ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শুক্রবার ৩০ জুলাই ২০২১ ১৫ শ্রাবণ ১৪২৮
ই-পেপার শুক্রবার ৩০ জুলাই ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

শান্তিরক্ষার সমরে সম্মুখে বাংলাদেশ
আলমগীর হোসেন, কঙ্গো থেকে ফিরে
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৫ জুলাই, ২০২১, ২:৫৫ এএম আপডেট: ১৫.০৭.২০২১ ৭:৫৪ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 336

দুর্গমে ভয়ঙ্কর অভিযানেও দুঃসাহসিক। কঠিন পরিস্থিতিতেও দুর্বার। মৃত্যুঝুঁকিকে তুচ্ছজ্ঞান করে সবার সামনে থেকে আফ্রিকার সংঘাতময় দেশ কঙ্গোতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষারী।


অপরাধীদের বিরুদ্ধে কেবল দুঃসাহসিক অভিযানই নয়, এই শান্তিরক্ষীরা স্থানীয় সাধারণ অসহায় মানুষদের পাশেও সিভিল মিলিটারি কো-অপারেশনের (সিমিক) প্রোগ্রামের আওতায় নানা সামাজিক ও মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করে জাতিসংঘের প্রশংসায় ভাসছেন।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে নিয়োজিত বিদেশি ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের চোখেও বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা এখন সবক্ষেত্রেই অতুলনীয় বলে জানা যায়। গত ১ থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত কঙ্গোর কয়েকটি অঞ্চলে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের কার্যক্রম পরিদর্শনকালে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

সরেজমিন কঙ্গোর ইতুরি প্রদেশের রাজধানী বুনিয়ায় টানা তিন দিন অবস্থানকালে দেখা গেছে, সেখানে এক ভীতিকর পরিস্থিতি। প্রায় রাতেই শহরে বা আশপাশে গোলাগুলি কিংবা সংঘাতের ঘটনা ঘটছে। এক গোত্র আরেক গোত্রের ওপর হামলা চালাচ্ছে। হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞসহ বীভৎস কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো। প্রায় সময়ই জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীদের টার্গেট করেও চালানো হয় হামলা।

সন্ধ্যার পর বন্ধ হয়ে যায় প্রায় সব দোকানপাট। সুনসান এলাকায় তখন বিরাজ করতে থাকে এক অজানা আতঙ্ক। রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত বুনিয়াজুড়ে থাকে নিয়মিত জরুরি অবস্থা (কারফিউ)। রাস্তাঘাটও একেবারেই অনুন্নত। ঠিকমতো চলাচল করাও কঠিন। তার মধ্যেও মৃত্যু হিসেবে ওৎ পেতে থাকে সন্ত্রাসীদের পুঁতে রাখা ডিনামাইন বোম। এমন এক অবস্থাতেও স্থানীয় সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষায় দুঃসাহসিকতার সঙ্গে নিয়মিত টহল ও অভিযান পরিচালনা করে যাচ্ছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্যানআরডিবি কন্টিনজেন্টের শান্তিরক্ষীরা।

শান্তিরক্ষীদের ভূমিকাসহ আনুষঙ্গিক নানা বিষয়ে কথা বলতে কঙ্গোর গোমা শহরে ফোর্সেস হেডকোয়ার্টারে গিয়ে সাক্ষাৎকার নেওয়া হয় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের কঙ্গোর (মনুস্কো) ফোর্স কমান্ডার ব্রাজিল সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট জেনারেল মার্কোস ডি সা আফোনসো দা কস্তার। এই ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তা সময়ের আলোকে বলেন, ‘কঙ্গোর মধ্যে বুনিয়া ও বেনি এলাকা সবচেয়ে বেশি সন্ত্রাসপ্রবণ। এখানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি বড় কন্টিনজেন্ট অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।

বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা এখানে অত্যন্ত শক্তিশালী নেতৃত্বের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কাজ করছে। মূল দায়িত্বের বাইরেও নানা সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে যাচ্ছে তারা। এ ছাড়া গত মে মাসে গোমায় যখন নাইরোগঙ্গা আগ্নেয়গিরির লাভা ছড়িয়ে পড়েছিল তখন সেখানে নিয়োজিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্যানইঞ্জিনিয়ার কন্টিনজেন্ট ও ব্যানএমপি স্থানীয় বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল। সত্যি বলতে, শান্তিরক্ষা কার্যক্রমসহ নানা কাজের কারণে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের প্রতি জাতিসংঘ এবং ব্যক্তিগতভাবে আমিও অত্যন্ত খুশি। তাদের এই কর্মকাণ্ডকে আমি সাধুবাদ জানাই।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্যানারডিবি-৪ কন্টিনজেন্টের আওতায় নেপালসহ একাধিক দেশের সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষীরা দায়িত্ব পালন করছেন। বুনিয়ায় নিয়োজিত এই ব্যানারডিবি-৪ কন্টিনজেন্টের অধিনায়ক কর্নেল মো. ফারুক হাওলাদার বলেন, জাতিসংঘের ‘ম্যান্ডেট’ অনুসারে প্রধানত স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সরকারকে স্থিতিশীলতায় সহযোগিতা করাই শান্তিরক্ষীদের মূল কাজ।

বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা অত্যন্ত পেশাদারিত্ব ও আন্তরিকতার সঙ্গে এ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। ব্যানারডিবি কন্টিনজেন্টের আওতায় ঝুঁকিপূর্ণ (রেডজোন) বিভিন্ন এলাকায় শান্তিরক্ষীদের ক্যাম্প স্থাপন করা আছে। শান্তিরক্ষীদের ওইসব ক্যাম্পে কুইক রিঅ্যাকশন (কিউআর) গ্রুপ রয়েছে। যারা কোনো ঘটনা জানতে পারলে খুব দ্রুতই ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযান পরিচালনা করতে বিশেষ পারদর্শী। এ ছাড়া প্রতিটি ক্যাম্পে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ব্যানএয়ার কন্টিনজেন্টের সহযোগিতায় হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ত্বরিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। ফলে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো বরাবরই তেমন সুবিধা করতে পারছে না।

কর্নেল ফারুক হাওলাদার জানান, ২০০৩ সাল থেকে কেবল বুনিয়াতেই সন্ত্রাসীদের হামলায় ১৪ জন শান্তিরক্ষী শহীদ হয়েছেন। প্রতিনিয়তই মৃত্যুঝুঁকি সত্ত্বেও দেশের পতাকার সম্মান ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষীরা এখানে সবক্ষেত্রে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। এজন্য জাতিসংঘও যেকোনো দেশের চেয়ে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের প্রতি বিশেষ আস্থা ও প্রশংসা জানিয়ে যাচ্ছে।

গোমায় নিয়োজিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্যানইঞ্জিনিয়ার-১১ কন্টিনজেন্টের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহবুবুল হক বলেন, শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি শান্তিরক্ষীরা স্থানীয় জনগণের জন্য রাস্তাঘাট, ব্রিজ নির্মাণ, স্কুল প্রতিষ্ঠাসহ দুর্যোগকালে পাশে দাঁড়ায়। সে কারণে স্থানীয় জনগণ ও জাতিসংঘের কাছে খুবই প্রশংসিত তারা। তারই স্বীকৃতিস্বরূপ টানা পাঁচবার সেরা কন্টিনজেন্ট নির্বাচিত হয়েছে ব্যানইঞ্জিনিয়ার কন্টিনজেন্ট-১১।

জানা গেছে, জাতিসংঘ কর্তৃক নিয়োগকৃত কঙ্গোর নর্দার্ন সেক্টর কমান্ডার হিসেবেও বহুজাতিক (বিভিন্ন দেশের) বাহিনীর শান্তিরক্ষীদের নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মোস্তাফিজুর রহমান। কঙ্গোর ইতুরি প্রদেশের বুনিয়ায় গিয়ে তার কার্যালয়ে কথা হয় এই কমান্ডারের সঙ্গে।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমান সময়ের আলোকে এ সময় বলেন, কঙ্গোতে কয়েকটি দেশের সেনাবাহিনী জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করলেও অতুলনীয় ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষীরা। দক্ষ পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং মানবিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের কারণেই তাদের জাতিসংঘ সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। এ মুহূর্তে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ শীর্ষে।

/জেডও/এসএইচ/


আরও সংবাদ   বিষয়:  বহুজাতিক কমান্ডো নেতৃত্বেও বাংলাদেশের নারী শান্তিরক্ষী  




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]