ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা বৃহস্পতিবার ২১ অক্টোবর ২০২১ ৬ কার্তিক ১৪২৮
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২১ অক্টোবর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

জলার অধিকার চান জেলেরা
কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২১, ১:২৮ এএম আপডেট: ১৪.১০.২০২১ ২:২১ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 76

ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, যমুনাবেষ্টিত উত্তরের জনপদ গাইবান্ধার বুকচিরে প্রবাহিত হচ্ছে ঘাঘট, করতোয়া, কাটাখালী, আলাই, মানস, বাঙ্গালী, নলেয়াসহ নানা নদ-নদী। ফলে এই জেলার বিভিন্ন অংশে তৈরি হয়েছে প্রাকৃতিক জলাশয়। জেলার সাত উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত এসব নদ-নদী, বিল-জলাশয় জেলার ভূমি গঠন, কৃষি উৎপাদন এবং মৎস্যসম্পদ আহরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এসব নদ-নদী, বিল-জলাশয়কে ঘিরে জীবিকা নির্বাহ করে জেলেরা, গড়ে তোলে মৎস্যকেন্দ্রিক জীবনব্যবস্থা। গড়ে ওঠে তাদের জীবন-সংস্কৃতি। কিন্তু সোনালি সেসব দিন এখন অনেকটাই ফিকে। কারণ একে একে জলাশয়গুলো চলে যাচ্ছে অমৎস্যজীবীদের দখলে। ফলে জেলেরা নিজ পেশা হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছে।

ঋণ, ধারদেনা ও দাদনের জালে আটকে থাকা এসব মৎস্যজীবী জাল ও জলার ওপর তাদের পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠা চায়। ২০০৯ সালের সরকারি জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতিমালায় বলা হয়, প্রকৃত  মৎস্যজীবীদের নিবন্ধিত সমিতিগুলোই জলমহাল ইজারায় অংশ নিতে পারবে। তাদের নামেই ইজারা সংক্রান্ত বন্দোবস্ত দেওয়া হবে। যে প্রাকৃতিক উৎস থেকে মাছ ধরে ও বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে, সে-ই প্রকৃত মৎস্যজীবী বলে নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন মৎস্যজীবী জানায়, প্রভাবশালীরাই জলাশয়গুলো ভোগ করছে। জেলেরা সেটাতে কামলা খাটছে। সরকারি নিয়মনীতি অনুসরণ করে এসব জলমহাল মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির নামেই খোলা দরপত্রের মাধ্যমে ইজারা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ইজারাপ্রাপ্ত অধিকাংশ সমিতির নেপথ্যে রয়েছে মধ্যস্বত্বভোগী প্রভাবশালী চক্র। কারণ বেশিরভাগ জলমহাল ইজারা নিতে কয়েক লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। যে সামর্থ্য প্রকৃত মৎস্যজীবীদের নেই। এ সুযোগে অমৎস্যজীবী প্রভাবশালী ব্যক্তিরা প্রকৃত মৎস্যজীবী সমিতির নাম ভাঙিয়ে জলমহালগুলো ইজারা নিয়ে থাকে। ইজারা নেওয়া, মাছ চাষ, মাছ ধরা, বাজারজাতকরণ ও মুনাফা পকেটে ওঠা পর্যন্ত পুরো কাজই চলে প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে।

সমিতিগুলোতে কয়েকজন প্রকৃত মৎস্যজীবী থাকে। ইজারা হস্তান্তরের ভুয়া কাগজ তৈরি করে সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষর নেওয়া হয়। ইজারার বিনিময়মূল্য হিসেবে প্রতিবছর লাভের অংশ থেকে কিছু টাকা দেওয়া হয় সংশ্লিষ্ট জেলেদের। মৎস্যজীবীরাই সারাবছর পরিশ্রম করে মাছ ধরে তুলে দেয় প্রভাবশালীদের হাতে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দরিদ্র মৎস্যজীবীরা সমিতি গঠন করলেও ইজারামূল্য দেওয়া ও অন্য সামান্য বিনিয়োগ করার আর্থিক ক্ষমতা তাদের থাকে না। এক্ষেত্রে ব্যাংকের মতো প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধাও তারা নিতে পারে না। সে ব্যবস্থাও প্রভাবশালীরাই নিয়ন্ত্রণ করে।

জেলেদের জীবিকার উৎস অমৎস্যজীবী প্রভাবশালীদের দখলে যাওয়ায় জাল-জল, বিল-জলাশয়, নদ-নদীর ওপর জেলেদের অধিকার সঙ্কুচিত হচ্ছে। বাপ-দাদার পেশা বাঁচিয়ে রাখতে জীবিকার প্রয়োজনে দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হয় তাদের। তবে জেলেদের কষ্টের আয়ের প্রায় সবটাই চলে যায় দাদন ব্যবসায়ীদের পকেটে। জাল নেই, জলা নেই, মাছ নেই, তাই চিরচেনা এই পেশা ছেড়ে জেলেরা বাধ্য হচ্ছে অন্য পেশায় যুক্ত হতে। বিশেষ করে কৃষিকাজে। যেখানে তারা সম্পূর্ণ নতুন এবং অদক্ষ।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, জেলার ১৮ হাজারের বেশি নিবন্ধিত জেলে রয়েছে। নিবন্ধিত মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সংখ্যাও ৯২টি। জেলায় ৩৪৯ দশমিক ১০ হেক্টর আয়তনের ৪২টি খাল, ৭ হাজার ৭৮৬ হেক্টর আয়তনের প্রধান ৬টি নদী, ৯৭৮ হেক্টর আয়তনের ১১০টি সরকারি বিল এবং ১৮৬ দশমিক ১২ হেক্টর আয়তনের ৩৩১টি পুকুর রয়েছে। এ ছাড়াও রয়েছে বেসরকারি বিল ও পুকুর। কালের বিবর্তনে মাছ উৎপাদনকারী নদী, খাল, বিল সবই এখন জলমহালের অন্তর্ভুক্ত। গোটা জেলায় গত অর্থবছরে ৪৬ হাজার ৮৫০ টন মাছ উৎপাদিত হয়। জেলায় মাছের চাহিদা রয়েছে ৪৮ হাজার ৬৩১ টন।

ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও যমুনাপাড়ের কয়েকজন জেলের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জেলেরা এসব নদ-নদীতে সারাদিন ও রাতে মাছ ধরে কাছের ঘাটে বিক্রি করে। অতিদরিদ্র জেলেরা মাছ ধরার জাল, নৌকা ও অন্যান্য উপকরণ কেনার জন্য এসব ঘাটের আড়তদার ও মহাজনদের কাছ থেকে প্রতিবছর ঋণ নেয়। স্থানীয়রা একে দাদন বলে। জেলেরা যে পরিমাণ টাকা দাদন নেয়, প্রতিদিন সেই টাকার ১৫ শতাংশ সুদ হিসেবে দাদন ব্যবসায়ীদের দিতে হয়। পাশাপাশি জেলেদের নিজ নিজ দাদন ব্যবসায়ীর আড়তে এনে মৌখিক নিলামে মাছ বিক্রি করতে হয়। আর নিলামে ওঠার আগেই জেলেদের মজুদ মাছের এক-দশমাংশ আড়তদার সরিয়ে রাখে। সরিয়ে ফেলা মাছ পরে আবার নিলামে তুলে বিক্রি করা হয়।

সদর উপজেলার কামারজানি ইউনিয়ন মৎস্যজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সাবু মিয়া বলেন, ‘আড়তদাররা প্রথমে মাছ, এরপর নগদ টাকা কেটে নেয়। এভাবে মাছ বিক্রির অর্ধেক টাকা তাদের পকেটে চলে যায়। এ কারণে দিন-রাত পরিশ্রম করেও জেলেদের সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকে।’

সুন্দরগঞ্জের তিস্তা পাড়ের জেলে নিমাই চন্দ্র জানান, ‘রাত জেগে মাছ ধরে সকালে তা তুলে দিতে হয় আড়তে। কেননা নিজ হাতে বাজারে মাছ বিক্রির অধিকার নেই তার। আড়তদার মাছের দাম হাঁকে। ডাকে অংশ নিয়ে মাছ কেনে পাইকাররা। নির্বাক দাঁড়িয়ে দেখেন তিনি। মুনাফার সিংহভাগই পকেটস্থ করে আড়তদার আর পাইকার।’

কয়েকজন আড়তদারের সঙ্গে কথা বললে তারা জানায়, ‘আমরা কাউকে জোর করে দাদনের টাকা দিই না। জেলেরা নিজেদের প্রয়োজনে আমাদের কাছে এসে টাকা নেয়। সারা দেশের মতো একই নিয়মে আমরা জেলেদের কাছ থেকে মাছ ও টাকা আদায় করি।’

জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতিমালায় পরিবর্তন দাবি করে জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতির জেলা সভাপতি উপেন্দ্রনাথ দাস বলেন, একদিকে জেলেদের অধিকার হনন হচ্ছে, অন্যদিকে কমছে তাদের আয়-রোজগার। নীতিমালায় জেলেদের অধিকার সংরক্ষণের জন্য সরকার বেশকিছু ধারা রেখেছে। কিন্তু বাস্তবে এসবের প্রয়োগ হচ্ছে না। প্রকৃত মৎস্যজীবী নয়, অমৎস্যজীবীরাই লিজ নিচ্ছে জলমহাল। স্থানীয় প্রভাবশালীরাই ভোগ করছে জলাভূমি।

জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতির ‘নব্য জলমহাল নীতিমালা’ বাস্তবায়ন চেয়ে তিনি বলেন, জেলেদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এজন্য তাদের বিনাসুদে ও সহজশর্তে ঋণ দিতে হবে। সরাসরি জেলেদের বন্দোবস্ত দিতে হবে জলমহাল। একই সঙ্গে কমাতে হবে লিজ মানিও। সর্বোপরি জাল ও জলার ওপর প্রকৃত মৎস্যজীবীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকারকে টেকসই উদ্যোগ নিতে হবে।

গাইবান্ধা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ফয়সাল আযম সময়ের আলোকে বলেন, সরকারি কর্মকর্তা ও মৎস্যজীবী প্রতিনিধির সমন্বয়ে রয়েছে জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটি। সরকারি আইন ও নিয়ম মেনে প্রকৃত মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিকে জলমহালগুলো ইজারা দেওয়া হয়। পরে জলমহালগুলো কীভাবে পরিচালিত হয় তা আমাদের এখতিয়ারের বাইরে। তাই এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে পারছি না।

/জেডও/


আরও সংবাদ   বিষয়:  জলা   জেলে  




এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ


সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]