ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা সোমবার ২৫ অক্টোবর ২০২১ ১০ কার্তিক ১৪২৮
ই-পেপার সোমবার ২৫ অক্টোবর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

ছিনতাই-ডাকাতির ১০ ডেঞ্জার জোন
এসএম মিন্টু
প্রকাশ: বুধবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ১:১৬ এএম আপডেট: ২২.০৯.২০২১ ১:১৯ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 416

বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ছিনতাইকারী-ডাকাত চক্র। টাকাসহ সর্বস্ব লুট করতে প্রতিনিয়তই ঘটাচ্ছে নৃশংস ঘটনা। করোনাকালে মানুষ যখন জীবন-জীবিকা নিয়ে দিশেহারা তখন এই অপরাধী চক্র ব্যাপকভাবে তৎপর। রাজপথ, অলি-গলি এমনকি জনসমাগমের মধ্যেও ঘটাচ্ছে ছিনতাই-ডাকাতির ঘটনা। গত বৃহস্পতিবারও পুরনো ঢাকার মিটফোর্ড এলাকায় আলমগীর বেপারি (৪০) নামে এক দিনমজুরকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে ছিনতাইকারীরা। হতাহতের এমন ঘটনার বাইরেও অস্ত্রের মুখে টাকা, ফোনসহ সর্বস্ব লুটের ঘটনা ঘটছে অহরহ, যার অধিকাংশই থেকে যায় জানাজানির আড়ালে। বিড়ম্বনার কথা ভেবে অনেক সময় পুলিশকেও জানাচ্ছেন না ভুক্তভোগীরা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীসহ আশপাশের এলাকায় চিহ্নিত অন্তত ১০টি এলাকায় ভয়ঙ্করভাবে তৎপর ছিতাইকারী ও ডাকাতরা। এলাকাগুলোতে স্থানীয় অপরাধীরা এই অপরাধকর্ম নিয়ন্ত্রণ করছে। বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব ভাগ করে নিয়ে টার্গেট করা ব্যক্তির ওপর হামলে পড়ছে তারা। এলাকা ১০টি হচ্ছে- তেজগাঁও, মহাখালী, বিমানবন্দর সড়ক, মগবাজার, কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ী, গুলিস্তান-মিটফোর্ড এলাকা, কুড়িল বিশ্বরোড, গাবতলী ও তুরাগ-আশুলিয়া।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে ছিনতাই-ডাকাতিপ্রবণ এ ১০টি এলাকাকে ডেঞ্জার জোন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর বাইরে পান্থপথ-গ্রিনরোড, চিড়িয়াখানা রোড, আগারগাঁও, তালতলাসহ আরও কিছু এলাকাতেও ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য চলছে বেশ কিছুদিন ধরে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, বিগত তিন মাসের অপরাধ চিত্র নিয়ে পুলিশ সদর দফতরে পর্যালোচনা সভা হয়। সভায় ডিএমপির আওতাধীন এলাকায় সংঘটিত ছিনতাই-ডাকাতির ঘটনায় ১৫টি মামলা হওয়ার তথ্য তুলে ধরা হয়। এর ১৪টিরই তদন্তে অপরাধীদের শনাক্ত করে গ্রেফতার করা হয়েছে। অর্থাৎ পুলিশ এখানে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই পারে মন্তব্য করে ডিএমপির এই শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, আমাদের কাজ অপরাধীদের শনাক্ত করে গ্রেফতারের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনা। সেটা নিয়মিতভাবেই হচ্ছে। এজন্য ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) ছিনতাই-ডাকাতি প্রতিরোধ টিমও রয়েছে। যারা সারা বছরই বিশেষভাবে এসব অপরাধের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে যাচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পুলিশ সদর দফতরের গত সপ্তাহে অপরাধ পর্যালোচনা সভাতেও রাজধানীসহ সারা দেশে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি বেড়ে যাওয়া নিয়ে আলোচনা হয়। এতে আইজিপি এসব অপরাধ রোধে গ্রাম পুলিশ, কমিউনিটি পুলিশকে সক্রিয় করার পাশাপাশি রাত্রিকালীন টহল ও চেকপোস্ট বাড়ানোর নির্দেশনা দেন।

তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল সত্ত্বেও ছিনতাইকারীরা নানা অপকৌশলে বেপরোয়াভাবে তাদের অপরাধকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। টাকা-পয়সাসহ মূল্যবান জিনিসপত্র না পেলেই হত্যার মতো লোমহর্ষক ঘটনা ঘটাচ্ছে। বৃহস্পতিবার ভোরেও এমন ঘটনা ঘটেছে। সূর্যের আলো ফুটতেই কাজের সন্ধানে বাসা থেকে বেরিয়ে রাজধানীর মিটফোর্ড বালুরঘাট মাঠ সংলগ্ন যান দিনমজুর আলমগীর বেপারি (৪০)। সেখানে একদল সশস্ত্র ছিনতাইকারী তার পথ আটকে টাকা-পয়সা নেওয়ার উদ্দেশে শরীর তল্লাশি করে। কিছু না পেলেও তাকে এলোপাতারি ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। স্থানীয়রা আলমগীরকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরিবারের আহার জোগাতে পথে বেরিয়ে পড়া আলমগীরের জীবনপ্রদীপই নিভিয়ে দেয় ছিনতাইকারীরা।

সাম্প্রতিক আরও কিছু ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা : রোববার সন্ধ্যার পর পিকআপ ভ্যান নিয়ে যাচ্ছিলেন এক কিশোর চালক। কুড়িল ফ্লাইওভারের গোড়ায় গতিরোধ করে মোটরসাইকেলে আসা দুই তরুণ। পিকআপ চালককে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে নগদ অর্থ হাতিয়ে নেয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কিশোর আক্ষেপ করে বলে, সামনেই পুলিশের চেকপোস্ট। চাকু ঠেকিয়ে নগদ ৭০০ টাকা নিয়ে গেল। পুলিশের চেকপোস্ট বসিয়ে কী লাভ!

গত ২ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ক্যাবল নেটওয়ার্ককর্মী হামিদুল ছিনতাইকারীদের কবলে পরেন। ছিনতাইকারীরা তার মোবাইল ও টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে তিনি চিৎকার করেন। পরে দুর্বৃত্তরা ছুরিকাঘাত করে টাকা ও মোবাইল ছিনিয়ে নিয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তার।

গত ৭ ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকার বংশাল থেকে ৩৫ লাখ টাকা নিয়ে মতিঝিল ব্যাংকের উদ্দেশে রওনা হন ব্যবসায়ী শহিদুল হাওলাদার। পেছন থেকে অনুসরণ করা দুর্বৃত্তরা গুলিস্থান গোলাপশাহ মাজারের সামনে আসামাত্রই এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এ ছাড়াও ১৬ মে রাজধানীর ভাষানটেক পুরনো কচুক্ষেত জেসমিন টাওয়ারের একটি মার্কেটের ব্যাটারির দোকানে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় বাধা দিলে ডাকাত দল নৈশ্যপ্রহরী সুজনকে মারধর করে ফেলে চলে যায়।

বিমানবন্দর রোডের কাওলা : বিমানবন্দর রোড, আবদুল্লাহপুর থেকে আশুলিয়ায় রয়েছে অর্ধশত ছিনতাইকারী গ্রুপ। ওই গ্রুপের সদস্যরা সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে ছিনতাই-ডাকাতির মতো ঘটনা ঘটিয়ে পালিয়ে যায়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই এলাকা মূলত নিয়ন্ত্রণ করে থাকে মনির, সাগর, ডন, রুবেল ও বন্ধু। বন্ধু সম্প্রতি ধারালো অস্ত্রসহ র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হলেও জামিন নিয়ে ফের ছিনতাই শুরু করেছে বলে জানায় এলাকাবাসী। কাওলার এক ব্যবসায়ী জানান, সন্ধ্যার পর এখানে দুই থেকে তিনজন হিজড়া জড়ো হয়। তারা পথচারী পেলেই রেললাইনের দিকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায়। পরে আরেক গ্রুপ অস্ত্র ঠেকিয়ে সর্বস্ব কেড়ে নেয়।

তুরাগ-আবদুল্লাহপুর-আশুলিয়া :
তুরাগ-আব্দুল্লাহপুর কেন্দ্রিক ছিনতাই-ডাকাতির সক্রিয় সদস্য বড় শাওন, ছোট শাওন, ইমরান, ঘারকাটা ইমরান, বাবলা, মনির, সঞ্জিত, ভাগনে শাওন ও ফেরদৌস। ওরা ৯ জন দিনভর আনাচে-কানাচে ঘোরাঘুরি করে। বিকাল গড়ালেই প্রস্তুতি নেয় ছিনতাই-ডাকাতির। সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত চলে তাদের অপরাধকর্ম। গ্রুপের বড় শাওন ও ছোট শাওন ছিনতাইয়ের মালামাল ক্রয় করে থাকে। এ ছাড়া স্লুইচগেট-আশুলিয়া রোড নিয়ন্ত্রণ করে রানা গ্রুপ। এই রানার আসল নাম সুইচগিয়ার রানা, জন্ম উত্তরা ৯ নম্বর এলাকায়। তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ২০-২৫ জনের একটি গ্রুপ। ওই গ্রুপের কাজ ডাকাতি-ছিনতাইসহ ভয়ঙ্কর অপরাধ করা। সন্ধ্যার পরপরই আবদুল্লাহপুরের স্লুইচগেটসহ আশুলিয়ার নির্জন পয়েন্টগুলোতে অবস্থান নেয় তারা। এদিকে উত্তরা-আশুলিয়া এলাকায় ডাকাত ও ছিনতাইকারী চক্রের আরেক ডেঞ্জার গ্রুপের হোতা মারুফ। এই মারুফের কাজ সবাইকে সমন্বয়-নিয়ন্ত্রণ করা। ছিনতাই-ডাকাতির সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে কেউ গ্রেফতার হলে মারুফ তাকে জামিনে বের করার ব্যবস্থা করেন। পরে জামিনে বেরিয়ে ছিনতাই-ডাকাতির টাকায় মারুফের পাওনা টাকা পরিশোধ করে ছিনতাইকারীরা।

কুড়িল বিশ্বরোড : গত ৫ মে বগুড়া থেকে ঢাকার উদ্দেশে আসেন সুভাষ। বিমানবন্দর পর্যন্ত ২০ টাকা ভাড়া ঠিক করে উত্তরা হাউজ বিল্ডিং এলাকায় ওঠেন রাইড শেয়ারিং করা অটোরিকশায়। কিছুদূর যাওয়ার পর পেছনে থাকা যাত্রী বেশি দুই ছিনতাইকারী সুভাষের মুখ গামছা পেঁচিয়ে ফোন, ৬ হাজার টাকা ও ব্যাগ কেড়ে নিয়ে কুড়িল বিশ্বরোড ফ্লাইওভারে ফেলে দেয়। পরের দিন ভোরে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই ঘটনায় জড়িত দুই ছিনতাইকারী গত ১৭ মে ডিবি পুলিশ ও খিলক্ষেত থানা পুলিশের অভিযানে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়।

কারওয়ান বাজার-ফার্মগেট এলাকা : ঢাকার অন্যতম পাইকারি বাজার কারওয়ান বাজার। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত চলে কেনাবেচা। ক্রেতারা এই বাজারে এসেই পড়েন মহাবিপদে। বিএফডিসির মোড় থেকে কারওয়ান বাজার মোড় পর্যন্ত কয়েকটি গ্রুপে ভাগ হয়ে ছিনতাই করে ছিনতাইকারীরা। কারওয়ান বাজার-ফার্মগেট এবং কারওয়ান বাজার মোড় থেকে বিএফডিসি পর্যন্ত এই চক্র দিনে-রাতে সমানতালে সক্রিয়। তারা যানজটে আটকে থাকা যাত্রী-পথচারীদের কাছ থেকে নানা সামগ্রী ছিনতাই করে। বুধবার কারওয়ান বাজার মোড়ে মোটরসাইকেলের পেছনে বসা এক নারী যাত্রীর কানের দুল ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায় দুজন ছিনতাইকারী। দিনের বেলা এই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলেও ওই ছিনতাইকারীকে ধরার চেষ্টা করেনি কেউ। অথচ সেখানে সবসময় পুলিশ সদস্যদেরও অবস্থান করতে দেখা যায়।

আরও কিছু ডেঞ্জার জোন : গত ১৩ জানুয়ারি রাত পৌনে ৩টার দিকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে খোকন মির (৩০) নামে এক পিকআপ চালক নিহত হন। ২ মে সন্ধ্যায় পুরান ঢাকার চকবাজারে ইসলামবাগে মুখোশ পরা ৫-৬ ছিনতাইকারী দেশি অস্ত্র ঠেকিয়ে এক ব্যক্তির মোবাইল ও টাকা ছিনিয়ে নিয়ে যায়। গত ১৪ আগস্ট বড় মগবাজার এলাকায় বিশাল সেন্টারের সামনে মুখোশ পরা তিনজনের একটি দল দেশি অস্ত্র ঠেকিয়ে আবদুল আলিম (২৪) নামে এক যুবকের নগদ টাকা ছিনিয়ে নিয়ে যায়।

ডিএমপির সূত্র মতে, ২০১৮ সালে ছিনতাইয়ের মামলা ছিল মাত্র ৭৮টি। ২০১৯ সালে ১১৯টি এবং ২০২০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭৬টি। চলতি বছর মে পর্যন্ত মামলা হয়েছে ৬১টি। ছিনতাই-ডাকাতির ঘটনায় কোনো ব্যক্তি বা ভুক্তভোগী মারা না গেলে মামলা নেয় না পুলিশ। ফলে ভুক্তভোগীরা মামলা করতে না পেরে আর থানায় যোগাযোগ করেন না।

এমন অনেকেই নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করে বলেন, মামলা হলে নাকি থানায় চাপ বেশি পরে। তাই কোনো ভুক্তভোগী মারা না গেলে মামলা নেয় না থানা।

ছিনতাই-ডাকাতির বিষয়ে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, এসব ঘটনা যেন না ঘটে তার জন্য র‌্যাবের তল্লাশি চৌকি বসানো থাকে। তিনি বলেন, ছিনতাই-ডাকাতি রোধ করতে হলে সবার আগে প্রয়োজন সচেতনতা। এই র‌্যাব কর্মকর্তা আরও বলেন, ডাকাত বা ছিনতাইকারীরা আগে থেকেই রেকি করে রাখে কোন কোন জায়গায় পুলিশ বা র‌্যাবের চেকপোস্ট রয়েছে। পরে সুযোগ বুঝে তারা ঘটনা ঘটায়।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]