ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা বৃহস্পতিবার ২১ অক্টোবর ২০২১ ৬ কার্তিক ১৪২৮
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২১ অক্টোবর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

কুড়িগ্রামে এক স্কুলের ৮৫ ছাত্রীর বাল্যবিবাহ
সময়ের আলো অনলাইন
প্রকাশ: সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ৩:৩০ পিএম আপডেট: ২০.০৯.২০২১ ৪:১৯ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 10942

উত্তরের জেলা কুড়িগ্রাম দারিদ্র্য আর বাল্যবিবাহ ইস্যুতে বরাবরই থাকে শীর্ষে। নদনদী ও চরের জেলায় বাল্যবিবাহ হয়ে থাকে সব সময়। কিন্তু অতিমারি করোনায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বন্ধ থাকার সময়ে জেলায় ব্যাপকহারে বাল্যবিয়ে হওয়ার তথ্য আসছে। প্রায় দেড় বছর পর গেল ১২ সেপ্টেম্বর সারাদেশের মত কুড়িগ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে খোলার পর থেকে প্রকাশ পাচ্ছে 'চোখ কপালে' ওঠার মতো সংখ্যা।

জেলা শিক্ষা অফিস বলছে, বিদ্যালয় খোলার পরদিনই জেলার ১০টি বালিকা বিদ্যালয়ের খবর নেয়া হয়। তাতে করোনার শুরুতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থেকে গত ১২ সেপ্টেম্বর খোলার মধ্যে ওই ১০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ২০৩ টি ছাত্রীর বিয়ে হয়ে গেছে। এরমধ্যে জেলা সদরের পাঁচটি বিদ্যালয়ের ৬৩ ছাত্রীর বিয়ে হয়েছে করোনাকালের বন্ধে। বিষয়টিকে বড়ই উদ্বেগজনক বলছেন সচেতন মহল।

কুড়িগ্রাম ফুলবাড়ী উপজেলার বড়ভিটা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮৫ জন শিক্ষার্থীর বাল্যবিবাহ সম্পন্ন হয়েছে। এরফলে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম হওয়ায় শিক্ষকদের মধ্যে চরম হতাশা দেখা দিয়েছে। এতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষাবিদরা। সোমবার সকালে উপজেলার বড়ভিটা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে গেলে বাল্যবিবাহের বিষয়টি নিশ্চিত করে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক মুহা. মতিউর রহমান খন্দকার জানান, তার বিদ্যালয়ের মোট ৩৪৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৮৫ জনের বাল্যবিবাহ হয়েছে।

এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে বলে জানান তিনি। ওই বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ২, সপ্তম শ্রেণির ১১, অষ্টম শ্রেণির ১৭, নবম শ্রেণির ২৮, দশম শ্রেণির ১৪ ও চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার্থী ১৩ জন বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে।

করোনা মহামারির কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার আগে এই বিদ্যালয়ে প্রতিদিন গড়ে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ছিলো ৭০-৯০ শতাংশ। বর্তমানে উপস্থিতি ৪০-৫০ শতাংশ। ওই বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায়, তারা ১২ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয় খোলার প্রথম দিনেই তাদের ১৭ জন বান্ধবীর বিয়ে হওয়ার খবর শুনে। এরপর তাদের সবার মন খারাপ হয়ে যায়। অনেকদিন পর বিদ্যালয় খোলার আনন্দের চেয়ে মন খারাপই বেশি ছিল তাদের।

একই প্রতিষ্ঠানের নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানায়, অনেকদিন পর স্কুল খুললো, সব বান্ধবীর সঙ্গে মজা করবো, আনন্দ করবো। কিন্তু সেটা আর হলো না। স্কুল এসে দেখলাম আমার ২৮ জন বান্ধবীর স্কুলে আর আসলো না। খুবই মন খারাপ হলো। পরে জানতে পারি আমার ২৮জন বান্ধবীসহ আমার স্কুলের ৮৫ জন শিক্ষার্থীর বাল্যবিবাহ হয়ে গেছে। জানি না আমার ভাগ্যে কী হবে।

এ ব্যাপারে বড়ভিটা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুহা. মতিউর রহমান খন্দকার জানান, বিদ্যালয় খোলার পর শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম থাকায় আমরা প্রতিটি শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেছি। যেসব শিক্ষার্থীর বিয়ে হয়ে গেছে আমরা তাদের বাড়িও যাচ্ছি। ঐসব শিক্ষার্থীরা যাতে স্কুলে আসে সে ব্যাপারে তাদের অভিভাবকদের সচেতন করছি। করোনার কারণে দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তারা পড়াশোনা থেকে পিছিয়ে পড়েছিল। এই সুযোগে পরিবার তাদের বাল্যবিবাহ দিয়েছেন।

তিনি আরও জানান, আমরা শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করার জন্য কাজ করছি। করোনার আগেই গত দেড় বছরেই স্কুলের ২৫ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থীর বাল্যবিবাহ বন্ধ করেছি। কিন্তু করোনাকালে খবর না পাওয়ায় গোপনে স্কুলের ৮৫ জন শিক্ষার্থীর বাল্যবিবাহ দেয় তাদের পরিবার।

বড়ভিটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. খয়বর আলী জানান, করোনার কারণে আমার ইউনিয়নে বাল্যবিবাহ বেড়েছে। আমরা এজন্য পদক্ষেপ নিচ্ছি। প্রশাসনের সহযোগিতায় পাড়ায় মহল্লায় বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে মতবিনিময়সহ সচেতনমূলক প্রচার চালানো হবে।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আব্দুল হাই জানান, বড়ভিটা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের বাল্যবিবাহের তথ্যটি পেয়েছি। এ উপজেলায় মোট ৭৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিভাবকদের সঙ্গে মতবিনিময় করে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনসচেতনতা বাড়াতে শিক্ষকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুমন দাস বলেন, ‘বড়ভিটা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮৫ জন শিক্ষার্থীর বাল্যবিবাহের বিষয়টি শুনেছি। বাল্যবিবাহ কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়, সে বিষয়ে সভা-সমাবেশসহ বিভিন্ন ধরনের প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে আমরা কাজ শুরু করেছি। প্রতিটি ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিকে নিয়ে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হচ্ছে। 

জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের সহকারী পরিদর্শক মো. মেহেবুব হাসান বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার প্রথম দিনে জেলার ১০টি বালিকা বিদ্যালয় থেকে তথ্য নেয়া হয়েছে। তাতে দেখা গেছে বন্ধের সময় ওই ১০টি প্রতিষ্ঠানে ২০৩ জন মেয়ে বাল্য বিয়ের শিকার হয়েছে। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বিয়ের পরিসংখ্যান দ্রুত পাওয়া যাবে।

জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শামসুল আলম জানান, সদরের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে পর্যবেক্ষণ করে ৬৩ মেয়ের বিয়ের খবর পাওয়া গেছে। যা সত্যিই উদ্বেগজনক। এ প্রাপ্ত তথ্যমতে, শতকরা ১৩ ভাগ শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে।

অন্যদিকে বাল্যবিয়ে রোধে কাজ করা একটি বেসরকারি সংস্থার তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। জেলায় বাল্যবিয়ের চিত্র রয়েছে আগের মতোই। করোনা সংকটের দীর্ঘ সময়ে ঘটে যাওয়া বিয়েগুলোর সংখ্যা একবারে পাওয়ায় বেশি মনে করা হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া বাল্যবিয়ের তথ্য থেকে আগের তুলনায় খুব একটা বেশি নয়।

তারা বলছে, ২০১৭ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ৪৫ মাসে জেলায় বাল্যবিবাহ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে ৩ হাজার ২২টি। এতে গড়ে প্রতি বিয়ে হওয়ছে ৬৭টিরও বেশি। আর করোনাকালে গত বছরের মার্চ থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ১৮ মাসে বাল্যবিয়ে হয়েছে ছয়শ’ নয়টি। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী করোনার সময় প্রতি মাসে গড়ে বিয়ের খবর মিলেছে ৩৪টির মতো। তবে বাস্তবতার সাথে হিসাবটির মিল নেই বলে মত দিয়েছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্ট অনেকে।


আরও সংবাদ   বিষয়:  বাল্যবিবাহ  




এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ


সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]