ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা রোববার ৫ ডিসেম্বর ২০২১ ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
ই-পেপার রোববার ৫ ডিসেম্বর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

এই সর্বনাশা নেশা থেকে মুক্তি মিলবে কবে?
অরূপ তালুকদার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২১, ১১:৪৬ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 99

আমরা এখন দিনের পর দিন যে ভয়ঙ্কর সমস্যাটির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি এবং আগামী প্রজন্মের জন্য যথেষ্ট উদ্বেগের মধ্যে সময় কাটাচ্ছি, সে সমস্যাটি হচ্ছে সারা দেশব্যাপী ভয়াবহ মাদকের বিস্তার। নানা নামের এবং ধরনের মাদক এখন আমাদের দেশের বিশেষ করে তরুণ-তরুণীদের হাতে হাতে ঘুরছে, তবে শুধু কম বয়সিদের হাতেই নয়, যুবক-যুবতী ও বৃদ্ধরাও এখন কোনো না কোনো মাদকের নেশায় বুঁদ হয়ে আছে।

অনেক দিন আগে থেকেই আমাদের দেশের সরকার মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করলেও আমাদের দেশের বেশ কিছু অসৎ ব্যবসায়ী তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি খাটিয়ে এবং কোটি কোটি কালো টাকা মাদক ব্যবসায় লগ্নি করে সারা দেশব্যাপী এক বিশাল মাদক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে। মাদক মাফিয়াদের দেশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই বিশাল সিন্ডিকেট অতি সহজেই ভেঙে দেওয়া সহজ হবে বলে মনে হয় না। যদিও দীর্ঘদিন ধরে আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা একযোগে অভিযান চালিয়ে মাদক ব্যবসার এই সিন্ডিকেট ভেঙে দেবার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কোনো কোনো স্থানে সফলও হচ্ছেন। কিন্তু এসব সিন্ডিকেটকে সমূলে উৎখাত করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেকে সরষের মধ্যে ভূত থাকার কারণেই সহজে কাক্সিক্ষত সাফল্য আসছে না বলে মনে করছেন।

উল্লেখ করা যেতে পারে, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার এবং লাওস- এই তিন দেশ মিলিয়ে যে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল তৈরি হয়েছে তা আমাদের দেশ থেকে খুব দূরে নয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের দেশ ব্যবহৃত হচ্ছে মাদক চোরাচালান এবং লেনদেনের আন্তর্জাতিক ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে।

গত ২৬শে জুন বিশ^ জুড়ে পালিত হয়েছে ‘মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস’। এই সময় সারা বিশ^ ছিল অতিমাত্রায় করোনাক্রান্ত। আর সে কারণে কোটি কোটি মানুষ দিনযাপন করেছে এক মহা আতঙ্কের মধ্যে, নিউ নরমাল জীবনধারায়। বহু মানুষের তখন চাকরি চলে গেছে, ব্যবসার ক্ষেত্রে লোকসানের সীমা ছাড়িয়ে গেছে, ফলে অর্থনৈতিক চাপে পড়ে বেকারত্ব ও প্রচণ্ড হতাশায় তারা আশ্রয় খুঁজেছে সহজলভ্য মাদকের কাছে। এর ফলেও বিশ^ব্যাপী বেড়েছে মাদকসেবীর সংখ্যা।

একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, আমাদের দেশে বিভিন্ন বয়সের প্রায় এক কোটি মানুষ এখন মাদকাসক্ত। বিভিন্ন উৎস থেকে তারা তাদের ইচ্ছেমতো মাদক সংগ্রহ করতে পারে। মাঝেমধ্যে যখন মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয় তখন মাদক ব্যবসায়ীরা নিত্যনতুন কৌশল আবিষ্কার করে মাদক লেনদেন অব্যাহত রাখে। কখনও কখনও তারা ব্যবহার করে কুরিয়ার সার্ভিস, প্রাইভেট কার, অ্যাম্বুলেন্স, পোস্টাল সার্ভিসসহ জানা-অজানা নানা পথ। এসব মাধ্যমে মাদক ব্যবসায়ীরা লেনদেন করে পরিচিত সাধারণ মাদক ছাড়াও ইয়াবা, হেরোইন, এলএসডি, আইস, কোকেন ইত্যাদির মতো দামি মাদক। এসব দামি মাদক নির্বিবাদে পাওয়ার জন্য রয়েছে হোম ডেলিভারির ব্যবস্থাও। উচ্চবিত্তদের জন্য বেশ কিছু সুন্দরী তরুণীদেরকেও নামে-বেনামে ব্যবহার করা হয় মাদক লেনদেনের কাজে। অভিযোগ আছে, এসব লেবাসধারী সুন্দরী অভিনেত্রী বা মডেলদের অনেকেই আবার প্রভাবশালী তথা ক্ষমতাশালীদের ছত্রছায়ায় আন্ডারওয়ার্ল্ড অপরাধ জগতের সঙ্গে যুক্ত থাকে। পুলিশের সোর্স ব্যবহার করে তাদেরকে ধরা আসলে সহজ কাজ নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকায় আটক হওয়া এই ধরনের কয়েকজন তরুণীকে আমরা দেখেছি। আটকের পর রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে এদের কাছ থেকে অনেক বিস্ময়কর তথ্য পেয়েছে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। তার তদন্ত চলছে। মামলা হয়েছে।

বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যাদি থেকে জানা যায়, কয়েক মাস আগে সরকারের ৫টি সংস্থা মিলে মাদক ব্যবসায়ীদের যে তালিকা তৈরি করেছে তা যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনা করে প্রায় ১২ হাজারের মতো মাদক লেনদেনকারী এবং ব্যবসায়ীদের সন্ধান পাওয়া গেছে। যার মধ্যে দেশব্যাপী ৭০০-র মতো আছে তথাকথিত গডফাদার। রাজধানী ঢাকায় আছে ৫০ জনের বেশি। তারা থাকে প্রায় সর্বদাই ধরাছোঁয়ার বাইরে। আমাদের আইনের হাত হয়তো ততটা লম্বা নয় যাতে তাদেরকে সহজে ধরা যায়। অদৃশ্য গডফাদারদের কেউ কেউ বেশিরভাগ সময় থাকে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া কিংবা দুবাইতে।

অভিজ্ঞজনেরা বলেন, মাদকসেবীদের কাছে ভয়াবহতম মাদক হচ্ছে এলএসডি (লাইসার্জিক অ্যাসিড ডাই-ইথালমাইড)। যাকে বলা হয়, ‘লাস্ট স্টেজ অব ড্রাগ’।

উল্লেখ করা যেতে পারে, এলএসডিতে আসক্ত একজন বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর ঘটনা আমরা জানি, যে এই মাদক গ্রহণের পর নিজের গলায় নিজেই এক সময় হঠাৎ করে দা চালিয়ে দিয়েছিল।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, এলএসডি এমন একটি ভয়ঙ্কর মাদক যা সেবনের পর মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা জেগে ওঠে। এমনি ঘটনা ঘটে আমাদের দেশের তথাকথিত আয়ুর্বেদিক ওষুধ ‘মাদক’ সেবনের পরও। এ ছাড়াও সাম্প্রতিক সময় আরও একটি নতুন মারাত্মক ধরনের মাদক পাওয়া যাচ্ছে আমাদের দেশে, যার নাম ‘ম্যাজিক মাশরুম’। এর কাজও ভয়ঙ্কর। সেবনের পর সেবনকারীর মধ্যে ধীরে ধীরে আত্মহননের প্রবণতা জাগতে থাকে। বিশেষ করে অভিজাত তথা উচ্চবিত্তদের সন্তানরা যারা ইতোমধ্যেই ভয়ানকভাবে কম্পিউটার গেমিংয়ের শিকার কিংবা অন্য কোনো সাধারণ মাদকে আসক্ত তারাই একসময় খুঁজতে থাকে ‘এলএসডি’, ‘ম্যাজিক মাশরুম’ অথবা ‘আইস’-এর মতো শক্তিশালী মাদক।

গত আগস্টে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ মাদকবিরোধী অভিযানের সময় বেশ কিছু মাদক ব্যবসায়ী আত্মগোপনে চলে গিয়েছিল, ইতোমধ্যে তারা আবার ফিরে এসেছে। তখন আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ বলেছিলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছেন। আমরা এই নীতি নিয়ে অভিযান চালিয়ে যাব। এবার ঘর থেকে অভিযান শুরু করেছি। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’

ধারণা করা হচ্ছে, আইজিপির সতর্কবাণী পরবর্তীকালে যথেষ্ট কাজে লেগেছে। কারণ অভিযোগ ছিল, কোথাও কোথাও মাদক ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছে অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি, এমনকি কিছু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যও। তারা ইতোমধ্যে অনেকটা সতর্ক হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

তবু মাদকবিরোধী অভিযান চলমান রাখার বিকল্প কিছু নেই বলে মনে করছেন অভিজ্ঞজনরা। তাদের ধারণা, এই অভিযান বন্ধ হয়ে গেলে মাদক চোরাচালানকারী ও ব্যবসায়ীদের তৎপরতা বৃদ্ধি পাবে।

বলতে বাধা নেই, বেশ কয়েক বছর ধরে নানা ধরনের মাদকদ্রব্য আমাদের সামাজিক জীবনে বড় রকমের অশুভ ছায়া ফেলেছে। এই অশুভ ছায়া থেকে আমাদের বর্তমান এবং আগামী প্রজন্মের জীবন বাঁচাতে মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি হয়ে পড়েছে। যদিও আগের চাইতে সাধারণ মানুষ এখন অনেকটাই সচেতন হয়ে উঠেছেন। এরপরেও নিজেদের উঠতি বয়সি সন্তানদের আচার-আচরণের দিকে সতর্ক নজর রাখা প্রয়োজন।

আমরা সবাই জানি, আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যেকোনো ধরনের মাদক সর্বদা ভয়ানকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যে কারণে বিশেষ করে, করোনাকালীন লকডাউনের সময় জনস্বাস্থ্যের ওপর মাদকের নেতিবাচক প্রভাব আরও বেশি করে লক্ষ করা গেছে। যেমন এই সময় অন্যান্য সময়ের তুলনায় পারিবারিক কলহ এবং সহিংসতা বেড়ে গেছে, সেই সঙ্গে বেড়ে গেছে সামাজিক অস্থিরতা যা রীতিমতো উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। মাদকের নিষ্ঠুর থাবা ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে পৌঁছে দিচ্ছে আমাদের দেশের উদীয়মান এবং সম্ভাবনাময় তারুণ্য এবং যুবক-যুবতীদের অদম্য সাহস এবং প্রাণশক্তিকে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, আমাদের দেশের এসব অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ-তরুণী ও যুবক-যুবতীদের বাদ দিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি সম্ভব নয়। তাই যেকোনো মূল্যে প্রতিহত করতে হবে মাদক ব্যবসায়ীদের এবং বন্ধ করতে হবে মাদকের অবাধ বিস্তার।

লেখক :  শব্দসৈনিক ও কথাসাহিত্যিক




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]