ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা  বুধবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১ ৭ আশ্বিন ১৪২৮
ই-পেপার  বুধবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

করোনা দুর্যোগ মোকাবিলায় করণীয়
ড. প্রিয়ব্রত পাল
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩০ জুলাই, ২০২১, ৭:১৯ এএম আপডেট: ০৪.০৮.২০২১ ৯:২১ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 70

করোনা দুর্যোগের কারণে বিশ্বব্যাপী জীবিকার ওপর মারাত্মক ঋণাত্মক প্রভাব পড়েছে, আমাদের দেশের অর্থনীতিতেও তার প্রভাব পড়েছে। অনেকে কাজ হারিয়ে বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন আবার অনেকে দেশের অভ্যন্তরে মোট চাহিদার ব্যাপক হ্রাসের কারণে কাজ হারিয়েছেন। জীবন রক্ষা করতে গিয়ে টিকা সংগ্রহে এবং স্বাস্থ্য খাতে স্বাস্থ্যবিধিসহ বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে এগুতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ সরকারের পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী এতদিনে দেশের শতকরা ৮০ ভাগ জনগণকে টিকা প্রদান করা সম্ভব হতো। কিন্তু ভারত থেকে চুক্তিকৃত যে পরিমাণ অক্সফোর্ড টিকা পাওয়ার কথা ছিল তার নিজের দেশে স্বাস্থ্য খাতে বিপর্যয়ের কারণে সরবরাহ করতে পারছে না। ফলে বর্তমানে সরকারকে চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এর জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। আমরা যদি বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন উৎস থেকে টিকা আমদানির পরিকল্পনা করতাম আজকের এই টিকার সমস্যায় পড়তে হতো না। 

তবে আশাব্যঞ্জক হলো বিদেশি দাতা সংস্থা ও দাতা দেশগুলো সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে ডেল্টা ধরন করোনা আক্রমণে সীমান্ত এলাকায় ঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়েছে সংক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে যদি দেশে উৎপাদন ক্ষমতাকে উৎসাহিত করা হতো এতদিনে আমাদের দেশে টিকা তৈরি, অক্সিজেনসহ জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জামাদি সরবরাহ করতে সক্ষম হতো। এ কারণে দেশের উৎপাদন ক্ষমতার ওপর বেশি জোর দিতে হবে।

বর্তমানে করোনার পাশাপাশি ডেঙ্গুর প্রকোপের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী কোভিড ও ডেঙ্গুর আক্রমণ থেকে জনগণকে যথাযথ সেবাদানের লক্ষ্যে ডাক্তারসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন ও নেতৃবৃন্দকে নিয়ে কার্যকর সভা করেছেন। কার্যক্রমও গুরুত্ব সহকারে শুরু করে দিয়েছেন যা প্রশংসাযোগ্য। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় স্বাস্থ্য অধিদফতর স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ, সংগঠনের, গার্মেন্টস, মাঝারি-ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ভোক্তা অধিদফতরসহ আরও অন্যান্য স্বার্থসংশ্লিষ্ট নেতৃবৃন্দকে নিয়ে একত্রে মতবিনিময় সভা করলে অনেক ফলপ্রসূ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যেত। পাশর্^বর্তী দেশগুলো এবং উন্নত বিশ্বে সংক্রমণ কমাতে সক্ষম হয়েছে বিধায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে ছাত্রছাত্রীরা ক্লাস শুরু করে দিয়েছে।

বর্তমানে টিকা আমদানি ও দেশে উৎপাদন দুটির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বিভিন্ন হাসপাতালে ডাক্তাররা জীবন বাজি রেখে কাজ করে যাচ্ছেন যাদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই এরপরও কিছু কিছু হাসপাতালে কিছু উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তিদের ডাক্তারদের ওপর বর্বরোচিত হামলা মেনে নেওয়া যায় না। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও জেলে প্রেরণ করা উচিত। নতুবা ডাক্তাররা মনোবল হারিয়ে ফেলবেন যা একেবারেই কাক্সিক্ষত নয়। আইনের শাসন কঠোরভাবে পালন করতে হবে। কেননা দেশে বিরোধী চক্র উদ্দেশ্যমূলকভাবে টিকা নিয়ে ভুল তথ্য প্রচারণা চালাচ্ছে। এ ব্যাপারে ইসলামিক ফাউন্ডেশন এবং বায়তুল মোকাররমের খতিবসহ দেশের স্বনামধন্য আলেমদের নিয়ে কমিটি করে সভা করে সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশের প্রতিটি মসজিদে ইমাম সাহেবদের খুতবাতে সুষ্ঠু ব্যাখ্যা দিয়ে এর প্রতিরোধ করার প্রয়োজন ছিল, তবে এখনও করা যায়।

জনসচেতন এবং জনসম্পৃক্ততা ছাড়া সামাজিক বিধি যেমন মাস্ক পরা, হাত ধোয়া, দূরত্ব মেনে চলা, পাড়া-মহল্লায় অযথা চায়ের দোকানে আড্ডা না দেওয়া ইত্যাদি মানানো সম্ভব নয়। পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাজে লাগানো উচিত। বর্তমান সরকারের গ্রাম পর্যন্ত টিকা প্রদানের সিদ্ধান্ত অভিনন্দনযোগ্য। তবে উৎপাদনের ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে এর কার্যকর ব্যবস্থা করা দরকার। কারণ ২৬ কোটি ডোজ টিকা আমদানি করে প্রদান করার সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। আমাদের অভিজ্ঞ ইপিআই টিমকে স্বল্পসময়ে ট্রেনিং দিয়ে প্রস্তুত করতে হবে যেন গ্রাম পর্যায়ে একসঙ্গে টিকা দেওয়া সম্ভব হয়। 

আমার বিশ্বাস, সবাইকে টিকা দেওয়া পরিকল্পনা ৬ মাস বা এক বছরের মধ্যে সম্পাদন করা সম্ভব হবে। উন্নত বিশ্বের মতো আমাদের দেশেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারবে। এত জনবহুল দেশে শুধু প্রণোদনার মাধ্যমে জনগণের জীবন জীবিকার সমাধান সম্ভব নয়। করোনা দুর্যোগে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় সীমিত করার জন্য সাম্প্রতিককালে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী সরকারি চাকরিজীবীদের সম্পদ বিবরণী জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক কিছু ইতিবাচক ফল দেবে যদি রাজস্ব বোর্ড সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে। বর্তমান সরকার কৃষিতে পুরোপুরি সফল। যদিও যথেষ্ট গুদাম ও হিমাগার না 
থাকার কারণে এবং যথাসময়ে ফসল কৃষকদের কাছ থেকে উৎপাদিত শস্য না কেনার কারণে কৃষকরা কম দামে মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। এ সমস্যা বহুদিনের। বর্তমানে সমাধান করা একান্ত জরুরি। 

বিদেশে শ্রমিকদের হয়রানি বন্ধ ও চাহিদা অনুযায়ী শ্রমিকদের ট্রেনিং দিয়ে পাঠাতে হবে সরকারিভাবে। অবৈধভাবে নারী পাচার বন্ধ করতে হবে যা আমাদের দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। শ্রমিকদের মানবেতর জীবনযাপন করতে হয় বা সর্বস্ব হারিয়ে দেশে ফিরতে হয় যা মোটেই কাক্সিক্ষত নয়।
টিকা যেভাবে আসছে এবং দেওয়া হচ্ছে তাতে শতকরা ৮০ ভাগ মানুষকে টিকার আওতায় আনতে এবং সংক্রমণ ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে অনেক সময় লেগে যাবে। এতদিন স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখা যাবে না, তাই চলমান টিভি প্রোগ্রামকে আরও উন্নত করতে হবে, গ্রাম পর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে। অনলাইনে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস-পরীক্ষা শুরু করে দিতে হবে। এ জন্য দেশব্যাপী বিশেষ করে গ্রামের ছাত্রছাত্রীদের ইন্টারনেটের সুযোগ করে দিতে হবে, কারণ বিউপিসহ ব্র্যাক, নর্থ-সাউথ ও অন্যান্য বিভিন্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল কলেজের নিয়মিত ক্লাস চলছে। ফলে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বৈষম্যও বৃদ্ধি পাচ্ছে, অনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাচ্ছে। 

শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখার বিষয়ে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাতে হবে। এরপর স্বাস্থ্য বিষয়ে বিশেষ জোর দিতে হবে। ঢাকা কিংবা বিভাগীয় শহর থেকে গ্রামকেন্দ্রিক করতে হবে। বর্তমান কমিউনিটি ক্লিনিককে চাহিদা অনুযায়ী যুগোপযোগী করতে হবে, স্বাস্থ্যসেবা জনগণের নাগালে নিয়ে যেতে হবে বিশেষ করে করোনা সংক্রান্ত জরুরি সেবাগুলো বিশেষ করে টিকা কর্মসূচি, ওষুধ ও চিকিৎসা সংক্রান্ত যেমন অক্সিজেন, আইসিইউ-সিসিইউ, এনজিওগ্রামের প্রয়োজনীয় সেবাগুলো জনগণের প্রয়োজনে কমিউনিটি ক্লিনিকে থাকতে হবে। প্রয়োজনীয় ডাক্তার ও জনবলের ব্যবস্থা করতে হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে ডাক্তারদের নিয়োগ দিলে করোনা মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারতেন। এদিকে গ্রামে বা গরিব পরিবারে বাল্যবিয়ে বেড়ে গেছে যা মা ও শিশুর মৃত্যুর ঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে। এ বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

বর্তমানে করোনা দুর্যোগ মোকাবিলায় বিশ্বের সব দেশের মতো বাংলাদেশেও লকডাউন অনুসরণ করে জীবন-জীবিকার সমন্বয় করতে হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে জনগণের জরুরি প্রয়োজনীয় সেবা ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়াতে জনগণ ঢাকা শহর নির্ভর হয়ে পড়েছে। বিষয়টি অনাকাক্সিক্ষত হলেও এই কঠিন বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে জনগণের চাহিদা অনুযায়ী লকডাউন পরিকল্পনা করতে হবে। লকডাউন সময়ে দিনমজুরসহ দুস্থ গরিবদের ডাটাবেজ তৈরি করে মোবাইল ব্যাংকিং বা মোবাইল সেবার মাধ্যমে তাদের বেঁচে থাকার মতো ন্যূনতম অর্থ সরকারের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়ে পৌঁছাতে হবে নতুবা লকডাউন কার্যকর হবে না। 

লকডাউনের শুরুর আগের দিন পর্যন্ত যাতায়াতের অবাধ পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকতে হবে যেন জনগণ তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ যেমন বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা, ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনীয় কাজ সেরে নিতে পারে। না হলে সামাজিক স্বাস্থ্যবিধি মানা হবে না, যা করোনা সংক্রমণের ঝুঁকিতে জনগণকে রাখবে যা আমরা কিছুদিন আগের লকডাউন এবং গত ঈদের অভিজ্ঞতা থেকে লক্ষ করেছি। তা ছাড়া আমাদের জনগণ পরিবারকেন্দ্রিক। অতএব বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আগামী দিনের লকডাউন পরিকল্পনা করা যথার্থ হবে। 
শিক্ষা ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর মতো কাক্সিক্ষত কমিটিতে যেখানে জাতীয় অধ্যাপক, প্রাইভেট ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসমূহের প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে আলোচনা করলে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত উপনীত হওয়া যাবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। বাংলাদেশ কোনো কারণে অন্য দেশ থেকে শিক্ষায় পিছিয়ে পড়বে তা বিশ্বাস করতে চাই না। টিকার অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও সুষ্ঠু বণ্টনের মাধ্যমে অর্থনীতি দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পারবে বলে বিশ্বাস করি।

ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী ঈদ উপলক্ষে করোনা দুর্যোগে সবার জীবনযাপন সহজতর করার লক্ষ্যে ৫টি প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন যা খুবই প্রশংসনীয়। কিন্তু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর সংখ্যা আমার মতে যথার্থ নয়। ঠিক একইভাবে দিনমজুর, ভিক্ষুকের সংখ্যার সঠিক তথ্য থাকলে যথাযথভাবে প্রণোদনা বণ্টন করা সম্ভব হতো। অতএব প্রণোদনা বণ্টনের সুষ্ঠু পরিকল্পনা একান্ত প্রয়োজন। তবে সরকার সবাইকে বিনামূল্যে টিকা প্রদানসহ অর্থনীতি স্বাভাবিককরণে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

ষ  অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ
     জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]