কিন্তু ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর একচেটিয়া অধিকারের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। অধ্যাপক ন্যাভারো বলছেন, টিকার অভাব নয়, রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইনে সংরক্ষিত বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তির অধিকারই কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করেছে। মহামারির ব্যাপকতা ও লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু প্রতিরোধ না করে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো বিপুল পরিমাণ মুনাফা করে যাচ্ছে। তার মতে, করোনার টিকাকে জনগণের পণ্য ভাবা উচিত। কোনোমতেই মেধাস্বত্ব থাকা উচিত নয়। এই মেধাস্বত্বের কারণেই অনেক দেশ নিজেদের প্রযুক্তি থাকার পরও ভ্যাকসিন উৎপাদন করতে পারছে না।
বাণিজ্যের জন্য মেধাস্বত্বের বড় নিয়ামক বিশ^ বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও)। গত বছরের আগস্টেই ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা ডব্লিউটিওর কাছে ভ্যাকসিনের মেধাস্বত্ব সাময়িক প্রত্যাহারের দাবি জানায়। জাতিসংঘ ও বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থাসহ একশরও বেশি দেশ এই দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করে। এ বছর মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন এই দাবির প্রতি নিজেদের সমর্থন জানায়। তবে ৩১ মে এ নিয়ে ডব্লিউটিওতে আলোচনা হলেও সঙ্কটের সমাধান হয়নি। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট এই প্রস্তাবের পক্ষে অবস্থান নিলেও ইউরোপীয় কমিশন এখনও পেটেন্ট ছাড়ের বিপক্ষে। করোনার টিকা উৎপাদনকারী ফাইজার-বায়োএনটেকসহ বড় বড় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিও এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। বিরোধিতা করছে বিশ^ব্যাংকও। তাদের যুক্তি, এতে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর ব্যবসা ব্যাহত হবে।
মেধাস্বত্ব আটকে রেখে একচেটিয়া টিকা পাওয়ার ক্ষেত্রে এই ব্যবসা বিপুল অসমতার জন্ম দিয়েছে। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন এটি ‘ভ্যাকসিন বর্ণবাদ’। কলম্বিয়ার ইউনিভার্সিটি অব অ্যান্ডেজের সমাজতত্ত্বের অধ্যাপক তাতিয়ানা আন্দিয়া রে মনে করেন, স্বাস্থ্য সুরক্ষা পাওয়ার মৌলিক মানবাধিকারকে উপেক্ষা করে ভ্যাকসিন বর্ণবাদ তৈরি হচ্ছে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনায়। শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে ‘ভ্যাকসিন কূটনীতি’ জারি করে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোকে একচেটিয়া মুনাফার পথ করে দেয়।
হার্ভার্ড বিশ^বিদ্যালয়ের বিশ্লেষক অ্যালিসিয়া ইয়ামিন ও পল ফার্মার অবশ্য ‘ভ্যাকসিন বর্ণবাদ’কে কেবল মানবাধিকারের সঙ্কট হিসেবে দেখছেন না। তারা একে দেখছেন রাজনৈতিক অর্থনীতি সমস্যা হিসেবে, যে ব্যবস্থায় টিকা বাণিজ্যের মনোপলি প্রতিষ্ঠা হয়। ক্ষুণ্ন হয় বৈশি^ক ন্যায়বিচারও।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]