ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা  বুধবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১ ৭ আশ্বিন ১৪২৮
ই-পেপার  বুধবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

শিক্ষকের মর্যাদা বনাম অধ্যক্ষের মাত্রাজ্ঞান
মহিউদ্দিন খান মোহন
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩০ জুলাই, ২০২১, ৭:২৩ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 66

শিক্ষকদের বলা হয় মানুষ গড়ার কারিগর। সে গ্রামের পাঠশালা হোক বা স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় হোক, শিক্ষক মানেই শিক্ষাগুরু। তিনি শিক্ষার্থীদের গড়েপিটে মানুষ করেন। সাধারণত বাবা-মায়ের পরেই শ্রদ্ধার মানুষ শিক্ষকরা। বাবা-মা সন্তানের জন্ম দেন। আর একজন শিক্ষক সে শিশুটিকে জ্ঞানের সন্ধান দেন। মহাবীর আলেকজান্ডার তার শিক্ষক দার্শনিক অ্যারিস্টটল সম্বন্ধে যে উক্তিটি করে গেছেন তা আজও শিক্ষকের মর্যাদার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তিনি বলেছিলেন, আমি আমার জন্মের জন্য আমার পিতার কাছে ঋণী, আর কীভাবে সে জন্মকে সার্থক করে বেঁচে থাকতে হয় সে শিক্ষার জন্য আমি অ্যারিস্টটলের কাছে ঋণী। আলেকজান্ডারের এ উক্তি থেকে একজন শিক্ষার্থীর জীবনে তার শিক্ষাগুরুর গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়।

শিক্ষক শব্দটি উচ্চারণের সঙ্গে একজন ভদ্র, রুচিবান এবং দায়িত্বশীল মানুষের ছবি মানসপটে ভেসে ওঠে। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষক তার ব্যক্তিগত কাজকর্মের দ্বারাও শিক্ষার্থীদের পাঠদান করে করে থাকেন। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের দেখানো পথেই হাঁটবে, নিজেদের গড়ে তুলবে এটাই প্রচলিত ধারণা। ছাত্রজীবনে আমরা দেখেছি শিক্ষকরা আমাদের সামনে সংযত হয়ে কথাবার্তা বলতেন, আচরণ করতেন। তারা ছাত্রদের সামনে ধূমপান পর্যন্ত করতেন না, পাছে তাকে দেখে ছাত্ররাও ধূমপানে আকৃষ্ট হয় এ আশঙ্কায়। আর সে জন্যই আমরা যারা কৈশোর-যৌবন পেরিয়ে প্রবীণ হতে চলেছি, এখনও সেসব শিক্ষকের নাম উচ্চারণ করলে শ্রদ্ধায় মাথা নত করি। 

সময় এখন বদলেছে। সামাজিক রীতিনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে অনেক কিছুই পরিবর্তিত হয়েছে। আগে আমরা শিক্ষকদের যেভাবে যে পরিমাণে শ্রদ্ধা-ভক্তি করতাম, এখনকার ছেলেমেয়েরা তা অনেকটাই করে না। শিক্ষকরা আগের মতো শ্রদ্ধার আসনে নেই। কেন যেন তাদের সে আসনটি টলে গেছে। তাহলে কি শিক্ষকরা তাদের ছাত্রছাত্রীদের সঠিক শিক্ষা দিতে পারছেন না? অনেকেই মনে করেন, শিক্ষকদের এই মর্যাদা হ্রাসের জন্য তারা নিজেরাই দায়ী। সবাই নয়, কিছু সংখ্যক শিক্ষকের মধ্যে নৈতিকতার যে ধস নেমেছে, সে কারণে শ্রদ্ধার আসনটি নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। 

গত ২৭ জুলাই দেশের নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ও একজন অভিভাবকের টেলিফোন কথোপকথনের যে বিবরণ দৈনিক পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে, তা পাঠ করে বিস্ময়ে বিমূঢ় হননি এমন কেউ নেই বোধহয়। একজন শিক্ষক, যিনি একটি বৃহৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্ণধার, তার মুখে অমন খিস্তিখেউড় এবং সন্ত্রাসী স্টাইলে হুমকি উচ্চারিত হতে পারে, তা ছিল সবার ধারণার বাইরে। স্কুলটির শিক্ষার্থীদের অভিভাবক ফোরামের উপদেষ্টা মীর সাহাবুদ্দিন টিপুর সঙ্গে ৪ মিনিট ৩৯ সেকেন্ডের কথোপকথনের যে অডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে, তা শুনে মনে হয়নি তিনি একটি শিক্ষালয়ের প্রধান। বরং মনে হওয়াটা স্বাভাবিক যে, তিনি কোনো সন্ত্রাসী গ্রুপের গডমাদার। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী এবং সর্বোচ্চ সরকারি চাকরির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ কেউ অমন অশ্লীল-অশ্রাব্য বাক্য মুখ দিয়ে উদগীরণ করতে পারেনÑ তা অবিশ্বাস্য। কিন্তু আমাদের কাছে যা অবিশ্বাস্য অনেক সময় তা-ই ঘটে।

ভিকারুননিসা নূন স্কুলের প্রিন্সিপাল মহোদয়ের যে রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড রয়েছে, সেটা তিনি নিজেই বলেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন যুব মহিলা লীগের সভাপতির সঙ্গে তার সখ্যের কথাও শুনিয়েছেন। তিনি এটাও বলেছেন, তার ভ্যনিটিব্যাগে পিস্তল থাকে এবং তিনি বালিশের নিচে পিস্তল নিয়ে ঘুমান। সুতরাং তার পেছনে কেউ লাগলে তিনিও তাকে ছেড়ে দেবেন না। 

এ বিষয়ে ওইদিন সমকালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধানমন্ডিতে স্কুলের একটি বাড়ি কেনা, প্রথম শ্রেণিতে ছাত্রী ভর্তি এবং প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন কাজ সংক্রান্ত বিষয়ে পরিচালনা পর্ষদের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছেন অধ্যক্ষ কামরুন নাহার মুকুল। পত্রিকাটি লিখেছে, কামরুন নাহার মুকুল শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রেষণে ভিকারুননিসায় কর্মরত আছেন। এর আগে তিনি মিরপুরের দুয়ারীপাড়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। তিনি পত্রিকাটিকে বলেছেন, ধানমন্ডিতে ৬৪ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি ভবন কেনার মাধ্যমে কতিপয় ব্যক্তির কমিশন খাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানোর কারণে ওই মহলটি তাকে টার্গেট করেছে।

২৮ জুলাইয়ের পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, ঘটনার তদন্তের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে এবং আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে। সঠিক তদন্ত হলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে। তখন বোঝা যাবে কোন পক্ষ দোষীÑ অধ্যক্ষ, না পরিচালনা পর্ষদের কর্মকর্তারা? তবে এ মুহূর্তে বিবেচ্য হলো তার উগ্র মানসিকতা ও ভাষার ব্যবহার। এটা অনুমান করা যায় যে, সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগে তিনি হয়তো বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। আর সে কারণেই মিরপুরের একটি অখ্যাত কলেজ থেকে ডেপুটেশনে দেশের সবচেয়ে নামি ও ঐতিহ্যবাহী নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির প্রধানের চেয়ারে উপবেশন করতে পেরেছেন। এটা অবশ্য অস্বাভাবিক কোনো ব্যাপার নয়। সব সরকারের আমলেই ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা আলাদা সুবিধা ভোগ করে থাকেন। 

তো কামরুন নাহার মুকুল যেহেতু যুব মহিলা লীগের সভাপতির খুব কাছের মানুষ এবং খোদ শিক্ষামন্ত্রীর আস্থাভাজন, তাই তার এ প্রাইজ পোস্টিংয়ে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায়নি। তবে কথা হলো তার আচরণ নিয়ে। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানের সঙ্গে ব্যবস্থাপনা কমিটির নানা বিষয়ে মতভেদ হতেই পারে। তা সমাধানের অনেক পথও রয়েছে। কেউ যদি হুমকি দেয় সে জন্য আইনের আশ্রয় নেওয়ার পথ আছে। তা না করে টেলিফোন-আলাপে পিস্তলের ভয় দেখানো কোনো মতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এটাতো তার জানার কথা যে, কাউকে আগ্নেয়াস্ত্রের ভয় দেখানো আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ; যা একজন শিক্ষকের কাছ থেকে মোটেও কাক্সিক্ষত নয়। 

অতীতে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে অনেক প্রিন্সিপাল ছিলেন। তাদের কেউ কেউ যে পরিচালনা পর্ষদ বা সরকারের প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে বিরোধে জড়াননি বা রোষানলে পড়েননি এমন নয়। তেমনি একজন ছিলেন অধ্যক্ষ হামিদা আলী। দীর্ঘদিন সুনামের সঙ্গে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করেছিলেন। কিন্তু একসময় প্রভাবশালী মহলের বিরাগভাজন হওয়ার পর সসম্মানে সেখান থেকে বিদায় নিয়েছেন। কোনো রকম সংঘাতে জড়াননি। তবে, শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষা এবং মান উন্নয়নে অবদানের জন্য তিনি আদর্শ অধ্যক্ষের মডেল হয়ে আছেন। আরেকজন ছিলেন অধ্যক্ষ হোসনে আরা শাহেদ। 

একাধারে শিক্ষাবিদ, লেখক ও কলামিস্ট। রাজধানীর অন্যতম ঐতিহ্যবাহী নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শেরে বাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ছিলেন দীর্ঘকাল। তিনি শুধু শিক্ষকতাই করেননি, পাশাপাশি নানা বিষয়ে জাতীয় দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকাসমূহে নিয়মিত কলাম লিখতেন। তার অনেকগুলো বই রয়েছে, যেগুলো পাঠকপ্রিয়তা এবং সুধীমহলের প্রশংসা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। দীর্ঘ কর্মজীবনে তাকে নিয়ে কোনো নেতিবাচক খবর শোনা যায়নি। এমন আরও অনেক নারী শিক্ষাবিদ রয়েছেন যাদের নাম এখনও শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। সবার কথা এখানে উল্লেখ করা সম্ভব নয়। তারা স্ব-স্ব যোগ্যতা বলেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি বা পোস্টিং পেয়েছেন এবং নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। কোনো রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে চেয়ারে বসেননি। ক্ষমতার দম্ভে তারা ধরাকে সরা জ্ঞান করেননি। যার ফলে তারা আজও নমস্য হয়ে আছেন। 

সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ-পদায়নে যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তারা ভালো কাজ করবেন আশা করেই সরকার হয়তো তাদেরকে নিয়োগ দেয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই ফলাফল হয় ভিন্ন। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ভাইস চ্যান্সেলরের সাম্প্রতিক ন্যক্কারজনক কর্মকাণ্ড জনমনে প্রশ্ন তুলেছে। কেউ চাকরির মেয়াদের শেষদিনে পছন্দের ছেলেদের পাইকারি হারে চাকরি দিয়ে ঝামেলা বাঁধিয়েছেন, কেউ দিনের পর দিন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে না গিয়ে বেতন-ভাতা-আপ্যায়ন বিল নিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। 

বেশ কয়েকজন ভিসির অপসারণের দাবিতে শিক্ষার্থীদের নামতে হয়েছে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন, ধর্মঘটসহ সর্বাত্মক আন্দোলনে। দলীয় আনুগত্য প্রদর্শন করতে গিয়ে এদের কেউ কেউ এমন সব কাণ্ডজ্ঞানহীন কথাবার্তা বলেন বা কাজ করেন, বিবেকবান মানুষেরা তাতে লজ্জিত হন। রাজধানীর একটি ঐতিহ্যবাহী কলেজ, যেটি নব্বইয়ের দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়েছে, সে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির ভিসি যখন প্রকাশ্যে বলেনÑ যুবলীগের চেয়ারম্যানের পদ পেলে তিনি ভিসির পদ ছেড়ে দেবেন, তখন তা পুরো শিক্ষক সমাজের জন্য লজ্জার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এ জন্য সচেতন ব্যক্তিরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আনুগত্যের চেয়ে মেধা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। 

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ কথা বলার সময় সম্ভবত মাত্রাজ্ঞান হারিয়েছিলেন এবং শিক্ষকের মর্যাদার বিষয়টিও বিস্মৃত হয়েছিলেন। সবচেয়ে বড় কথা, এ ধরনের দু’-চারজন মানুষের জন্য সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়, পড়তে হয় বিব্রতকর অবস্থায়। সমস্যাটা সেখানেই।

ষ  সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক







সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]