ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শুক্রবার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ ২ আশ্বিন ১৪২৮
ই-পেপার শুক্রবার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

সচেতনতা ও সঠিক জ্ঞানই পারে কঠিন বর্জ্যের উৎপাদন কমাতে
দীপিকা পাল পিউ
প্রকাশ: শনিবার, ২৪ জুলাই, ২০২১, ৭:৫০ এএম আপডেট: ২২.০৮.২০২১ ৯:৩৬ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 184

আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস ব্যবহার বা ভোগ করার পর অব্যবহারযোগ্য যে আবর্জনা তৈরি হয় সেগুলোকে বর্জ্য পদার্থ বলে। বর্জ্য সাধারণত কঠিন, তরল, গ্যাসীয়, বিষাক্ত ও বিষহীন এই পাঁচ প্রকারের হয়ে থাকে। জীববৈচিত্র্য রক্ষা, পরিবেশ দূষণ ও অবনমন রোধের উদ্দেশ্যে আবর্জনা সংগ্রহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পুনর্ব্যবহার এবং নিষ্কাশনের সমন্বিত প্রক্রিয়াকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বলা হয়। সাধারণত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বলতে বোঝায় বর্জ্য বস্তুর উৎপাদন হ্রাস করা। 

বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে বর্জ্য উৎপাদনের হার। বাংলাদেশে বর্জ্য সৃষ্টির পরিমাণ প্রতিবছরে প্রায় ২২ দশমিক ৪ মিলিয়ন টন অথবা মাথাপিছু ১৫০ কিলোগ্রাম। এভাবে যদি বর্জ্যরে পরিমাণ বাড়তে থাকে তাহলে ২০২৫ সালের মধ্যে দৈনিক বর্জ্যরে পরিমাণ দাঁড়াবে ৪৭ হাজার ৬৪ টন। যা আমাদের পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তবে আমাদের বর্তমান অবস্থাও যে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য অনুকূলে রয়েছে তাও নয়। কঠিন বর্জ্যরে এই অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি পরবর্তীতে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য যে একটি বিরাট সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, করোনার কারণে সাধারণ ছুটি ঘোষণার এক মাস পর উৎপাদিত হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য। 

এর মধ্যে শুধু ঢাকায় প্রায় ৩ হাজার ৭৬ টন কঠিন বর্জ্য। যেখানে সার্জিক্যাল মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস এবং স্যানিটাইজারের বোতল এই কঠিন বর্জ্যরে নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। এ ছাড়া ত্রাণ বিতরণে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের ব্যাগও ভূমিকা রেখেছে। এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২৬ মার্চ থেকে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে পলিথিন ব্যাগের বর্জ্য ৫ হাজার ৭৯৬ টন, পলিথিন হ্যান্ড গ্লাভস ৩ হাজার ৩৯ টন, সার্জিক্যাল হ্যান্ড গ্লাভস ২ হাজার ৮৩৮ টন, সার্জিক্যাল মাস্ক ১ হাজার ৫৯২ টন এবং হ্যান্ড স্যানিটাইজারের বোতল থেকে ৯০০ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন করেছে।
ঢাকা শহরে অধুনা কিছু কিছু এলাকায় ডাস্টবিনের এমন ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। তবে চোখে পড়েছে শুধু দুটি ডাস্টবিন। একটি কালো রঙের, অন্যটি সবুজ রঙের। বাড়িতে বসবাসরত মানুষরা নিজে থেকে এসেই ফেলে যাচ্ছেন বর্জ্যগুলো। যার থেকে খুব সহজেই সিটি করপোরেশনের বর্জ্য সংগ্রাহকরা আলাদা করেই তুলে নিতে পারছেন। তবে এর ব্যবহার এবং প্রয়োগ 

যথাযথভাবে হলে পরিবেশবান্ধব একটি উদ্যোগ গ্রহণ করা যেত। যার থেকে শুধু পরিবেশ দূষণই রক্ষা পেত না সঙ্গে সঙ্গে ৩জ পদ্ধতির মাধ্যমে ভালো একটি মুনাফাও অর্জন করা সম্ভব হতো। 

প্রতিবছর শুধু আমেরিকানরা ৫০ বিলিয়ন খাদ্য ও পানীয় ক্যান, ২৭ বিলিয়ন কাচের বোতল এবং বয়াম, ৬৫ মিলিয়ন প্লাস্টিক এবং ধাতব বয়াম ফেলে দেয়। এই বর্জ্যরে ৩০ শতাংশ হলো প্যাকেজিংয়ের উপকরণ। আমাদের দেশেও এই শতকরা হার প্রায় একই রকম। প্রতিদিন যে পরিমাণ কঠিন বর্জ্য উৎপাদন হচ্ছে, তাতে এই বর্জ্যরে পরিমাণ হ্রাস করে পরিবেশের বিশুদ্ধতা রক্ষায় সবচেয়ে উপযুক্ত উপায় হলো ৩টি নীতি। 

১. হ্রাস করা : রিডিউস বলতে অতিরিক্ত দ্রব্য ব্যবহার হ্রাস করে শুধু প্রয়োজনীয় দ্রব্য ক্রয় করাকে বোঝায়। ক্ষতিকর, অপচনশীল এবং পুনর্ব্যবহারে অযোগ্য দ্রব্যের ব্যবহার সর্বনিম্ন হারে কমিয়ে আনতে হবে এবং শুধু প্রয়োজনীয় জিনিস ক্রয় করায় আগ্রহী হতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আবারও ব্যবহার অযোগ্য দ্রব্য যেমন কাগজের থালা, ন্যাপকিন, রেজর ইত্যাদির ব্যবহার এড়িয়ে চলতে হবে। এসবের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি পণ্যের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে যাতে করে কঠিন বর্জ্যরে সৃষ্টি কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভবপর হয়। প্যাকেটজাত কিছু পণ্য আছে যা কিনতে গেলে পণ্যটি মোড়ক করার প্রয়োজন নেই। তারপরও পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি এবং আকর্ষণীয় করতে প্লাস্টিক কিংবা কাগজের মোড়ক ব্যবহার করা হয়, যা অপ্রয়োজনীয়। এই ব্যবহার বন্ধ করে দিতে হবে। একটি কম্পিউটার ব্যবহার করে বর্জ্য কমানো যেতে পারে। অনেক সংবাদপত্র ও পত্রিকা এখন অনলাইনের মাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ করে থাকে। এ ছাড়াও শুধু প্রয়োজনে প্রিন্ট আউট করতে হবে এবং কাগজের উভয় পৃষ্ঠাই ব্যবহার করতে হবে। 

‘ওয়ান টাইম ইউজ’ এই ধরনের দ্রব্য ব্যবহার থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে এবং এর উৎপাদনও বন্ধ করে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে ওয়ান টাইম প্লেট, গ্লাস, বাটি ইত্যাদি এবং প্ল্যাস্টিক জাতীয় পণ্য ব্যবহার থেকে নিজেকে সংযত রাখা অতি আবশ্যক।

২. পুনর্ব্যবহার : পুনর্ব্যবহার বিষয়টি বলতে বোঝায় একই পণ্য একাধিকবার ব্যবহার করাকে। আমাদের গৃহস্থলি ও কর্মক্ষেত্রের অনেক পুরনো, ভাঙা, নোংরা, অপ্রয়োজনীয় জিনিস আছে, যা আমরা কোনো প্রকার বিচার-বিবেচনা না করেই ফেলে দিই, যা শুধু বর্জ্যরে উৎপাদনই বৃদ্ধি করে না, পরিবেশেরও ক্ষতি করে থাকে। বাজার করার জন্য একটি কাপড় কিংবা পাটের ব্যাগ সঙ্গে নিয়ে গেলে দোকান থেকে প্লাস্টিক বা কাগজের ব্যাগের ব্যবহার কমে যাবে। আর এই বস্তা বা ব্যাগ পুনঃব্যবহারযোগ্য। যা কঠিন বর্জ্যরে উৎপাদন হ্রাসে ভূমিকা রাখতে পারে। কফির ক্যান, জুতার বাক্স এবং প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার বা অন্য জিনিস সঞ্চয় বা চারু ও কারুশিল্প প্রকল্প করা যেতে পারে। জামাকাপড়, খেলনা, আসবাবপত্র কিংবা অব্যবহারযোগ্য দ্রব্য ফেলে না দিয়ে বিক্রি করা বা অনুদান হিসেবেও দেওয়া যেতে পারে।
একটি কাগজ ব্যবহারের ক্ষেত্রে উভয়পাশর্^ ব্যবহার করা, কোনো উপহারসামগ্রী মোড়কের জন্য চকচকে কাগজ না কিনে বাসার পুরনো বইয়ের পাতা, ক্যালেন্ডার কিংবা পত্রিকা ইত্যাদি দিয়ে মোড়ক করলে নতুনত্ব তো আসবেই পাশাপাশি অর্থ সাশ্রয় হবে।

প্লাস্টিকের তৈরি প্লেট, চামচ, থালার পরিবর্তে অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র ব্যবহার করা, পলিথিন কাগজে খাবার সংরক্ষণ না করে প্লাস্টিক পাত্রে খাদ্য সঞ্চয় করা। এ ছাড়া ঘরের পুরনো কাপড় দিয়ে খুব সহজেই একটা সুন্দর মোরা বা সোফা বা চেয়ার তৈরি করা সম্ভব। কিংবা কোমল পানীয়ের বোতলের তলার অংশটি কেটে সুন্দর একটি ফুলের টব তৈরি করা যেতে পারে। এই পুনঃব্যবহার পদ্ধতি অনেক আগে থেকেই আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে। যা কঠিন বর্জ্য হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে অর্থসাশ্রয়ীও বটে।
দৈনিক অনেক জিনিসই ব্যবহার করা হয়। যেমন কাগজের ব্যাগ, ক্যান, এমন আরও অনেক জিনিস যা পুনর্ব্যবহৃত হতে পারে। নতুন কোনো পণ্য কিনতে গেলে পুনর্ব্যবহার করা যায় এবং যার থেকে নিজেই কিছু তৈরি করে ফেলা যায় এমন দ্রব্য ক্রয়ে আগ্রহী হতে হবে। একটি নষ্ট হয়ে যাওয়া বৈদ্যুতিক বাল্বের ভেতরে মোম ঢুকিয়ে সহজেই একটি পেপার ওয়েট তৈরি করা যায়। ঘরে বসেই কোনো যন্ত্র কিংবা বাড়তি ঝামেলা ছাড়া গলে যাওয়া মোমগুলোকে এক করে গলিয়ে সুন্দর পুতুল, খেলনা, শো পিস তৈরি করা সম্ভব। কিংবা চাইলে নিজেই আবার মোমবাতি তৈরি করা সম্ভব যার জন্য সঠিক জ্ঞান প্রয়োজন।
সর্বোপরি, কঠিন বর্জ্যরে হ্রাস করায় সবাইকে অগ্রসর হতে হবে। 

কারও পক্ষে একা এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব না। আমাদের দায়িত্বশীলতা এবং সচেতনতাই পারে কঠিন বর্জ্যরে এই চলমান বৃদ্ধি হ্রাস করতে। এ ছাড়া আজকের শিশু দেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধার। তাই ছোটবেলা থেকেই শিশুদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে এবং এ শিক্ষা দিতে হবে পরিবার থেকেই। পরিবার থেকে যেখানে সেখানে বর্জ্য না ফেলার শিক্ষা শিশুদের ছোটবেলা থেকেই সচেতন হতে সাহায্য করবে। তা ছাড়া পাঠ্যপুস্তকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে নির্দিষ্ট অধ্যায় সংযুক্ত করলে এবং গণমাধ্যমে যথাযথ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান প্রচারসহ কার্যকর বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে শিশুসহ আমাদের সবাইকে সচেতন করে তুলতে হবে। আর এভাবেই নিরাপদ, সুস্থ-সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করতে কঠিন বর্জ্য উৎপাদন হ্রাস করায় অংশ নিতে হবে ব্যক্তি থেকে বৃহত্তর পর্যায়ে।


     শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং
     বিভাগ,জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ^বিদ্যালয়  
     ত্রিশাল, ময়মনসিংহ




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]