ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা সোমবার ১৮ অক্টোবর ২০২১ ৩ কার্তিক ১৪২৮
ই-পেপার সোমবার ১৮ অক্টোবর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

অপব্যবহারের অজুহাত
এখনও অস্ত্র পায়নি মাদক অধিদফতর
আবদুল্লাহ আল মামুন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১২ অক্টোবর, ২০২১, ১২:৫৪ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 338

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরকে (ডিএনসি) চৌকস বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে অপারেশন সংশ্লিষ্ট সদস্যদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র তুলে দেওয়ার কথা 
থাকলেও খুবই মন্থরগতিতে চলছে এ প্রক্রিয়া। বিভিন্ন কারণে বর্তমানে অস্ত্র পাওয়া না-পাওয়ার দোলাচলে রয়েছে ডিএনসি। এর মধ্যে অধিদফতরের বেশ কয়েকজন সদস্যের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংস্থাটির জন্য অস্ত্র পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি করেছে বলে জানা গেছে। পাশাপাশি অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার হতে পারে- অন্যান্য বাহিনীর এমন অজুহাত ও অনীহামূলক ভূমিকাসহ নানা কারণে ঝুলে রয়েছে বিষয়টি।

যদিও ডিএনসির কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যক্তির দায় কোনোভাবেই প্রতিষ্ঠানের ওপরে পড়ে না। সব বাহিনী বা সংস্থার মধ্যেই কিছু না কিছু অপরাধমূলক কর্মকাÐ ঘটে থাকে। দেখার বিষয় প্রতিষ্ঠান সেগুলোকে প্রশ্রয় দেয় কি না। ফলে মাদক নিয়ন্ত্রণের প্রধান সংস্থা হিসেবে ডিএনসির অপারেশনাল কাজে অস্ত্র থাকার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। 

তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, একটি বাহিনী বা সংস্থার সদস্যদের যখন অস্ত্র দেওয়ার বিষয় আসে তখন তা যাচাই বা গবেষণার প্রয়োজন হয়। সে কারণেই এ প্রক্রিয়ায় সময় লাগছে। 

সংস্থার কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ইয়াবাসহ সব ধরনের মাদক কারবারির কাছে প্রায়ই আগ্নেয়াস্ত্র পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন সময় তাদের ধরতে অভিযানে গিয়ে ডিএনসির বহু সদস্য আক্রান্ত ও গুরুতর আহত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে খালি হাতে মাদক কারবারিদের ধরতে যাওয়া খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এ কারণে অভিযান ইস্যুতে বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে আতঙ্কও কাজ করছে। এ কারণে সদস্যদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে শিগগিরই ডিএনসির সদস্যদের অস্ত্র পাওয়ার বিষয়টি সুরাহা হবে বলে আশা করেন তারা।

ডিএনসি সূত্র জানায়, ২০২০ সালের ২৭ ডিসেম্বর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ উপদেষ্টা কমিটির এক সভায় বাহিনীর সদস্যদের অস্ত্র দেওয়ার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ওই সভায় কমিটির চেয়ারম্যান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ছাড়াও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন, শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম, পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নানসহ ১৭টি মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় সিপাহি থেকে পরিদর্শক পর্যন্ত অস্ত্র দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয় ও বেশ কয়েকটি নতুন সিদ্ধান্ত হয়। এর মধ্যে একটি সিদ্ধান্ত ছিল, জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব বিষয়টি চূড়ান্ত করতে একটি কমিটি গঠন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেবেন। ওই বৈঠকে হওয়া সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের ৮ ফেব্রæয়ারি কমিটির চেয়ারম্যান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এ সংক্রান্ত একটি রেজ্যুলেশনে স্বাক্ষর করেন। এ ছাড়া সভার অনুমোদিত সিদ্ধান্তের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে ১৪ ফেব্রæয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে সুরক্ষা বিভাগের উপসচিব মুহাম্মদ আবদুর রউফ মিয়া স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে নির্দেশনা জারি করা হয়।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (ডিএনসি) মহাপরিচালক মো. আবদুস সবুর মÐল সময়ের আলোকে বলেন, ‘সময়ের প্রয়োজনেই এখন মাদকদ্রব্য অধিদফতরের অভিযান পরিচালনার জন্য অস্ত্র পাওয়া জরুরি। কেননা অপরাধের ধরন পাল্টেছে, অপরাধীরাও হরহামেশায় অস্ত্র ব্যবহার করছে। সশস্ত্র মাদক কারবারিদের ধরতে হচ্ছে খালি হাতে। এটা নিঃসন্দেহে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। তিনি জানান, গত তিন মাসের মধ্যে অস্ত্র পাওয়ার বিষয়ে অগ্রগতি মিটিং সম্ভবত হয়নি। তবে বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।’

গণমাধ্যম ও ডিএনসি সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ২২ আগস্ট ভোলার দৌলতখানে এক মাদক কারবারির কামড়ে অধিদফতরের দুই সদস্য আহত হন। একই বছরের ১৯ মে কুমিল্লার দেবীদ্বারে অভিযান গিয়ে ৬ সদস্য পিটুনির শিকার হন। ২০২০ সালের ২৩ ডিসেম্বর রাজধানীর মোহাম্মদপুরে অস্ত্র ও মাদকসহ চার কারবারিকে গ্রেফতার করা হয়। ৫ নভেম্বর গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে মাদক ব্যবসায়ীকে ধরতে গিয়ে দুই কর্মকর্তাসহ পাঁচজন হামলার শিকার হন। একই বছরের ২০ জুলাই মেহেরপুর সদরে অভিযানে গিয়ে দুই কর্মকর্তা হামলার শিকার হন। ২০১৮ সালের ৬ এপ্রিল রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে কারবারিদের হামলায় আহত হন সংস্থার তিন সদস্য। ২০১৭ সালের ২৩ ফেব্রæয়ারি দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে এক কর্মকর্তাসহ দুজন আহত হন। ২০১৬ সালের ১১ অক্টোবর সাতক্ষীরায় জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অফিসে হামলা চালিয়ে ৩ আসামিকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।

সংস্থার ঊর্ধ্বতন বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, বিশে^র সব দেশে মাদক নিয়ন্ত্রণরোধী দায়িত্বরত সংস্থার অস্ত্র রয়েছে। এমনকি পাশর্^বর্তী দেশ ভারতে মাদক নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও মিয়ানমারে মাদক নিয়ন্ত্রণরোধী সংস্থার সদস্যদেরও অস্ত্র আছে। এসব ঘটনা তুলে ধরে ডিএনসির পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে অস্ত্র চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি নিয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসে। এরপর দীর্ঘদিন পার হলেও অস্ত্র পাওয়া না পাওয়ার বিষয়টি ঝুলে আছে। 
সংস্থার এক তথ্যে দেখা গেছে, ২০১০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে ডিএনসির সদস্যরা অভিযানে গিয়ে মাদক কারবারিদের কাছ থেকে ১৩টি রিভলবার, ৫৭টি পিস্তল, একটি শটগান, একটি পাইপগান, চারটি এয়ারগান, ২৩টি ম্যাগাজিন এবং ৬৪৬ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করেছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, নিরস্ত্র এ বাহিনীটি মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযানে গিয়ে বহুবার আক্রান্ত হয়েছে। এতে বাহিনীর বহু সদস্য গুরুতর আহত হন। অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে খালি হাতে অভিযান পরিচালনার কারণে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এ কাজ করতে হচ্ছে। এর কারণে সদস্যদের ভেতরে আতঙ্ক কাজ করছে। এসব বিষয় বিবেচনা করে মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করা সিপাহি থেকে পরিদর্শক পর্যন্ত আগ্নেয়াস্ত্র পাওয়া প্রয়োজন বলে তারা মনে করছেন। অস্ত্র পেলে কর্মীদের মনোবল বাড়বে এবং সাহসিকতার সঙ্গে কাজ করতে পারবে।
ডিএনসির কর্মকর্তারা আরও বলেন, চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি রাজধানীর কোতোয়ালি এলাকা থেকে ৯০ ভরি স্বর্ণ ডাকাতির ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মুন্সীগঞ্জ জেলার সহকারী পরিচালক সাকিব হাসানসহ পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। সাকিব ছাড়া অন্য চারজন ডিএনসির সিপাহি ছিলেন। ওই ঘটনায় সমালোচনাসহ ডিএনসির কর্মকর্তাদের ভূমিকা কেমন হবে এমন নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। একইভাবে আইনশৃঙ্খলায় নিয়োজিত অন্যান্য বাহিনীর মধ্যেও ডিএনসির অস্ত্র পাওয়ার বিষয়ে অনীহা রয়েছে। হঠাৎ করে অস্ত্র পেলে ইতিবাচক ব্যবহারের চেয়ে নেতিবাচক ব্যবহার বাড়তে পারে বলে অন্যান্য বাহিনীর ঊর্ধ্বতন বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

তবে এমন অভিযোগ ও আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছেন ডিএনসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তাদের ভাষ্য, যথাযথ প্রশিক্ষণসহ অস্ত্র দেওয়া হলে মাদকবিরোধী অভিযানের ক্ষেত্রে ইতিবাচক সাড়া ফেলবে। এতে বাহিনীর সদস্যরা সাহসিকতার সঙ্গে কাজ করতে পারবেন। অন্যথায় খালি হাতে কিছু ছিঁচকে কারবারিকে গ্রেফতার সম্ভব হলেও মাদকের বিস্তাররোধে আশানুরূপ সাফল্য আসবে না। কর্মকর্তারা আরও বলেন, বিভিন্ন বাহিনীতে অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার আছে। একজন সদস্যের অনৈতিক কর্মকাÐের দায় কখনও প্রতিষ্ঠান নিতে পারে না। এক্ষেত্রে যে অন্যায় করবে তার জন্য শাস্তির বিধান করলেই হয়ে যায়।

ডিএনসির এক তথ্যে দেখা গেছে, দেশের ৬৪টি জেলায় অধিদফতরের কার্যালয় রয়েছে। আগস্ট মাস পর্যন্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ মঞ্জুর করা মোট জনবলের সংখ্যা ৩ হাজার ৫৯ জন। এর মধ্যে কর্মরত ১ হাজার ৮৪৫ জন। পদ ফাঁকা রয়েছে ১ হাজার ২১৪টি। আবার মোট জনবলের মধ্যে মাঠ পর্যায়ে আভিযানিক কাজে থাকা মঞ্জুর করা সিপাহির সংখ্যা ৯২৮ জন। এর মধ্যে কর্মরত ৭২৮ জন। এ ছাড়া ২১০ জন উপপরিদর্শকের মধ্যে ২০৮ এবং ১৮৬ জন পরিদর্শকের মধ্যে ১২৬ জন কর্মরত।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (সুরক্ষা ও সেবা) মো. মোকাব্বির হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, একটি বাহিনী বা সংস্থার জন্য যখন অস্ত্র প্রদানের বিষয় আসে তখন সে বিষয়ে অনেক ধরনের যাচাই বা গবেষণার ব্যাপার থাকে। অস্ত্রের স্বীকৃতি, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণসহ অনেক ইস্যু জড়িত। ফলে চাইলেই এটা হবে না। এসব প্রক্রিয়ার কারণে এ বিষয়ে সময় লাগছে। 

প্রসঙ্গত, ১৯৭৬ সালে এক্সাইজ অ্যান্ড ট্যাক্সেশন ডিপার্টমেন্ট পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে নারকটিকস অ্যান্ড লিকার পরিদফতর গঠন করা হয়। আশির দশকে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার বেড়ে গেলে ১৯৮৯ সালে সরকার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ জারি করে। পরে ১৯৯০ সালের ২ জানুয়ারি ওই আইন প্রণয়নের মাধ্যমে অধিদফতর গঠন করা হয়। ২০১৮ সালের নতুন আইনেই চলছে অধিদফতর।


আরও সংবাদ   বিষয়:  মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর   ডিএন  




এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ


সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]