ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা রোববার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১১ আশ্বিন ১৪২৮
ই-পেপার রোববার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

মৃত্যু সংবাদে মুমিনের ভাবনা ও করণীয়
ইয়াসিন আরাফাত ত্বোহা
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩০ জুলাই, ২০২১, ৬:০৯ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 145

মৃত্যু সংবাদ পাওয়া মাত্রই মুসলমানদের মুখে উচ্চারিত হয় ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’, অর্থাৎ, ‘নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং তাঁর কাছেই আমরা ফিরে যাব।’ কারও মুখে এ আয়াত শোনা মাত্রই আমাদের বিবেক জানান দেয়, কেউ একজন মারা গেছেন। অতঃপর আমরা মৃত ব্যক্তির জন্য আফসোস করি, তার কর্মের হিসাব মিলাই, ব্যবসার গতিবেগ ভাবি, সম্পদ ও অট্টালিকার কথা চিন্তা করি এবং তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই। কথা হলো আয়াতের মূলমন্ত্র কী? এটা অন্যের মৃত্যু সংবাদ দেয় নাকি নিজের মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’
 
কথাটিতে দুটো বাক্য আছে, প্রথমত ‘ইন্না লিল্লাহি’, অর্থ আমরা তো আল্লাহরই। দ্বিতীয়ত ‘ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’, অর্থ ‘আর নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।’ দুটো বাক্যই গভীর মর্ম ও ব্যঞ্জনার ধারক, যার উপলব্ধি মুমিনের বুকে আনে প্রশান্তি ও নির্ভরতা আর তার হৃদয়ে জাগিয়ে দেয় এক পবিত্র প্রত্যাশা। আয়াতাংশদ্বয় আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, আমরা আল্লাহর সৃষ্টি, মাবুদের নিকট থেকে আমরা এ দুনিয়ায় আগমন করেছি আবার মাবুদের ডাকে সাড়া দিয়ে তাঁরই কাছে ফিরে যেতে হবে। 

‘আমরা তো আল্লাহর’ কথাটিতে আছে এক অপূর্ব সমর্পণ এবং অদ্ভুত অন্তরঙ্গতা। আরবি ভাষা হিসেবেও বাক্যটির ভাব ও ব্যঞ্জনা এমনই। আরবি ভাষাবিদ মনীষীগণ এ বাক্যের তরজমা করেছেন এভাবেÑ আমরা তো আল্লাহর অর্থাৎ তাঁর মাখলুক ও সৃষ্টি, মামলুক ও দাস। পৃথিবীতে মালিকানা বলে একটা কথা আছে। বাড়ি-গাড়ি জমিজমা, কলকারখানা, কোম্পানি, ব্যাংক, বীমা, সম্পদহ আরও কত কিছুরই মালিকানা রয়েছে। এই পার্থিব মালিকানার রয়েছে নানা সূত্র। যেমনÑ ক্রয়-বিক্রয়, হেবা, দান, উইল, মিরাস ইত্যাদি। এই যে মালিকানার নানা সূত্র, এগুলো তো সর্বজনস্বীকৃত। আর এই স্বীকৃতির ওপরই চলছে গোটা পৃথিবীর সব কাজ-কারবার। অথচ লক্ষণীয় বিষয় হলো, এসব সূত্রের কোনোটাকেই বলা যায় না, শূন্য থেকে সৃষ্টি। শুধু আল্লাহর সৃষ্টিই হলো শুরু থেকে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা যখন কোনো কিছু ইচ্ছা করেন, তখন তিনি বলেন, ‘হও’ আর সঙ্গে সঙ্গেই তা হয়ে যায়।
আর ‘ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ অর্থাৎ, ‘নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী’, 

এই কথাটিতে আছে আখিরাতের প্রতি মুমিনদের ঈমানের ঘোষণা। পৃথিবীর নানা অবস্থা বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, এই পৃথিবী ক্ষণস্থায়ী। এখানের সুখও ক্ষণস্থায়ী, দুঃখও ক্ষণস্থায়ী। বিপদে আক্রান্ত হলে বুঝে আসে, পৃথিবীর সুখ কত অসার! পাওয়ার প্রত্যাশা ও হারানোর বেদনার মাঝে বাস্তব সুখ কত ক্ষণিকের! স্বজন-প্রিয়জনের মৃত্যু স্মরণ করিয়ে দেয়, জীবন কত ক্ষণস্থায়ী! কত দ্রুত অপসৃয়মাণ। এই তো ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে এবং ‘সময়’ আসছে। হজরত ওমর (রা.)-এর বিখ্যাত বাণীÑ ‘প্রতিদিন ঘোষণা হয় অমুক মারা গেছে, অমুকের ইন্তেকাল হয়েছে। একটি দিন তো অবধারিত, যেদিন বলা হবে ওমরের মৃত্যু হয়েছে।’ বর্তমানে বৈশি^ক মহামারি ‘কোভিড -১৯, (করোনা)’ সকাল-সন্ধ্যা আমাদের সেই ক্ষণস্থায়ী জীবন, চিরসত্য মৃত্যু ও চিরস্থায়ী পরকালীন জীবনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

আল্লাহ সুবহানাল্লাহু ওয়া তায়ালা মৃত্যু সম্পর্কে চমৎকার উপস্থাপন পেশ করেন, ‘প্রতিটি প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর অবশ্যই কেয়ামতের দিনে তাদের প্রতিদান পরিপূর্ণভাবে দেওয়া হবে। সুতরাং যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে সে-ই সফলতা পাবে। আর দুনিয়ার জীবন শুধুই ধোঁকার সামগ্রী।’ (সুরা আলে ইমরান : ১৮৫)। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমরা যেখানেই থাক না কেন, মৃত্যু তোমাদের পাকড়াও করবেই।’ (সুরা নিসা : ৭৮)।

’ সুরা জুমুয়ার ৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমরা যে মৃত্যু থেকে পালাতে চাও, সেই মৃত্যুর সঙ্গে অবশ্যই তোমাদের সাক্ষাৎ হবে। তারপর তোমাদের সেই মহান আল্লাহর কাছে ফেরত পাঠানো হবে, যিনি প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব বিষয় জানেন এবং তিনি তোমাদের এবং তোমাদের আমল ও কাজকর্ম সম্পর্কে অবহিত করবেন।’ সুরা মুলকে বর্ণিত হয়েছে, ‘যিনি জন্ম ও মৃত্যু সৃষ্টি করেছেন, যাতে করে তিনি তোমাদের যাচাই করে নিতে পারেন যে, কর্মক্ষেত্রে কে তোমাদের মধ্যে উত্তম।’ আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা (মানুষের) মৃত্যু সময় তার প্রাণায়ু বের করে নেন, আর যারা ঘুমের সময় মরেনি তিনি তাদেরও রুহ বের করেন অতঃপর যার ওপর তিনি মৃত্যু অবধারিত করেন তার প্রাণবায়ু তিনি (ছেড়ে না দিয়ে রেখে দেন) এবং বাকিদের (রুহ) একটি সুনির্দিষ্ট সময়ের জন্য ছেড়ে দেন; এর (ব্যবস্থাপনার) মধ্যে এমন সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে। যারা বিষয়টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে।’ মুমিন ব্যক্তি কারও মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নিজের মৃত্যুর কথা স্মরণে আনেন, নিজের আমলের হিসাব করেন, জাহান্নামের ভয়ে কাবু হয়ে যান।

মৃত্যু সম্পর্কে হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলছেন, ‘মৃতের সঙ্গে তিনটি জিনিস কবর পর্যন্ত যায়। এর মধ্যে দুটি ফিরে আসে এবং একটি থেকে যায়। যে তিনটি কবর পর্যন্ত যায় তা হচ্ছে, মৃতের পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়স্বজন, মাল-সম্পদ ও আমল। কিন্তু পরিবার-পরিজন ও মাল-সম্পদ ফিরে আসে এবং আমল কবরে থেকে যায়।’ (বুখারি)। এদিকে কীভাবে ঈমানের সঙ্গে মৃত্যু লাভ করা যায় সে সম্পর্কে কোরআন-হাদিসে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, যারাই মহান আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা গবেষণা করে, তাদের সঙ্গে আল্লাহর নিগূঢ় সম্পর্ক তৈরি হয় এবং আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্য লাভ করে। ফলে তাদের জন্য ঈমানি মৃত্যু লাভে সহায়ক হয়। পৃথিবীর এক চিরন্তন সত্য ‘মৃত্যু’। 

এ মৃত্যু নামক শব্দটি কারও জন্য প্রচণ্ড ভয়ানক আবার কারও জন্য সফলতার মানদণ্ড। দুনিয়ার জীবন থেকে আখেরাতের চিরস্থায়ী ঠিকানায় যাওয়ার অন্যতম মাধ্যমও এটি। মৃত্যু পরবর্তী জীবন সম্পর্কে সতর্ক করতে আল্লাহ তায়ালা কোরআনুল কারিমে বান্দাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেনÑ ‘তোমরা দুনিয়ার জীবনকেই প্রাধান্য দিচ্ছ অথচ পরকালীন জীবনই উত্তম ও চিরস্থায়ী।’ (সুরা : ১৬-১৭)

সর্বসাধারণ ‘ইন্না লিল্লাহ’ দ্বারা অন্যের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে থাকে আর মুমিনগণ ‘ইন্না লিল্লাহ’ শোনার সঙ্গে সঙ্গেই নিজের মৃত্যুর কথা স্মরণ করে। সর্বদা মৃত্যুর কথা স্মরণকারী ব্যক্তি কখনও আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত হয় না। মৃত্যুর কথা স্মরণকারী ব্যক্তির গম্ভীর ও গুরুত্বপূর্ণ জীবনে এক মুহূর্ত সময়ও নষ্ট হতে পারে না। রাসুলের জীবনে একটি মিনিটও অযথা ব্যয় হয়নি। যথাযথ পরিকল্পনা ও সঠিক পদ্ধতি ছাড়া কেউ উঁচু স্তরে পৌঁছাতে পারে না। তাই প্রত্যেক মুসলমানকে মৃত্যুর কথা স্মরণপূর্বক সময়ের মূল্যায়ন করতে হবে, যথাযথভাবে সময়কে কাজে লাগাতে হবে। 

মৃত্যুর স্মরণ কোনো দুঃখপূর্ণ বা নেতিবাচক বিষয় নয় বরং রাসুল (সা.) সুন্নতের অনুসরণ। মৃত্যুর স্মরণ সর্বদা নিজের কর্মকাণ্ডের হিসাব গ্রহণ, গুনাহ থেকে তাওবা করা, আল্লাহর দিকে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করে। আমাদের পার্থিব জীবন হোক বরকতময় এবং পরকালীন জীবন হোক চিরপ্রশান্তিরÑ আল্লাহর কাছে এই দোয়া ও প্রার্থনা।





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]