ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা  বুধবার ২০ অক্টোবর ২০২১ ৫ কার্তিক ১৪২৮
ই-পেপার  বুধবার ২০ অক্টোবর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

এবারের করোনায় পূজার অর্থনীতি
মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২১, ৯:৩১ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 144

গেল বছর করোনার কারণে বেশিরভাগ উৎসবের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছিল। এতে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল উদ্যোক্তারা। প্রথম আঘাতের শিকার হয় বৈশাখী মেলার উদ্যোক্তারা। তাদের দোকান খোলা সম্ভব হয়নি। ক্রেতারাও তখন ভয়ে ঘর থেকে বের হননি। এরপর ঈদুল ফিতরের কেনাবেচাও তলানিতে ঠেকেছিল। কোরবানিটা কেউ কেউ কোনোরকমে সামাল দিতে পারলেও দুর্গাপূজার উৎসবটায় গেলবার অনেকেই কেনাবেচায় সাহসী হয়নি। যদিও সেই সময় সংক্রমণটা কিছুটা নিম্নমুখী ছিল। তারপরও প্রস্তুতি না থাকায় দুর্গোৎসবের কেনাবেচাটা গেলবার অনেকটাই প্রাণহীন হয়ে পড়েছিল। বলা চলে, গেলবার অর্থনীতির অন্যতম প্রাণশক্তি উৎসবকেন্দ্রিক কেনাবেচা মারাত্মক ধরনের সঙ্কটে পড়েছিল। সেকারণে ২-৩ দশক ধরে বাংলাদেশে উৎসব অর্থনীতির সংযোজনটা গতবার জাতীয় অর্থনীতিতে প্রায় নেতিয়ে পড়েছিল। করোনা এভাবে অর্থনীতিকে আকস্মিকভাবে আক্রমণ করবে তা কারও ভাবনা-চিন্তায় ছিল না।

জাতীয় অর্থনীতিতে ক্রমেই বৈশাখী, দুই ঈদ এবং পূজার উৎসব আয়োজন ও কেনাবেচা কয়েক লাখ-কোটি টাকা সঞ্চালন ঘটাতে শুরু করেছিল। এতে নানা পেশার অসংখ্য মানুষ ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়েছিল। বাংলাদেশে গড়ে উঠতে থাকে অসংখ্য ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান, যেগুলো দেশীয় কারুকার্যের বাহারি পোশাক, অলঙ্কার, ব্যবহার্য সামগ্রী, ধর্মীয় নানা ধরনের সামগ্রী, পশুখামার ইত্যাদি। এ ছাড়া ধর্মীয় এবং জাতীয় উৎসবকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ, যাতায়াত, অবকাশ, পর্যটন ইত্যাদি শিল্পও এই সময়ে দ্রুত প্রসার লাভ করতে থাকে। একটি স্থিতিশীল মধ্যবিত্ত শ্রেণি অর্থনীতির এইসব নতুন নতুন ধারা-উপধারায় বেড়ে ওঠে যা বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতায় নতুন সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হয়। অতীতে এত দ্রুত অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চার করার মতো তেমন বড় ধরনের কোনো প্রণোদনা শক্তি ছিল না। কিন্তু গত দেড়-দুই দশকে সামষ্টিক অর্থনীতির সঙ্গে ব্যষ্টিক নানা ক্ষেত্র দ্রুত যুক্ত হয়ে পড়ে। এগুলো আগে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা না হলেও সময়ের বিবর্তনে এবং আর্থ-সামাজিক নানা পরিবর্তনের ঢেউ এই পরিবর্তনগুলোকে ত্বরান্বিত করেছে।

দুর্গাপূজা আমাদের দেশের সনাতন হিন্দু সমাজের সবচাইতে বড় এবং দীর্ঘসময়ব্যাপী চলা একটি উৎসব। এর আয়োজন তাই বেশ ব্যাপকভাবেই নিতে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে গোটা সম্প্রদায়ের অর্থনৈতিক নানা ধরনের উদ্যোগ। সেই উদ্যোগকে মহিমান্বিত করার জন্য সমাজের বৃহত্তর সম্প্রদায়ও নানাভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে। বিশেষত ব্যবসা-বাণিজ্যকেন্দ্রিক নানা প্রতিষ্ঠান এই উৎসবকে প্রাণবন্ত করতে যার যার অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখে। ফলে এটি উৎসবের দিক থেকেই শুধু সার্বজনীনতা লাভ করে না, অর্থনৈতিক দিক থেকেও এর ব্যাপক প্রভাব ও প্রসার ঘটে। সার্বজনীন পূজাকে প্রতিবছর দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত করতে হাজারো পূজামণ্ডপ তৈরি হয়। এ বছরও ৩২ হাজার ১১৮টি পূজামণ্ডপ তৈরি হয়েছে যা গেল বছরের চাইতে ১ হাজার ৯০৫টি বেশি। ঢাকা মহানগরে এবার ২৩৮টি পূজামণ্ডপে পূজা হচ্ছে। গ্রামগঞ্জেও পূজামণ্ডপের আয়োজন করা হয়েছে। প্রতিটি পূজামণ্ডপকে কেন্দ্র করে সনাতন ধর্মাবলম্বী পেশাজীবী মানুষ নানা কাজে যুক্ত হচ্ছে। এদের অধিকাংশই পূজার আয়োজনে যুক্ত হওয়ার জন্য বেশ আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে থাকে। প্রতিমা তৈরিতে মাটি সরবরাহকারী, বাঁশ-কাঠ সরবরাহকারী, রঙ-তুলি সরবরাহকারী, প্রতিমা তৈরি, রঙ করা ও পূজামণ্ডপ তৈরির সঙ্গে যুক্ত, ঢোল ও ঢাকবাদক, পূজা সম্পন্নকারী ব্রাহ্মণ এবং তার সহকারী পূজারি, প্রসাদ এবং পূজার যাবতীয় নৈবদ্য সরবরাহকারী ইত্যাদি বড় ধরনের ভূমিকা পালন করে থাকে। এর আয়োজনে ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যুক্ত হয়। এ কারণে প্রতিটি পূজামণ্ডপকে কেন্দ্র করে একেকটি এলাকাভিত্তিক পূজা কমিটি গড়ে ওঠে। একসময় গ্রামের জমিদার একক নামেই পূজার আয়োজন করতেন। তার যতটা না অর্থবিত্ত ছিল তার চাইতে বেশি তিনি পূজারিদের বিনাশ্রমে নিয়োজিত করতেন। বিনিময়ে কয়েকদিনের ভরণপোষণ বহন করতেন। কিন্তু এখন সময় পাল্টে গেছে। পূজামণ্ডপকেন্দ্রিক কমিটি পূজাকে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য ব্যাপকসংখ্যক সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করেন। প্রতিটি পূজামণ্ডপ যেন নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে শোভাবর্ধন করতে পারে সেভাবে আয়োজন করা হয়ে থাকে। এর ফলে পূজামণ্ডপকেন্দ্রিক ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান অঞ্জলি প্রদান ছাড়াও ব্যাপক সামাজিকতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এতে সর্ব ধর্মের মানুষের সমাবেশ ঘটে থাকে। বেশিরভাগ পূজা কমিটি পূজা উপলক্ষে স্যুভেনির প্রকাশ করে থাকে। প্রকাশনা শিল্পও এর ফলে বাড়তি কাজ করার সুযোগ পায়। সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সনাতনী সমাজের সব স্তরের মানুষজনের কেনাকাটার আয়োজন। উৎসবকে কেন্দ্র করে এখন গরিব-ধনী সবার মধ্যেই নতুন পোশাক, জুতা স্যান্ডেল, নারীদের গয়না, প্রসাধনী সামগ্রী, সিঁদুর, আবির ইত্যাদির কেনাকাটা বেশ জমে ওঠে। এবার করোনা সংক্রমণ কমে যাওয়ায় বিপুলসংখ্যক মানুষ কেনাকাটায় অংশ নিয়েছেন। ফলে বিপণিবিতানগুলো নতুন করে প্রাণ খুঁজে পেয়েছে। ব্যবসায়ীরা এক কথায় বেচাকেনায় খুশি। উৎসব ভাতায় সরকারি চাকরিজীবীরা পূজার কেনাকাটায় বাড়তি খরচ করার যে সুযোগটি পায় তা শেষ বিচারে জাতীয় অর্থনীতিতেই যুক্ত হয়। আরও একটি ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, উৎসবকেন্দ্রিক কেনাবেচার জন্য বিরাটসংখ্যক মানুষ কলকাতা, ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর যাতায়াত করতেন। এর ফলে দেশের বিক্রেতারা ক্রেতা হারাতেন, দেশ হারাত বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা। এবারের করোনার আতঙ্কে বিদেশ গমনটা সেভাবে ঘটেনি। ফলে দেশের অর্থ দেশেই থেকে গেল, দেশের দোকানিরা খুশিমতো বেচাকেনার সুযোগ পেল। পূজায় বড় একটি অর্থ লেনদেনের ব্যাপার ঘটে মিষ্টি, প্রসাদ, খিচুড়িসহ নানা ধরনের খাবারদাবারের আয়োজনে। পূজামণ্ডপের চারপাশে অস্থায়ী দোকান বসে। অনেকেই পূজা উপলক্ষে দুপয়সা উপার্জনও করার সুযোগ পায়। পূজার এই ৫ দিন কেনাবেচায় ব্যস্ত থাকে শহরের দোকানপাটও। বাড়তি বেচাকেনায় উপার্জনের সুযোগ পায় দোকানিরা। সবকিছু মিলিয়ে এবারের পূজায় অর্থনীতিতে কত হাজার কোটি টাকা সংযোজন ঘটল তা হয়তো এই মুহূর্তেই বলা যাবে না। ধারণা করা হচ্ছে, এটি ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে এই ৩০ হাজার কোটি টাকার সঞ্চালন নতুন যে গতিবেগ সৃষ্টি করবে তা বছর শেষে আরও বড় ধরনের বাড়তি মূল্য সংযোজন ঘটাবে।

আগামী শুক্রবার বিজয়া দশমী শেষে দেবী দুর্গা কৈলাসে যাবেন দোলায়। এসেছিলেন তিনি ঘোড়ায় চড়ে। ভক্তরা তার কাছে এবার বিশেষভাবে করোনার সংক্রমণ থেকে মুক্তির প্রার্থনা করছে। গত দুই বছর করোনায় বিশ্ব মানবসভ্যতা নাকাল হয়ে পড়েছিল। উপমহাদেশের প্রায় সব মানুষই করোনার এই করাল গ্রাসে প্রিয়জনদের হারিয়েছে, অনেকে আক্রান্ত হয়ে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই দুই বছর মানুষ করোনার প্রকোপে অর্থনৈতিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষজন সবচাইতে বেশি কষ্টে পড়েছে। অনেকে কাজ হারিয়েছে, অনেকে সীমিত উপার্জন দিয়ে কোনোপ্রকারের বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে গেছে। গেল বছর করোনার সংক্রমণ বেশি থাকায় দুর্গোৎসবও মনমতো পালন করা যায়নি। এ বছর সংক্রমণের গতি কমে আসায় অনেকেই সাহস সঞ্চয় করে দুর্গোৎসবের আয়োজন করেছে। তাতে দুই বছরের দুঃখ-কষ্ট, ব্যথা-বেদনা ও মানসিক অবসাদ কিছুটা ভুলে যাওয়ার একটি উপলক্ষ খুঁজে পেয়েছে। সেই আয়োজনে শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীরাই অংশ নেয়নি, অন্যরাও আসছে, দেখা সাক্ষাৎ করছে। সার্বজনীন পূজার মহামিলনে কিছুটা সময় অতিবাহিত করছে। এ যেন বন্দিজীবন থেকে মুক্তিলাভের পরমানন্দ উপভোগ করা। এবারের পূজায় সেটিই সবচাইতে বড় পাওয়া। মানুষ কর্মে ফিরতে পেরেছে, ধর্ম তাকে সুযোগ করে দিয়েছে। এখন প্রতীক্ষায় থাকা হবে আগামী এক বছরের। বছরটি যদি হয় সত্যি সত্যি করোনামুক্ত তাহলে সামনের দিনগুলোতে উৎসব আসবে, বৈশাখের খুব বেশি দেরি নেই, একই সঙ্গে ঈদের খুশিও সমানভাবে উপভোগ করে নিতে পারবে সবাই। আগামী এই দিনে দেবী দুর্গা আবার যখন আসবেন তখন এর চাইতেও বেশি কর্মচাঞ্চল্যে মানুষের প্রাণ, দেশ ও বিশে^র সর্বত্র জীবন-জীবিকা স্বাভাবিক গতিময়তা যেন লাভ করে সেটিই হবে সবার প্রত্যাশা ও প্রতীক্ষা।

লেখক: ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]