ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শুক্রবার ৩০ জুলাই ২০২১ ১৫ শ্রাবণ ১৪২৮
ই-পেপার শুক্রবার ৩০ জুলাই ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

আজ আর লিখব না, শুধুই কোট করব
রণেশ মৈত্র
প্রকাশ: সোমবার, ১৯ জুলাই, ২০২১, ১১:০৩ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 60

হ্যাঁ রূপগঞ্জ, আজকের রূপগঞ্জ। নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ। শুধুই কান্না- কান্নারই ছবি। আগুনে কান্না- আর্ত কান্না। পুড়ন্ত মানুষের কান্না- অঙ্গারে পরিণত হওয়াদের স্বজনদের কান্না-হৃদয় নিংড়ানো কান্না।

এ কান্না নিয়ে আজ আর লিখব না। পুরান ঢাকায় দফায় দফায় কেমিক্যাল গোডাউনসমূহে আগুন লাগায় অগ্নিদগ্ধদের কান্না নিয়ে বেশ কয়েকবার লিখেছি। অন্যান্য সময়ের মানুষের কান্না- একাত্তরের অবরুদ্ধ বাংলাদেশের কোটি মানুষের কান্না, অতীতের দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষদের কান্না, অসংখ্যবার ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কান্না, ভারতে বিজেপি কর্তৃক নির্যাতিত মুসলিমদের কান্না, ইসরাইলিদের হাতে নির্যাতিত ফিলিস্তিনিদের কান্না, সারা বাংলাদেশে যৌন নির্যাতনের শিকার হাজারো তরুণীর কান্না- জীবনভর এগুলো নিয়ে লিখে চলেছি। তো চলেছেই।

৮ জুলাই অপরাহ্ণ রূপগঞ্জের সেজান জুসের কারখানায় অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়ে গণহত্যার শিকার ৫২ জন মৃত, শতাধিক আহত, সংখ্যাহীন নিখোঁজ শ্রমিকের স্বজনদের কান্না কারখানা পুড়িয়ে দেওয়ার ফলে সাত হাজার বেকারত্বজনিত কারণে তাদের ওপর নির্ভরশীল পরিবার-পরিজনদের কান্না, স্বামীহারা স্ত্রীর কান্না, স্ত্রীহারা স্বামীর কান্না, সন্তানদের জন্য মা-বাবার এবং মা-বাবার জন্য সন্তানদের কান্নার দীর্ঘ, বেদনাদায়ক কাহিনি নিয়ে আজ আর লিখব না। হতে পারে, কোনো কান্না নিয়েই ভবিষ্যতে আর লিখব না। এ কান্না তো থামে না। আজ এদেশের এ-প্রান্তে কাল ও-প্রান্তে কান্নার অশ্রুসিক্ত মিছিল সততই যেন শান দিয়ে চলেছি। অভ্যস্ত হয়ে গেছি।
১১ জুলাই রোববারে দেশের কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত তার অংশ উদ্বৃতি করব শুধু। একটি জাতীয় দৈনিক ওইদিন ‘শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, দ্রুত অক্সিজেন দিন’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে লিখেছে-

‘সবেমাত্র গিয়ে দাঁড়িয়েছি। কিছুক্ষণ পরই ভবনটির চতুর্থ তলায় আটকা পড়া কয়েক নারী কর্মীর ফোন আসে আমার এক সহকর্মীর কাছে। ফোনের অপর প্রাপ্ত থেকে বলা হচ্ছিল- আমরা জীবিত আছি কিন্তু শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। কালো ধোঁয়ায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। আমাদের দ্রুত অক্সিজেন দেওয়ার ব্যবস্থা করুন।’

একই পত্রিকার সাংবাদিককে শ্রমিক মনা মুক্তা বলেন, ‘মাত্র ১০ মিনিট আগে নাইমা আমি টয়লেটে গেছি গা। বের হইয়া দেখি আমাগো রুম থাইক্যা ধূমা উঠতাছে। অনেকে চিল্লাইতেছে। দুই মাইয়া বাঁচবার লাইগ্যা লাফ দিয়া মইরা গেল। আগুনের খবর ছড়ানোয় শ্রমিকরা তাড়াহুড়া করে নামতে শুরু করে। আগুন দ্রুতগতিতে প্রথম তলা থেকে তৃতীয় তলায় ছড়িয়ে পড়ে। এই দৃশ্য দেখে তৃতীয় তলা পর্যন্ত হাইড্রোলিক মই লাগিয়ে লাফিয়ে পড়তে শুরু করে- তাদের কারও কারও হাত বা পা জখম হয়। কারও মাথা ফেটে রক্ত ঝরতে থাকে। শুরু হয় পুরো কারখানাজুড়ে চিৎকার চেঁচামেচি। চতুর্থ তলা থেকে আওয়াজ ভেসে এলো, বাঁচাও-বাঁচাও। পুরুষরা নামতে পারলেও নারী শ্রমিকরা আটকা পড়ে যান। কিন্তু সুপারভাইজর মাহবুব তাদের নামতেও দেয়নি। কিন্তু সেই মাহবুবকেও শেষতক ওই নারী শ্রমিকদের সঙ্গে পুড়ে লাশ হতে হয়েছে।’
সজীব গ্রুপের হাসেম ফুড ও বেভারেজ লিমিটেডের কিউসি হিসেবে কাজ করতেন কিশোরগঞ্জের শ্রমিক ফয়সাল হোসেন। সেদিনের বেঁচে ফেরাকে ‘ভাগ্য’ বলে মনে করেন তিনি। ‘লাশ হতে হয় অনেক বন্ধু ও পরিচিত জন। আমি পিলার দিয়ে লাফিয়ে কোনোমতে বেঁচে যাই। এখন বন্ধুর লাশ নিতে মর্গে এসেছি।

সাংবাদিকের মর্গের সামনে কথা হয় মুস্তাকিমের সঙ্গে। তার অভিযোগ, ‘কর্মীদের ভেতরে ঢুকিয়ে তালা মেরে দেওয়া হয়েছিল। তালা না মারলে এত শ্রমিকের প্রাণ হারাতে হতো না।’

আরেক কাগজে লিখেছে, ‘তারা জানেন না প্রিয়জনের লাশ পাবেন কি না।’ একই কারখানার শ্রমিক মবিউদ্দিনের খোঁজ নেই। খবর পেয়ে নোয়াখালীর হাতিয়া থেকে চাচা ছুটে আসেন ঢাকায়। একবার আগুনে পোড়া কারখানার সামনে, একবার নারায়ণগঞ্জ পুলিশ স্টেশনে, আবার কখনও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটছেন।
মেয়ে সান্ত্বনার (১৩) খোঁজে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে এসেছেন শিমু আখতার। মৃতদেহ শনাক্ত করতে ডিএনএ নমুনা দেন তিনি। তিনি বলেন, আমার মেয়ে সান্ত্বনা তিন দিন হলো কাজে যোগ দিয়েছিল। সপ্তাহ পার না হতেই লাশ হতে হলো। সান্ত্বনার বাবা জাকির হোসেন আট বছর আগে মারা গেছে। চার ছেলেমেয়েকে নিয়ে ভুলতা গাউছিয়া নতুন বাজার এলাকায় থাকেন তিনি। তিনিও একটি গার্মেন্টে কাজ করেন। সংসারে সচ্ছলতার জন্য ছোট্ট মেয়েকে ৫,৩০০ টাকার চাকরি নিয়ে দেন।
আগুনে পোড়া কারখানায় কাজ করতেন অমরিতা বেগম। অন্যদের মত অমরিতার ছয় বছরের মেয়ে সুমা আকতারেরও ডিএনএ নমুনা নেওয়া হয়। অমরিতার ছয় বছরের মেয়ে সুমা বলছে, ‘আমার আম্মুরে আইন্যা দাও।’

শ্রমিকরা বলছেন, কারখানাটি ছিল আদতে জেলখানা। জরুরি নির্গমণের কোনো সিঁড়ি ছিল না। কারখানাতে কর্মরত অধিকাংশই ছিল শিশু শ্রমিক। তাদের বেতন ছিল ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা মাত্র।

এ কারখানায় ১৩ বছরের নাজমুল এক বছর ধরে কাজ করে। এক বছরের কাজের অভিজ্ঞতায় নাজমুল জানিয়েছে, দোতলার ফ্লোরটি দুটি ভাগে বিভক্ত। এক ভাগে সফট ড্রিংকস তৈরি হতো। ড্রিংকস তৈরির জায়গাটুকু জেলখানার মতো নেট দিয়ে ঘেরা ছিল। যেখানে তার বয়সি ছেলেমেয়েরাই কাজ করত। ছেলেদের বেতন ৬ হাজার ও মেয়েদের বেতন দেওয়া হতো ৫ হাজার ৭০০ টাকা। শিশু শ্রমিকদের দিয়ে ওভারটাইমও করানো হতো। তারা যখন কাজে ঢুকত বাইরে থেকে সিকিউরিটি গার্ড তালা মেরে দিত।

এক জাতীয় দৈনিক ‘১০০ টাকা ওভারটাইমের জন্য’ এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মর্গ চত্বরে তার প্রিয়জনের লাশ খুঁজে না পেয়ে যখন সাংবাদিকের কাছে কথা বলছিলেন তখন তার দুচোখ বেয়ে পানি ঝরছিল। আমার বাবা ভবঘুরে টাইপের। কাজকর্ম করে না। আমাদের সঙ্গে ঠিকমতো থাকেও না। মাঝেমধ্যে আসে আবার চলে যায়। আমাদের দুই ভাইবোনের জন্য মা খুব কষ্ট করে। প্রায় প্রতিদিন মা ওভারটাইম করত ১০০ টাকা বেশি রোজগারের জন্য। মায়ের বেতন আর ওভারটাইমের টাকায়ও আমাদের ঠিকমতো চলত না। ভাড়া বাসায় থাকি। ভাড়া দিতেই তো প্রায় টাকা শেষ হয়ে যেত, সংসার চালাবে কী করে মা? তাই মায়ের কষ্ট দেখে আমিও ওই কারখানায় চাকরি নিয়েছিলাম। প্রতিদিন মায়ের সঙ্গে যেতাম কারখানায়। কান্নাজড়িত কণ্ঠে শ্রমিক শিশুটি বলে ওঠে, বাবা থেকেও নেই- মাকেও হারালাম। আমরা এতিম হয়ে গেলাম বলেই অঝোরে কান্না।

হ্যাঁ, আকাশে-বাতাসে-আগুনে ধোঁয়ায়, রোদে-বৃষ্টিতে, পথে-ঘাটে-বনে-জঙ্গলে, গ্রামে ও শহরে আজ শুধুই কান্নার রোল।
 
লেখক : একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক

/এসএ/




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]