ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা সোমবার ২৫ অক্টোবর ২০২১ ১০ কার্তিক ১৪২৮
ই-পেপার সোমবার ২৫ অক্টোবর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

৫০০ কিডনি বিক্রিতে জড়িত মান্নান চক্র
আলমগীর হোসেন
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২১, ৯:২৭ এএম আপডেট: ১৫.১০.২০২১ ৯:৩৬ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 98

ঋণগ্রস্ত বা দরিদ্রতার চরমে থাকা মানুষগুলো ছিলেন আব্দুল মান্নানের টার্গেটে। টার্গেট ব্যক্তিদের রাজি করাতে বিভিন্ন পর্যায়ে লোক নিযুক্ত থাকত। টার্গেট ব্যক্তির দুর্বলতাগুলোকে শনাক্ত করে সে অনুসারে নানা কথা বলে কিডনিদানের জন্য মনোবল বাড়ানো হতো। এমনকি ‘একটি কিডনি দিলে কিছুই হয় না, এটা অতিরিক্ত থাকে’- এমনসব কথা বলে এবং বিপুল অঙ্কের টাকা দেওয়ার কথা বলে রাজি করানো হতো সহজ-সরল মানুষজনকে। এভাবে বিগত এক যুগে জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার বাসিন্দা র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার আব্দুল মান্নান সংঘবদ্ধভাবে অন্তত ৫০০ কিডনি বিক্রি করিয়েছে বলে জানা গেছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, জয়পুরহাটের বাসিন্দা আব্দুল মান্নানের বিরুদ্ধে অবৈধ কিডনি বেচাকেনার দায়ে সাতটি মামলায় চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দেওয়া হয়েছিল। দুটি মামলায় বর্তমানে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি ছিল। গা-ঢাকা দিয়ে থেকেই কিডনি বেচাকেনার অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছিল সে। মান্নান কয়েকবার গ্রেফতার হয়ে অল্প কিছুদিন করে কারাগারেও থাকে। প্রতিবারই জামিনে মুক্তি পেয়ে বিপুল টাকার লোভে ফের কিডনি বেচাকেনার অপকর্ম করত। মান্নান বর্তমানে শাহরিয়ার ইমরানের হয়ে কাজ করছিল। মান্নান স্থানীয় দালালদের সমন্বয় করত। শাহরিয়ার দেশীয় চক্রের হয়ে পাশর্^বর্তী দেশের (ভারত) চক্রের সঙ্গে সমন্বয়ের কাজ করত। পুরো প্রক্রিয়ায় বর্তমানে ‘প্ল্যানার’ হিসেবে কাজ করছিল গ্রেফতার শাহরিয়ার ইমরান। র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন সময়ের আলোকে বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারদের কাছ থেকে অবৈধ কিডনি বেচাকেনার ভয়াবহ নানা তথ্য পাওয়া গেছে। বিশেষ করে জয়পুরহাটের মান্নান সংঘবদ্ধভাবে এ পর্যন্ত ৫০০ কিডনি বিক্রি করিয়েছে বলে স্বীকার করেছে। এ ছাড়া শাহরিয়ার ইমরানও অন্তত একশর বেশি কিডনি বেচাকেনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। মান্নান পড়ালেখা তেমন করেনি। সে মূলত স্থানীয় দালালদের সমন্বয় করতেন।

অন্যদিকে শাহরিয়ার পড়ালেখা জানা ও প্রযুক্তিজ্ঞান সম্পন্ন হওয়ায় ওই সিন্ডিকেট পরিচালনা করছিলেন। ফেসবুক পেজে বিজ্ঞাপন দিয়ে কিডনি বেচাকেনাসহ বিদেশি চক্রের সঙ্গে সমন্বয়ের কাজটি মূলত শাহরিয়ার নিয়ন্ত্রণ করতেন।

জানা গেছে, দেশে প্রতিনিয়তই কিডনি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও এই রোগের ব্যাপক প্রকোপ আছে। ফলে যাদের কিডনি একেবারেই ‘ড্যামেজ’ হয়ে যাচ্ছে, তাদের জীবন বাঁচানোর জন্য কিডনি প্রতিস্থাপন একান্ত অবশ্যক। সে অনুসারে নিকট স্বজন দিয়ে সবসময় কিডনি জোগাড় হয় না। তখনই বিপাকে পড়া রোগী বা স্বজনরা দ্বারস্থ হচ্ছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা দালালদের কাছে। এই দালালরা গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র-অসহায় মানুষদের টাকার লোভ দেখিয়ে অবৈধ প্রক্রিয়ায় কিডনিদানে রাজি করাচ্ছে। এর বিনিময়ে কিডনিদাতা (ডোনার) অল্প কিছু টাকা পেলেও বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে দালাল চক্র। অনেক সময় চুক্তিমতো ন্যূনতম সেই টাকাও পাচ্ছেন না জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কিডনি দেওয়া দরিদ্র ডোনাররা।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে কিডনির অবৈধ বেচাকেনার দায়ে শাস্তির পরিমাণ তুলনামূলক কম। এর ফলে চিহ্নিত বা পেশাদার কিডনি দালালরা গ্রেফতার হওয়া নিয়ে ভ্রুক্ষেপ করছে না। বারবার গ্রেফতার হলেও আইনি নানা ফাঁকফোকরে অল্পদিনেই জামিন পেয়ে যাচ্ছে। যেখানে একটি কিডনির ব্যবস্থা করে দিলে দশ থেকে ১৫ লাখ টাকা পেয়ে যাচ্ছে সেখানে অল্প কিছুদিনের কারাবাস বা শাস্তিকে চক্রের সদস্যরা গায়েই লাগাচ্ছে না।

জানা গেছে, গত সোম ও মঙ্গলবার এলিট ফোর্স র‌্যাব সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত রাজধানীর নর্দ্দা এলাকা ও জয়পুরহাট জেলা থেকে অবৈধ কিডনি বেচাকেনা চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতাররা হলো- চক্রের হোতা মো. শাহরিয়ার ইমরান আহম্মেদ (৩৬), মো. মেহেদী হাসান (২৪), মো. সাইফুল ইসলাম (২৮), মো. আব্দুল মান্নান (৪৫) ও মো. তাজুল ইসলাম ওরফে তাজু (৩৮)।

গ্রেফতারের পর র‌্যাব আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিল, প্রতিটি কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য দিশেহারা রোগী-স্বজনদের কাছ থেকে নেওয়া হতো ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা। এর বিপরীতে কিডনিদাতাকে (ডোনার) তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি করা হতো। আস্থা সৃষ্টির জন্য অগ্রিম দেওয়া হতো মাত্র দুই লাখ টাকা। কিন্তু কিডনি প্রতিস্থাপন (ট্রান্সপ্ল্যানটেশন) সম্পন্ন হলে দরিদ্র সেই ডোনারকে প্রতিশ্রুতির সেই টাকা না দিয়ে উল্টো হুমকি-ধমকি দেওয়া হতো। এখানেই শেষ নয়, টার্গেট ব্যক্তিকে পার্শ্ববর্তী দেশে নেওয়ার পর কোনো কারণে রোগীর সঙ্গে কিডনি ম্যাচিং না হলে তখন পাচার করা বা ডোনার ব্যক্তির ৭০ শতাংশ লিভার কেটে রাখা হতো! ‘বাংলাদেশ কিডনি ও লিভার পেশেন্ট চিকিৎসা সেবা’ এবং ‘কিডনি লিভার চিকিৎসা সেবা’ নামে ফেসবুকে দুটি পেজ খুলে সেখানে বিজ্ঞাপন দিয়ে কিডনি কেনাবেচা করে যাচ্ছিল প্রতারক চক্রটি। এর আগেও ২০১১ সালে জয়পুরহাটের কালাই উপজেলাসহ উত্তরাঞ্চলকেন্দ্রিক একাধিক চক্র দরিদ্র সহজ-সরল বিপুলসংখ্যক মানুষকে নানা কৌশলে কিডনি বিক্রি করিয়েছিল। ওই সময়ে চক্রের বেশ কয়েকজন সদস্যকে গ্রেফতার করেছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।


আরও সংবাদ   বিষয়:  কিডনি বিক্রি   পাচার চক্র  




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]