ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শুক্রবার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ ২ আশ্বিন ১৪২৮
ই-পেপার শুক্রবার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

রাজশাহীর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদকে অভিনন্দন
বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে আসুক দেশ
রণেশ মৈত্র
প্রকাশ: সোমবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ১১:৪৫ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 63

অভিনন্দন জানাই আশির দশকের রাজশাহীর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদকে, শনিবার তারা জাতীয় রাজনীতির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিকটির প্রতি অঙ্গুলি হেলন করে সময়োপযোগী কতিপয় সুপারিশ সরকার ও দেশবাসীর কাছে তুলে ধরার জন্য। খবরটি জানা গেল একটি জাতীয় দৈনিকে বিগত ৫ সেপ্টেম্বর রোববারে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে।

দেশের সর্বাধিক পুরাতন খ্যাতনামা প্রগতিশীল ওই পত্রিকাটি তাদের শেষ পৃষ্ঠায় ‘রাজনীতিবিদদের কাছে রাজনীতি ফিরিয়ে আনাসহ ৬ প্রত্যাশা’ শীর্ষক দুই কলামব্যাপী প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে : আশির দশকের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, রাজশাহীর উদ্যোগে শনিবার বেলা ১১টায় নানকিং কনভেনশন হল, রাজশাহীতে ‘সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা প্রত্যাশা, প্রাপ্তি ও আজকের প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক এক গোলটেবিল সুধী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সুধী সমাবেশে আলোচকরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, আশির দশকের ছাত্র সংগ্রামের সোনালি অর্জন ও বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করেন এবং আলোচনা শেষে সুধী সমাবেশের পক্ষ থেকে বেশ কিছু প্রস্তাবনাও উপস্থাপন করা হয়। দলগুলোয় শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করতে হবে। বিজ্ঞানমনস্ক, যুক্তিবাদী, একমুখী হবে। বাহাত্তরের সংবিধানের মূল ধারায় দেশ পরিচালনা করতে হবে। নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন করতে হবে।

গোলটেবিল সুধী সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন আশির দশকের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ছাত্র নেতা ও ভিপি রাগীব আহসান মুন্না। ওই সুধী সমাবেশ আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য প্রফেসর আবদুল খালেক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রফেসর এসএম আবু বকর, প্রফেসর মলয় ভৌমিক প্রফেসর শাহ আলম শান্তনু প্রমুখ।

এ ছাড়াও আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন আশির দশকের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা ও রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান আসাদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ইকবাল, সাবেক ছাত্র নেতা মো. হাবিবুর রহমান বাবু, রাজশাহী কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি শরিফুল ইসলাম বাবু ও সাবেক জিএস আল মাসুদ শিবলী, সাবেক ছাত্র নেতা আবু রায়হান মাসুদ, সাবেক ছাত্র নেতা মেরাকুল আলম মেরাজ, কামরান হাফিজ ইয়ামিন, শাহাবুদ্দিন আহমেদ লিকু, জিয়াউল হক জিয়া, আবদুল হাকিম, রাজশাহী মহানগর ছাত্র লীগের সাবেক সভাপতি মো. শফিকুজ্জামান শফিকসহ শতাধিক নেতা।

উপরে লিখিত বিষয়টি এমন একটি সময়  আলোচনায় আনা হলো যখন আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শ হয়ে পড়েছে (বা করে ফেলা হয়েছে) অত্যন্ত মøান ও বিবর্ণ, যখন দেশের রাজনীতি বহুলাংশে হাইজ্যাক করেছে অপরাজনীতি। দেশের রাজনীতি যখন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে রাজনীতিবিরোধী সুবিধাবাদী, ব্যবসায়ী ও দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তি ও আমলাদের হাতে, সেই মুহূর্তে এই আলোচনা শুধু সময়োপযোগীই নয়- এটা এখন দেশের আনাচে-কানাচে ব্যাপক মানুষের অংশগ্রহণে আলোচনার বিষয়। যদিও এ কথা অনস্বীকার্য যে করোনা মহামারির এই ভয়াবহ ও ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে ব্যাপক কোনো গণজমায়েত আজও যুক্তিযুক্ত নয়। কিন্তু সীমিত পর্যায়ে দায়িত্বশীল নেতাকর্মীদের (স্বাস্থ্যবিধি মেনে) উপস্থিতিতে বিষয়টি নিয়ে মহানগর, জেলা ও উপজেলা এবং শুধু রাজনীতিতে সক্রিয়রাই নন, সংস্কৃতিসেবী, আইনজীবী, সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা, ঐতিহাসিকদের সর্বাধিক সম্ভব সমাবেশ ঘটিয়ে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলাটাও সময়ের দাবি। এ দাবিতে সব সংশ্লিষ্ট মহল দ্রুত উদ্যোগী হয়ে জনমত গড়ে তুলতে পারলে সমগ্র দেশ উপকৃত হবে, দেশের মানুষ ক্রমান্বয়ে সঙ্কটমুক্ত হবে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শ নতুন করে সোনালি সূর্যের মতো উদিত হবে, দেশের শিশু-কিশোর
তরুণ-তরুণীরা উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত হবে। তারা বিজ্ঞানচেতনা ও অসাম্প্রদায়িক আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে দেশের জন্য অবদান রাখবে। বাঙালি সংস্কৃতি ও বাঙালি সভ্যতা অবলুপ্তির হাত থেকে শুধু টিকিয়ে রাখবে না বরং এক নতুন মহিমায় বাংলাদেশকে আবার মহিমান্বিত করবে। মৌলিক অর্থে বাহাত্তরের মূল সংবিধানটি অবিকল পুনরুজ্জীবিত হয়ে একাত্তরের সুমহান বিজয় বার্তা সমগ্র সমাজে নতুন করে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হবে। সেই শুভ দিন, সেই প্রত্যাশিত দিন ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে যারাই রাজশাহীতে এই অসাধারণ আয়োজন করেছিলেন, যারাই আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছিলেন, যারাই শ্রোতা হিসেবে উপস্থিত থেকে আলোচক আয়োজকদের উৎসাহিত করেছেন- তারা সমগ্র জাতির কাছে প্রাণঢালা অভিনন্দন পাওয়ার যোগ্য। এই প্রচেষ্টার প্রতি অন্ততপক্ষে নিজের সংহতি জানিয়ে কিছু জরুরি বিষয় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে চাই। আমি মনে করি, বিষয়গুলো উল্লেখ করার অধিকার একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে, প্রগতিশীল রাজনীতিক হিসেবে, প্রবীণ সাংবাদিক, ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সবাই উল্লেখের অধিকার রাখেন।

বেদনাদায়ক সত্য হলো, সত্তর দশকের সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান, আশির দশকের পর সামরিক শাসক স্বৈরাচারী এরশাদ তাদের নিজ নিজ ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার লক্ষ্যে অসাংবিধানিক পদ্ধতিতে বাহাত্তরের সংবিধানের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রহিম’ সংযোজন ও জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলামসহ সব সাম্প্রদায়িক ও উগ্র ধর্মান্ধ, স্বাধীনতাবিরোধী দলগুলোকে সংবিধানবহির্ভূত এবং অবৈধভাবে প ম সংশোধনীর মাধ্যমে বৈধতা দান এবং একই পদ্ধতিতে অবৈধ অষ্টম সংশোধনীর মারিফত ‘রাষ্ট্রধর্ম’ সংযোজন করে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ দেশকে মুক্তিযুদ্ধের ধারার বদলে পাকিস্তানি ধারায় ফিরিয়ে নিয়েছিল, সেই অবস্থা থেকে আমরা আজও বের হয়ে আসতে পারিনি।  এতে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশকে মারাত্মকভাবে পেছনে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

পরিস্থিতিটা এতটাই পাকিস্তানি ধারার রূপ লাভ করেছে, রাজনীতির ও সন্ত্রাসের অঙ্গনে সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তির ঔদ্ধত্যপূর্ণ হুমকিতে সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে একটি ভাস্কর্য অপসারণ, পাঠ্যপুস্তকের সাম্প্রদায়িকীকরণ এবং এমনকি বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে বঙ্গবন্ধুর একটি বিশাল ভাস্কর্য নির্মাণের সরকারি প্রকল্পও অঘোষিতভাবে পরিত্যক্ত করা হয়েছে।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর সন্ত্রাসী হামলা। সাম্প্রতিককালের ঘটনাটি নিশ্চয়ই সবার মনে আছে। সুনামগঞ্জে হেফাজতের তৎকালীন যুগ্ম আমির মাওলানা মামুনুল হক সাম্প্রদায়িকতার উসকানি দিয়ে ওয়াজ করার পর দিরাই-শাল্লা উপজেলাধীন একটি গ্রামের শতাধিক হিন্দু পরিবারের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগে পর ঝুমন দাশ ফেসবুকে মানুমুলের ওই ভাষণের বিরোধিতা করে একটা পোস্ট দিলে তাকে গ্রেফতার করা হয়। আজও তিনি ছাড়া পাননি। অন্যদিকে শতাধিক বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, লুটপাটের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা মামলা করলে যাদের গ্রেফতার করা হয়েছিল তারা অনেকেই দিব্যি জামিনে মুক্তি পেয়েছে।   এখন তারা গ্রামবাসীদের মামলা তুলে না নিলে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হবে বলে হুমকি দিয়ে বেড়াচ্ছে। নির্দোষ ঝুমন দাশ জেলে আর অপরাধীরা বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এটি নিশ্চয়ই বঙ্গবন্ধুর ও লাখো মুক্তিযোদ্ধার স্বপ্নের বাংলাদেশের নমুনা নয়- লাখো শহীদের আত্মদানের লক্ষ্যের প্রতি সঙ্গতিপূর্ণও নয়। এ রকম ঘটনা অহরহ ঘটছে। কিন্তু অপরাধীদের বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির নেই। নিবন্ধের কলেবর না বাড়িয়ে রাজশাহীর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের প্রতি আবার অভিনন্দন জানিয়ে এমন আয়োজন সর্বত্র হোক, বাংলাদেশ আবারও বাহাত্তরে ফিরে যাক এবং তা স্থায়ী হোক- এ কামনা করি।

লেখক : একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক

/জেডও/




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]