ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শুক্রবার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ ২ আশ্বিন ১৪২৮
ই-পেপার শুক্রবার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

ধেয়ে আসছে বন্যা : আগাম প্রস্তুতি জরুরি
মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন
প্রকাশ: শনিবার, ২৪ জুলাই, ২০২১, ৮:০৬ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 122

বিপদসীমার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে তিস্তার পানি। যমুনায় শুরু হয়েছে ভাঙন। ধেয়ে আসছে বন্যা। এক বিপর্যয়ের মধ্যে আরেক বিপর্যয়। করোনার ধাক্কা সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছে সরকার। আসছে বন্যা। ইতোমধ্যে অনেক এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। রাজশাহীর পদ্মায় পানি বাড়ছে ধীরলয়ে।

তিস্তার ডালিয়া পয়েন্টে ব্যারাজের ৪৪টি গেট খুলে রাখা হয়েছে। ফলে তিস্তা পারের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। উজানের ঢল বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের পানি ছেড়ে দেওয়ায় এমনটি হয়েছে বলে জানা যায়।  গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারি ইউনিয়নের এক হাজারের বেশি পরিবারের মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় আছে। আবার পানি বাড়ায় মানুষ আরও দুর্ভোগে পড়েছে।

যমুনার ভাঙনের কবলে পড়েছে শাহজাদপুর, এনায়েতপুর, চৌহলীসহ আরও কয়েকটি পয়েন্ট। প্রতিদিন নদীতে বিলীন হচ্ছে বসতভিটাসহ ফসলি জমি। নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলার ধনু নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া এই সাত হাওর জেলায় বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কদিন ধরে উজানের ঢলে বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বেড়ে বন্যার সৃষ্টি করেছে। চলমান লকডাউনের কারণে মানুষের দুর্ভোগের অন্ত নেই তার মধ্যে বন্যা। সাধারণ মানুষের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তার শেষ নেই। বন্যা একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। নদীর পানি ফুলেফেঁপে ওঠে চারপাশ প্লাবিত করাকে বলা হয় বন্যা। বন্যা প্লাবিত এলাকার মানুষের দুঃখ-দুর্দশার সীমা-পরিসীমা থাকে না। বন্যা চলে যাওয়ার পরও বেশ কিছুদিন থাকে এর প্রভাব।

বাংলাদেশে প্রায় প্রতিবছরই বন্যা হয়। এবারও বন্যার আশঙ্কা করছে পানি, নদী ও আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে এবার বড় আকারের বন্যা হওয়ার আশঙ্কা আছে। নদীগুলোর পানি দুকূল প্লাবিত করেই ক্ষান্ত হবে না, সঙ্গে নিয়ে আসবে ডায়রিয়া, কলেরা, আমাশয়, পেটের পীড়াসহ নানা রোগবালাই। ডেঙ্গু এবং মশাবাহিত অন্যান্য রোগতো আছেই। করোনা অতিমারি চলছে। এই ধাক্কা সামলানোই কঠিন। তারপর যদি বন্যা আসে তা হবে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। বন্যার কবলে পড়ে হাজার হাজার, ক্ষেত্রবিশেষে লাখ লাখ মানুষ দুর্ভোগ পোহাবে। ইতোমধ্যে কোথাও কোথও বন্যা শুরু হয়েছে। দুর্ভোগ পোহাচ্ছে কয়েক হাজার পানিবন্দি মানুষ।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ তো মেনে নিতেই হবে। তারপরও সাবধানতা অবলম্বন খুব দরকার। কথায় বলে ‘সাবধানের মার নেই’। আগে থেকে সতর্ক হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। বছরের কোন সময়টায় বন্যা হয় তাও সবার জানা। জানা বিষয়টা নিয়ে সাবধান হওয়া যত সহজ অজানা বিষয় নিয়ে সাবধান হওয়া তত সহজ নয়। করোনা একটা অজানা মহামারি। শুধু অজানাই নয়, মানুষ জীবনে কোনোদিন করোনার নামই শোনেনি। যার কারণে করোনার ব্যাপারে আগাম সাবধান হওয়া যায়নি। নেওয়া যায়নি সতর্কতা। বন্যা একটা জানা বিষয়। তাই বন্যার বাপারে আগাম সতর্কতা অবশ্যই নেওয়া যাবে। বিশেষজ্ঞদের কথার গুরুত্ব অনুধাবন করে বন্যা মোকাবিলার জন্য আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হবে বুদ্ধিমানের কাজ। 

সরকারকে তাই সাবধান হতে হবে। ব্যাপক প্রস্তুতি নিতে হবে। একসঙ্গে দুটি বিপদ মোকাবিলার জন্য যেমন প্রস্তুতি নেওয়া দরকার তেমন প্রস্তুতি নিতে হবে। এক মহাবিপদ করোনা অতিমারি চলছে। আরেক বিপদ বন্যা আসছে। সে অনুযায়ী প্রস্তুতি না নিলে বিপদের কাছে হার মানতে হবে। হার মানা মানে জীবনের বড় পরাজয়। এ রকম পরাজয়ের সুযোগ এতটুকু নেই। বন্যা বিস্তারের আগেই যদি প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া যায় তাহলে বিপদ আমাদেরকে কাবু করতে পারবে না। দাপটের সঙ্গে মোকাবিলা করা যাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বন্যা।

বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ। এদেশের মানুষ নানা দুর্যোগ মোকাবিলা করে বেঁচে আছে। বিপুল প্রাণের ক্ষয়, ফসলের ক্ষতি, সম্পদের হানি সবকিছুর পরও মানুষ বেঁচে থাকে। নতুন করে গড়ে তোলে বাড়িঘর, জীবনের প্রবাহ। প্রাকৃতিক দুর্যোগ যখন বিপুল আকারে, প্রচণ্ড রূপে হাজির হয় তখন তার আঘাতে হাজার হাজার মানুষের স্বাভাবিক জীবন ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো অতিমাত্রায় ঘনবসতির দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি হয়।

বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাপ করাই দুরূহ। বন্যার ভয়াবহতা সামলাতে অনেক সময় হিমশিম খেতে হয়। সরকারি বেসরকারি সব সংস্থা মিলেও সামলাতে পারে না। ভয়াবহ বন্যায় দুর্ভোগে পড়ে সাধারণ মানুষ। তাদের জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয়। 

জীবন-জীবিকা বাধাগ্রস্ত হয়। বন্যার সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত সাধারণ মানুষ অনেকটা দিশেহারা হয়ে যায়। বন্যার পানিতে তলিয়ে যায় তাদের বাড়িঘর, দোকানপাট, ফসলি জমি। ভাসিয়ে নিয়ে যায় গবাদিপশু-গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি সব। অসহায় মানুষদের হাহাকারে ভারী হয় আকাশ-বাতাস। সাহায্যকারী সরকারি-বেসরকারি সংস্থার দিকে তাকিয়ে থাকে সবাই। 

বন্যা ও প্লাবন বাংলাদেশের নিয়মিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ। প্রতিবছরই বর্ষাকালে পাহাড়ি ঢলে বন্যা ও প্লাবন সৃষ্টি হয়। আকস্মিক প্লাবনে জলবন্দি হয়ে পড়ে হাজার হাজার পরিবার। সর্বনাশা বন্যার পানিতে গ্রাম জনপদ, ফসলের মাঠ, পথঘাট, বাড়িঘর সবকিছু তলিয়ে যায়। ঘরবাড়ি গবাদিপশু ভেসে যায় বন্যার পানির স্রোতে। বর্ষাকালে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে যখন প্রবল বৃষ্টিপাত হয়, উত্তরদিক থেকে পাহাড়ি ঢল নেমে আসে, তখন বাংলাদেশের নদীগুলো উপচে পড়ে এবং প্লাবন সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশে বন্যা ও প্লাবনের ইতিহাস অনেক প্রাচীন। আধুনিক কালে উনিশ শতকের শেষের দিকে এবং বিশ শতকের মাঝামাঝি ভয়াবহ বন্যার ইতিহাস মেলে। ১৯৫৪ ও ১৯৫৫ সালে পরপর দুবছর বন্যা যে তাণ্ডব সৃষ্টি করেছিল তা আজও প্রবীণদের মনে বিভীষিকার স্মৃতি হয়ে আছে। ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে প্রায় ৫ লাখ মানুষের প্রাণহানির ধারণা করা হয়। ১৯৭৪ সালের বন্যায় সারা দেশ ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বন্যা পরবর্তীকালে দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় এবং বহু লোকের প্রাণহানি ঘটে। ১৯৮৪ ও ১৯৮৮ সালের সর্বনাশা বন্যায় প্রায় ১ কোটি লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ভেঙে পড়েছিল দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড। 

১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড় এবং সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে প্রায় দেড় লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। উপকূলীয় অঞ্চলের পাঁচটি জেলার ঘরবাড়ি, গবাদিপশু, গাছপালা, জমির ফসল, নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। 

২০০৭ সালে দেশের মধ্যাঞ্চলের বন্যায় ও নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রায় সোয়া কোটি মানুষ। ভেঙে পড়ে দেশের কৃষিনির্ভর অর্থনীতি। এ বছরের ১৫ নভেম্বর রাতে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলবর্তী জেলাগুলোর ওপর প্রচণ্ড গতিতে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’। ঘণ্টায় ২৪০ থেকে ২৬০ কিলোমিটার বেগে ঘূর্ণিঝড়ের মহাতাণ্ডবে সবকিছু লন্ডভন্ড হয়ে যায়। 

এভাবে প্লাবন, বন্যা ও ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিভিন্ন সময় লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, ধ্বংস হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ। 
বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ে এদেশের দরিদ্র মানুষ। তারা কাঁচা ঘরবাড়ি তৈরি করে কোনোরকম জীবনধারণ করে। প্লাবন-বন্যায় তাদের বাঁশের তৈরি কাঁচা ঘরবাড়ি পানিতে ডুবে যায়, পুরনো বাঁশের খুঁটি পচে ভেঙে পড়ে। অনেকের ঘর ভেসে যায় প্লাবনের তোড়ে। আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে হাজার হাজার মানুষ। 

এ অবস্থায় নারী ও শিশুরাই বিপদে পড়ে বেশি। বহু দরিদ্র পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে আশ্রয় নেয় বেড়িবাঁধে, সড়কের ধারে, স্কুল ঘরে ও মসজিদের বারান্দায়। বন্যার প্রবল স্রোতে গ্রামের কাঁচা রাস্তা, সেতু-কালভার্ট, ভেঙে পড়ে। বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় যোগাযোগ ব্যবস্থা। 
এ সময় মানুষের কোনো কাজ থাকে না। কর্মহীন হয়ে দুর্ভোগে পড়ে বানভাসি মানুষ। গ্রামের মানুষ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটে যায় শহরের দিকে। শহরের বস্তি, ফুটপাথ হয় তাদের আবাসস্থল। 

বন্যার সময় খাদ্য, আশ্রয়, চিকিৎসার অভাবে দুর্গত মানুষ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। দুর্বিষহ জীবনধারণ করতে হয় তাদের। চারদিকে অথৈ পানি থাকার পরও পান করার মতো একফোঁটা বিশুদ্ধ পানি তারা পায় না। বন্যার দূষিত পানি পান করে তারা পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়। 

বন্যাকবলিত সাধারণ মানুষ মানবেতর জীবনধারণ করে। এ অবস্থায় মানবিক কারণে অনেকেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোও এগিয়ে আসে। সরকারি ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান উপদ্রুত এলাকায় ত্রাণশিবির, লঙরখানা স্থাপন করে দুর্গত জনগণের মধ্যে খাদ্য, বস্ত্র, ওষুধ, বিশুদ্ধ পানি ইত্যাদি অত্যাবশ্যকীয় সামগ্রী বিতরণ করে। অনেকে বক্তিগতভাবেও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বন্যা মোকাবিলা করা সহজ হয়।

বর্ষাকালে বন্যা হওয়া বাংলাদেশে কোনো নতুন ঘটনা নয়। ভারত ও নেপাল থেকে আগত তিনটি বড় নদীর প্রবাহ বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। বর্ষাকালে বেশি বৃষ্টি হলে এই তিনটি নদীতে প্লাবন সৃষ্টি হয়। বিপুল জলরাশির প্রতিক্রিয়ায় বন্যা দেখা দেয়। হিমালয়ের বরফ গলার কারণেও জলস্ফীতি ঘটলে তা বন্যার সৃষ্টি করে।

বাংলাদেশের নদীগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে পলি জমতে থাকায় নদীর গভীরতা কমে গেছে। ফলে নদীগুলোর ধারণক্ষমতা কম। অল্প পরিমাণ পানিতেই নদী উপচে সমতল ভূমি প্লাবিত হয়। নাব্যতা সঙ্কটের কারণে নদীগুলো গতিহীন। 

বনাঞ্চল নিধন ও অপরিকল্পিত রাস্তাঘাট নির্মাণের কারণেও বন্যা দেখা দেয়। তবে বাংলাদেশের বন্যার সবচেয়ে বড় কারণ নদীগুলোর পানি ধারণ ক্ষমতা কম। যার কারণে ভারতের পানি আসার সঙ্গে সঙ্গে চারদিক প্লাবিত হয়।

বানভাসি মানুষের দুঃখ-দুর্দশা হাহাকার চরমে পৌঁছলে মানুষ নদীকে অভিশাপ দিতে শুরু করে। বুঝে বা না বুঝে যেভাবেই হোক মন থেকে চলে আসে অভিশাপ। জ¦ালা-যন্ত্রণা কত সহ্য করা যায়? দিনের পর দিন মাসের পর মাস বানভাসি হিসেবে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকতে থাকতে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। একজন মানুষ আসলে কত দিন পানিবন্দি থাকতে পারে? তিক্ত বিরক্ত হয়ে শেষে নদীকে দোষারোপ করে।

ভাগ্যবিধাতার হাততো অবশ্যই আছে। মানুষের হাতও কম নেই। বানভাসি মানুষদের বান বা বন্যায় ভাসার জন্য অন্যতম প্রধান দায়ী আমাদের পাশের দেশ ভারত। ভারতের সঙ্গে ৫৪টি নদীর সীমানা নিয়ে বাংলাদেশের সমস্যা দীর্ঘদিনের। ভারত শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা দেয় না বরং বর্ষা মৌসুমে বিপুল পরিমাণ পানি ছেড়ে দিয়ে পানিতে তলিয়ে দেয় গোটা বাংলাদেশকে। বন্যাপ্রবণ এলাকাগুলো পানিতে তলিয়ে যায়।

শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের চাষাবাদের জন্য যখন পানি দরকার হয় তখন একফোঁটা পানিও দেয় না ভারত। বর্ষাতে যখন পানি দরকার নেই তখন ভারত পানির বাঁধ খুলে দেয়। উজান তথা ভারতের পানিতে তলিয়ে যায় শত শত একর জমি। বন্যায় কবলিত হয় বাংলাদেশের শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জ।
ভারতের সঙ্গে পানি নিয়ে সমস্যা একদিনের নয়। বছরের পর বছর ধরে চলছে ৫৪টি নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়ে বিরোধ। ‘ভারত ছেড়ে দেয় কিন্তু ছাড় দেয় না।’ তাই বাংলাদেশের বানভাসি মানুষের দুর্দশা আর অকাল বন্যার জন্য ভারত অধিকাংশ দায়ী। এই দায়ভার বহন করবে কী বৃহদাকার দেশটি স্বীকারই করে না। পুরোপুরি অস্বীকার করে আসছে বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ ধরে। 
৫৪ নদীর সমস্যার সামান্যতম সমাধান হলেও বাংলাদেশ খরা, অকাল বন্যা, নদীভাঙনসহ নানা বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেত। এসব বিপদ যত না প্রাকৃতিক তার চেয়ে বেশি মানুষের সৃষ্টি। বিশেষ করে আমাদের প্রতিবেশী ভারতের সৃষ্টি।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের নদী সমস্যার সমাধান হলে বাংলাদেশের অনেক সমস্যার অটো সমাধান হবে। বাংলাদেশের মানুষ নদীভাঙন, অকাল বন্যা, খরার হাত থেকে রক্ষা পাবে। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এসব সমস্যার আপাতত সমাধান করা যায়। অস্থায়ী এই সমাধানের দুটি উপায় আছেÑ নদী মুখে বাঁধ এবং নদী খনন বা ড্রেজিং।  নদীর মুখে বাঁধ দিয়ে বন্যার পানি আটকানো যায়। অকাল বন্যার কবল থেকে বাঁচার জন্য বাংলাদেশ ভারতের যৌথ নদী সীমানায় ভারত যেমন বাঁধ দিয়ে পানি আটকায় ও ছাড়ে বাংলাদেশও তা করতে পারে। এর জন্য বিপুল অঙ্কের টাকা খরচ হবে; কিন্তু বাংলাদেশ খরা এবং অকাল বন্যা থেকে রেহাই পাবে। ভারত অনেক নদীর মুখে বাঁধ দিয়ে ইচ্ছামতো পানি নিয়ন্ত্রণ করছে। বাংলাদেশের প্রয়োজনের সময় পানি দিচ্ছে না। বাংলাদেশে যখন দরকার নাই তখন তাদের দেশে বন্যা থেকে রেহাই পেতে বাংলাদেশে পানি ছেড়ে দিচ্ছে এবং বাংলাদেশ ডুবে যাচ্ছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ নদীর নাব্যতা বা গভীরতা কম হওয়ায় ভারত থেকে আসা পানি ধারণ করতে পারে না। উপচে পড়ে অকাল বন্যার সৃষ্টি হয়। এভাবে বছরের পর বছর বাংলাদেশের মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।

এ সমস্যা থেকে আপাতত পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য নদীগুলো খনন বা ড্রেজিং করা আবশ্যক। ড্রেজিং করলে পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়বে। ফলে কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের কৃষিকাজ ও চাষাবাদ সমস্যার দ্রুত সমাধান হবে। উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। মাছ চাষ সহজতর হবে। বন্যাকে সম্পূর্ণ প্রতিরোধ করা না গেলেও একে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বিশ্বের বহু দেশ এ সঙ্কট নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশেও ইতোমধ্যে বন্যা নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। 
বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য নদী বিশেষজ্ঞ দ্বারা সুপরিকল্পিত উপায়ে বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ভরাট নদীগুলো পুনঃখনন করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। খনন করা হচ্ছে। জলাধার, সøুইস গেট, রেগুলেটর ব্যারেজ নির্মাণ করা হচ্ছে।  বন্যার কবল থেকে বাঁচার জন্য আগাম সতর্কতা নেওয়া খুব দরকার। সে জন্য সরকারিভাবে পূর্ব সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ খুব জরুরি। দুর্গত মানুষের কাছে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী পাঠানোর আগাম ব্যবস্থা করতে পারলে সহজে বন্যা মোকাবিলা করা যাবে। বন্যা ও দুর্যোগপূর্ণ এলাকার আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর সঠিক পরিচর্যা ও ব্যবহার করতে হবে। বন্যার পর 
কৃষকদের মধ্যে যেন বিনামূল্যে বীজ সার কীটনাশক বিতরণ করা যায় সে ব্যবস্থা রাখতে হবে। 

সভ্যতার শুরু থেকে নানা দুর্যোগ মোকাবিলা করেই মানুষ এ পর্যন্ত এসেছে। চীনের দুঃখ হোয়াংহো নদীর বন্যাকেও নিয়ন্ত্রণ করেছে চীনের মানুষ। বাংলাদেশের মানুষও পারবে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করতে। সুপরিকল্পিত ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে তারা যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় সফল হতে পারে। বন্যাকে নিয়ন্ত্রণ করা গেলেই এর সুফল ভোগ করা যাবে। বন্যা আসার যে অশনিসঙ্কেত দেখা দিয়েছে তাকে গুরুত্ব দিতে হবে। একসঙ্গে দুটি বিপদ সরকারকে মোকাবিলা করতে হবে। করোনাভাইরাস এরই মধ্যে সরকারকে মারাত্মক বিপাকে ফেলেছে। এটা মোকাবিলায় হিমশিম খেলেও সরকার যথেষ্ট সফলতার পরিচয় দিচ্ছে। 
বন্যার ব্যাপারে এখন থেকেই চিন্তাভাবনা না করলে সামনে আরও বিপদের সম্মুখীন হতে হবে। তাই আগে থেকে সাবধান হওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। কোনো কোনো স্থান বন্যাকবলিত হয়েছে। প্রতিদিন বাড়ছে বন্যার প্রকোপ ও ভয়াবহতা। আরও ভয়াবহ বন্যার পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে। এই পূর্বাভাসটাকে অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।

সাবেক খণ্ডকালীন শিক্ষক 
    টেলিভিশন, চলচ্চিত্র ও ফটোগ্রাফি বিভাগ




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]