ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ৩০ নভেম্বর ২০২১ ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
ই-পেপার মঙ্গলবার ৩০ নভেম্বর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

হাসুপা’র দেখা রাসেল, পিঁপড়ার নাম দিয়েছিল ‘ভুট্টো’
হাবীব রহমান
প্রকাশ: সোমবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২১, ৩:২৭ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 255

‘শেখ রাসেল চলাফেরায় বেশ সাবধানি কিন্তু সাহসী ছিল, সহসা কোনো কিছুতে ভয় পেত না। কালো কালো বড় পিঁপড়া দেখলে ধরতে যেত। এক দিন একটা বড় ওলা (বড় কালো পিঁপড়া) ধরে ফেলল আর সঙ্গে সঙ্গে কামড় খেল। ছোট্ট আঙুল কেটে রক্ত বের হলো। সঙ্গে সঙ্গে ওষুধ দেওয়া হলো। আঙুলটা ফুলে গেছে। তারপর থেকে আর পিঁপড়া ধরতে যেত না। কিন্তু ওই পিঁপড়ার একটা নাম নিজেই দিয়ে দিল। কামড় খাওয়ার পর থেকেই কালো বড় পিঁপড়া দেখলেই বলত ‘ভুট্টো’। নিজে থেকেই নামটা দিয়েছিল রাসেল।’

ছোট ভাই শেখ রাসেলকে ঘিরে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অজস্র স্মৃতি। রাসেলের প্রথম হাঁটতে শেখাও ‘হাসুপা’র হাত ধরে। আবার পঁচাত্তরের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের আগে তাকে জার্মানি না নিয়ে যাওয়ার আক্ষেপ এখনও ঝরে বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যার কণ্ঠে। এসব স্মৃতি নিয়ে ‘আমাদের ছোট রাসেল সোনা’ শিরোনামে একটি লেখা প্রকাশিত হয় ছাত্রলীগের প্রকাশনা ‘মাতৃভূমি’তে, ২০১১ সালে। পরে সেসব স্মৃতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী একই শিরোনামে বইও লিখেছেন। আজ শেখ রাসেলের ৫৭তম জন্মবার্ষিকী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ছোট্ট রাসেল ‘হাসুপা’ বলে ডাকত। 

বঙ্গমাতাকে আব্বা বলে ডাকত : আন্দোলন-সংগ্রাম নিয়ে ব্যস্ত বঙ্গবন্ধু ঘুরে বেরিয়েছেন দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। রাসেল বঙ্গমাতাকে আব্বা বলেও ডাকত। ‘আব্বার সঙ্গে প্রতি ১৫ দিন পর আমরা দেখা করতে যেতাম। রাসেলকে নিয়ে গেলে আর আসতে চাইত না। খুবই কান্নাকাটি করত। ওকে বোঝানো হয়েছিল যে, আব্বার বাসা জেলখানা আর আমরা আব্বার বাসায় বেড়াতে এসেছি। আমরা বাসায় ফেরত যাব। বেশ কষ্ট করেই ওকে বাসায় ফেরত আনা হতো। আর আব্বার মনের অবস্থা কী হতো তা আমরা বুঝতে পারতাম। বাসায় আব্বার জন্য কান্নাকাটি করলে মা ওকে বোঝাত এবং মাকে আব্বা বলে ডাকতে শেখাতেন। মাকেই আব্বা বলে ডাকত।’

৬ দফা দিয়ে বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হয়ে গেলে রাসেলের কিছু খেতে না চাওয়ার ঘটনাও এসেছে প্রধানমন্ত্রীর লেখায়। ‘আব্বা গ্রেফতার হওয়ার পর থেকেই রাসেলের খাওয়া-দাওয়া একরকম বন্ধ হয়ে যায়। কিছু খেতে চাইত না।’

রাসেলের নামকরণের প্রেক্ষাপটও লিখেছেন প্রধানমন্ত্রী। ‘আব্বা বার্ট্রান্ড রাসেলের খুব ভক্ত ছিলেন, রাসেলের বই পড়ে মাকে ব্যাখ্যা করে শোনাতেন। মা রাসেলের ফিলোসফি শুনে শুনে এত ভক্ত হয়ে যান যে, নিজের ছোট সন্তানের নাম রাসেল রাখলেন।’ বার্ট্রান্ড রাসেল ছিলেন নোবেলজয়ী (১৯৫০) দার্শনিক।

রাসেলের কবুতর নিয়ে প্রধানমন্ত্রী লেখেন, ‘আমাদের বাসায় কবুতরের ঘর ছিল। বেশ উঁচু করে ঘর করা হয়েছিল। অনেক কবুতর থাকতো সেখানে। মা খুব ভোরে উঠতেন, রাসেলকে কোলে নিয়ে নিচে যেতেন এবং নিজের হাতে কবুতরদের খাবার দিতেন। রাসেল যখন হাঁটতে শেখে তখন নিজেই কবুতরের পেছনে ছুটত, নিজে হাতে করে তাদের খাবার দিত। আমাদের গ্রামের বাড়িতেও কবুতর ছিল।’

‘রাসেলকে কবুতর দিলে কোনও দিন খেত না। এত ছোট বাচ্চা কিভাবে যে টের পেত কে জানে। ওকে আমরা অনেকভাবে চেষ্টা করেছি। ওর মুখের কাছে নিলেও খেত না। মুখ ফিরিয়ে নিত। শত চেষ্টা করলেও কোনোদিন কেউ ওকে কবুতরের মাংস খাওয়াতে পারে নি।’ পোষা প্রাণীদেরও খুব ভালোবাসত রাসেল। প্রধানমন্ত্রী তাদের পারিবারিক পোষা কুকুর টমির সঙ্গে রাসেলের বন্ধুত্বের কথাও লিখেছেন।

পুলিশ দেখলেই সেøাগান : ‘১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যখন অসহযোগ আন্দোলন চলছে, তখন বাসার সামনে দিয়ে মিছিল যেত আর মাঝেমধ্যে পুলিশের গাড়ি চলাচল করত। দোতলার বারান্দায় রাসেল খেলা করত, যখনই দেখত পুলিশের গাড়ি যাচ্ছে তখনই চিৎকার করে বলত, ‘ও পুলিশ কাল হরতাল’। 

ছোট্ট রাসেলের ব্যক্তিত্ববোধ : একাত্তরের বন্দিখানার স্মৃতিচারণ করেন শেখ হাসিনা। যেখানে রাসেলের স্ট্রং পার্সোনালিটি উঠে আসে। তিনি লেখেন, ‘বন্দিখানায় থাকতে আব্বার কোনও খবরই আমরা জানি না। কোথায় আছেন, কেমন আছেন কিছুই জানি না। প্রথম দিকে রাসেল আব্বার জন্য খুব কান্নাকাটি করত। চোখের কোণে সব সময় পানি। যদি জিজ্ঞাসা করতাম, ‘কি হয়েছে রাসেল?’ বলত ‘চোখে ময়লা’। অবাক লাগত এটুকু একটা শিশু কীভাবে নিজের কষ্ট লুকাতে শিখল।’

আর্মি অফিসার হওয়ার ইচ্ছা ছিল রাসেলের : ‘রাসেলকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করত, বড় হয়ে তুমি কী হবে? তা হলে বলত, আমি আর্মি অফিসার হব। ওর খুব ইচ্ছা ছিল সেনাবাহিনীতে যোগ দেবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই ওর ওই ইচ্ছা। কামাল ও জামাল মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর সব গল্প বলার জন্য আবদার করত। খুব আগ্রহ নিয়ে শুনত।’
মুক্তিযুদ্ধের পর সবসময় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে থাকত : প্রধানমন্ত্রী লেখেন, ‘রাসেলের সব থেকে আনন্দের দিন এলো যেদিন আব্বা ফিরে এলেন। এক মুহূর্ত যেন আব্বাকে কাছছাড়া করতে চাইত না। সবসময় আব্বার পাশে পাশে ঘুরে বেড়াত। ওর জন্য ইতোমধ্যে অনেক খেলনাও আনা হয়েছে। ছোট সাইকেলও এসেছে, কিন্তু কিছুক্ষণ পরপরই ও আব্বার কাছে চলে যেত।’

‘আব্বা প্রতিদিন সকালে অফিসে আসতেন, দুপুরে গণভবনে বিশ্রাম নিতেন, এখানেই খাবার খেতেন। বিকেলে হাঁটতেন আর এখানেই অফিস করতেন। রাসেল প্রতিদিন বিকেলে গণভবনে আসত। তার সাইকেলটাও সঙ্গে আসত। রাসেলের মাছ ধরার খুব শখ ছিল। কিন্তু মাছ ধরে আবার ছেড়ে দিতো। মাছ ধরবে আর ছাড়বে এটাই তার খেলা ছিল। একবার আমরা সবাই মিলে নাটোরে উত্তরা গণভবনে যাই। সেখানেও সারা দিন মাছ ধরতেই ব্যস্ত থাকতো।’

‘রাসেল আব্বাকে ছায়ার মতো অনুসরণ করতো। আব্বাকে মোটেই ছাড়তে চাইতো না। যেখানে যেখানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব আব্বা সেখানে তাকে নিয়ে যেতেন। মা ওর জন্য প্রিন্স স্যুট বানিয়ে দিয়েছিলেন। কারণ আব্বা প্রিন্স স্যুট যেদিন পরতেন রাসেলও পরতো। কাপড়-চোপড়ের ব্যাপারে ছোটবেলা থেকেই তার নিজের পছন্দ ছিল। তবে একবার একটা পছন্দ হলে তা আর ছাড়তে চাইতো না।’

জাপান সরকারের আমন্ত্রণে বিশেষভাবে ছিল রাসেলের নাম : ছোট ভাই সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী লেখেন, ‘ওর নিজের আলাদা একটা ব্যক্তিত্ব ছিল। নিজের পছন্দের ওপর খুব বিশ্বাস ছিল। জাপান থেকে আব্বার রাষ্ট্রীয় সফরের দাওয়াত আসে। জাপানিরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন দেয়। শরণার্থীদের সাহায্য করে জাপানের শিশুরা তাদের টিফিনের টাকা দেয় আমাদের দেশের শিশুদের জন্য।’

‘সেই জাপান যখন আমন্ত্রণ জানায় তখন গোটা পরিবারকেই আমন্ত্রণ দেয় বিশেষভাবে রাসেলের কথা উল্লেখ করে। রাসেল ও রেহানা আব্বার সঙ্গে জাপান যায়। রাসেলের জন্য বিশেষ কর্মসূচিও রাখে জাপান সরকার। খুব আনন্দ করেছিল রাসেল সেই সফরে।’

জয়ের হাতে চকলেট দিয়ে খেলনা নিয়ে নিতো রাসেল : ‘সব থেকে মজা করতো যখন রাসেল জয়ের কাছ থেকে কোনও খেলনা নিতে চাইতো তখন জয়কে চকলেট দিত। আর চকলেট পেয়ে জয় হাতের খেলনা দিয়ে দিত, বিশেষ করে গাড়ি। রাসেল গাড়ি নিয়ে খেলতো, জয়ের যেই চকলেট শেষ হয়ে যেত তখন বলত চকলেট শেষ, গাড়ি ফেরত দাও। তখন আবার রাসেল বলতো চকলেট ফেরত দাও, গাড়ি ফেরত দেব। এই নিয়ে মাঝেমধ্যে দু’জনের মধ্যে ঝগড়া লেগে যেত, কান্নাকাটি শুরু হতো। মা সবসময় আবার জয়ের পক্ষ নিতেন। রাসেল খুব মজা পেত। 

রাসেলকে জার্মানি নিয়ে না যাওয়ার আক্ষেপ প্রধানমন্ত্রীর : পঁচাত্তরের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের আগে প্রধানমন্ত্রী জার্মানি যান। সপরিবারে হত্যাকাণ্ডে তিনি ও শেখ রেহানা বেঁচে যান। প্রধানমন্ত্রী লেখেন, ‘৩০ জুলাই আমি জার্মানিতে স্বামীর কর্মস্থলে যাই। রাসেলের খুব মন খারাপ ছিল। কারণ সে আর জয় এক সঙ্গে খেলতো। আমি জার্মানি যাওয়ার সময় রেহানাকে আমার সঙ্গে নিয়ে যাই। রাসেলকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম; কিন্তু ওর জন্ডিস হয়, শরীর খারাপ হয়ে পড়ে। সে কারণে মা ওকে আর আমাদের সঙ্গে যেতে দেননি। রাসেলকে সেদিন যদি আমাদের সঙ্গে নিয়ে যেতে পারতাম তা হলে ওকে আর হারাতে হতো না।’


আরও সংবাদ   বিষয়:  শেখ রাসেল   হাসুপা  




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]