ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা রোববার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১১ আশ্বিন ১৪২৮
ই-পেপার রোববার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

পড়াশোনার আগ্রহে ভাটা
মোস্তফা ইমরুল কায়েস
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ১:৫৮ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 75

টাঙ্গাইল সদরের জুবায়ের উজ্জ্বলের তিন মেয়ে। এর মধ্যে দ্বিতীয় মেয়ে সামিয়া জুবায়ের (১১)। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। অনলাইনে ক্লাস করলেও তার পড়াশোনার প্রতি তেমন কোনো মনোযোগ ছিল না। গত দেড় বছরে একটিবারের জন্যও সে বই নিয়ে পড়তে বসেনি। খেলাধুলাও করে না। এর আগে এই শিশু রাত ১০টা পর্যন্ত জেগে থাকলেও এখন প্রতিদিন রাত ১টায় ঘুমোতে যায়। অন্যদিকে বান্দরবান জেলা সদরের রিচার্ড বমের ৯ বছরের ছেলে সানমুলিয়ান আথাং বম তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। স্কুল বন্ধ থাকার কারণে অনলাইনে ক্লাস করেছে। তবে এখন ভাটা পড়েছে পড়ালেখার আগ্রহে। পড়াশোনার চেয়ে বিনোদনেই বেশি আগ্রহ। সানমুলিয়ানের বাবাই এ তথ্য জানান।

গত এক সপ্তাহে অর্ধ শতাধিক অভিভাবক এবং ৫০টি প্রাথমিক ও কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনায় স্কুল বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার আগ্রহে ভাটা পড়েছে। আগের মতো তারা পড়তে-বসতে চায় না। আর পড়লেও মনোযোগ নেই। দেড় বছরের বেশি সময় অধিকাংশ শিক্ষার্থীরই সময় কেটেছে বই ছাড়াই।

অভিভাবকরা জানান, তাদের সন্তানরা স্কুল বন্ধ থাকায় অনলাইনে ক্লাস করলেও সেই সংখ্যা ছিল মোট শিক্ষার্থীর অর্ধেক। অনলাইন ক্লাসের প্রতি আগ্রহ ও মনোযোগ কোনোটাই ছিল না। বাসায় হাতের কাজ দিলেও সেটি তারা নিয়মিত করেনি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাঠানো পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ও খাতা দিলে তাতে বই দেখেই অধিকাংশ শিক্ষার্থী লিখেছে।

আবার কারও কারও স্বজন লিখে দিয়েছেন বলেও জানান তারা। এই পরীক্ষা মূল্যায়ন করা অনেকটা অর্থহীন বলে মনে করেন তারা। তবে দীর্ঘ সময়ে স্কুল বন্ধ থাকায় ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের স্কুলে ফিরিয়ে আনা বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করেন ময়মনসিংহের বৈলরকানহর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ফারহানা আক্তার। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, আমরা পড়াশোনার শিট দিয়েছি, অনলাইনে পড়িয়েছি কিন্তু পাঠদানটা সরাসরি না হওয়ায় বিশাল ফারাক রয়েই গেছে। তবে আগের মতো পড়াশোনার আগ্রহ পাইনি শিক্ষার্থীদের মাঝে। তিনি বলেন, অভিভাবকরা প্রায়ই অভিযোগ নিয়ে আসছে, বাচ্চারা বাসায় পড়াশোনা করে না। আর পড়তে বসলেও মনোযোগ নেই। বেশি মনোযোগ গেম টিভির প্রতি।
অধিকাংশ অভিভাবক আরও জানান, তাদের সন্তানরা অনলাইনে ক্লাস করলেও নেট সমস্যা, মোবাইলে এমবি কেনা ঝামেলা, নেটে বসে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে গেম খেলা ও কার্টুন দেখার কারণে কোনো মনোযোগ ছিল না ক্লাসের প্রতি। অধিকাংশ ছেলেমেয়ে বাসায় নিজ ইচ্ছায় কোনো পড়াশোনা করেনি। যেটুকু পড়াশোনা করেছে তা জোর করে পড়ানো হয়েছে- তবে কোনো মনোযোগ ছিল না বাচ্চাদের।

বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, সারা দেশে গত ১৮ মাসে প্রায় ১০ হাজার কিন্ডারগার্টেন স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। এসব স্কুলের অন্তত কয়েক লাখ শিশুর কোনো পড়াশোনাই হয়নি। মাত্র ১০ শতাংশেরও কম শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে পেরেছে। বাকিরা ছিল বঞ্চিত।

জয়পুরহাট সদরের জাকিরা আকতার জানান, তার সন্তানকে দেড় বছর আগে স্কুলে ভর্তি করানোর কথা ছিল। গতবার জীবনের নতুন স্কুলে ভর্তির জন্য বেশ উচ্ছ্বাস ছিল তার ছেলে রাফসানের (৫)। কিন্তু এখন আর সে আগ্রহ নেই। সেবার নিয়মিত মায়ের কাছে বর্ণমালা শিখলেও করোনায় পড়াশোনায় অনেক ভাটা পড়েছে। তিনি মনে করেন, স্কুল জীবনের শুরুতে সন্তানের জন্য এটি বড় ক্ষতি।

ফরিদপুর সদরের অভিভাবক রাসেল সরকার বলেন, আমার মেয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াশোনা করে। কিন্তু তার লেখাপড়ায় কোনো মন নেই। আবার জোর করে বসালেও তার কোনো মনোযোগ দেখতে পাই না। অন্যদিকে যশোরের কেশবপুরের আলামিন একাডেমির তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী তানজিমের বাবা সাজ্জাদ হোসেন জানান, তার মেয়ে অনলাইনে ক্লাস করতে পারেনি। ফলে পড়াশোনার দিকে আগ্রহও নেই। তিনি মনে করেন, এই দেড় বছর পড়াশোনা ছাড়াই সে বড় হয়েছে যা তার সন্তানের জন্য বড় ক্ষতি হয়েছে। আর এটা পড়াশোনার বড় ঘাটতি। চাঁদপর সদরের কেএম মাসুদ বলেন, আমার চতুর্থ শ্রেণি পড়ুয়া সন্তানের করোনার কারণে সব কিছু গোল্লায় গেছে।

ঢাকা দক্ষিণ হলিসিটির দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী মেহেনাজ আহমেদের মা ফারজানা আক্তার বলেন, স্কুল বন্ধ ও করোনার জন্য আমার মেয়ের কোনো পড়াশোনা হয়নি। এ ঘাটতি কীভাবে পূরণ করব সেই চিন্তায় আছি। টাঙ্গাইলের অভিভাবক মির্জা শাকিল মনে করেন, শিক্ষাঙ্গনে ফিরিয়ে আনতে হবে আগের মতো পরিবেশ। বাড়তি যত্ন নেওয়া। মা-বাবা ও শিক্ষকদের ভাবতে হবে কীভাবে তাদের চাঙ্গা করা যায়।

নাটোর বাগাতিপাড়ার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাহবুবুর রহমান জানান, তিনি তার স্কুলের শিক্ষার্থীদের বিষয়ে সম্প্রতি খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছেন অর্ধেকের বেশিজন সারা বছর কোনো পড়াশোনাই করেনি। অনেকের বই পর্যন্ত বাড়ি থেকে হাওয়া হয়ে গেছে। তিনি জানান, তার গ্রামের স্কুলপড়ুয়া ছেলেমেয়েরা এখন সারা দিন খেলাধুলা আর মাছ ধরে সময় কাটায়।

পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে ভাউলাগঞ্জ গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ফজলুর রহমান জানান, তার স্কুলের বেশিরভাগ শিক্ষার্থী বাড়িতে খেলে এবং টিভি দেখে সময় কাটিয়েছে। ফলে তাদের মধ্যে পড়াশোনার আগ্রহ কম। তবে তারা স্কুলে আসার জন্য মরিয়া থাকলেও স্মৃতিশক্তি আগের মতো নেই বলে তার ধারণা।

ফরিদপুরের সদর উপজেলার সানরাইজ প্রি-ক্যাডেট স্কুলের শিক্ষক রেজাউল করিম জুয়েল বলেন, পড়ালেখার আগ্রহ আগের চেয়ে কমে গেছে। তিনি মনে করেন, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার দিকে ফিরিয়ে আনতে শিক্ষক ও অভিভাবক সবাইকে আন্তরিক হতে হবে। তাদের পেছনে বেশি বেশি সময় দিতে হবে। যেসব শিক্ষার্থী অনলাইনে অংশ নেয়নি তাদের পড়াশোনামুখি করে তোলাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।

কুড়িগ্রামের রাজারহাটের খুকুমণি রেসিডেন্সিয়াল স্কুলের প্রধান শিক্ষক গৌতম কুমার কোঙ্গর বলেন, পড়াশোনার আগ্রহ তো আগের মতো নেই। প্রায়ই অভিভাবকরা ফোন করে অভিযোগ করেন- তার সন্তান পড়তে বসে না।

নেত্রকোনার ক্রিয়েশন কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষক মাহবুব জানান, তার স্কুলের যেসব শিক্ষার্থী অনলাইনে যুক্ত ছিল তাদের পড়াশোনার প্রতি গত দেড় বছরে তেমন আগ্রহ ছিল না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম মনে করেন, পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারানো শিশুরা নিয়মিত ক্লাস করলেই আগের অবস্থায় ফিরতে পারবে। তবে একটা শ্রেণির শিশুরা ঝরে পড়েছে। তাদের মা-বাবার চাকরি বা আয়ের পথ বন্ধ হওয়ায় তাদের পড়াশোনা বন্ধ হয়েছে। এই ঝরে পড়া শিশুদের ফিরিয়ে আনাও চ্যালেঞ্জ হবে। তবে স্কুল খুললে প্রতিটি স্কুলে পর্যাপ্ত মাস্ক সরবরাহ এবং হাত ধোঁয়ার ব্যবস্থার জন্য সরকারকে অনুরোধ জানান তিনি। তার ধারণা, ছেলেমেয়েরা দুই-চার দিন ক্লাসে গেলেই তাদের মাঝে পুরনো উদ্যম ও মনোযোগ ফিরে আসবে।

বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব জিএম জাহাঙ্গীর কবির রানা সময়ের আলোকে বলেন, স্কুল খোলার পর শিক্ষার্থীদের কোনো ধরনের চাপ দেওয়া যাবে না। তাদের ভালোবাসা, আদর ও স্নেহ দিয়ে মনের মাধুরী মিশিয়ে পাঠমুখি করতে হবে। তবে শিক্ষার্থীদের পাঠ ও স্কুলমুখি করতে তিনি সরকারের কাছে প্রণোদনা (শিশুদের নাশতার জন্য বিস্কুট, হাত ধোয়ার জন্য হ্যান্ড স্যানিটাইজার, সাবান ও মাস্কের ব্যবস্থা) দেওয়ার অনুরোধ করেন।

এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মাহবুব হোসেনকে ফোন করে এবং ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে কোনো ধরনের জবাব পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী নওফেল আহমেদকে কল করা হলেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি।

/জেডও/




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]