ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শুক্রবার ৩০ জুলাই ২০২১ ১৫ শ্রাবণ ১৪২৮
ই-পেপার শুক্রবার ৩০ জুলাই ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

বিদেশে কর্মী পাঠানোর আগে চাই প্রশিক্ষণ
মেহেদী হাসান বাবু
প্রকাশ: সোমবার, ১৯ জুলাই, ২০২১, ১১:৩০ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 66

উন্নত জীবন সবাই চান। সেই জীবনের আশায় পরিবার-পরিজন ছেড়ে পাড়ি জমান বিদেশে। এতে তারা যেমন উন্নত জীবনের সাধ পান, তেমনি তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সে সমৃদ্ধ হয় দেশের অর্থনীতি। তবে ভাগ্য বদলের আশায় অনেকেই বেছে নেন অবৈধ পথ। আর স্বপ্নের ইউরোপ যাওয়ার পথে পথে রয়েছে ভয়ঙ্কর মৃত্যুফাঁদ! আলো-বাতাসহীন কন্টেইনার, গহীন অরণ্য, গভীর সমুদ্র, তপ্ত মরুভূমি পাড়ি দিয়ে বিপজ্জনকভাবে ইউরোপের পথে পা রাখছে অসংখ্য বেকার যুবক। এসব বিপদ কাটিয়ে ইউরোপের স্বপ্নে বিভোর মানুষগুলো একসময় নিশ্চিত মৃত্যুকূপের দিকে এগিয়ে যান। আর সেই মৃত্যুকূপের নাম লিবিয়ার ভূমধ্যসাগর।

অবৈধ পথে স্বপ্নের ঠিকানায় পৌঁছাতে পারলেও অধিকাংশই হন ভাগ্যাহত। কারও কারও সলিল সমাধি হয়। কেউ প্রাণ হারায় অনাহারে-অর্ধাহারে, নানা রোগ-শোকে। সম্প্রতি লিবিয়া-সিরিয়া সঙ্কটে ইউরোপীয় দেশগুলোতে যাওয়ার ঘটনা বেড়েছে কয়েক গুণ। বিগত বছরগুলোয় এসব মৃত্যুফাঁদের মধ্যে নৌকা ডুবে মৃত্যুর ঘটনা বেড়েছে কয়েকগুণ বেশি। পারাপারের জন্য মৌসুমের তোয়াক্কা না করে সব সময়ই নৌকায় মানব পাচার ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ায় দিনে দিনে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। যেমন- গত ২৪ জুন ভূমধ্যসাগরে ভাসমান অবস্থায় ২৬৪ জন বাংলাদেশি অভিবাসন প্রত্যাশীকে উদ্ধার করেছে তিউনিশিয়ান কোস্ট গার্ড। তারা লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর হয়ে ইতালি যাচ্ছিলেন। সাগর পাড়ি দেওয়ার সময় নৌযান ভেঙে যাওয়ায় তারা পানিতে ভাসছিলেন। আন্তর্জাতিক রেডক্রস সোসাইটির কর্মকর্তা মঙ্গি সিøম গণমাধ্যমকে বলেন, উদ্ধারের পর তাদের তিউনিশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় দ্বীপ জেরবারের একটি হোটেলে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশি ও মিসরীয়দের ভূমধ্যসাগরে ভাসমান অবস্থায় পাওয়া যায়। এর আগে গত ১০ জুন ১৬৪ জন বাংলাদেশিকে তিউনিশিয়ান উপকূল থেকে উদ্ধার করে দেশটির কোস্ট গার্ড। তারাও ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এ ছাড়া ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার সময় গত ১৮ মে ৩৬ জন, ২৭ ও ২৮ মে ২৪৩ জন বাংলাদেশিকে উদ্ধার করে তিউনিশিয়ান কোস্ট গার্ড। গণমাধ্যম সূত্র বলছে, এই মুহূর্তে তিউনিশিয়ায় কমপক্ষে ৭০৭ জন বাংলাদেশি রয়েছেন।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর তথ্য মতে, করোনাভাইরাস মহামারির পূর্বে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ যেতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৬ হাজার ৯০৬ জন। নিখোঁজ হয়েছেন ১২ হাজারের বেশি মানুষ। ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে ৬৩৬ জন, ২০১৪ সালে ৭৭০ জন, ২০১৫ সালে ১৫৫৫ জন, ২০১৬ সালে ১৪৮৫ জন, ২০১৭ সালে ৭৯৫ জন, ২০১৮ সালে ৬৭৭ জনসহ এখন পর্যন্ত নিখোঁজ রয়েছেন ১২ হাজার ৫৩৯ জন। ইউরোপীয় কমিশনের পরিসংখ্যান বিষয়ক দফতর ইউরোস্ট্যাট-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৮ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত এক লাখেরও বেশি বাংলাদেশি ইউরোপের দেশগুলোতে অবৈধভাবে প্রবেশ করেছেন। এর মধ্যে ২০১৬ সালে ১৭ হাজার ২১৫ জন রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করলে ১১ হাজার ৭১৫টি আবেদন বাতিল করা হয়। ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য মতে, কেন্দ্রীয় ভূমধ্যসাগর ব্যবহার করে ইতালিতে প্রবেশের হার দিন দিন বাড়ছে। ইউএনএইচসিআর-এর মতে, ভূমধ্যসাগর ব্যবহার করে ইউরোপে প্রবেশকারীর সংখ্যায় বাংলাদেশিদের অবস্থান চতুর্থ। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১১ হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশী লিবিয়া হয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করেন। গত বছর থেকে এই সংখ্যা প্রায় ৭০ শতাংশ বেশি।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য মতে, অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশের ক্ষেত্রে সাতটি রুট ব্যবহার করা হয়। এর সবগুলোই লিবিয়া কিংবা তুরস্ক থেকে ইউরোপে প্রবেশের জন্য ব্যবহার করা হয়। এ সাত রুটের মধ্যে ‘জনপ্রিয়’ কেন্দ্রীয় ভূমধ্যসাগরের রুট। এটি ব্যবহার করে লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়া নিরাপদ মনে করে অনিয়মিত অভিবাসীরা। দালালের কথায় প্রভাবিত হয়ে লাখ লাখ টাকা খরচ করে সুদান, মিসর, আলজেরিয়া, দুবাই ও জর্ডান থেকে চলে যান লিবিয়া কিংবা তুরস্ক। সেখান থেকে শুরু হয় ইউরোপ যাওয়ার মূল পর্ব। ইউরোপ যেতে মোট খরচ হিসাবে চাওয়া হয় ১০ থেকে ১৪ লাখ টাকা। পথে বিভিন্ন কারণে অনেক প্রাণ ঝরে যায়। পরিবারের সদস্যদের কাছে প্রিয় মানুষটির লাশও পৌঁছায় না অনেক সময়। সেই টাকা আদায় করা হয় আগেই, এমনকি যাত্রা শুরুর পর শারীরিক নির্যাতন করেও টাকা আদায় করা হয়। কিন্তু এ ধরনের ঘটনা রোধে আমাদের প্রশাসনিক অগ্রগতি কতটুকু?

করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারির কারণে চারদিকে বাড়ছে অভাব আর হতাশা। গত বছরের মার্চে দেশজুড়ে লকডাউন ঘোষণার পর কর্মসংস্থান হারিয়ে হাজার হাজার মানুষ নাম লিখিয়েছিলেন বেকারের খাতায়। করোনাকালে বিরাটসংখ্যক নিম্ন-মধ্যবিত্ত তথা স্বল্প আয়ের মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছেন। এখন তারা নিঃস্ব, তারা নতুন গরিব। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সংখ্যা আড়াই কোটির মতো। আইএলওর গবেষণার তথ্য হলো করোনা মহামারির কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিতে তরুণ প্রজন্ম। ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সিদের মধ্যে ২৪ দশমিক ৮ শতাংশই বেকার হয়েছেন।

গবেষণায় দেখা যায়, তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার দ্বিগুণ। প্রাণঘাতী ঝুঁকি-বিপত্তির পরও অবৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়া বন্ধ হচ্ছে না। কারণ হিসেবে সরকারের নীতি ও করণীয় সম্পর্কে স্বচ্ছতার অভাবকে দায়ী বলে আমরা মনে করি। বলার অপেক্ষা রাখে না, অনেক দেশেই বৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার পথ রুদ্ধ হওয়ার কারণে অনেকেই নানা অবৈধ উপায়ে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এতে তারা প্রতারণা ও হয়রানির শিকার হচ্ছে। বিদেশ গমনেচ্ছুদের দালালের খপ্পরে পড়ে প্রতারিত হওয়ার ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। মৌখিক প্রচারণায় বলা হয় শিপে করে তারা ইউরোপের স্বপ্নের দেশ ইতালিতে পৌঁছাবেন। বাস্তবতা হলো, শিপ নয় এ যেন মৃত্যুর এক ফাঁদের নাম প্লাস্টিকের বোর্ড।

সবচেয়ে বড় কথা, তারা কোনোভাবে ইউরোপে পৌঁছাতে পারলে প্রথম যে কাজটা করবে সেটা হচ্ছে রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়া। রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদনে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিজ দেশের বিরুদ্ধে নানা রকম মিথ্যা, মনগড়া, খারাপ তথ্য দেওয়া হয়। যার কারণে ইউরোপের দেশগুলো বৈধভাবেও বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিতে আগ্রহ দেখায় না। ট্যুরিস্ট ও শিক্ষা ভিসা দিতেও চরম কড়াকড়ি আরোপ করে থাকে। এখনও লোকজনের ধারণা, যেকোনোভাবে ইউরোপে যেতে পারলেই বোধহয় ভালো থাকা যাবে। পরিস্থিতি যে এখন ভিন্ন, ইউরোপ যে এখন আর অবৈধভাবে আসা লোকজনকে আশ্রয় দিতে রাজি নয়, বরং কাগজপত্রহীন মানুষগুলোকে ধরে ধরে ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছে, এমন তথ্য জানা নেই বহুজনের। ইতোমধ্যে ইউরোপ বলেই বসেছে, অবৈধ লোকজনকে দ্রুত ফিরিয়ে আনা না হলে বাংলাদেশের নাগরিকদের ভিসা বন্ধ করে দেওয়া হবে।

জীবনের সর্বস্ব বাজি রেখে উন্নত জীবনের আশায় মৃত্যুভয়কে উপেক্ষা করে অবৈধ পথে তরুণরা পৌঁছাতে চায় স্বপ্নের দেশে। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, প্রশাসনের কিছু অসাধু লোকের অনৈতিকতার কারণে পাচার কমছে না। তন্মধ্যে সাধারণ মানুষের অসচেতনতা পাচারকারী চক্র সারা দেশে তাদের জাল বিস্তার করেছে। সাগরপথে মানবপাচারের ঘটনায় দেশের ভাবমর্যাদা নষ্ট হচ্ছে। শ্রমবাজারও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সমস্যার সমাধানে বৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার পথ সহজ করতে হবে। রুখতে হবে দালালদের দৌরাত্ম্য। আইনের কঠোর প্রয়োগ, জোর তৎপরতা এবং শক্তিশালী সীমান্ত ব্যবস্থাপনা থাকলে মানবপাচার বন্ধ করা সম্ভব। অবৈধ পথে বিদেশ যাত্রা রোধ ও বিদেশে নিরাপদ কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার জন্য বৈধ পথে কম খরচে প্রবাসে কর্মসংস্থানের সরকারি উদ্যোগে গতি আনা, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মী প্রেরণ নিশ্চিত করা জরুরি।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী

/এসএ/




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]