ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা বৃহস্পতিবার ২১ অক্টোবর ২০২১ ৬ কার্তিক ১৪২৮
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২১ অক্টোবর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

দক্ষিণা ছাড়াই গুরু
নাজমুল হক তপন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ১০:০৬ পিএম আপডেট: ২১.০৯.২০২১ ১০:৩৫ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 283

একটা অভিজ্ঞতা দিয়ে শুরু করছি। ২০০৫ সালে প্রকাশিত হয় দৈনিক সমকাল। প্রকাশিত হওয়ার পাঁচ মাস আগে থেকেই আমরা সংশ্লিষ্ট হয়েছিলাম পত্রিকাটির সঙ্গে। উদ্বোধনী সংখ্যায় আনা হয়েছিল নতুনত্ব। প্রকাশিত হওয়ার প্রথম সাত দিন জুড়েই ছিল বিশেষ আয়োজন। মূল পত্রিকার সঙ্গে এক একদিন এক একটা বিষয়ের উপর ১৬ পাতার বিশেষ সংখ্যা। একই আয়োজন ছিল স্পোর্টস নিয়েও। ক্রীড়ার বিশেষ আয়োজনে জালাল (জালাল আহমেদ চৌধুরী) ভাইয়ের লেখার শুরুটা চেষ্টা করলেও ভুলতে পারব না।

জালাল ভাইয়ের ভাষায়, একটা নতুন পত্রিকায় বিশেষ লেখা মানে টসে হেরে সবুজ ঘাসের উইকেটে নতুন বলের ফাস্ট বোলারদের মুখোমুখি হওয়া। নতুন পত্রিকায় ক্রীড়া আয়োজনে প্রথম লেখার চাপ বুঝানোর জন্য এর থেকে যুতসই উপমা আর কি হতে পারে? লেখাটি আমরা বারবার পড়েছি। আর যতই পড়ি ততই মুগ্ধ হই। লেখাটি পড়েছিলেন আমাদের সম্পাদক গোলাম সারোয়ার ভাই। বলেছিলেন, রাজনীতির কলামে যেমন আব্দুল গাফফার চৌধুরী তেমনি  জালাল আহমেদ চৌধুরীকে ক্রীড়া কলামিস্ট বানানো সম্ভব?

বাংলাদেশ ক্রিকেটে ’অবৈতনিক ক্রিকেট’ কোচ কে ?  প্রশ্নটাই অবান্তর। ক্রীড়া সাংবাদিকদের জটিল সব প্রশ্নের উত্তর কার কাছে পাওয়া যাবে?

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে , ঘুরে ফিরে একটাই নাম। শেন ওয়ার্নের ‘ফ্লিপার’ বুঝতে তরুণ সাংবাদিক কার কাছে ছুটে যাবেন? কেন জালাল ভাই আছেন না ? ১৯৯০ এর শেষ দিকে। ক্রীড়া সাংবাদিক হিসাবে পথচলা শুরু করেছি। বিশেষ কোন লেখা মানেই সেটা নিয়ে বিস্তর গবেষণা করি আমি আর  আমার বন্ধু রঞ্জন সেন।  ওয়ার্নের উপর বিশেষ একটা লেখা তৈরির জন্য দুজনা অনেক কিছু ঘাঁটলাম। কিন্তু কিছু টেকনিক্যাল জায়গায় আটকে গেলাম। অ্যাপয়েন্ট নিয়ে ক্রিকেট বল নিয়ে জালাল ভাইয়ের টিপস নিতে দৌড়ল রঞ্জন। অফিসে কাজ পড়ে যাওয়ায় যেতে আমি পারিনি। ওই সময় সাপ্তাহিকগুলোতে নিয়মিত লিখি। তুলনামুলকভাবে আমার চেয়ে রঞ্জন একটু  কম লেখে। সাপ্তাহিক বিচিত্রা’য় ওয়ার্নকে নিয়ে লিখল রঞ্জন। অনেকের বিবেচনায় ওই লেখাটি ছিল ওই সময়ের সেরা। ওয়ার্নের বোলিং রহস্য পানির মত সহজ করে দিয়েছিলেন জালাল ভাই।

এ সময়ের ক্রিকেটকে আদৌ ভদ্রলোকের খেলা, বলা যায় কিনা, এনিয়ে সংশয়বাদীদের সংখ্যাই বেশি। জাগতিক লোভ - লালসার  প্রভাব ক্রিকেটেও সমানভাবেই বর্তমান।  তারপরও আমরা ক্রিকেটকে ভদ্রলোকের খেলা ভাবতে বাধ্য। কেননা আমরা  জালাল ভাইকে দেখেছি, তার সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ পেয়েছি। ক্রিকেট চর্চা তখনই নান্দনিক  যখন এর সঙ্গে যোগ হয় শিল্প - সাহিত্যের মিশেল, এই বোধটা জীবনভর আঁকড়ে ধরে থাকাটা বোধকরি কেবল জালাল ভাইয়ের পক্ষেই সম্ভব। জালাল ভাইয়ের সাহিত্যে আসক্তি নিয়েই লেখা যায় পাতার পর পাতা।

বিশুদ্ধ চর্চাই বোধকরি মানুষকে বিনয়ী করে, করে প্রচার বিমুখ। আমার মত সাধারণ একজন ক্রীড়া সাংবাদিককেও উৎসাহ দিতেও কোন কার্পণ্য করেননি। ২০১৯ সালে ফেব্রুয়ারির বই মেলায় প্রকাশিত হল আমার লেখা ’ রিনি ও তার বাইশ গজের সংসার।’ ফেসবুকে বইটার রিভিউ লিখলেন ক্রীড়া সাংবাদিক মাকুসুদা লিসা। ওই পোস্টে  কমেন্ট অপশনে জালাল ভাই লিখলেন, সুখবরটা দেয়ার জন্য ধন্যবাদ লিসা। তপনের কলম ক্রীড়ানন্দের, কথনরসের, অলকানন্দা বইয়ে দিতে শুরু করেছে বুঝতে পারছি। পারলে আজই কিনব। অনেক কষ্টে বই কেনা থেকে জালাল ভাইকে বিরত রাখি। বইটা নিয়ে উনার বাসায় গিয়েছিলাম। বেশ কয়েকবারই উনার আজিমপুরের বাসায় গিয়েছি। আমার বইয়ের কথা তুলে বলতেন, এত তাড়াহুড়া কর কেন? আরো যত্ন করে, সময় নিয়ে বড় কলেবরে লেখা উচিৎ। খুব ভাল বিষয়বস্তু ছিল। কিন্তু সময় দাওনি। মেলায় বের করার তাড়া ছিল বোঝা যায়।

কথায় কথায় বেশ অনেকবারই জালাল ভাইকে বলেছিলাম, আপনার কোন প্রকাশনা নাই। বাংলা ক্রীড়া সাহিত্যের উপর আপনি লিখলে , সেটা অবশ্যই ‘মাস্টার পিস’ হবে। ভাষা শৈলী, শব্দের গাঁথুনি, খেলার প্রতি নিবেদন, সবকিছু থাকার পরও প্রকাশনা নাই। একটু যেন উদাস হয়ে গেলেন জালাল ভাই। বললেন, সেভাবে আমার নির্দিষ্ট কোন জায়গা তৈরি হয়নি। দোষটা বোধ হয় আমারই।’

এমন সাহিত্যনিষ্ঠ মানুষটা আমাদের গড়পড়তা মানের বই নিয়েও ভেসেছেন উচ্ছ্বাসে - আবেগে। অথচ তাকে দিয়ে বড় কাজ করিয়ে নেয়ার দায় আমরা কতটুকু অনুভব করেছি! জালাল ভাই যে দক্ষিনা ছাড়া গুরু। ক্রিকেটার, ক্রীড়া সাংবাদিক, ক্রীড়া সাহিত্য রচয়িতা, সবাইকে নিজের জ্ঞানভাণ্ডার থেকে অকাতরে বিলিয়ে গেছেন, চাননি কিছুই। আর এটাই বোধকরি ছিল তার নীরব প্রতিবাদ! তিনি যে দক্ষিণা ছাড়া গুরু। জালাল ভাইয়ের কাছ থেকে আমরা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম শুধু নেয়াতেই। আমি সবসময়ই বিশ্বাস করি, বাংলা ভাষায় একজন ‘পিটার রোবাক’ আমরা পেতেই পারতাম। কিন্তু আমরা ব্যস্ত নিজেদের নিয়েই। গুরুকে দক্ষিণা দিতে হয়, আমাদের চিরাচরিত এই মহতী শিক্ষার পথ থেকে আমরা বিচ্যুত হয়েছি অনেক আগেই।

জালাল ভাই, আপনার কাছে ক্ষমা চাওয়ার ধৃষ্টতা আমার নাই।

/এসএম


আরও সংবাদ   বিষয়:  নাজমুল হক তপন   জালাল আহমেদ চৌধুরী  




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]