ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শুক্রবার ৩০ জুলাই ২০২১ ১৫ শ্রাবণ ১৪২৮
ই-পেপার শুক্রবার ৩০ জুলাই ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

আগ্নেয়গিরির সামনে দাঁড়িয়ে শান্তিরক্ষা
আলমগীর হোসেন, কঙ্গো থেকে ফিরে
প্রকাশ: শনিবার, ১৭ জুলাই, ২০২১, ২:০৬ এএম আপডেট: ১৮.০৭.২০২১ ৪:১৯ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 217

গত ২২ মে সন্ধ্যা আনুমানিক সোয়া ৭টা। কঙ্গোর বৃহত্তম আগ্নেয়গিরিতে ‘মাউন্ট নিয়ারোগঙ্গো’ হঠাৎ ঘটে ভয়াবহ বিস্ফোরণ। মুহূর্তেই রক্তবর্ণ হয়ে যায় আকাশের একটি অংশ। কাঁপতে থাকে পাহাড়ি ভূমি থেকে শুরু করে বসতবাড়িসহ সব স্থাপনা। লাভা ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে অবিরত চলতে থাকে ভূমিকম্প। জীবন বাঁচাতে ছুটতে থাকে স্থানীয় মানুষ। এর মধ্যেও আগ্নেয়গিরির সামনে দাঁড়িয়ে দুঃসাহসিকভাবে স্থানীয় সাধারণ মানুষের সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা। তারা এগিয়ে না এলে আরও বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটত।

সময়ের আলোর সঙ্গে কথা বলছিলেন কঙ্গোর গোমা শহরের পার্শ্ববর্তী মুনিগির বাসিন্দা যুবক আলতামাস টাইগার। পৃথিবীর অন্যতম জীবন্ত আগ্নেয়গিরি নিয়ারোগঙ্গোর অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনায় ভয়াবহ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের এমন দুঃসাহসিক ও মানবিক সহযোগিতার কথা এভাবেই বর্ণনা করেন তিনি।

কেবল আলতামাস নন, স্থানীয় আরও একাধিক বাসিন্দা এবং গোমায় নিয়োজিত বাংলাদেশের ব্যানইঞ্জিনিয়ার কন্টিনজেন্টের শান্তিরক্ষীদের মুখেও শোনা যায় সেই সময়ের গা শিউরে ওঠা ভয়াবহতার কাহিনি। এ ছাড়াও বিগত দুই সপ্তাহ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন পরিদর্শনে গিয়ে কঙ্গোতে অবস্থানকালেও আগ্নেয়গিরির লাভার ভয়ানক ক্ষতচিহ্ন পরিলক্ষিত হয়।

ওই পরিদর্শনকালে উপস্থিত থাকা ব্যানইঞ্জিনিয়ার কন্টিনজেন্টের (কনস্ট্রাকশন) অপারেশন অফিসার মেজর এএসএম সাদিক শাহরিয়ার সময়ের আলোকে বলেন, ‘আমরা মৃত্যু খুব কাছ থেকে দেখেছি। এর আগে কখনই এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হইনি। জ্বলন্ত লাভার সামনে দাঁড়ানো অবস্থায় অনবরত ভূমিকম্প ঘটতে থাকলে সবাই দিশেহারা হয়ে পড়ে। মনেই হয়নি, আমরা বেঁচে থাকতে পারব। সেই ঘটনায় শান্তিরক্ষীরা মানসিকভাবে এখনও অনেকটা বিপর্যস্ত। কিন্তু এমন ভয়ঙ্কর অবস্থার মধ্যেও সেই সময় আমরাই (বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা) একমাত্র সরে না গিয়ে অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম।’

মেজর সাদিক আরও বলেন, ‘আগ্নেয়গিরিতে বিস্ফোরণের পর থেকেই প্রায় ১৫ দিন পর্যন্ত মুহুর্মুহু ভূমিকম্প হয়। ঘণ্টায় ১৩ থেকে ১৫ বার ভূমিকম্প হয়েছে। বাংলাদেশে আমরা যে ধরনের ভূমিকম্প প্রত্যক্ষ করি রিখটার স্কেলে তার তুলনায় আরও অন্তত দেড়গুণ বেশি ভয়াবহতা ছিল। প্রায় ২০ দিন পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। এরপর রাস্তাঘাট সংস্কার করে বুকাবো শহরে ঠাঁই নেওয়াদের পুনরায় গোমা শহরে প্রত্যাবর্তন করানো হয়।’

সরেজমিন দেখা যায়, গোমা শহরের পাশের মুনিগি এলাকায় নিয়োজিত রয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্যানইঞ্জিনিয়ার-১১ কন্টিনজেন্ট। এই কন্টিনজেন্টের ক্যাম্প থেকে মাত্র সাত-আট কিলোমিটার দূরেই আগ্নেয়গিরি নিয়ারোগঙ্গোর অবস্থান। সন্ধ্যা বা পড়ন্ত বিকালে মাউন্ড নিয়ারোগঙ্গোর দিকে তাকালে পাহাড়টির চূড়ায় লালচে ধোঁয়া নির্গমন হতে দেখা যায়। অবশ্য বিস্ফোরণের ঠিক কয়েকদিন আগে নিয়মিতভাবে সন্ধ্যার পর থেকে পাহাড়ের চূড়া ও পেছনের আকাশ পুরো লাল হয়ে থাকতে দেখেছেন এখানকার শান্তিরক্ষীসহ স্থানীয়রা।

মুনিগি হয়ে নিয়ারোগঙ্গোর কাছে দাঁড়িয়ে দুচোখ যেদিকে যায় মনে হয় শুধু সবকিছু যেন পোড়া পাথর আর মাটির স্তূপ। দূরে কিছু বড় বড় গাছ থাকলেও কোনোটি পুড়ে কয়লা আবার কোনোটি শুধু শুকিয়ে কঙ্কালসার দাঁড়িয়ে আছে। ওই পোড়া ধ্বংসস্তূপে কিছুটা কষ্ট করে সামনে এগোলে দেখা যায়, ঘটনার প্রায় দেড় মাস পরও সেখানে অনেক স্থানে লাভার নিচ থেকে বের হচ্ছিল গরম ধোঁয়া। কতটা ভয়াবহ পরিস্থিতি ছিল তা সহজেই অনুমান করা যায়।

কঙ্গোতে (মনুস্কো) নিয়োজিত ফোর্স ইঞ্জিনিয়ার্স হেডকোয়ার্টারের কর্নেল (মরক্কো রয়্যাল আর্মড ফোর্সেস) নাবিল বেনামারা সময়ের আলোকে বলেন, ‘আমাদের ব্যানইঞ্জিনিয়ার জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের ম্যান্ডেট অনুসারে অত্যন্ত আন্তরিকতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে অর্পিত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। এর বাইরেও গত মে মাসে নিয়ারোগঙ্গোর লাভা উদগিরণ ও ভূমিকম্প শুরু হলে ব্যানইঞ্জিনিয়ারের শান্তিরক্ষীরা স্থানীয় অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। ওই সময় প্রাণভয়ে ছুটে চলা স্থানীয় মানুষ ও জাতিসংঘের স্টাফদের নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করেছিলেন বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা। কিন্তু তারা নিজেরা এলাকা ছাড়েননি। বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের এই মানবিক সহায়তার ঘটনাটি স্থানীয় পর্যায়ে ও জাতিসংঘের কাছে খুবই প্রশংসনীয়। এ টিমের সঙ্গে কাজ করে আমি সত্যিই গর্বিত।’

কঙ্গোর গোমায় নিয়োজিত ব্যানইঞ্জিনিয়ার-১১ কন্টিনজেন্টের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহবুবুল হক সময়ের আলোকে বলেন, আগ্নেয়গিরির অগ্নিলাভাও বন্যার পানির মতো ধেয়ে যেতে থাকে নিচু এলাকায়। যেদিক দিয়ে লাভা গড়িয়েছে সেদিকই পুড়ে পাথর-কয়লা হয়েছে। বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং (ব্যানইঞ্জিনিয়ার) কন্টিনজেন্টের মুনিগি ক্যাম্প আগ্নেয়গিরির সবচেয়ে নিকটবর্তী হওয়ায় আমরা এর ভয়াবহতা সবার আগে প্রত্যক্ষ করি। কমান্ডারের তাৎক্ষণিক নির্দেশে আমরা অস্ত্র, সরঞ্জামসহ গোমা থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে সাকে এলাকায় স্থানান্তরিত হই। একই সঙ্গে কঙ্গোর জনগণ আগ্নেয়গিরি এলাকা ছেড়ে সাকের দিকে যেতে থাকে। পরে ফোর্স কমান্ডারের নির্দেশে মনুস্কোর কর্মকর্তা ও তার পরিবার এবং স্থানীয় বিপুলসংখ্যক জনগণকে বুকাবো শহরে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু সেই স্থানান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে গিয়ে দেখা যায়, আগ্নেয়গিরি ও ভূমিকম্পে রাস্তাঘাট ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘটনার পরের দিনই মাত্র ২৪ ঘণ্টায় রাস্তা সংস্কার করা হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এবারের আগ্নেয়গিরি অগ্ন্যুৎপাতে ঘটনায় অর্ধশতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এবারে আগুনের লাভা মাউন্ট নিয়ারোগঙ্গো থেকে গড়িয়ে প্রায় ৯ কিলোমিটার দূরবর্তী গোমা বিমানবন্দরের রানওয়ের ঠিক শুরুতেই থেমে যায়। কালো পাথরের মতো লাভার সেই পোড়া পদার্থগুলো এখনও গোটা এলাকায় বিস্তৃত।
 
স্থানীয়রা জানান, প্রায় ২০ বছর আগেও একবার লাভা ছড়িয়ে পড়েছিল। সে সময় কম প্রাণহানি হয়। কিন্তু ১৯৭৭ সালে ভয়াবহ লাভা উদগিরণে বহু মানুষের প্রাণহানি হয়। কথিত আছে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। সে সময়ে মাউন্ট নিয়ারোগঙ্গোর চারদিকে প্রায় অর্ধশত কিলোমিটার এলাকায় লাভা ছড়িয়ে পড়েছিল। অবশ্য এখনও অনেক এলাকায় গিয়ে সেই পোড়া কালো মাটি-পাথরে আস্তরণ দেখা যায়।

/জেডও/




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]