ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা বৃহস্পতিবার ২১ অক্টোবর ২০২১ ৬ কার্তিক ১৪২৮
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২১ অক্টোবর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

সাধারণ মানুষ পড়েছে মহা বিপাকে
অরূপ তালুকদার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১২ অক্টোবর, ২০২১, ১২:৫৯ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 172

বারবার একই ঘটনা ঘটে চলেছে। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর এ এক অদ্ভুত অবস্থা আমাদের দেশে। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে এরকমটা সাধারণত দেখা যায় না। সেসব দেশে সবকিছুতেই কমবেশি নিয়ন্ত্রণ থাকে। কেউ কোনো কিছু তার ইচ্ছেমতো করতে পারে না।

বলছিলাম ব্যবসায়ীদের কথা। আমাদের দেশে ছোট-বড় ব্যবসায়ীরা অনেকটাই যেন স্বাধীনভাবে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য চালায়। যার যেমন খুশি তেমনভাবে যেকোনো পণ্যের মূল্য বাড়ায়-কমায়। অভিজ্ঞ মহলের ধারণা, ব্যবসায়ীদের এই যথেচ্ছাচারের পেছনে সরকারের নিয়ন্ত্রণ হীনতাই মূল কারণ। বিশেষ করে বড় ব্যবসায়ীদের যেন এমন একটা ধারণা হয়ে গেছে যে, তারা ইচ্ছে করলে যেকোনো পণ্যের মূল্য কমিয়ে-বাড়িয়ে তা বাজারজাত বা গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করতে পারে। আইন সহজে তাকে ছুঁতে পারে না। কখনও কখনও সরকারের তরফ থেকে তদারকির নামে মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হলেও তারা গ্রাহকদের চাহিদা এবং বাজারের পণ্য সরবরাহ বা মূল্য নির্ধারণ ইত্যাদি বিষয়ের ব্যাপারে কোনো খোঁজখবর না নিয়ে বরং কিছু আর্থিক জরিমানা করে তাদের কাজ শেষ করে চলে যায়। কখনও কখনও সরকারিভাবে কোনো কোনো পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে দিলেও সে নির্দেশ ঠিকভাবে পালিত হয় না। ফলে মূল সমস্যার কোনো সমাধানও হয় না। দিনের পর দিন এভাবেই চলছে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেছেন, ‘বিভিন্ন বাজারে যেকোনো পণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে পণ্যের স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। কেননা পণ্যের সরবরাহ না বাড়িয়ে তার মূল্যমান নির্ধারিত করে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজার তদারকি তথা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় সাময়িকভাবে সমস্যার কিছু সমাধান হলেও প্রকৃতপক্ষে তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। দেশজ উৎপাদন বা প্রয়োজনমাফিক পণ্য আমদানি করে বাজারে তার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হবে। না হলে তার সুযোগ অসাধু ব্যবসায়ীরা নিতেই থাকবে।’

প্রকৃতপক্ষে বাজারে সরবরাহকৃত পণ্যের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ সরকারি সংস্থাসমূহের মাধ্যমে হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। তাহলে কিছুটা হলেও ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হবে।

নির্দ্বিধায় বলা যায়, করোনাকালীন অস্থির সময়ে দেশের সব মানুষই ছিল অনেকটা আতঙ্কগ্রস্ত। ফলে তার মধ্য থেকে চালাক মানুষরা সাধারণ মানুষদের নানাভাবে ঠকিয়ে তাদের নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করেছে, আর্থিক সুবিধা তুলে নিয়েছে, যার বেশিরভাগটাই হয়েছে প্রতারণার মাধ্যমে। যেমন- এমএলএম, ই-কমার্স বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠান নানাভাবে আর্থিক সুবিধা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে কেউ কিছু বোঝার আগেই দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে। এখন হাজারো মানুষ তাদের সর্বস্ব হারিয়ে কপাল চাপড়াচ্ছেন। সরকার এসব প্রতারকদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে কিছু ব্যবস্থা নিলেও প্রতারিত গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে তেমন কিছু করতে পারছে বলে মনে হচ্ছে না। কেননা প্রতারকরা ইতোমধ্যেই গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার করে বসে আছে। সে টাকা উদ্ধার করা অত সহজ হবে বলে মনে হয় না।

এদিকে বড় বড় ব্যবসায়ীরাও পেয়েছে সুযোগ। তারা তাদের ইচ্ছেমতো ভোগ্যপণ্যের মূল্য নানা অজুহাতে বাড়িয়ে দিয়েছে। এই ধরনের সুযোগ তারা বড় কোনো উৎসবের সময়ও নিয়ে থাকে। বাইরের পৃথিবীতে যেকোনো দেশে কোনো বড় উৎসবের সময় নানা ধরনের পণ্য প্রতিযোগিতামূলক কম দামে ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করে থাকে বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু আমাদের এখানে ঘটে উল্টো ঘটনা। পাশাপাশি বড় বড় শহরগুলোতে তথাকথিত মূল্যহ্রাসের বদলে চলতে থাকে এক ধরনের প্রতারণা। স্বাভাবিকভাবে তার শিকার হয় সাধারণ মানুষ।

বাজার বিষয়ে অভিজ্ঞজনেরা বলেছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির কতিপয় বড় বড় অসাধু ব্যবসায়ীর এই অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি বন্ধ করার ক্ষেত্রে বাণিজ্য, কৃষি, খাদ্য এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়সাধন একান্তই জরুরি। আমাদের দেশে বিভিন্ন নামে অসৎ ব্যবসায়ীরাই তৈরি করে থাকে অবৈধ সিন্ডিকেট, যারা বেশিরভাগ সময় বাজার নিয়ন্ত্রণে মুখ্য ভূমিকা রাখে। এদের কৌশলী দৌরাত্ম্য আমরা সা¤প্রতিক সময়ে দেখছি ভোজ্য তেল, পেঁয়াজ, চিনিসহ সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে।

এর ফলে করোনা আতঙ্ক থেকে এসময়ে দেশের সাধারণ মানুষ মোটামুটি মুক্ত হলেও এবার পড়েছে তারা উভয় সঙ্কটে। একদিকে তাদের কষ্টার্জিত সঞ্চয় নানা ধরনের প্রলোভন ও প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নিচ্ছে একদল ই-কমার্স ব্যবসায়ী, অন্যদিকে প্রায় প্রতিদিন পকেট কাটছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অসৎ ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট। তারা এখন কোথায় যাবে, কী করবে? অসহায় এসব মানুষের কোনো প্রশ্নের জবাব দেওয়ার জন্য কেউ কোথাও নেই। সত্যি কথা বলতে কী, মুক্তবাজার অর্থনীতির ভূত আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের মাথার ওপর থেকে আর কখনও যাবে বলে মনে হয় না। নিষ্কৃতিও মিলবে না।

বর্তমান অস্থির বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ ট্রেডিং করপোরেশন (টিসিবি) তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে প্রতি কেজিতে পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে ২৫ থেকে ৩০ টাকা। সপ্তাহ দুয়েক আগে ভারত থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে প্রতি কেজি ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। সেই পেঁয়াজ এখন বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৭৫ থেকে ৮০ টাকা দরে। কোনো কোনো বাজারে ৮৫ টাকা দরে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে। মূল্যবৃদ্ধির হার ৬০ থেকে ৭৫ শতাংশ। এখানে সাধারণ মানুষের কী করার আছে?

ব্যবসায়ীরা বলছেন, অতিবৃষ্টি এবং বন্যার জন্য ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে এবার পেঁয়াজ উৎপাদন কম হয়েছে। সে জন্য ভারতীয় বাজারেও পেঁয়াজের কিছুটা ঘাটতি দেখা দিয়েছে, সামান্য দামও বেড়েছে।
কিন্তু সেটা আমাদের দেশের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়েনি। এক্ষেত্রে সবচাইতে অবাক ঘটনাটি হচ্ছে, আমাদের দেশে এখন দেশীয় পেঁয়াজের কিছুমাত্র ঘাটতি নেই। তারপরেও আশ্চর্যজনকভাবে ভারতে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে এই খবরটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি ঘটিয়েছে আমাদের দেশের ছোট-বড় ব্যবসায়ীরা। এজন্য কারওর কাছে তাদের কোনো জবাবদিহিতার প্রয়োজন পড়ে না।

স্মরণ করা যেতে পারে, বছর দুই আগে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি কোনো কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হলে আমাদের দেশের ছোট-বড় ব্যবসায়ীরা প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি করে ছিল ১০০ থেকে ১৫০ টাকায়। অতি চতুর কিছু ব্যবসায়ী সে সময়ে প্রচুর পরিমাণ দ্রুত পচনশীল এই পণ্যটি গুদামজাত করে রাখার কারণে শেষ পর্যন্ত পচে যাবার পরে তা নালা-নর্দমায় ফেলে দেওয়ায় আশপাশের পরিবেশ পর্যন্ত নষ্ট করে ফেলেছিল। তবে এখন শুধু পেঁয়াজই নয়, কমবেশি দাম বেড়েছে চাল, ডাল, চিনি, ভোজ্য তেলসহ প্রায় সব নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির। আমাদের দেশের বেশিরভাগ নিম্নবিত্ত মানুষের খাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় স্বর্ণা এবং বিআর-২৮ চালের দাম বেড়েছে প্রতি কেজিতে ৩ থেকে ৪ টাকা। প্রতি কেজি এখন বিক্রি হচ্ছে ৫৩ থেকে ৫৫ টাকায়।

পাশাপাশি মিনিকেট ৬২ থেকে ৬৫ এবং নাজিরশাইল ৬৫ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি। চালের দাম এখনও ঊর্ধ্বমুখী। আগে থেকে ধীরে ধীরে বেড়ে যাওয়া মসুর ডালের দাম এখনও কমেনি। তবে সবচাইতে আশ্চর্যজনকভাবে নানা অজহুাতে ভোজ্য তেলের আমদানিকারকরা সয়াবিন তেলের প্রতি লিটারে মূল্যবৃদ্ধি করেছে বিস্ময়করভাবে। বছর দুই আগেও যে সয়াবিন তেলের প্রতি লিটারের মূল্য ছিল ১১০ টাকা তা এখন এসে দাঁড়িয়েছে ১৫৩ টাকায়। উল্লেখ্য, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রতি লিটারে ৪ টাকা বাড়িয়ে বাজারে খোলা সয়াবিনের দাম খুচরা পর্যায়ে ১২৯ টাকা ও প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১৫৩ টাকা এবং পাম অয়েলের দাম ১১৬ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে। এর চার দিন পরে আবার খোলা বাজারে চিনির দাম প্রতি কেজি সর্বোচ্চ ৭৪ টাকা এবং প্যাকেটজাত চিনির দাম প্রতি কেজি ৭৫ টাকা নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু সরকারের নির্ধারিত এই মূল্য পাইকারি বাজারে কিছুটা মানা হলেও খুচরা বাজারে মানা হয় না, সেখানে নির্ধারিত মূল্যের ওপরে ৫ থেকে ১০ টাকা, কখনও কখনও তারও বেশি নেওয়া হয় ক্রেতাদের কাছ থেকে। কোনো যুক্তির কথা শুনতে চায় না কোনো ব্যবসায়ী।

এর পাশাপাশি মাছ, মাংস, ডিম এবং শাকসবজির বাজারেও কমবেশি মূল্যবৃদ্ধির ঢেউ লেগেছে। সেখানেও যথারীতি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সম্পর্কে একজন অন্যজনকে দোষারোপ করে চলেছেন খুচরা, পাইকারি ও আড়তমালিকরা। এক্ষেত্রেও সরকারি বাজার মনিটরিংয়ের ব্যর্থতা রয়েছে বলে মনে করেন বাজার বিশ্লেষকরা। এর মধ্যে মূল্যবৃদ্ধির দুয়েকদিন আগে, বাজার থেকে কোথাও কোথাও হঠাৎ করে চিনি একেবারে উধাও হয়ে গিয়েছিল। এখন আবার ধীরে ধীরে ফিরে আসছে। বর্তমান বাজার পরিস্থিতি দেখে মনে হওয়া স্বাভাবিক, মুক্তবাজার অর্থনীতির ঘেরাটোপে গড়ে ওঠা বাজার সিন্ডিকেটের এই দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণে আনা দিন দিন আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

লেখক : শব্দসৈনিক ও কথাসাহিত্যিক




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]