ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা সোমবার ২৫ অক্টোবর ২০২১ ১০ কার্তিক ১৪২৮
ই-পেপার সোমবার ২৫ অক্টোবর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

খুঁটিতেই দখলের সুযোগ ঢাকার চারপাশের নদী
ফয়সাল খান
প্রকাশ: শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ৫:১৩ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 117

গাজীপুরের তুরাগ তীরের সান্ধারপাড় বস্তি এলাকা। হাইকোর্টের নির্দেশে ঢাকার চারপাশের নদীর সীমানা নির্ধারণের অংশ হিসেবে তুরাগের এই এলাকায়ও খুঁটি স্থাপন করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরণীর নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। কিন্তু খুঁটিগুলো নদীতীর থেকে বেশ ভেতরে স্থাপন করা হয়েছে। এভাবে সীমানাখুঁটি স্থাপন করায় নদীর জায়গা দখলমুক্ত করার উদ্যোগই এখন উল্টো নদী দখলের সুযোগ করে দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

বর্তমানে নদীতে বর্ষা বা বন্যার পানিও নেই। এরপরও তুরাগ নদের তীরবর্তী টঙ্গীর সান্ধারপাড় এলাকায় সীমানাখুঁটি তীর থেকে বেশ দূরে দেখা যায়। ওই এলাকায় সীমানাখুঁটি ও তীরের মধ্যবর্তী অন্তত ১০০ মিটার জায়গায় পানি ও কচুরিপানা রয়েছে। সান্ধারপাড় বস্তির পরই রয়েছে বেশ কয়েকটি কারখনা, এরপর বিশ^ ইজতেমা ময়দান। এই এলাকা থেকে পশ্চিম দিকে তাকালে নদী ও বিস্তীর্ণ জলাভূমিতে ১০-১৫টি সীমানাখুঁটি চোখে পড়ে। এখানকার প্রায় সব খুঁটিই পানির মধ্যে। 

বর্ষকালে নদীর পানি বাড়লে অনেক সীমানাখুঁটি ডুবে যায় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। শুধু সান্ধারপাড় এলাকায়ই নয়, তুরাগ নদের অন্যান্য এলাকাতেও এমন সীমানাখুঁটি রয়েছে বলে জানা গেছে।

সম্প্রতি এ বিষয়ে জরিপকাজ পরিচালনা করে একটি বেসরকারি সংস্থা। তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, তুরাগে এ ধরনের সহস্রাধিক সীমানাখুঁটি নদীর মধ্যেই স্থাপন করা হয়েছে। বুড়িগঙ্গায়ও এমন তিন শতাধিক সীমানাখুঁটি রয়েছে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।

ফলে নদীর জায়গা দখলমুক্ত করতে উদ্যোগই এখন উল্টো নদী দখলের সুযোগ করে দিচ্ছে। সীমানাখুঁটির বাইরে থাকা নদীর জায়গা যেকোনো সময় অবৈধ দখলে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, অপরিকল্পিতভাবে তড়িঘড়ি করে দায়সারাভাবে এসব সীমানাখুঁটি স্থাপন করা হয়েছে। খুঁটিগুলো সঠিক জায়গায় স্থাপন করা হয়নি। এ কারণে এসব সীমানাখুঁটি স্থাপনের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হবে না। সীমান নির্ধারণে সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে এমন হতো না। 

নদীর সীমানাখুঁটি জরিপকারী বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ সময়ের আলোকে বলেন, আমরা বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদে সীমানাখুঁটি স্থাপন করা হয়েছে এমন প্রায় ৩৭ কিলোমিটার জায়গা সরেজমিন ঘুরে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছি। এর আগে বিভিন্ন মৌসুমে তোলা সীমানাখুঁটির ছবি, জিপিএস সার্ভে, গুগল আর্থ স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। জরিপে ১ হাজার ৪২৩ সীমানাখুঁটি নদীর মধ্যে পেয়েছি। এর মধ্যে তুরাগে ১ হাজার ১১১টি আর বুড়িগঙ্গায় ৩১২টি সীমানাখুঁটি রয়েছে। সীমানাখুঁটিগুলো যেভাবে স্থাপন করা হয়েছে, তা অবৈধ দখলদারদের নদী দখলের সুযোগ করে দেবে।

তবে নদীর সীমানাখুঁটিগুলো সঠিক জায়গাতেই স্থাপন করা হয়েছে বলে দাবি বিআইডব্লিউটিএ’র। তারা বলছে, জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই সীমানাখুঁটি স্থাপন করা হয়েছে। কারও কাছে ভুল মনে হলে আদালতে বা মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দিতে পারে। 

এ প্রসঙ্গে বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান কমোডর গোলাম সাদেক সময়ের আলোকে বলেন, নদীর সীমানাখুঁটিগুলো সিএস নকশা অনুযায়ী বসানো হয়েছে। নদীগুলোর পোর্ট চিহ্নিত করা আছে। ১৯০৮ ও ১৯৬৬ সালের পোর্ট অনুযায়ী হাই ওয়াটার এবং লো ওয়াটার জোন চিহ্নিত করে সীমানাখুঁটি বসানো হয়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সীমানা পিলারের বাইরে প্লাবনভূমি ও জলাভূমি থাকতে পারে। সেগুলো দেখভাল করার জন্য সরকারের অন্যান্য সংস্থা রয়েছে। 

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান এসএমএম আলী কবির বলেন, নদীর সীমানাখুঁটি স্থাপনের কাজ করছে বিআইডব্লিউটিএ। তাদের কাজের ব্যাপারে নদী রক্ষা কমিশন গায়ে পড়ে কোনো কথা বলতে পারে না। কেননা দুটি সংস্থাই এক মন্ত্রণালয়ের অধীনে। এ ছাড়া পত্রপত্রিকার কিছু সংবাদ ছাড়া এখনও এ সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ পাইনি। কেউ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দিলে বিষয়টি নিয়ে কাজ করা যাবে।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালুনদীর তীরভূমিতে সীমানাখুঁটি স্থাপন, তীর, ওয়াকওয়ে ও জেটিসহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণ (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্পটি ২০১৮ সালের জুলাইয়ে শুরু হয়। ৮৪৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকার এ প্রকল্প বাস্তবায়নে এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৭৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। 

প্রকল্পের আওতায় চার নদীর সীমানা নির্ধারণে ১০ হাজার ৮২০টি সীমানাখুঁটি বসানোর কথা ছিল। পরে তা কমিয়ে সাড়ে ৭ হাজার নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে ৪ সহস্রাধিক সীমানাখুঁটি দৃশ্যমান হয়েছে। ২০২২ সালে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত সঠিক জায়গায় নদীর সীমানাখুঁটিই স্থাপন করতে পারেনি। বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদের অনেক জায়গায় সীমানাখুঁটি দৃশ্যমান হলেও বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর সীমানাখুঁটি নির্মাণ এখনও দৃশ্যমান হয়নি। 

এদিকে বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদের তীরে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করে সীমানাখুঁটি স্থাপন করা হলেও তা ফের দখল হয়ে যাচ্ছে। পুরনো দখলদাররাই বিভিন্ন অপকৌশলে নদীর জায়গায় অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করছে। কেউবা আবার ভাঙা স্থাপনাই মেরামত করে নিচ্ছে। এমনকি বুড়িগঙ্গার তীরে থাকা বিআইডব্লিউটিএ কার্যালয়ের আশপাশের নদীর জায়গাই বেদখল হয়ে গেছে। প্রশাসনের নাকের ডগায় বহাল-তবিয়াতে আছে দখলদাররা। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের পর এসব জায়গায় ওয়াকওয়েসহ প্রকল্পের অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ না করায় এগুলো ফের দখল হচ্ছে। তাই পুরো প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ না করলে উচ্ছেদ আর সীমানাখুঁটি স্থাপন করতেই বছরের পর বছর পার হয়ে যাবে। অবশ্য স্থানীয় অনেকের দাবি, বিআইডব্লিউটিএসহ স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই নদীর জায়গা দখল করছে অবৈধ দখলদাররা। তবে এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিআইডব্লিউটিএ’র স্থানীয় কর্মকর্তারা।
অন্যদিকে দীর্ঘদিনের দখল-দূষণে মৃতপ্রায় ঢাকার চারপাশের নদী বাঁচাতে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা আলোর মুখ দেখেনি। ২০০৯ সালে আদালতের আদেশে ঢাকার চারপাশের নদী দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তখন বুড়িগঙ্গা ও তুরাগে প্রায় ৬ হাজার সীমানাখুঁটি স্থাপন করা হয়। ওইসব খুঁটির অধিকাংশই সঠিক জায়গায় স্থাপন করা হয়নি। কিছু সীমানাখুঁটি নদীতে আবার কিছু সীমানাখুঁটি প্লাবনভূমিতে স্থাপন করা হয়। 

বিতর্কের মুখে নাদী রক্ষায় গঠিত টাস্কফোর্স থেকে একটি কমিটি করে দেওয়া হয়। পরে ২০১৪ সালে দাখিল করা ওই কমিটির রিপোর্টে বলা হয়, নদীর সীমানা নির্ধারণে স্থাপন করা অধিকাংশ সীমানাখুঁটিই সঠিক জায়গায় স্থাপন করা হয়নি। 
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নদীর সীমানা নির্ধারণ করে পানির প্রবাহ সচল করা ও নদীতীর দৃষ্টিনন্দন করে গড়ে তুলতে সরকার দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর অংশ হিসেবে ঢাকার চারটি নদীর তীরে ফের অবৈধ দখল উচ্ছেদে নামে বিআইডব্লিউটিএ। 

২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ৬ মাস ধরে চলা এ অভিযানে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও বালুনদীর উভয় পাড়ের ১৫৭ কিলোমিটার জায়গায় ৪ হাজার ৭৭২টি ছোট-বড় স্থাপনা উচ্ছেদ করে সংস্থাটি। উদ্ধার হয় ১২১ একর তীরভূমি। অবশ্য মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে উদ্ধার করা জায়গার বেশিরভাগই দখল হয়ে গেছে।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]