ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা বৃহস্পতিবার ২১ অক্টোবর ২০২১ ৬ কার্তিক ১৪২৮
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২১ অক্টোবর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

প্রতারণার শাস্তি কী পরকালে
আলী হাসান তৈয়ব
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ৬:৪৫ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 216

ইসলাম সততা ও শুভ্রতার ধর্ম। ইসলামের প্রতিটি বিধান ও আচরণবিধিতে সততার শিক্ষা বিদ্যমান। পক্ষান্তরে মিথ্যা, ধোঁকা ও প্রতারণা ইসলামে ঘৃণ্য পাপ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। একজন প্রকৃত মুমিন ও দায়িত্বশীল মুসলিম কারও সঙ্গে প্রতারণা করতে পারে না। আল্লাহর সন্তুষ্টিকামী মুসলিম হিসেবে এবং মহাসত্যবাদী নবীর উম্মত হিসেবে কখনই কাম্য নয় কোনো মুসলিম কারও সঙ্গে প্রতারণা করবে। সামাজিক লেনদেন বা ব্যবসায়-বাণিজ্যে চাতুর্য বা প্রতারণার আশ্রয় নেবে। মহানবী (সা.)-এর দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা, ‘যে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (মুসলিম : ১৬৪)

প্রতারণার মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ হালাল নয়। প্রতারণার কামাই মানে অবৈধ উপার্জন, হারাম কামাই। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে হারাম সম্পদ ভক্ষণ করা থেকে কঠিনভাবে বারণ করেছেন। বর্ণিত হয়েছে- ‘হে মুমিনগণ, তোমরা পরস্পরের মধ্যে তোমাদের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না, তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসার মাধ্যমে হলে ভিন্ন কথা।’ (সুরা নিসা : ২৯)

বাছবিচারহীন উপার্জন দিয়ে উদরপূর্তির নিন্দা করে আল্লাহ জানিয়েছেন- এটা ঈমানহীন লোকদের কাজ, ঈমানদার ব্যক্তি এ কাজ করতে পারে না। হারাম উপার্জন দিয়ে পেট ভরলে তার ঠিকানা জাহান্নাম। বর্ণিত হয়েছে- ‘কিন্তু যারা কুফুরি করে, তারা ভোগ বিলাসে মত্ত থাকে এবং জন্তু জানোয়ারের মতো উদরপূর্তি করে; আর জাহান্নামই তাদের নিবাস।’ (সুরা মুহাম্মাদ : ১২)। তেমনি রাসুলুল্লাহ (সা.) পরিষ্কার বলেছেন- ‘হারাম খাদ্য দিয়ে প্রতিপালিত দেহ জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (শুয়াবুল ঈমান : ৫৭৫৯)

প্রতারণা করে উপার্জিত অর্থে গঠিত দেহের ঠিকানা জাহান্নাম। এ অর্থের দান আল্লাহ গ্রহণ করেন না। এমন ব্যক্তির দোয়াও আল্লাহ কবুল করেন না। একটি দীর্ঘ হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা পুত-পবিত্র, তিনি পুত-পবিত্র জিনিসকেই গ্রহণ করেন। আল্লাহ তায়ালা যে কাজ করতে রাসুলদের প্রতি নির্দেশ করেছেন তদ্রূপ এই একই কাজের নির্দেশ মুমিনদেরকেও করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘হে রাসুলগণ! পাক-পবিত্র হালাল রুজি খাও এবং নেক আমল কর।’ (সুরা মুমিনুন : ৫১)। আল্লাহ আরও বলেন, ‘হে মুমিনগণ! আমি তোমাদেরকে যা উপজীবিকা স্বরূপ দান করেছি সেই পাক-পবিত্র বস্তুসমূহ ভক্ষণ করো।’ (সুরা বাকারা : ১৭২)। অতঃপর তিনি (সা.) দৃষ্টান্ত হিসেবে এক ব্যক্তির অবস্থা উল্লেখ করে বলেন, ‘এক ব্যক্তি দূর-দূরান্তের সফর করছে, তার মাথার চুল এলোমেলো, শরীর ধুলাবালুতে মাখা। এ অবস্থায় ওই ব্যক্তি দুই হাত আকাশের দিকে উঠিয়ে কাতরকণ্ঠে বলে ডাকছে, হে রব! হে রব!’ কিন্তু তার খাবার হারাম, পানীয় হারাম, পরনের পোশাক হারাম। আর এ হারামই সে ভক্ষণ করে থাকে। তাই এমন ব্যক্তির দোয়া কীভাবে কবুল হতে পারে? (মুসলিম : ১০১৫)

একজন মুমিন কিছুতেই ভুলে যেতে পারে না, নিজের উপার্জিত প্রতিটি অর্থ সম্পর্কে আল্লাহর কাছে জবাবহিদি করতে হবে। অবৈধ উপার্জনের হিসাব না দিয়ে এক চুল আগাতে পারবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন বান্দার পা দুখানি সরবে না। (অর্থাৎ আল্লাহর সামনে থেকে যাওয়ার তাকে অনুমতি দেওয়া হবে না) যতক্ষণ না তাকে প্রশ্ন করা হবে; তার আয়ু সম্পর্কে, সে তা কিসে ক্ষয় করেছে? তার বিদ্যা সম্পর্কে, সে তাতে কী আমল করেছে? তার মাল সম্পর্কে, কী উপায়ে তা উপার্জন করেছে এবং তা কোন পথে ব্যয় করেছে? আর তার দেহ সম্পর্কে, কোন কাজে সে তা ক্ষয় করেছে?’ (তিরমিজি : ২৪১৭)

পরিতাপের বিষয় বস্তুবাদী শঠতাপূর্ণ বিশ^ব্যবস্থায় প্রতারণা এখন একটা শিল্পের রূপ পরিগ্রহ করেছে। সত্যের পোশাকে, সততার লেবেলে বিচিত্রভাবে প্রতারণার প্রতিযোগিতা চলছে। বিশেষত আধুনিক প্রযুক্তি ও অন্তর্জালের বিস্তারে সত্য ও সততা সোনার হরিণে পরিণত হয়েছে। ঘরে-বাইরে, কাছের-দূরের মানুষ দ্বারা মানুষ প্রতারিত হচ্ছে। ব্যক্তি-সমষ্টি প্রচঞ্চনার জাল বিছিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠায় প্রাণান্তকর প্রয়াস চালাচ্ছে। কিন্তু কারও যেন ভেবে দেখার সময় নেই- এভাবে আসলে আমরা কেউ জিতছি না। আমরা কেউ কাউকে নয়, আসলে নিজেকেই প্রতারিত করছি।

ব্যবসায় ওজনে ফাঁকি দেওয়া, পণ্যে ভেজাল দেওয়া, একটি বলে অন্যটি দেওয়াসহ নানা উপায়ে প্রতারণা চলছে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো আজকাল কিছু ব্যবসা উদ্ভাবিত হয়েছে- যার মূল পুঁজি প্রতারণা। বিভিন্ন এমএলএম ব্যবসা ও অনলাইন বিজনেস এক্ষেত্রে আমাদের সামনে চাক্ষুষ প্রমাণ।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘সুতরাং তোমরা পরিমাণে ও ওজনে পরিপূর্ণ দাও এবং মানুষকে তাদের পণ্যে কম দেবে না।’ (সুরা আরাফ : ৮৫)। আধুনিক যুগে সবার ধান্দা অপরকে ঠকানোর আর নিজে জেতার। আল্লাহ তায়ালা এই মন্দ স্বভাবের নিন্দা করে সাবধান করেছেন সাড়ে চৌদ্দশ বছর আগে! ইরশাদ হয়েছে, ‘ধ্বংস যারা পরিমাপে কম দেয় তাদের জন্য। যারা লোকদের কাছ থেকে মেপে নেওয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে। আর যখন তাদেরকে মেপে দেয় অথবা ওজন করে দেয় তখন কম দেয়।’ (সুরা মুতাফফিফিন : ১-৩)

আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, একদিন রাসুল (সা.) বাজারে গিয়ে একজন খাদ্য বিক্রেতার পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, তিনি খাদ্যের ভেতরে হাত প্রবেশ করে দেখলেন ভেতরের খাদ্যগুলো ভেজা বা নিম্নমানের। এ অবস্থা দেখে রাসুল (সা.) বললেন, হে খাবারের পণ্যের মালিক এটা কী? লোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসুল, এতে বৃষ্টি পড়েছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তুমি সেটাকে খাবারের ওপরে রাখলে না কেন; যাতে লোকেরা দেখতে পেত? ‘যে ধোঁকা দেয় সে আমার উম্মত নয়।’ (মুসলিম : ১০২) এবার কল্পনা করুন বর্তমান পুঁজিবাজারের ফড়িয়াবাজ ও সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের অবস্থা কী হবে!

কথায় কথায় আমরা অন্যকে ফাঁকি দেই, চালাকি করি এবং প্রতারণার আশ্রয় নিই। আমরা কি কখনও ভেবে দেখেছি এটা কত বড় অপরাধ? এর পরিণতি কত ভয়াবহ? ইসলামে খেলাচ্ছলে, ঠাট্টা করে কিংবা সরল মনে শিশুদের সঙ্গেও মিথ্যা-প্রতারণা নিষেধ। আমাদের কাউকে কেউ যদি মুনাফিক বলে তাহলে তার দিকে তেড়ে যাব অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) কী বলছেন শুনুন, ‘মুনাফিকের আলামত তিনটি- ১. যখন কথা বলে মিথ্যা বলে। ২. আমানত রাখলে খেয়ানত করে এবং ৩. প্রতিশ্রুতি দিলে তা ভঙ্গ করে।’ (বুখারি : ২৫৬২)

মিথ্যা বলা ছাড়া প্রতারণা করা যায় না। মিথ্যার শিল্পিত রূপই প্রতারণা। কোরআন ও হাদিসে মিথ্যার নিন্দা ও অপরাধের ভয়াবহতা সম্পর্কে অনেক বাণী এসেছে। শুধু একটি হাদিস খেয়াল করুন যেখানে বলা হয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গুনাহগুলোর অন্যতম হলো মিথ্যা বলা। যেমন- রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘আমি কি তোমাদের সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহের খবর দেব না?’ তিনি তিনবার উচ্চারণ করলেন প্রশ্নটি। সাহাবিরা বললেন, অবশ্যই হে আল্লাহর রাসুল। তিনি বললেন, আল্লাহর সঙ্গে শরিক করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া- তিনি বসা অবস্থা থেকে হেলান দিয়ে বললেন- এবং মিথ্যা কথা বলা। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি কথাটির পুনরাবৃত্তি করতেই থাকলেন, এমনকি মনে মনে বললাম, ইস তিনি যদি নীরব হয়ে যেতেন! (বুখারি : ২৬৫৪; মুসলিম : ৮৮)। আল্লাহ সবাইকে বোঝার ও আমল করার তাওফিক দিন।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]