ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা  বুধবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১ ৭ আশ্বিন ১৪২৮
ই-পেপার  বুধবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

তিতিক্ষার পর তিতিক্ষা
মনি হায়দার
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩০ জুলাই, ২০২১, ৮:৫৯ এএম আপডেট: ০২.০৮.২০২১ ৩:২৩ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 163

মারুফা বেগমকে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ছুটছে বিকট শব্দ তুলে।

যদিও রাস্তা ফাঁকা, কোনো যন্ত্রচালিত যানবাহন নেই রাস্তায়, কিন্তু টেনশন যাচ্ছে না শ্যামলের। অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে মায়ের হাত ধরে বসে আছে শ্যামল আর নারগিস। ওরা দুজনে পিঠাপিঠি ভাইবোন। শ্যামল থাকে খুলনায়। বৈকালীতে ওর মোটর পার্টসের দোকান। ছোট বোন নারগিসের বিয়ে হয়েছে পাশের গ্রাম বিরামপুরে। বড় ভাই লিটন মাহমুদ থাকে ঢাকায়। মা মারুফা বেগম বাড়িতে একাই থাকেন। স্বামী তৌকির খোন্দকার মারা গেছেন পনেরো বছর আগে। বৈধব্যর ধকল, শোক আর সন্তাপ নিয়ে জীবনের অনেকগুলো বছর পার করেছেন মারুফা বেগম। এখন অনেকটা সুখের দিন যাপন করছেন বাড়িতে, নিজের মতো করে। দুঃখ একটাই- ছেলেমেয়েরা কাছে থাকে না। কিন্তু মোবাইল ফোনে প্রায় প্রতিদিন ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আলাপ করেন।
গত মাসে শ্যামল বাড়ি আসে জ্বর নিয়ে। জ্বরের সঙ্গে ছিল খুশখুশে কাশি। টেলিভিশনে, পত্রিকায় যেভাবে কোভিড বাড়ছে, ছেলের জ্বর আর কাশি দেখে ভয় পেয়েছিলেন মারুফা বেগম। তিনি ভর্ৎসনা করে বলেছেন, এই সময়ে তোকে বাড়ি আসতে কে বলেছে?
আপনাকে দেখতে ইচ্ছে করছিল, তাই... শ্যামল খোন্দকার শুয়ে শুয়ে আদা দিয়ে রংচায়ের কাপে চুমুক দেয়।  থেমে যান মারুফা বেগম। ছেলে যখন এক-দেড় মাস পর পর মাকে দেখার জন্য উতলা হয়ে বাড়ি আসে, তখন কী আর বলার থাকে? বরং এক ধরনের আনন্দ, গর্ব আর সুখ ছড়িয়ে পড়ে মনের ও শরীরের কোনায় কোনায়। ঢাকা থেকে মোবাইলে জর্জরিত করতে থাকে লিটন, তুই আসার সময় মুখে মাস্ক পরেছিলি?
পড়েছিলাম ভাইয়া, কৈফিয়ত দেয় শুয়ে শুয়ে শ্যামল। স্যানিটাইজের ছোট সুদৃশ্য বোতল দেখিয়ে বলে, সারাক্ষণ বাসে, রিকশায়, ফেরিতে হাতে মেখেছি। 
গন্ধ পাচ্ছিস খাবারের?
পাচ্ছি।
ও, একটু আশ্বস্ত হয় লিটন খোন্দকার। গন্ধ পাওয়াটাই হলো আসল। করোনার ভাইরাস নানা ধরনের। কোনোটা অল্পতে রেহাই দেয়, আর কোনোটা... লিটন খোন্দকার শেষ করে না শঙ্কার বাক্য। 
আমার মনে হয়,সর্দিই হয়েছে ভাইয়া। 
তুই বড় এক ডাক্তার! বড় ভাইয়ের ধমকে চুপসে যায় শ্যামল।
মারুফা বেগম বিছনায় বসে বসে কুলায় চাল রেখে বাছছিলেন আর দুই পুত্রের মধ্যে সংলাপ শুনছিলেন। বুকটার মধ্যে অদম্য সুখ চিনিমাখা পিঁপড়ার গতিতে ছড়িয়ে পড়ে- দুই ভাইয়ের মধ্যে এমন মিল, আজকাল দেখাই যায় না। ঢাকা থেকে ফোন এলে শ্যামল মোবাইলের লাউড স্পিকার খুলে দেয়, যাতে পাশে বসা মাও শুনতে পারে দুই ভাইয়ের সংলাপ। 
শোন, আমি একটা প্রেসক্রিপশন পাঠাচ্ছি হোয়াটসঅ্যাপে, সেইভাবে ঔষধ খাবি। বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার ডাক্তার বন্ধু সাইফুল ভূঁইয়া আগেই আমাকে পাঠিয়েছে হোয়াটসঅ্যাপে সতর্ক থাকার জন্য। এই প্রেসক্রিপশন মেনে চলবি। বাড়ির বাইরে যাবি না একদম। মায়ের কাছ থেকে দূরে থাকবি জ্বর না কমা পর্যন্ত। তোর তো আবার মাখামাখি স্বভাব। আর এক ঘণ্টা পর পর আদা, তেজপাতা, লেবুর রস মিশিয়ে চা খাবি। মাকে বলবি, ফ্লাস্কে যেন চা রান্না করে তোর পাশে রেখে দেয়, চায়ের কাপসহ। বুঝেছিস?
জি...। 
এখন রাখলাম। রাতে আবার ফোন দেব...।
আচ্ছা। লিটন ফোন কাটার সঙ্গে সঙ্গে তাকায় মায়ের দিকে, দেখলে তোমার বড় ছেলে আমাকে কেমন করে শাসায়?
মৃদু হাসেন, শাসাবে না? বড় ভাই, তোকে কোলে পিঠে করে বড় করেছে না!
একদম চুপ শ্যামল খোন্দকার। 
বাড়িতে প্রায় এগার দিন থেকে একেবারে জ্বর-কাশিমুক্ত হয়ে খুলনায় চলে যায় শ্যামল। তাও মাসখানেক হয়নি, দুপুরে নারগিসের ফোন, ছোট ভাই? 
কী রে? সারা দেশে চলছে লগডাউন। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ আজন্ম আত্মপ্রতারক। প্রথম দু-তিন দিন লকডাউন মানলেও পাঁচ দিনের মাথায় গোটা ব্যাপারটা লুকোচুরির পর্যায়ে চলে যায়। দোকানপাট অল্পবিস্তর গলির মধ্যে খোলা থাকে। মানুষ মোড়ে মোড়ে জটলা পাকায়, চা সিগারেট ফোঁকে আর সরকারের চৌদ্দ গুষ্ঠি তুলে গালি দেয়। চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে বলে রিকশাঅলা জাফর, আরে ভাই আমরা অইলাম মোসলমান। কলমা পড়ছি। যারা একফির কলমা পড়ে হেগো আর করোনা ফরোনায় ধরে না। 
তুমি ঠিকই কইচো, সমর্থন করে সোলেমান কাজী। বিরোধী দলের স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী- আর এই করোনা ফরোনা কোত্তেকে আইচে জানো? এইসব খিরস্টানরা বানাইয়া আমাগো দেশে পাঠাইচে, যাতে আমরা মইরা ছাপ অইয়া যাই। আর হালারা আমাগো দেশটা দখল করতে পারে। হোনো নাই, সুন্দরবনের নিচে, সমুদ্রে তেল আর গ্যাসের বিশাল খনি পাওয়া গেচে। বাসা থেকে বের হয়ে গলির মুখে চান সওদাগরের চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে শ্যামল গল্পগুলো শুনছিল আর মনে মনে হাসছিল। একটা জাতির মাঝারি লেভেলের জনগণের চিন্তার পরিধি যদি এই ধরনের হয়, সেই জাতির গোয়া মারা ঠেকাবে কোন শালায়? এক কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে ভাবছে শ্যামল, যাব দোকানে? রিপন কী করছে? চাচাতো ভাই রিপন দোকানে কাজ করে। ওর ওপর অনেকটা দায়িত্ব। সোনার বাংলার পার্টসের দোকান খুলতে পেরেছে কি না, জানার জন্য কেবল পকেট থেকে মোবাইল বের করেছে, নারগিসের ফোন। 
কী রে?
মায় তো বাচবে না- কান্নাজড়িত গলা নারগিসের। 
পুরো শরীর ঝাঁকি খায় শ্যামলের, মার কী অইচে?
তিন দিন ধইরা মার জ্বর, কাশি। কিচ্ছু খাইতে পারে না। বমি করে খালি-
তিন দিন ধরে... তুই আজকে ফোন দিচ্ছিস? ক্রোধে গলার স্বর আটকে যায় শ্যামল খোন্দকারের। তুই প্রথম দিন জানাস নাই ক্যান?
আমি তো জানলাম গতকাল- আমারে খবর পাঠাইচে। নাইলে তো জানতাম না। গতকাল একটু ভালো ছিল কিন্তু রাত থেকে-
তুই সেই রাইতে জানালি না কেনো?
আমারে মায়ে তোমাগো জানাইতে না করছে। কইচে তোমরা চিন্তা করবা।... হাউমাউ কান্নায় ভেঙে পড়ে নারগিস। ছোটভাই, তাড়াতাড়ি বাড়ি আসো।ছোট বোনের কান্নায় আক্রান্ত শ্যামল খোন্দকার। একটু আগে কড়া গলায় ধমকের জন্য খারাপ লাগছে, এবং নিজেরও বুক ভেঙে কান্না আসছে। প্রাণপণ শক্তিতে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে শ্যামল খোন্দকার। ওইদিকে, মোবাইলের ওপ্রান্তে আকুল হয়ে কাঁদছে নারগিস আর একটা বাক্যই বারবার বলছে, মার খুব কষ্ট অইতেছে। তাড়াতাড়ি বাড়ি আসো। মায়ে বাঁচবে না... তিনটি বাক্য একের পর এক আওড়াচ্ছে আর কাঁদছে। 
ঠিক আছে বুড়ি, ছোট বোনটাকে গভীর স্নেহের প্রকাশকালে শ্যামল বুড়ি ডাকে। আমি আসতেছি, তুই চিন্তা করিস না।
আইচ্ছা- আমি কিন্তু তোমাকে জানাইছি মায়রে কইবা না।
ঠিক আছে, তুই সব সময়ে মায়ের কাছে থাক। আদা তেজপাতা লবঙ্গ দিয়ে চা খেতে দে। আর ফারুক ডাক্তারকে খবর দে- না, থাক। তুই মায়ের কাছে যা। আমি ফারুককে ফোন করে দিচ্ছি। 
ফারুক উজানগাঁও গ্রামের মানুষ। একসঙ্গে উজানগাঁও স্কুলে পড়েছে, মেট্রিক পাস করে শ্যামল খোন্দকার চলে এসেছে খুলনায়, বড় মামার বাসায় থেকে দৌলতপুর কলেজে ভর্তি হয়ে পড়াশোনার জন্য। ফারুক ভাণ্ডারিয়া কলেজ থেকে বিজ্ঞানে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে দুই বছরের পল্লী চিকিসকের কোর্স করে বরিশালের একটা এনজিও থেকে। এখন ফারুক গোটা এলাকার একমাত্র ভরসা। ফারুককে ফোন করে সব জানিয়ে বাড়িতে গিয়ে মারুফা বেগমের পরিস্থিতি দেখে জানাতে বলে শ্যামল।
আমি এখনই যাচ্ছি তোগো বাড়ি... ফারুক জানায়।
চান সওদাগর চায়ের কাপ বাড়িয়ে দিলে কাপটা হাতে নেয় শ্যামল। চায়ে চুমুক দিয়ে নিজেকে নিজে বলে, হ্যালো মি. শ্যামল, প্রকৃত বুদ্ধিমান যোদ্ধারা বিপদে ধৈর্য হারায় না। তুমি নিজেকে কী মনে করো? বোকাচোদা না বুদ্ধিমান? বোকাচোদা মনে করলে কুনু কথা নাই আর যদি বুদ্ধিমান মনে করো, তাইলে মাথাটা ঠান্ডা রাখো। এখন দ্রুত একটা অ্যাম্বুলেন্স যোগাড় করো। এবং খুলনা থেকে বাগেরহাট পিরোজপুর পাড়েরহাট হয়ে তোমাদের উজানগাঁও গ্রামে চলে যাও। বাড়িতে গিয়ে দেখো মায়ের কী অবস্থা। জানাও বড় ভাইকে...।
চায়ের অর্ধেক খেয়ে কাপটা রেখে ফোন দেয় পরিচিত এক অ্যাম্বুলেন্সঅলাকে। আগে থেকে মারুফা বেগমের হার্টের সমস্যা। বছরে দুই একবার খুলনায় এনে চিকিৎসা করাতে হয়। সেই সুবাদে পরিচিত অ্যাম্বুলেন্সঅলা সমীর হালদারকে ফোন দেয়। ফোনটা ধরেই বলে সমীর হালদার, আইতেছি ভাই।
বাড়িতে এসে মায়ের পরিস্থিতি দেখে ভেতরে ভেতরে মুষড়ে পড়লেও নিজেকে শক্ত রাখে শ্যামল খোন্দকার। জানায় লিটনকে। সব শুনে বলে, ঢাকায় নিয়ে আয়। সেই যাত্রা চলছে। মাওয়া ঘাটে এসে দেখে সব ফেরি বন্ধ। আর প্রতি দশ মিনিট পর পর লিটনের ফোন, কই তোরা?
আমরা ফেরিতে, অনেক পরে ফেরি এলে জানান দেয় শ্যামল।
আমি মুগদা কোভিড হাসপাতালের সামনে আছি। সরাসরি এখানে চলে আয়...
বিকেলের দিকে হাসপাতালের সামনে চলে আসে মারুফা বেগমকে বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স। দরজা খুলে মায়ের বিপন্ন মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের কান্না রোধ করতে পারে না লিটন। প্রায় মিনিটখানেক কান্নার পর নিজেকে সামলে অ্যাম্বুলেন্সের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ায় লিটন।
দাঁড়িয়ে আছো কেনো? মাকে হাসপাতালের ভেতরে নিয়ে চলো। তাড়া দেয় শ্যামল। ঢাকা শহরের কোনো হাসপাতালের আইসিইউ বেড খালি নেই, আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে লিটন খোন্দকার, এখানে আমার বন্ধুর বাবা আছেন, ডাক্তার মোবারক খান। উনি আশ্বাস দিয়েছেন- একটা বেডের...
তাহলে চলো, উদ্বিগ্ন শ্যামল।
সেই বেডে একজন রোগী আছে, মরণাপন্ন। হয়তো এখন, নয়তো পাঁচ মিনিট, না হয় আধা ঘণ্টা পর মারা যাবে। সেই রোগীটিও আমার বন্ধুর বাবা। বন্ধুর বাবার মৃত্যুর পরই মাকে সেই বেডে নেয়া হবে। আমাদের অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই শ্যামল... খুব আস্তে নিজের সকল ব্যথা অসহায়ত্ব ধারণ করে বলে লিটন। অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে বসে শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রবল কষ্টে হাঁপিয়ে ওঠা মায়ের হাত ধরে নিঃশব্দে কাঁদছে কন্যা নারগিস। বাইরে কাঁদছে দুই পুত্র- লিটন আর শ্যামল খোন্দকার।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]