ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শুক্রবার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ ২ আশ্বিন ১৪২৮
ই-পেপার শুক্রবার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

নজরুল ভাই স্মরণে
প্রকাশ: রোববার, ২৭ জুন, ২০২১, ১১:২৩ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 207

রণেশ মৈত্র
বিগত ২০ জুন সবাইকে হতবাক-শোকস্তব্ধ করে দিয়ে এই পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিলেন সিডনি প্রবাসী ঈশ^রবাদী, পাবনার নজরুল ইসলাম। খুব একটা অপ্রতাশিতভাবেই খাবরটি প্রথম টেলিফোনে দিল প্রবীর। সে ‘বাবা দিবস’ উপলক্ষে প্রণামও জানাল। পরপরই ফেসবুক ও প্রশান্তিকা মারফত খবরটির বিস্তারিত জানলাম। গভীর শোকে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম-পূরবীও।
ইয়াসমিন ভাবি ও সন্তানেরা রইলেনÑ রইলেন তার অসংখ্য বন্ধু-বান্ধব-আত্মীয়-স্বজন। নজরুল ভাইয়ের স্মৃতিকে ধারণ করে তাদের সবার প্রতি আন্তরিক সহানুভূতি ও সহমর্মিতা জানাই। আমরাও সবার শোকের অংশীদার।
নজরুল ভাই আমাকে আগে থেকেই চিনতেনÑ তেমনটাই বলেছিলেন সিডনিতে ২০০০ সালে প্রথম সাক্ষাৎ ও আলোচনাকালে। এরপর যতবার সিডনি গিয়েছি খবর পেলেই ছুটে আসতেন প্রবীরের বাসায় আমাদের সঙ্গে দেখা করতে। যতদিন সিডনি থেকেছি, প্রায় প্রতি মাসেই একবার করে আসতেন আমার ও পূরবীর সঙ্গে দুয়েক ঘণ্টা করে সময় কাটাতে। সঙ্গে আনতেন নানা রোগে জর্জরিত ইয়াসমিন ভাবিকেও। উভয়েই ছিলেন শতভাগ অসাম্প্রদায়িক ও বাঙালি সংস্কৃতি অন্তঃপ্রাণ।
নজরুল ভাই ছিলেন মৃত্তিকা বিজ্ঞানী উচ্চশিক্ষিত। চাকরি করতেন করাচিতে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে। ওই অবস্থায় একদিন এক সংবাদপত্রে দেখলেন, অস্ট্রেলিয়ায় মৃত্তিকা বিজ্ঞানী পদে নিয়োগ দেওয়া হবে। যে যে গুণাবলি চাওয়া হয়েছিল তার সবগুলো যোগ্যতাই থাকার ফলে তিনি একটি দরখাস্ত পাঠিয়ে দিলেন যথাস্থানে। কিছুদিনের মধ্যেই তার নিয়োগপত্র এসে গেল অস্ট্রেলীয় সরকারের কাছ থেকে। তিনি সেখানে গিয়ে কাজে যোগদান করলেনÑ সপরিবারে সেখানেই থেকে গেলেন।
পরপরই এসে গেল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তানি নৃশংসতার খবরে গভীরভাবে বিচলিত হয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধের কাজে সহায়তার জন্য অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরার সরকার ও মুজিবনগরে প্রতিষ্ঠিত তাজউদ্দীন সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ, মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অস্ট্রেলিয়ার সমর্থন সংগ্রহের কাজ সাফল্যের সঙ্গে করতে সমর্থ হলেন। আত্মপ্রচার বিমুখ নজরুল ভাই মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কোনো দেন দরবার করেননি তাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বা সম্মানিত করতে। মৃত্যুর পরে হলেও, প্রবাসী বাঙালি মুক্তিযোদ্ধা (মরণোত্তর) হিসেবে তাকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন।
নজরুল ভাই সিডনিতে গড়ে তুলেছিলেন অস্ট্রেলিয়ান-বাঙালি অ্যাসোসিয়েশন। তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন দুই সংগঠনের প্রথম সভাপতি। দিবারাত্রি সচেষ্ট থেকেছেন সেখানকার বাঙালি সমাজকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে। বেশ কিছুকাল তিনি ওই ঐক্য ধরে রাখতে পেরেছিলেন। কিন্তু সে মুহূর্তে সেখানে দলীয় ভিত্তিতে বাঙালিরা বিভক্ত হতে শুরু করলেন। নজরুল ভাই নীরবে সরে এলেন। তার কথা ছিল অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাঙালিদের অনেকখানি সমস্যা আছেÑ দলমত নির্বিশেষে সবাইকেই যার মোকাবিলা করা প্রয়োজন। কিন্তু বিভক্তি এলে, ঐক্যবদ্ধ না থাকলে তা মেটানো সম্ভব নয়। তাই সত্য হলোÑ দলীয় কমিটিগুলো, বিশেষ করে সেখানকার আওয়ামী লীগের নানা গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। বিএনপি-জামায়াতের খবর জানি নাÑ তবে বিএনপির মধ্যেকার দলাদলির খবর মাঝেমধ্যে কানে আসত সিডনিতে থাকাকালে। পরিণতিতে প্রবাসী অস্ট্রেলিয়ান সমাজের ঐক্যবদ্ধ মূল সংগঠনটির অস্তিত্বই বিলুপ্ত হলো।
তবুও অস্ট্রেলিয়ার বাঙালি সমাজের যেকোনো সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হলেই সস্ত্রীক সেখানে গিয়ে উপস্থিত হতেন এবং শেষ পর্যন্ত মনোযোগ সহকারে অনুষ্ঠানগুলো দেখতেন।
দেশগত প্রাণ নজরুল ইসলাম প্রতিবছর সস্ত্রীক দেশে আসতেন নভেম্বর-ডিসেম্বরের দিকে। সর্বশেষ এসেছেন ২০১৯ সালে। দেশে এসে দুয়েক মাস করে থাকতেনÑ নানাস্থানে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করতেন বন্ধু বৎসল নজরুল ভাই। প্রতিবারই দেশে পাবনা শহরে এসে আমার ও আমার সহধর্মিণী পূরবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও গল্পগুজব করতেন। অস্ট্রেলিয়াতেই হোক বা বাংলাদেশেই হোকÑ যখন যেখানেই যেতেন, তার অসুস্থ স্ত্রী ইয়াসমিন ভাবিকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন। কোথাও কদাপি একা যেতে তাকে দেখিনি। তার আহারাদি ছিল অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত। বাড়ির বাইরে কোথাও গেলে সাধারণত ফল-মূল খেতেন। স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এমন কোনো খাবার কখনও তাকে খেতে দেখিনি।
অস্ট্রেলিয়াতে প্রথম দুই দফায় গিয়ে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই যেতে হতো তার বাসায়। সন্ধ্যা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চলত দেশের সাম্প্রতিক বিষয় এবং অন্যান্য সমসাময়িক বিষয় নিয়ে আলোচনা। এতে যোগ দিতে সেখানকার চিন্তাশীল বাঙালি অধ্যাপক। সাংবাদিক ও সমাজকর্মীরা। চমৎকার আলাপ-আলোচনা তর্ক-বিতর্ক চলত বিভিন্ন বিষয়ে। ভিন্নমত শ্রদ্ধার সঙ্গে সভা শেষে সবাই মিলে রাতের খাবার খেয়ে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরতেন। আমাকে তো নজরুল ভাই সন্ধ্যায় নিয়ে যেতেন ও রাত্রিতে তার গাড়ি করেই রেখে যেতেন। আবার ছেলে প্রবীরের বাসায় বেশ কিছুকাল চলার পর ওই চমৎকার প্রোগ্রামও কিছু লোকের উৎসাহের অভাবে বন্ধ হয়ে যায়। তবে নজরুল ভাই যেমন ছিলেন তার্কিকÑতেমনই মিষ্টভাষী।
নোবেলজয়ী ড. ইউনূসের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক ছিল। তিনি সিডনি গেলে তার সম্মানে একটি বিশাল সভার আয়োজন করেন তিনি। নজরুল ভাই ওই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বলে শুনেছি। তার ওপর গ্রামীণ সাপোর্ট গ্রুপের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। ওই গ্রুপের সহায়তায় তিনি সেখানকার বাঙালিদের কিছু কিছু করে টাকা দিতে উদ্বুদ্ধ করতেন। এভাবে অর্জিত টাকা দেখে ওই সংস্থার কাছে পাঠাতেন গরিব মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার জন্য মাসিক ভাতা হিসেবে। আমাকে একবার তিনি বলেন, গরিব মেধাবী ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে ওই বৃত্তির জন্য দরখাস্ত সংগ্রহ করতে। প্রথম বছর পাবনা মহিলা কলেজের দুটি ছাত্রীর দরখাস্ত পাঠালামÑ ওরা মাসে ১,৫০০ টাকা করে বৃত্তি পেল। এভাবে প্রতি বছরই ৮-১০ জন করে ছাত্রছাত্রীর দরখাস্ত পাঠাতে শুরু করি। বছর তিনেক হলো তা আর পাঠাই না। ৫-৬ বছরে আমার মাধ্যমেই মোট প্রায় ৫০ জন গরিব মেধাবী ছাত্রছাত্রী ওই একই হারে বৃত্তি পেয়েছে। এর দ্বারা দেশের গরিবের প্রতি তার টান কতটা তা উপলব্ধি করা যায়। পোশাক-আশাকেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধা। প্যান্ট ও খাটো একটা পাঞ্জাবি ছিল তার সাধারণ পোশাক। শীতকালে কোথাও যেতে হলে সাধারণ স্যুট পরতেন।
ঢোলা পাঞ্জাবির তিনি ছিলেন ঘোর বিরোধী। বলতেন, ঢোলা পাঞ্জাবি যারা পরেন তারা যে অপ্রয়োজনীয় বাড়তি কাপড় ব্যবহার করেন তা দিয়ে হয়তো একটি ছেলের হাফ শার্ট হতে পারে। সুতরাং ঢোলা পোশাক কারও পরা উচিত নয়। তিনি কখনও কোথাও যেতে হলে নির্ধারিত সময়ের পাঁচ মিনিট আগেই পৌঁছে যেতেনÑ দেরি করতেন না এক মিনিটও। কঠোর সময়ানুবর্তিতা পালনের জন্য সিডনিতে তার খুব নাম ছিল। করোনাজনিত কারণে ২০২০ সালে তিনি দেশে আসেননি। আর আসবেনও না। একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সৎ ও কর্তব্যনিষ্ঠ মানুষকে হারালাম নজরুল ভাইয়ের মৃত্যুতে। ৮২ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়Ñ এ কারণে তার মৃত্যুকে ঢ়ৎবসধঃঁৎব ফবধঃয বলা যাবে না। তবে যেহেতু তিনি সুস্থ, সবল ও কর্মঠ ছিলেনÑ তাই তার এই আকস্মিক মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক। ইয়াসমিন ভাবি একা হয়ে গেলেন। সন্তানেরা তার দেখাশোনা ও পরিচর্যা করবেÑ এই ভরসা। নজরুল ভাইকে জানাই শেষ শ্রদ্ধা।

ষ একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক







সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]