ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা বৃহস্পতিবার ২১ অক্টোবর ২০২১ ৬ কার্তিক ১৪২৮
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২১ অক্টোবর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

কে হত্যা করেছিল আফ্রিকার চে গুয়েভারাকে
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২১, ১২:০৫ পিএম আপডেট: ১৩.১০.২০২১ ৩:৪১ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 94

প্রায় ৩৪ বছর পর শুরু হলো আফ্রিকার চে গুয়েভারা খ্যাত টমাস সাঙ্কার খুনের বিচার। বুরকিনা ফাসোর এক সময়ের তুমুল জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট টমাস সাঙ্কারার হত্যাকাণ্ডে সে সময় স্তম্ভিত হয়ে পরে পুরো আফ্রিকা। সোমবার বুরকিনা ফাসোর রাজধানী ওয়েগাদুগুতে এর আনুষ্ঠানিকভাবে ১৪ জনের বিচার শুরু হয়েছে।

১৯৮৭ সালের ১৫ অক্টোবর এক অভ্যুত্থান চলাকালে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে সেনাসদস্যদের গুলিতে নিহত হন সাঙ্কারা। ওই ঘটনার পর তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ব্লেইজ কমপাওরে ক্ষমতায় বসেন। যে ১৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, তার মধ্যে কমপাওরেও আছেন। ২০১৪ সালে ব্যাপক গণবিক্ষোভের পর পদত্যাগে বাধ্য হয়ে তিনি দেশ ছেড়ে পার্শ্ববর্তী আইভরি কোস্টে আশ্রয় নেন। বিবিসি জানায়, এখনও তিনি সেখানেই আছেন। ১৯৮৩ সালে সাঙ্কারা-কমপাওরে জুটিই দেশটির ক্ষমতা নিয়েছিলেন, যার ফলে সাঙ্কারা প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। কমপাওরে অবশ্য বরাবরই সাঙ্কারা হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, তিনি বিচারও বয়কট করেছেন।

আফ্রিকার ‘নায়ক’
আফ্রিকায় সাঙ্কারা অত্যন্ত জনপ্রিয়। পশ্চিম আফ্রিকাজুড়ে অসংখ্য ট্যাক্সিতে সাঙ্কারার ছবি সংবলিত স্টিকার দেখা যায়। টমাস সাঙ্কারা মেমোরিয়াল কমিটির সাধারণ সম্পাদক লুক দামিবা বলেন, ‘আমাদের কাছে সাঙ্কারা একজন দেশপ্রেমিক। তিনি তার জনগণকে ভালোবাসতেন, দেশকে ভালোবাসতেন, আফ্রিকাকে ভালোবাসতেন। আমাদের জন্য তিনি তার জীবন দিয়েছেন।’

সাঙ্কারা নিজে খুব সাধারণ জীবনযাপন করতেন। নিজের বেতন কমিয়েছিলেন, কমিয়েছিলেন সরকারি সব কর্মকর্তার বেতনও। সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য এয়ারলাইন্সের প্রথম শ্রেণির টিকেটও নিষিদ্ধ করেছিলেন তিনি। তার অগ্রাধিকার তালিকায় ছিল শিক্ষা। তার চার বছরের শাসনে বুরকিনা ফাসোর স্বাক্ষরতার হার ১৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল। তিনি দেশজুড়ে ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচিও চালিয়েছিলেন।

‘মার্কসীয় দর্শনের’ অনুসারী সাঙ্কারা জমি পুনঃবণ্টন করেছিলেন, জোতদারদের কাছ থেকে জমি নিয়ে সেগুলো দিয়েছিলেন দরিদ্র কৃষককে। তার এ পদক্ষেপের ফলে দেশটির তুলার উৎপাদন অনেক বেড়ে গিয়েছিল।

সাঙ্কারার শাসনামলেই দেশের নাম ‘আপার ভোল্টা’ থেকে বদলে ‘বুরকিনা ফাসো’ রাখা হয়েছিল, যার অর্থ ‘ন্যায়পরায়ণ মানুষের ভূখণ্ড’। তিনি পুরো আফ্রিকাকে এক হয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের মতো তার দৃষ্টিতে ‘নয়া-উপনিবেশবাদের’ বিরুদ্ধে দাঁড়াতে বলেছিলেন। তিনি বলতেন, ‘যে তোমাকে খাওয়ায়, সেই তোমাকে নিয়ন্ত্রণ করে।’

২০১৯ সালে রাজধানীর টমাস সাঙ্কারা মেমোরিয়াল পার্কে সাঙ্কারার একটি ছয় মিটার লম্বা ব্রোঞ্জের মূর্তি উন্মোচিত হয়; মূর্তিটির প্রথম সংস্করণ নিয়ে আপত্তি ওঠার পর গত বছর সেটির সংস্কারও করা হয়েছে।

দামিবা বলেছেন, পার্কটিকে আরও বড় করারও পরিকল্পনা আছে তাদের, যেখানে থাকবে ৮৭ মিটার লম্বা একটি টাওয়ার, যেখান থেকে ওয়েগাদুগুর পুরোটা দেখা যাবে। থাকবে সাঙ্কারার সমাধিসৌধ, সিনেমা হল ও মিডিয়া লাইব্রেরি। তবে সাঙ্কারার কট্টর বামপন্থি নীতির কঠোর সমালোচক ছিল বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, তারা তার শাসনামলকে ‘কঠোর দমনপীড়নের সময়’ হিসেবেও অভিহিত করেছে। ১৯৮৬ সালে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এক প্রতিবেদনে সাঙ্কারার আমলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিচার ছাড়াই আটকে রাখা ও তাদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালানোর অভিযোগ আনা হয়।

তিন দশকের বিচারপ্রক্রিয়া
সাঙ্কারা হত্যাকাণ্ডের ১০ বছর পর, ১৯৯৭ সালে তার স্ত্রী মারিয়াম স্বামীর খুন নিয়ে ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করেন; কিন্তু এ নিয়ে তদন্ত হবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে সুপ্রিমকোর্ট দেড় দশক কাটিয়ে দেয়।

স্বামীকে হত্যায় ফ্রান্সই ‘মাস্টারমাইন্ড’ ছিল বলে অভিযোগ করে আসছেন মারিয়াম। তিনি বলেন, ‘আমি দীর্ঘ সময় ধরে এ (বিচারের) জন্য অপেক্ষা করছি। আমি সত্য জানতে চাই, জানতে চাই কে তাকে মেরেছে।’

২০১৪ সালে কমপাওরে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর মামলায় খানিকটা অগ্রগতি দেখা যায়। পরের বছর সাঙ্কারার বলে মনে হওয়া একজনের দেহাবশেষ কবর থেকে তোলা হয়, তবে সেই দেহাবশেষ আদতেই সাঙ্কারার কি না, ডিএনএ বিশ্লেষণ করেও তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

সাঙ্কারার ভাই পল বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করছি, বেøইজ কমপাওরের শাসনের ২৭ বছর অপেক্ষা করেছি। তার (কমপাওরে) আমলে বিচারের সম্ভাবনার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারতাম না আমরা।’

২০১৬ সালে বুরকিনা ফাসো কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্রান্স সরকারের কাছে সাঙ্কারা হত্যাকাণ্ডের সামরিক নথি প্রকাশের অনুরোধ জানায়। পরে ফ্রান্সের আর্কাইভে থাকা এ সংক্রান্ত নথিগুলো ‘ডি ক্লাসিফায়েড’ (গোপন না রাখার ঘোষণা দেওয়া) এবং তিন ধাপে বুরকিনা ফাসোর কাছে হস্তান্তর করা হয়। শেষ ধাপের নথিগুলো দেওয়া হয় চলতি বছরের এপ্রিলে।

বিচারের মুখোমুখি কারা
কমপাওরে ছাড়াও তার সাবেক চিফ অব স্টাফ জেনারেল গিলবার্ট দিয়েনদেরে ও আরও ১১ জনকে সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচারের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ওপর হামলা’, ‘হত্যাকাÐে জড়িত থাকা’ ও ‘মৃতদেহ গায়েব করার’ অভিযোগ আনা হয়েছে।

কমপাওরে ছাড়াও বিচারে অনুপস্থিত থাকছেন একজন, তার সাবেক নিরাপত্তা প্রধান হায়াসিনথে কাফান্দো। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, সাঙ্কারা এবং অন্য ১২ জনের হত্যায় জড়িত দলটির নেতৃত্ব তিনিই দিয়েছেন। তার জন্য আন্তর্জাতিক গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি আছে।

২০১৫ সালে ব্যর্থ এক অভ্যুত্থানে জড়িত থাকা দিয়েনদেরে অবশ্য ২০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। এ ছাড়া অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন সাঙ্কারার মৃত্যুসনদে স্বাক্ষর করা চিকিৎসক দিয়েব্রে জঁ ক্রিস্তোফও। মৃত্যুসনদে তিনি লিখেছিলেন, সাঙ্কারার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে সরকারি নথিতে মিথ্যা বলার অভিযোগ আনা হয়েছে।

অনেকের আশঙ্কা, সাঙ্কারা হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়ায় দেশ আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে। পশ্চিম আফ্রিকার দেশটিতে কমপাওরের প্রভাব এখনও ফিকে হয়নি, যে কারণে তার অনুগত সেনারা স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে বলে আশঙ্কা অনেক বিশ্লেষকের।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের (আইসিজি) সাহেল বিশেষজ্ঞ ম্যাথিউ পেলেরিন বলেন, ‘আমার মনে হয় না, এই বিচার অস্থিতিশীলতা বাড়িয়ে দেবে। ন্যায়বিচার ছাড়া বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সমঝোতা বিরল।’ তবে বুরকিনা ফাসোর প্রেসিডেন্ট রক মার্ক কাবোরের আশা, এই বিচার উত্তেজনা প্রশমিত করবে এবং জাতিকে আরও ঐক্যবদ্ধ করবে।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]