ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা সোমবার ২৫ অক্টোবর ২০২১ ১০ কার্তিক ১৪২৮
ই-পেপার সোমবার ২৫ অক্টোবর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

ই-কমার্সে প্রতারণা : সম্ভাবনার শুরুতেই সঙ্কট
এসএম আলমগীর
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ৪:২২ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 170

অ্যামাজন, আলিবাবার মতো ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান বিশ্ববাজারে এক চেটিয়া ব্যবসা করে যাচ্ছে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি দেখেই মূলত বাংলাদেশের বাজারে অনেক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে মহামারি করোনাকালে লকডাউনে অনলাইনকেন্দ্রিক পণ্য বিকিকিনি বেড়েছে গত দুই বছরে। কিন্তু বছর দুয়েক না গড়াতেই চরম সঙ্কটে পড়েছে দেশের ই-কমার্স খাত। ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, ধামাকার মতো প্রতিষ্ঠান যে হারে গ্রাহক ঠকানোর ব্যবসা করেছে তাতে শুরুতেই হোঁচট খেল সম্ভাবনাময় এ খাতটি। অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন না থাকা, ই-কমার্স সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা না থাকা এবং প্রস্তুতির অভাবেই এ সঙ্কট তৈরি হয়েছে।

মূলত ইন্টারনেটের মাধ্যমে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে ই-কমার্স। অর্থাৎ ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি, যেমন ব্যক্তিগত কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাবলেট, মোবাইল ফোন ইত্যাদি ব্যবহার করে ওয়েব ও ইলেকট্রনিক ডেটা আদান-প্রদানের মাধ্যমে সব ধরনের ভৌত এবং ডিজিটাল পণ্য ও সেবা ক্রয়-বিক্রয় করাকে বোঝায়। এটি মূলত অনলাইনে ব্যবসা পরিচালনার একটি আধুনিক ডিজিটাল মাধ্যম, যা সরকারের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমন্বয় সাধন, ব্যবসায়িক লেনদেন ও যোগাযোগ সহজীকরণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে।

ইলেকট্রনিক প্লাটফর্মকে ব্যবহার করে দেশে ২০০৬ সালে পণ্য বা সেবা ক্রয়-বিক্রয় বেসরকারিভাবে শুরু হয়। তখন অনলাইন বাণিজ্যের সরকারি অনুমোদন ছিল না। প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। পরবর্তী সময়ে ২০১০ সালে সরকার ব্যাংক ই-কমার্স বিষয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে দেশে পুরোপুরিভাবে চালু হয় ই-কমার্স। তবে বিগত ১০ বছরে সেভাবে ই-কমার্সের বিকাশ না ঘটলেও গত তিন বছরে এর ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে। সেই সঙ্গে প্রতারণার হারও বেড়েছে।

সম্প্রতি জার্মান পরিসংখ্যান পোর্টাল স্ট্যাটিস্টা জানায়, চলতি বছরে বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতের আকার দাঁড়াবে ১৯৫ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি, যা টাকার হিসাবে প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকা। ২০২৩ সাল নাগাদ এই খাতে লেনদেনের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াবে ২৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি। কিন্তু এই সম্ভাবনাময় খাতটিকে শুরুতেই হোঁচট খেতে হচ্ছে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য।

এ বিষয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মেয়াজ্জেম হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে নতুন যেকোনো উদ্যোগ চালু হয় বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তোদের হাত দিয়ে। নতুন যে উদ্যোগ শুরু হয় সেটি নিয়ে শুরুতে আইন, নীতি বা কাঠামো সেভাবে তৈরি হয় না। এ জন্য যেকোনো নতুন উদ্যোগের শুরুতে এ ধরনের সঙ্কট দেখা দেয়। দেশের ই-কমার্স নিয়ে চলমান সঙ্কটটিও এরই অংশ। দেশে এখনও ই-কমার্স ব্যবসা নিয়ে স্বচ্ছ ধারণার অভাব আছে, প্রস্তুতির অভাব আছে, ই-কমার্স নিয়ন্ত্রণে যে ধরনের সরকারি বিধি থাকার দরকার তার অভাব রয়েছে, মনিটরিংয়ের অভাব রয়েছে। অথচ ই-কমার্স খাতের সামনে অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। বিশে^র অনেক নামি-দামি প্রতিষ্ঠান ই-কমার্সের ব্যবসা করছে দাপটের সঙ্গে। সেসব প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে চলছে সেগুলো পর্যবেক্ষণ করে দ্রুত আমাদের দেশে ই-কমার্সের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করা দরকার। এ ছাড়া যে চ্যালেঞ্জে পড়েছে ই-কমার্স সেটি মোকাবিলা করে একটি গাইডলাইন তৈরি দরকার। সেই সঙ্গে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর অপারেশনাল স্ট্রাকচারও ঠিক করা দরকার। তা ছাড়া ক্রেতাদেরও এখানে সচেতন হওয়ার দরকার আছে।

ই-কমার্সের সংগঠন ই-ক্যাবের তথ্যমতে, বাংলাদেশে ই-কমার্স বাড়ছে খুবই দ্রুতগতিতে। তিন বছর ধরে এ খাতের প্রবৃদ্ধি প্রায় ১০০ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতিবছর প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে এ খাত। দেশে ই-কমার্সের ক্রেতারা মূলত শহরকেন্দ্রিক। তার মধ্যে ৮০ শতাংশ ক্রেতা ঢাকা, গাজীপুর ও চট্টগ্রামের এবং তাদের মধ্যে ৩৫ শতাংশ ঢাকার, ৩৯ শতাংশ চট্টগ্রামের এবং ১৫ শতাংশ গাজীপুরের অধিবাসী। অন্য দুটি শহর হলো ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জ এবং আরেকটি মেট্রোপলিটান শহর সিলেট। ৭৫ শতাংশ ই-কমার্স ব্যবহারকারীর বয়স ১৮ থেকে ৩৪-এর মধ্যে। ই-ক্যাব আরও জানায়, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার উদ্যোক্তা ফেসবুক পেজে ব্যবসা করছেন। তাদের মধ্যে ২০ হাজারের বেশি উদ্যোক্তা সক্রিয়। বাংলাদেশে প্রায় সাত হাজার ৫০০ প্রতিষ্ঠান প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ই-কমার্সের সঙ্গে যুক্ত।

দেশে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছেÑইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, ধামাকা, আলিশামার্ট। সম্প্রতি ই-অরেঞ্জের মালিক সোনিয়া মেহজাবিন, তার স্বামী মাসুকুর রহমানকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এই প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষক বনানী থানার ওসি তদন্ত শেখ সোহেল রানা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় ভারতে গ্রেফতার হয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে গ্রাহকের ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণা করে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে ‘নিরাপদ ডটকম’ নামের একটি ই-কমার্স সাইটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকেও (সিইও) গ্রেফতার করেছে পুলিশ। শাহরিয়ার খান নামে ওই ব্যক্তি ই-কমার্স সাইট খুলে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে সাধারণ গ্রাহকদের আকৃষ্ট করেন। ৫০ শতাংশ মূল্য ছাড়ে মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ফ্রিজ, ওভেনসহ অন্যান্য ইলেকট্রনিক পণ্য ৩০ দিনের মধ্যে হোম ডেলিভারি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেন।

দেশে এখন সবচেয়ে আলোচিত নাম ইভ্যালি। প্রতিষ্ঠানটি ১ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ লোপাট করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে ক্রেতার কাছ থেকে অগ্রিম হিসাবে নিয়েছে ৩১১ কোটি টাকা, মার্চেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ইভ্যালির কাছে পাবে ২০৬ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটির এমডি ও সিইও মোহাম্মদ রাসেল এবং তার স্ত্রী ও ইভ্যালির চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিনের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারেরও অভিযোগ রয়েছে। প্রতারণার অভিযোগ সর্বশেষ গত শুক্রবার তাদের দুজনকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। দুজনকে রিমান্ড শেষে আজ মঙ্গলবার আবার আদালতে তোলা হবে। ইভ্যালির লাখ লাখ গ্রাহক এখন টাকা ফেরত পেতে বা পণ্য পেতে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে।

সম্প্রতি সময়ে আরও যেসব ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান সাধারণ মানুষের অর্থ লোপাট করেছে তার মধ্যে আছে- ধামাকা ৮০৩ কোটি টাকা, এসপিসি ওয়ার্ল্ড ১৫০ কোটি টাকা, সুমন প্রোডাক্ট ৫০ কোটি টাকা, চলন্তিকা ৩১ কোটি টাকা, নিউ নাভানা ৩০ কোটি টাকা, কিউ ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং ১৫ কোটি টাকা এবং নিরাপদ ডটকম ৮ কোটি টাকা। এভাবে একের পর ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের প্রতারণার কারণেই মূলত ই-কমার্স খাত শুরুতেই মহা সঙ্কটে পড়েছে।

ই-ক্যাব সভাপতি শমী কাইসার সময়ের আলোকে বলেন, সম্প্রতি বেশ কয়েকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে ক্রেতা ঠকানোর। ক্রেতাদের পণ্য বা মূল্য ফেরত না দেওয়া, ই-ক্যাবকে নতুন মালিকদের পূর্ণ তথ্য না দেওয়ায় ই-অরেঞ্জের সদস্য পদ স্থগিত করা হয়েছে। অর্থ আত্মসাৎ, ইক্যাবের চিঠির জবাব না দেওয়া, অফিস বন্ধ পাওয়ায় টোয়েন্টিফোর টিকেটির সদস্য পদ স্থগিত করা হয়। এ ছাড়া আর গ্রিনবাংলা ই-কমার্স ও এক্সিলেন্ট ওয়ার্ল্ড অ্যাগ্রো ফুড অ্যান্ড কনজ্যুমার লিমিটেডের বিরুদ্ধে এমএলএম ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ পাওয়ায় তাদের সদস্য পদ স্থগিত করা হয়েছে। এ ছাড়া ৯টি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছে ই-ক্যাব। এগুলো হচ্ছে ইভ্যালি ডট কম লিমিটেড, ফাল্গুনি শপ ডট কম, আলেশা মার্ট, ধামাকা শপিং, আদিয়ান মার্ট, সিরাজগঞ্জ শপ, আমার বাজার লিমিটেড, গ্লিটার্স আরএসটি ওয়ার্ল্ড ও অ্যানেক্স ওয়ার্ল্ড ওয়াইড লিমিটেড। এর বাইরেও আরও কিছু সদস্য প্রতিষ্ঠানকে আমরা মনিটরিংয়ে রেখেছি। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে এবং প্রমাণ পেলে আমরা দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছি।  




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]