ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা  বুধবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১ ৭ আশ্বিন ১৪২৮
ই-পেপার  বুধবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

সবচেয়ে দূষিত শহরে বইছে নির্মল বাতাস
হিরা তালুকদার
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩০ জুলাই, ২০২১, ৭:৫৩ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 89

পৃথিবীকে যদি আগের জায়গায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারি, সেটাই হবে করোনা থেকে পাওয়া সবচেয়ে বড় শিক্ষা।’ পরিবেশবিদ জয়ন্ত বসুর এই কথার প্রেক্ষিতে বলতেই হয়, করোনা থেকে শিক্ষা না হলেও এই মহামারি রোধে দেওয়া লকডাউনের কারণে ক্ষণিকের জন্য হলেও দূষিত বাতাসের শহর ঢাকায় ফিরেছে নির্মল বাতাস। বিশ্বের বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এয়ার ভিজ্যুয়ালের গত পাঁচ বছর ধরে দেওয়া পর্যবেক্ষণে অধিকাংশ সময় ঢাকাকে দূষিত বাতাসের শহর বলা হলেও হঠাৎই পাল্টে গেছে চিত্র। গত ২৩ জুলাই থেকে বিশ্বের অন্যতম নির্মল বায়ুর শহরে পরিণত হয়েছে ঢাকা। 

মূলত কোনো শহরে মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ির কালো ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলা ও শিল্প-কারখানার ধোঁয়া মিলে বায়ুর মান খারাপ হয়। গত ঈদুল আজহা ও টানা ১৪ দিনের লকডাউনকে সামনে রেখে ঢাকা থেকে প্রায় ৫৬ লাখ মানুষ গ্রামের বাড়ি চলে যায়। বন্ধ হয়ে যায় কল-কারখানাসহ সব ধরনের গণপরিবহন। অতি জরুরি ছাড়া ইঞ্জিনচালিত সব যানবাহন বন্ধ রয়েছে ঢাকাসহ সারা দেশে। বেশির ভাগ নির্মাণকাজও বন্ধ। এসব কারণেই রাজধানীর বায়ুর মানের অস্বাভাবিক উন্নতি হয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

এয়ার ভিজ্যুয়াল ২০১৬ সাল থেকে ঢাকাসহ বিশ্বের ৯৬টি শহরের বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ করে আসছে। বিশেষজ্ঞরা জানান, বাতাসের ক্ষতিকর বস্তুকণা পিএম-১০ ও পিএম-২.৫-এর মাত্রা অনুযায়ী ওই মান পরিমাপ করা হয়। এ ছাড়া সালফার ডাই অক্সাইড, কার্বন মনো-অক্সাইড, নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড ও গ্রাউন্ড লেভেল ওজোনে সৃষ্ট বায়ুদূষণ বিবেচনা করে এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স বা একিউআই তৈরি হয়। একিউআই নম্বর যত বাড়তে থাকে, বায়ুমান তত ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচিত হয়। 

একিউআই শূন্য থেকে ৫০-এর মধ্যে থাকলে সেই এলাকার বাতাসকে ভালো বলা যায়। ৫১ থেকে ১০০ হলে গ্রহণযোগ্য, ১০১ থেকে ১৫০ হলে স্পর্শকাতর, ১৫১ থেকে ২০০ হলে সবার জন্য অস্বাস্থ্যকর, ২০১ থেকে ৩০০ হলে খুবই অস্বাস্থ্যকর এবং ৩০১ ছাড়িয়ে গেলে সেই বাতাসকে বিপজ্জনক ধরা হয়। এয়ার ভিজ্যুয়ালের তথ্য মতে, গত ২১ জুলাই থেকেই ঢাকার বায়ুর মান ভালো হতে শুরু করে। এরপর টানা পাঁচ দিন ঢাকার বায়ুর মানের সূচক গড়ে ৫০-এর নিচে ছিল, যা ভালো হিসেবে ধরা হয়। স্বাভাবিক সময়ে এই সূচক ২০০-এর বেশি থাকে। কখনও কখনও তা ৩০০ ছাড়িয়ে যেত।
সংস্থাটি জানায়, গত ২৮ জুলাই বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় ৩ নম্বরে ছিল দিল্লি। আর সেদিন ঢাকার অবস্থান ছিল ৬৮তম। 

নির্মল বাতাসের প্রভাব পড়েছে মানুষের দৃষ্টিসীমায়। আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য মতে, স্বাভাবিক সময়ে যেখানে ঢাকায় ২ থেকে ৪ কিলোমিটার দূরের জিনিস দেখা যায়, সেখানে গত ২২ থেকে ২৯ জুলাই পর্যন্ত ৭ থেকে ৯ কিলোমিটার বা কখনও কখনও ১০-১১ কিলোমিটার দূরের জিনিস দেখা গেছে, যা গত ১৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

অধিদফতর জানায়, ২২ জুলাই ঢাকার বায়ুতে দূষিত বস্তুকণার পরিমাণ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। এ ধরনের বায়ুর মান সাধারণত গবেষণার ল্যাব ও উন্নত দেশগুলোর স্বাস্থ্যকর শহরগুলোতে পাওয়া যায়। গত ২৮ জুলাই ঢাকার বায়ুর মান সূচক ছিল ৪১।

এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক জিয়াউল হক বলেন, ‘সবাই সচেতন হলে ঢাকার বায়ুর মান ভালো থাকত। কারণ ঢাকার চারপাশে নদী, বছরের অর্ধেক সময় বৃষ্টিসহ নানা প্রাকৃতিক কারণে এখানকার বায়ুর মান ভালো থাকার কথা। কিন্তু রাজধানীর চারপাশের ইটভাঁটা, যানবাহনের ধোঁয়া আর নির্মাণকাজের ধুলার কারণে ঢাকার বায়ু বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় বারবার শীর্ষে উঠে আসছে।’ 

রাজধানীকে দূষণ থেকে বাঁচাতে পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি) ২০১৯ সালের ২১ জানুয়ারি রিট করে। ওই রিটে ২০২০ সালের ১৩ জানুয়ারি হাইকোর্ট ৯ দফা নির্দেশনা দেন। সেগুলো হচ্ছেÑ ঢাকা শহরে মাটি, বালু, বর্জ্য ও মালামাল ঢেকে পরিবহন করতে হবে। চারপাশ ঘিরে উন্নয়ন বা নির্মাণকাজ করতে হবে। মাটি, বালু, সিমেন্ট, পাথরসহ নির্মাণসামগ্রী ঢেকে রাখতে হবে। ঢাকার রাস্তায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সকাল-বিকাল পানি ছিটাতে হবে সিটি করপোরেশনকে। রাস্তা, কালভার্ট, কার্পেটিং, খোঁড়াখুঁড়ির কাজ আইন ও দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী নিশ্চিত করতে হবে। যেসব যানবাহন নির্ধারিত মাত্রার বেশি কালো ধোঁয়া ছড়ায় সেগুলো জব্দ করতে হবে। 

সড়ক পরিবহন আইনের বিধান অনুযায়ী প্রত্যেক যানবাহনের ‘ইকোনমিক লাইফ’ নির্ধারণ করতে হবে। যেসব পরিবহনের ‘ইকোনমিক লাইফের’ মেয়াদ পেরিয়ে গেছে, সেসব যানবাহন নিষিদ্ধ করতে হবে। ঢাকা ও তার আশপাশের এলাকায় অবৈধ ইটভাঁটা বন্ধ করতে হবে। পরিবেশ অধিদফতরের অনুমোদন ছাড়া টায়ার পোড়ানো বা ব্যাটারি রিসাইকেলিং বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। শপিংমল, বাজার, দোকানের প্রতিদিনের বর্জ্য ব্যাগ ভরে নির্ধারিত জায়গায় রাখতে হবে এবং সেগুলো অপসারণে সিটি করপোরেশনকে পদক্ষেপ নিতে হবে।

সময়ের আলোকে এইচআরপিবির প্রেসিডেন্ট মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে যখনই লকডাউন দেওয়া হয়, তখনই ঢাকার বায়ুর মান উন্নত হয়। অর্থাৎ এই শহরের বায়ুদূষণ আমাদের সৃষ্টি করা, প্রাকৃতিক নয়।’ তিনি বলেন, ‘ঢাকা ও আশপাশের এলাকার বায়ুদূষণ রোধে গতবছর জানুয়ারিতে হাইকোর্ট যে ৯ দফা নির্দেশনা দিয়েছিলেন, তা মানা হলে লকডাউন ছাড়াও এই এলাকার বায়ুর মান ভালো থাকত।’ 

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ও ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ক শরিফ জামিল সময়ের আলোকে বলেন, ‘ধোঁয়া, ধুলা ও অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইডের কারণে ঢাকা শহরের বায়ুর মান চরম খারাপ পর্যায়ে চলে এসেছিল। তবে চলমান লকডাউনে বায়ুর মান উন্নত হয়ে এমন পর্যায়ে এসেছে, যা পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো বায়ুর শহরের সমপর্যায়ে। এ থেকে বোঝা যায়, আমরা চাইলেই এই শহরের বাতাস ভালো রাখতে পারি।’ ঢাকার বায়ুর মান ভালো রাখতে সরকারকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বাপার নির্বাহী সহসভাপতি ডা. আব্দুল মতিন বলেন, ‘গাড়ি, কল-কারখানাতে ইটিপি থাকবে না, থাকলেও নষ্ট থাকবে বা খরচের ভয়ে চালাবে না, ইটের ভাঁটা চলবে, এগুলোতে বিষাক্ত কয়লা দেওয়া হয়। তাতে ইটিপি লাগানো হবে না। এগুলো হলে বায়ুদূষণ হবেই।’ তিনি বলেন, ‘লকডাউনে এগুলো হয়তো কম বা বন্ধ আছে, এ কারণে দূষণ কমেছে। আবার চালু হলে, দূষণও বাড়বে। এখন সরকারকে আগে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, বায়ুদূষণ বন্ধ করতে চায় কিনা। সরকার চায় কিন্তু হয়নি, এমন তো কখনও হয়নি। সরকার চাইলেই বায়ুদূষণ বন্ধ হয়ে যাবে।’




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]