ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা রোববার ৫ ডিসেম্বর ২০২১ ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
ই-পেপার রোববার ৫ ডিসেম্বর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

গ্রামবাংলার ঐতিহ্য নৌকাবাইচ
মো. আল-মামুন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২১, ১১:৪২ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 121

নদীমাতৃক বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, আনন্দায়োজন, উৎসব ও খেলাধুলা সবকিছুতেই নদী ও নৌকার সরব আনাগোনা। হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সংস্করণ বাংলাদেশের নৌকাবাইচ। এক সময় এদেশে যোগাযোগ ছিল নদীকেন্দ্রিক আর বাহন ছিল নৌকা। এখানে নৌ শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে বিভিন্ন শিল্পকেন্দ্র। এসব শিল্পে যুগ যুগ ধরে তৈরি হয় দক্ষ ও অভিজ্ঞ কারিগর। এই কারিগরদের হাত ধরে তৈরি হতে থাকে বড় বড় নৌকা। এসব নৌকা তৈরির মূলে ছিল তাদের প্রতিযোগী মানসিকতা।

এভাবে একসময় বিভিন্ন নৌযানের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়। নৌযানের এই প্রতিযোগিতাই হলো নৌকাবাইচ। ‘বাইচ’ শব্দটি ফারসি, যার অর্থ বাজি বা খেলা। তবে এখানে দাঁড় টানার কসরত ও নৌকা চালনার দ্বারা বিজয় লাভের লক্ষ্যে আমোদ-প্রমোদমূলক প্রতিযোগিতা বোঝায়। একদল মাঝি নিয়ে একেকটি দল গঠিত হয়। এমন অনেকগুলো দলের মধ্যে নৌকা দৌড় বা নৌকা চালনা প্রতিযোগিতাই হলো নৌকাবাইচ। নদীমাতৃক বাংলাদেশে নৌকাবাইচ লোকায়ত বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি অংশ। পৃথিবীতে সর্বপ্রথম ‘মেসোপটেমিয়ার’ লোকেরাই এটির প্রচলন করেছিল বলে ইতিহাস বলে।

খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২০০০ বছর আগে ‘মেসোপটেমিয়ার’ লোকেরা ইউফ্রেটিস নদীতে একধরনের নৌকাবাইচের আয়োজন করত। এর কয়েক শতাব্দী পর মিসরের নীলনদের জলে নৌকা চালনা প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এরপর ছড়িয়ে পড়তে থাকে এর প্রসার। কালের পরিক্রমায় ‘মেসোপটেমিয়ার’ মানুষদের শুরু করা খেলাটি আমাদের দেশেও চলে আসে। তবে কবে এদেশে গণবিনোদন হিসেবে নৌকাবাইচের প্রচলন হয়েছিল তার সঠিক ইতিহাস পাওয়া যায় না। ‘বাইচ’ শব্দটির ব্যুৎপত্তি বিবেচনা করে অনুমিত হয়েছে যে, মধ্যযুগের মুসলমান নবাব, সুবেদার, ভূস্বামীরা যাদের নৌবাহিনী ছিল তারা এই প্রতিযোগিতামূলক বিনোদনের সূত্রপাত করেছিলেন। তবে নৌকাবাইচের সূচনা নিয়ে দুটি জনশ্রুতি আছে। প্রথম জনশ্রুতিটি হলো জগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রাকে কেন্দ্র করে। জগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রার সময় স্নানার্থীদের নিয়ে বহু নৌকার ছড়াছড়ি ও দৌড়াদৌড়ি পড়ে যায়। এতেই মাঝি-মাল্লা-যাত্রীরা প্রতিযোগিতার আনন্দ পায়। এ থেকে কালক্রমে নৌকাবাইচের শুরু হয়।

দ্বিতীয় জনশ্রুতিটি হলো পীরগাজীকে কেন্দ্র করে। আঠারো শতকের শুরুর দিকে কোনো এক গাজী পীর মেঘনা নদীর এক পাড়ে দাঁড়িয়ে অন্য পাড়ে থাকা তার ভক্তদের কাছে আসার আহ্বান করেন। কিন্তু ঘাটে কোনো নৌকা ছিল না। ভক্তরা তার কাছে আসতে একটি ডিঙি নৌকা খুঁজে বের করেন। যখনই নৌকাটি মাঝ নদীতে এলো, তখনই নদীতে তোলপাড় আরম্ভ হলো। নদী ফুলে-ফেঁপে উঠল। তখন চারপাশের যত নৌকা ছিল তারা খবর পেয়ে ছুটে আসেন। তখন সারি সারি নৌকা একে অন্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলে। এ থেকেই নৌকাবাইচের গোড়াপত্তন হয়। মুসলিম যুগের নবাব-বাদশাহদের আমলে নৌকাবাইচ বেশ জনপ্রিয় ছিল। অনেকে মনে করেন, নবাব-বাদশাহদের নৌবাহিনী থেকেই নৌকাবাইচের গোড়াপত্তন হয়। পূর্ববঙ্গের ভাটি অঞ্চলের রাজ্য জয় ও রাজ্য রক্ষার অন্যতম কৌশল ছিল নৌশক্তি। বাংলার বারো ভূঁইয়ারা নৌবলেই মোগলদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন। মগ ও হার্মাদ জলদস্যুদের দমনে নৌশক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখে। এসব রণবহর বা নৌবহরে দীর্ঘাকৃতির ছিপজাতীয় নৌকা থাকত।

নৌকাবাইচকে উৎসাহ প্রদান ও ঐতিহ্যকে ধরে রাখার লক্ষ্যে প্রতি বছর বাংলাদেশে জাতীয় নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশে প্রধানত ভাদ্র-আশি^ন মাসে নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা হয়। বাংলাদেশের জাতীয় নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতার দূরত্ব ৬৫০ মিটার। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের নৌকাবাইচের উন্নয়নের জন্য ‘বাংলাদেশ বোয়িং ফেডারেশন’ গঠিত হয়। সনাতন নৌকাবাইচ ও বোয়িংয়ের মধ্যে সমন্বয়সাধন করাই বাংলাদেশ বোয়িং ফেডারেশনের কাজ। এ ফেডারেশনটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বোয়িং ফেডারেশনের সদস্য। বাংলাদেশ ১৯৯০ সালে একটি আন্তর্জাতিক নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। নৌকাবাইচের নৌকার গঠন কিছুটা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। এই নৌকা হয় সরু ও লম্বাটে। লম্বায় যেমন অনেক দীর্ঘ; ঠিক তেমনই চওড়ায় খুবই সরু। সরু ও লম্বাটে হওয়ার দরুন নদীর পানি কেটে দ্রুত চলতে সক্ষম এবং প্রতিযোগিতার উপযোগী। নৌকার সামনের গলুইটাকে খুব সুন্দর করে সাজানো হয়। তাতে কখনও করা হয় ময়ূরের মুখ, কখনও রাজহাঁস বা অন্য কোনো পাখির মুখাবয়ব। নৌকাটিতে উজ্জ্বল রঙের কারুকাজ করে বিভিন্ন নকশা তৈরি করা হয়। সর্বোপরি নৌকাটিকে দর্শকের সামনে যথাসম্ভব আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টা থাকে। কারুকার্য ও গঠনের দিকে তাকালে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার বাইচের নৌকাগুলোর মধ্যে বিচিত্রতা দেখা যায়। একেক অঞ্চলের নৌকাবাইচের জন্য একেক রকমের নৌকার প্রচলন রয়েছে। ঢাকা, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ- এ অঞ্চলগুলোতে বাইচের জন্য সাধারণত কোশা নৌকা ব্যবহৃত হয়। এর গঠন সরু এবং লম্বায় প্রায় ১৫০ ফুট থেকে ২০০ ফুট পর্যন্ত হয়। কোশা নৌকার সামনের ও পেছনের অংশ একেবারে সোজা।

টাঙ্গাইল ও পাবনায় নৌকাবাইচে সরু ও লম্বা ধরনের ছিপজাতীয় দ্রুতগতিসম্পন্ন নৌকা ব্যবহৃত হয়। এর গঠনও সাধারণত কোশা নৌকার মতো। এর সামনের দিকটা পানির সঙ্গে মিশে থাকে আর পেছনের অংশটি পানি থেকে প্রায় ৫ ফুট পর্যন্ত উঁচু হয়। এই নৌকায় সামনের ও পেছনের মাথায় চুমকির বিভিন্ন কারুকার্য থাকে। কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আজমিরিগঞ্জ ও সিলেট অঞ্চলে বাইচের জন্য সারেঙ্গী নৌকা ব্যবহৃত হয়। এর আকারও কোশা ও ছিপজাতীয় বাইচ নৌকার মতোই। এর সামনের ও পেছনের দিকটা পানি থেকে দু-তিন ফুট উঁচু থাকে এবং মুখটা হাঁসের মুখের মতো চ্যাপটা হয়। চট্টগ্রাম, নোয়াখালী জেলার নিম্নাঞ্চল ও সন্দ্বীপে বাইচের জন্য সাম্পান ব্যবহৃত হয়। সাম্পান দেখতে জাহাজের মতো। ঢাকা ফরিদপুরে ব্যবহৃত হয় গয়না নৌকা। গয়না দৈর্ঘ্যে প্রায় ১০০ ফুট থেকে ১২৫ ফুট ও মাঝখানে ৮ থেকে ৯ ফুট প্রশস্ত। এর সামনের দিকটা পানি থেকে ৩ ফুট ও পেছনের দিকটা পানি থেকে ৪ থেকে ৫ ফুট উঁচু হয়। বাইচের নৌকাগুলোর বিভিন্ন নাম রয়েছে। যেমন- উড়ন্ত বলাকা, অগ্রদূত, ঝরের পাখি, পঙ্খিরাজ, ময়ূরপঙ্খি, সাইমুন, তুফান মেল, সোনার তরি, দীপরাজ ইত্যাদি। এসব বাইচ নৌকা তৈরিতে সাধারণত শাল, গর্জন, শিল কড়ই, চাম্বুল ইত্যাদি গাছের কাঠ ব্যবহৃত হয়। নৌকাবাইচের নৌকায় ওঠার অনেক আনুষ্ঠানিকতা রয়েছে। সবাই পাক-পবিত্র হয়ে গেঞ্জি গায়ে এবং মাথায় একই রঙের গামছা বেঁধে নেয়। প্রতিটি নৌকায় ২৫, ৫০ বা ১০০ জন মাঝি থাকেন। বৈঠা হাতে নৌকার দুপাশে মাঝিরা সারি বেঁধে বসে পড়ে। মাঝিদের বৈঠা টানাকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার জন্য একজন পরিচালক থাকে, যাকে বলা হয় গায়েন।

সে বসবে নৌকার গলুইয়ে। মাঝিরা একত্রে জয়ধ্বনি সহকারে নৌকা ছেড়ে দিয়েই একসঙ্গে কোনো একটি গান গাইতে আরম্ভ করে এবং সেই গানের তালের ঝুঁকে ঝুঁকে বৈঠা টানে; যার ফলে কারও বৈঠা ঠোকাঠুকি না লেগে একসঙ্গে পানিতে অভিঘাত সৃষ্টি করতে থাকে। গায়েন কাঁসির শব্দে এই বৈঠার এবং গানের গতি বজায় রাখতে সাহায্য করে।

অন্য সব নৌকাকে পেছনে ফেলে নিজেদের নৌকাকে সবার আগে নেওয়ার চেষ্টায় প্রয়োজনবোধে কাঁসির শব্দে বৈঠার গতি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয় এবং সেই সঙ্গে গানের গতিও বেড়ে চলে। এ ছাড়া এই সময় দেহ ও মনের উত্তেজনার বশেই গানের মধ্যে ‘হৈ, হৈয়া’- এই ধরনের শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। নৌকাবাইচের সময় মাঝি-মাল্লারা সমবেত কণ্ঠে যে গান গায় তা সারিগান নামে অভিহিত। নৌকার মধ্যে ঢোল-তবলা নিয়ে গায়েনরা থাকেন। তাদের গানগুলো মাঝিদের উৎসাহ আর শক্তি জোগায়। ঢোল ও করতালের সঙ্গে সঙ্গে নৌকাবাইচে সব মাঝি-মাল্লারা তালে তালে এক সুরে গান গেয়ে ছুটে চলেন।

শিশু-কিশোর থেকে বৃদ্ধ, সবাই আগ্রহ নিয়ে ছুটে চলেন নৌকাবাইচ দেখতে। প্রমত্তা নদীবক্ষে সঙ্গীতের তাল-লয়ে দাঁড়িদের ছন্দময় দাঁড় নিক্ষেপে নদী-জল আন্দোলিত করে যে মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের অবতারণা হয়, তা অতুলনীয়। আবেগ-উত্তেজনায় নৌকাবাইচ হয়ে ওঠে আপামর মানুষের নির্মল আনন্দের সপ্রাণ প্রতিভূ। নদীমাতৃক বাংলাদেশ নদীর তরঙ্গভঙ্গের সঙ্গে এ মাটির মানুষের আশৈশব মিতালি। নদী তাই হয়ে উঠেছে এখানে মানুষের প্রাণোচ্ছল ক্রীড়াসঙ্গী। এই প্রেক্ষাপটে নদীবক্ষে নৌকা শুধু যোগাযোগের মাধ্যমই নয়, হয়ে উঠেছে জলক্রীড়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নৌকাবাইচ তারই একটি দৃষ্টিনন্দন রোমাঞ্চময় দৃষ্টান্ত। সাধারণত ধান কাটার পরে কৃষকরা এ উদ্যোগ নেয়। একজন কৃষকের জমিতে ধান পাকলে ভূমিহীন মজুররা ধান কাটে। বর্ষার জলে ডুবে থাকা ধান কেটে ক্লান্ত জীবনের গতি আনতেই কৃষকদের এই আয়োজন। কৃষকরা তাদের মজুরদের নিয়ে বাইচের আয়োজন করে। কৃষকের নৌকায় যে মজুররা যায় তাদের ‘বাইচা’ বলে। গ্রামীণ কৃষকরা মজুরদের ওপর যে পরিমাণ নির্ভরশীল, তার জন্য সে তাকে শুধু শ্রমের মূল্যে মূল্যায়িত করে না। ধান কাটা হলে তারা এক দিন নাচ-গান ও ভূরিভোজের আয়োজন করে। বর্তমানে নদীদখল ও কলকারখানার বর্জ্যরে মাধ্যমে নদী তার স্বাভাবিক গতি হারিয়েছে। নদীর পানি শুকিয়ে নদী মরে যাচ্ছে। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য নৌকাবাইচ। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও ইছামতী নদীতে তাই এখন আর নৌকাবাইচের আয়োজন দেখা যায় না। দক্ষিণাঞ্চলের বাইচের দুটি বড় এলাকা গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার বাঘিয়া ও কালীগঞ্জ এলাকার বিলের পাড়। ধীরে ধীরে শুকিয়ে আসে বিল। আড়িয়াল খাঁ নদ ও মধুমতী নদীর অবস্থা এখন শোচনীয়। ফলে নৌকাবাইচ দেওয়া এখানে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তাই গ্রামবাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য নৌকাবাইচের প্রচলন রাখতে ও বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতি ধরে রাখতে হলে নদী পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই।

-বাংলাবাজার, ঢাকা


আরও সংবাদ   বিষয়:  গ্রামবাংলার ঐতিহ্য   নৌকাবাইচ  




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]