ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শুক্রবার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ ২ আশ্বিন ১৪২৮
ই-পেপার শুক্রবার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট কেন অতি ধুরন্ধর প্রাণঘাতী?
শেখ আনোয়ার
প্রকাশ: শনিবার, ২৬ জুন, ২০২১, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 201

দেড় বছরেরও বেশি সময় হতে চলল পৃথিবীজুড়ে চলছে কালান্তক করোনার কালবেলা। করোনার হানায় বদলে গেছে দৈনিক রোজনামচা। গতি হারিয়েছে স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ। মারণব্যাধির দাপটে পর্যুদস্তু জনজীবন। দিনরাত এক করে বিজ্ঞানীরা আলোচনা, গবেষণা চালালেও এখনও পর্যন্ত অধরা এই রোগ থেকে মুক্তির সদুত্তর মেলেনি। যার ফলে দিন যতই যাচ্ছে ততই নিত্যনতুন উপসর্গ নিয়ে হাজির হচ্ছে করোনাভাইরাস। বাংলাদেশেও রূপ বদলানো ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট বা ডেল্টা করোনাভাইরাসের দাপট স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের কাছে আতঙ্ক ও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ধুরন্ধর-ধূর্ত ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট করোনা
মনে করুন গ্রিক দার্শনিক, প্লেটো, হেরাকলিটাস, প্লুটার্র্কের সেই থিসিয়াসের জাহাজের ধাঁধা। সেই রকম যদি কোনো জীবাণুর জিনে এত পরিবর্তন ঘটে যায়, সে কি আর সেই আগের ভাইরাস থাকে? না শুধু নামেই করোনা, কিন্তু তার আড়ালে এক নতুন প্রজাতির ভাইরাস? আগে শরীরে তৈরি হওয়া ভাইরাসের অ্যান্টিবডি দিয়ে আটকায় না এই ডেল্টা প্রজাতি। এমনকি আগে একবার করোনা ইনফেকশন হলেও সুরক্ষা নেই। ঠিক ধুরন্ধর রাজনীতিবিদদের মতো ধূর্ত জঘন্য এই ডেল্টা করোনাভাইরাস, যা মিউটেশন করে নিজের প্রোটিনের গঠনকে রদবদল করে ফেলার ক্ষমতা রাখে। এই ভাইরাসের প্রাণভোমরা এতটাই খতরনাক যে, এটি হাজার হাজার বার কপি করে ফেলে ভাইরাসের আরএনএ জিনোমকে। একেকটি কপি থেকে তৈরি হয় একেকটি জ্যান্ত ভাইরাস। আবার অন্যদিকে ভাইরাসের আরএনএ ছাড়াও তৈরি হয় বিভিন্ন রকমের মেসেঞ্জার আরএনএ। তার থেকে তৈরি হয় বিভিন্ন রকমের প্রোটিন যা আরএনএ জিনোমের সঙ্গে মিশে তৈরি করে আরও নতুন ভাইরাস। এই নতুন ভাইরাস বানাবার সময় নিজেকে সাজিয়ে গুছিয়ে নেয় দেহ কোষের গলগি বডি (নিউক্লিয়াসের নিকটে অবস্থিত দুই স্তরবিশিষ্ট ঝিল্লি দিয়ে বেষ্টিত নালিকা, জালিকা, ফোস্কা, থলি ইত্যাদি আকৃতির সাইটোপ্লাজমীয় অঙ্গাণুকে গলগি বডি বলা হয়।) যন্ত্রকে চাকর হিসেবে ব্যবহার করে। তারপর সোজা পৌঁছে যায় কোষের মেমব্রেনে। মেমব্রেনের লিপিডকে ছিনিয়ে নিয়ে নিজেকে ঢেকে নেয় বর্মে। আবার আক্রমণ করে নতুন দেহ কোষকে। ঘটনাগুলো একটা ক্রাইম সিরিজের গল্পের মতো শোনালেও এসবের সত্যি উপাদান বিজ্ঞানীরা সংগ্রহ করেছেন এই সাংঘাতিক মৃত্যুদূতকে ল্যাবরেটরিতে কালচার করে।
ভারতীয় ভ্যারিয়েন্টে কেন ভ্যাকসিন অচল?
বিশেষজ্ঞের মতে, সংক্রমণ বেশি ছড়িয়ে পড়লে ভাইরাস রূপ পাল্টে আরও দুর্দম হয়ে ওঠে। অতি সংক্রামকের পাশাপাশি ডেল্টা প্রজাতি কোভিডের চেনা উপসর্গ সব সময় দেখা যায় না। তখন তাকে ওষুধ দিয়েও রোখা যায় না। করোনার
তৃতীয় ঢেউ বয়ে এনেছে কোভিডের এই নতুন প্রকারভেদ- ডেল্টা। করোনার ডেল্টা প্রজাতির প্রভাবের মধ্যেই এখন ভাইরাসটির সাউথ আফ্রিকান, নাইজেরিয়ান ও ইউকে ভ্যারিয়েন্টও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বিজ্ঞানীরা জানান, ‘এভাবে যত করোনার প্রজাতির বিবর্তন ঘটবে, ড্রাগ কাজ নাও করতে পারে। ততই টিকার শক্তি হ্রাস হওয়ার একটা আশঙ্কা রয়ে যায়।’ সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ‘ভাইরাসের ডেল্টা প্রজাতির সামনে ক্রমে শক্তি হারাচ্ছে টিকা।’ তাই ডেল্টা প্রজাতি আতঙ্কে চিন্তা বাড়ছে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের।
খতরনাক ভারতীয় ভ্যারিয়েন্টের থাবা
ডেল্টার মিউটেশন এক দিনের মধ্যে হয়নি। যত নতুন মানুষের শরীরে ভাইরাস ঢুকেছে, তত নতুন মিউটেশন হয়েছে। এভাবে জিনের পরিবর্তন জমা হতে হতে একদিন আবির্ভূত হয়েছে এই ডেল্টা নামের রক্তবীজের বংশ। দারুণ সংক্রমণের ক্ষমতা।
হু হু করে ছড়িয়েছে শহর থেকে শহরে, তারপর গ্রামে। সম্প্রতি প্রতিবেশী দেশ ভারতে করোনার ভয়াবহতায় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট একটি মুখ্য ভূমিকা পালন করে। দেশটিতে ২০২০ সালের অক্টোবরে প্রথম এই প্রজাতি দেখা দেয়। ২০২১ সালের ৩১ মে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যে নতুন করোনাভাইরাসের শ্রেণিবিভাগ প্রকাশ করে, সেখানে ডেল্টা, ডেল্টা প্লাস এবং আরও তিন প্রজাতির সঙ্গে রয়েছে ভ্যারিয়েন্ট অব কনসার্নড শ্রেণিতে। মানে এই ভ্যারিয়েন্টকে নিয়ে পৃথিবীজুড়েই দুশ্চিন্তা রয়েছে। ভারতজুড়ে তাণ্ডব চালানোর পর এটি এখন মহাসাগর পেরিয়ে ইউরোপে পাড়ি দিয়েছে। মারাত্মক ছোঁয়াচে ডেল্টা সংস্করণ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মাথাচাড়া দিতে শুরু করেছে। ডেল্টা সংস্করণ নিয়ে দুশ্চিন্তায় জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা মার্কেল। ব্রিটেনে করোনা ভাইরাসের দৈনিক সংক্রমণ প্রায় চার মাস পর আবার দশ হাজারের মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। নতুন করে আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৯৫ শতাংশই ডেল্টা সংস্করণ বহন করছে। ফলে হাসপাতালের ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিটের ওপর চাপ এবং মৃতের সংখ্যা বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। ব্রিটেনে শিশুদের মধ্যে এই সংস্করণ ছড়িয়ে পড়ার কারণে শিশুদেরও টিকা দেওয়ার কথা আলোচনা হচ্ছে। ব্রিটেনের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনেক দেশেও করোনায় আক্রান্তদের মধ্যে এই ভ্যারিয়েন্টের অনুপাত বেড়ে চলেছে। ডেল্টা সংস্করণের প্রসার নিয়ন্ত্রণ করতে পর্তুগালের রাজধানী লিসবন দেশের বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। রাশিয়ার রাজধানী মস্কো থেকেও ডেল্টা সংক্রমণের হার বাড়ার খবর পাওয়া যায়। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে দৈনিক সংক্রমণের হার প্রায় তিন হাজার থেকে সাত হাজার ছুঁয়েছে।
ভ্যারিয়েন্ট কেন ভয়ঙ্কর?
বিজ্ঞানীরা বলেছেন, ‘অপ্রতিরোধ্য ডেল্টা প্রজাতির ভাইরাসকে ভ্যাকসিন দিয়েও মারা যায় না। ভাইরাসের মধ্যেই জিন পরিবর্তনের ক্ষমতা থাকে এবং সেই মিউটেশন হতে পারে চোখের নিমিষে।’ সাধারণ করোনাভাইরাস রোগীর শরীরে বেশিদিন বেঁচে থাকে না। কিন্তু সাত থেকে চৌদ্দ দিনের মধ্যেই ভাইরাস যখন কোষের মধ্যে বংশবৃদ্ধি করে, তখনই মিউটেশন হয়। অর্থাৎ, ভাইরাস যত নতুন নতুন মানুষের শরীরে ঢুকবে, ততই নতুন মিউটেশন হওয়ার আশঙ্কা! করোনার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সেই ২০১৯ সালের ভাইরাস এখন শুধু নামেই রয়েছে। এখনকার ভাইরাসের জিনে ইতোমধ্যে ঘটে গেছে আমূল পরিবর্তন। বিবর্তনের ইতিহাসে মিউটেশন এক অতি প্রয়োজনীয় ঘটনা। মনে করুন, যদি মিউটেশন না হতো, তা হলে ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হতো। সেই অ্যান্টিবডি আস্তে আস্তে সংক্রমণ কমিয়ে আনত। কিন্তু ভাইরাস চাইবে নিজের জিনের সংরক্ষণ। মানুষ যেমন তার ওষুধ, ভ্যাকসিন ইত্যাদি অস্ত্র নিয়ে জীবাণুজগতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে, তেমন ভাইরাসেরও অস্ত্র রয়েছে সেই আক্রমণ প্রতিহত করার। মিউটেশন হলো সেই গোপন অস্ত্র। জিনের পরিবর্তন ভাইরাসের বাহ্যিক রূপে বদল এনে ভয়ঙ্কর করে তোলে। আগের ওষুধ, আগের ভ্যাকসিন, সবই তখন অচল, অসহায় হয়ে যায়!
গ্রামাঞ্চলে কি ভ্যারিয়েন্ট করোনা?
গ্রামাঞ্চলে ঘরে ঘরে বাড়ছে করোনার উপসর্গ জ্বর, সর্দি-কাশি, গা ব্যথা ও ডায়রিয়া। মৌসুমি জ্বর-জারি বলে এড়িয়ে যাচ্ছেন অনেকেই। বেশিরভাগ লোক ডাক্তার দেখাতে অনীহা প্রকাশ করছেন। অনেকে সামাজিক বয়কটের শিকার হওয়ার শঙ্কায় বিষয়টি চেপে যাচ্ছেন। সচেতনতার অভাবে অধিকাংশ মানুষ করোনার উপসর্গ দেখা দেওয়ার পরও টেস্ট করাচ্ছে না। তাদের বারবার বলেও কাজ হচ্ছে না। যা ভয়াবহ পরিণতির ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে গবেষকরা মনে করেন। গ্রামে গ্রামে এখন যে অবস্থা, তাতে ব্যাপকভাবে নমুনা পরীক্ষা করে শনাক্ত নির্ণয় করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া না গেলে বিস্ফোরণের মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। তখন তা কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে যদি ভাইরাস আরও অপ্রতিরোধ্য হয়ে যায়, তাহলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু মৃত্যু প্রত্যক্ষ করা ছাড়া আমাদের সামনে বিকল্প কিছু থাকবে না। তাই বাড়ি বাড়ি গিয়ে নমুনা পরীক্ষা করা ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই। স্বাস্থ্য বিভাগকে এ ব্যাপারে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।
ভ্যারিয়েন্ট মোকাবিলায় প্রস্তুতি কতটা?
করোনাভাইরাস পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় সাত জেলায় লকডাউন ও ঢাকার বিভিন্ন প্রবেশপথে বাইরের জেলা থেকে জরুরি পরিবহন ছাড়া সব যানবাহন প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলেও শত শত মানুষ, যে যেভাবে পারছে আসছে ঢাকায়। ঢাকার রাস্তায় বের হলে মনে হয় করোনাভাইরাসের কোনো অস্তিত্ব নেই। বাজারের ভিড় কিংবা যানজটে আটকে থাকা অবস্থাতেও অনেকে মাস্ক পরার বিষয়টি গ্রাহ্য করেন না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা অবশ্যই দ্রুততার সঙ্গে বন্ধ করতে হবে। বিশেষ করে জনাকীর্ণ এলাকাগুলোতে। এমন অবস্থায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় যে খোলেনি, এটা ভালো কাজ হয়েছে। পাশাপাশি এক জায়গায় অনেক লোক জড়ো হওয়ার ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে। দেশব্যাপী স্বাস্থ্যবিধি কার্যকর করার জন্য মাস্ক পরা ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। গবেষকদের আশঙ্কা, করোনা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে ঢিলেঢালা ভাব ও মানুষের মধ্যে অসচেতনতার ফলে যেকোনো সময় করোনার সংক্রমণ হু হু করে ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। করোনার প্রভাব যদি দীর্ঘায়িত হয়, তা হলে পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা বলা কঠিন। আমাদের অবশ্যই আসন্ন বিপদ সতর্কতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। মহামারির একেবারে শুরুর দিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরীক্ষা, আক্রান্ত ব্যক্তিদের বিচ্ছিন্নকরণ ও কন্ট্যাক্ট ট্রেসিংয়ের ওপর জোর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। তাই এটিই এই ভাইরাসের প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্যোগ। এমন পরিস্থিতিতে চলাচলে জনসাধারণকে বিধিনিষেধ ও স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলতে ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর হতে হবে। সরকারকে অবশ্যই এ অবস্থায় করোনা পরীক্ষায় কোনো শৈথিল্য দেখালে চলবে না। পরীক্ষা বাড়ালে অ্যাক্টিভ করোনা রোগী অকল্পনীয় বেড়ে যাবে। সামান্য জ্বর-সর্দির সমস্যা
থাকলেও সরকারি হাসপাতালে বিনা খরচায় লালারস পরীক্ষা করতে হবে। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বিনামূল্যে পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। করোনা রোগীরা যাতে দ্রুত নিকটবর্তী হাসপাতালে ভর্তি হতে পারে, তার সব ব্যবস্থা তৈরি রাখতে হবে। সংক্রমিত ব্যক্তির যথাযথ চিকিৎসা দিতে হবে। করোনার ওষুধ ও অক্সিজেনের মজুদ বাড়াতে হবে। আইসিইউ ব্যবস্থাসহ সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার সুযোগ আরও অনেক বাড়াতে হবে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোর চিকিৎসার মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি সেবামূল্য যৌক্তিক করতে হবে। শুধু রোগীকে নয়, কেউ সংক্রমিত হলে তার সংস্পর্শে যারা এসেছেন, তাদের সবাইকে পরীক্ষার আওতায় আনতে হবে এবং অবশিষ্ট সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে হবে। কোয়ারেন্টাইন ও আইসোলেশনের ব্যবস্থা আরও অনেক কঠোরভাবে বাড়াতে হবে। যাতে করে তাদের কারণে অন্যের সংক্রমণ না বাড়ে।
ভ্যারিয়েন্ট কি করোনার শেষ?
জি না। ডেল্টা প্রজাতিতেই করোনা মহামারির শেষ নয়। হয়তো কিছুদিন পরে আবার আসবে নতুন মিউটেশন। তার ধ্বংসের ক্ষমতা হয়তো হবে আরও বেশি। কিংবা আমাদের সৌভাগ্য হলে, হয়তো কমে যাবে ভাইরাসের তেজ। ১৯১৮ সালের ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারির সময়ে এ রকমই হয়েছিল। তিন বছর তাণ্ডব চালানোর পর হঠাৎ করেই ভাইরাস বিদায় নিয়েছিল। ভ্যাকসিন নেওয়া থাকলে তাতে কিছুটা হলেও সুরক্ষা দেবে। তাই ভ্যাকসিন নিতেই হবে। তবে বিশ্বজুড়েই এখন ভ্যাকসিনের সঙ্কটকাল। অনেক দেশ যেখানে এখনও ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু করতে পারেনি। তার মধ্যেও শেখ হাসিনা সরকার পাঁচ মাস আগে বাংলাদেশে গণটিকাদান শুরু করে। ভ্যাকসিন সঙ্কটের কারণে টিকাদান ব্যাহত হলেও করোনা পরিস্থিতিতে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশই এখন সব থেকে ভালো অবস্থানে রয়েছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ যেন ভবিষ্যতে করোনাভাইরাসের টিকা তৈরি করতে পারে, সেই ব্যবস্থাও করছে সরকার। তবুও আমাদের মনে রাখা দরকার, জীবাণু জগতের বিরুদ্ধে যুদ্ধটা অত সহজ নয়। আজ থেকে তিন বা চার হাজার বছর আগেকার মিসরীয় মমির অস্থির মধ্যে টিবির জীবাণু পাওয়া গেছে। আজ চার হাজার বছর ধরে যক্ষ্মার সঙ্গে আমাদের লড়াই চলছে। করোনা তো সবে দেড় বছর! তবে মানবজাতি নিশ্চিহ্ন হয়নি ভয়ঙ্কর অসুখের প্রকোপেও। তাই লড়তে হবে। মৃত্যু কমিয়ে আনার জন্য সবাইকেই সহযোগিতা করতে হবে। পালন করতে হবে সুস্থ ও স্বাস্থ্যকর জীবন। আগের মতো আবার জীবন আর জীবিকা কিছুদিন স্থগিত না করে উপায় নেই। অর্থনৈতিক লাভালাভের হিসাব ভুলে সবাই মিলে অসামান্য দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রয়োজনীয় উৎপাদনমুখী কাজগুলো চালু রেখে, অল্পে সন্তুষ্ট থেকে দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে, সামাজিক দূরত্ব মেনে, ঘরে বসে থেকে, বাইরে বের না হয়ে প্রতিরোধ দুর্গ টিকিয়ে রাখার বিকল্প নেই।
শেষ কথা
করোনায় দেশজুড়ে আমরা অসংখ্য এমন মানুষকে হারিয়েছি, যাদের এত তাড়াতাড়ি পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ছিল না। সর্বাত্মক লকডাউন বা কড়া বিধিনিষেধে এখন যেটুকু বেকারত্ব হবে, তা হয়তো অর্থনীতি স্বাভাবিক হলে দ্রুত পূরণ হবে। অতীতেও তা হয়েছে। কিন্তু যে প্রাণগুলো করোনার আঘাতে চলে যাচ্ছে, তার পূরণ তো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই অর্থনীতির অজুহাতে বিচলিত হয়ে পড়ার পুনরাবৃত্তি যেন এবার না ঘটে। আত্মশাসনের মধ্য দিয়ে আমরা যেন বলিষ্ঠভাবে সংকল্প গ্রহণ করি, আগে নির্মূল করতে হবে করোনাকে। তাতে যদি নিজেদের অনেকটা বদলেও নিতে হয় তাহলেও মেনে নিতে হবে। আমাদের জীবন ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় স্থায়ী পরিবর্তন ঘটানো ছাড়া মুক্তি নেই।
লেখক : বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক
সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]