ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা সোমবার ৬ ডিসেম্বর ২০২১ ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
ই-পেপার সোমবার ৬ ডিসেম্বর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

দাঙ্গা ‘উসকানি’তে নয়, মানসিক প্রস্তুতিতে
স্বরলিপি
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২১ অক্টোবর, ২০২১, ৪:২১ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 112

আজ এবং আগামীর জন্য ‘সম্প্রদায়ের মন’ যেভাবে প্রস্তুত হচ্ছে- সেই অনুযায়ী তৈরি হবে পারষ্পারিক সম্পর্ক। ‘সম্প্রদায়ের মন’ নিশ্চয় দাঙ্গার কারণ ভুলে যাবে না। দাঙ্গার প্রধান কারণ হিসেবে বরাবর সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ বা উসকানিকে প্রধান হিসেবে ধরা হয়। 

দাঙ্গার মূলে আরও যেসব উপাদান সহযোগী ভূমিকায় থাকে তার মধ্যে আর্থিক-সামাজিক কাঠামো, শিক্ষাকাঠামো অনুযায়ী ব্যক্তির সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, মানসিক চাপ, বর্তমানে আরও যে বিষয়টি প্রকট আকার ধারণ করেছে তাহলো স্বেচ্ছায়-অনিচ্ছায় উন্মূল হওয়া এবং জন্মভিটার সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা। 

‘হলিডে ডেসটিনেশন’ নামে যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে তার ভেতর বিলীন হয়ে গেছে সামাজিক আচরণের পুরোনো অনেক বন্ধন, মানুষের দায়, অর্থনীতির দায়, শিল্পের দায়, রাজনীতির দায়। এগুলো কখনো কখনো ‘নিজ’ গণ্ডি অতিক্রম করতে পারছে না। এইযে সংকীর্ণ ‘নিজ’ ধারণা তৈরি হওয়া সমাজ- অনুন্নত মানুষের উন্নত প্রযুক্তি আর উন্নত অর্থনীতির সাথে সামঞ্জস্য রাখতে পারছে না। 

দুইশো বছরের ঔপনিবেশ থেকে ভারতভূমি স্বাধীন হবার ঠিক আগের বছর যখন পরবর্তী রাজনীতি আর রাজনীতিকের নাম-নমুনা নির্দিষ্ট হচ্ছিল সেই সময় ১৯৪৬ এর দাঙ্গা। এই দাঙ্গা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত মতামত হলো রাজনৈতিক উসকানি।

এ বিষয়ে কানাডার রায়ার্সন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের শিক্ষক ও দাঙ্গা বিষয়ক গবেষক জনম মুখোপাধ্যায় তার ‘ভাবতে হবে, কেন দাঙ্গা’ নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন,  ‘আমি এ কথা বলছি না যে ছেচল্লিশের দাঙ্গার ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ বা উসকানিকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া উচিত। এ দুটোই দাঙ্গার হিংস্রতাকে বাড়িয়েছিল, কিন্তু দাঙ্গাকে বুঝতে হলে কেবল আলাদা করে এ দুটো কারণকে চিহ্নিত করাই যথেষ্ট নয়। আরও নানা বিষয়ের দিকে তাকাতে হবে। যেমন, সেই সময়ের আর্থিক ও সামাজিক কাঠামো, জনসংখ্যার চাপ, শহরের এলাকার উপর দখল ও তার ব্যবহারের নকশায় পরিবর্তন প্রভৃতি। এগুলো ধরলে দাঙ্গার ব্যাখ্যা অত সরল মনে হবে না।’ 

এই বিচারে এবার সামাজিক প্রভাব নিয়ে তৈরি হওয়া মানুষের ‘রাজনৈতিক মন’ নিয়ে কথা বলা যেতে পারে। ব্রিটিশ শাসনামলের প্রভাবে তৈরি হওয়া ‘রাজনৈতিক মন’ নিয়ে ভাবা যেতে পারে। রাজনৈতিক নিপীড়নের শুরু হয়েছিলো ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে বাংলার পরাজয়ের পর শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলো ‘ভাগ কর এবং শাসন কর’ প্রক্রিয়ায়।

ব্রিটিশ শাসনের শেষকালে ৪৬এর দাঙ্গা। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তি এবং নবগঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রে ফের ব্যাপক দাঙ্গা সংঘটিত হয় ১৯৬৪সালে। পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশের ঐক্য ও সংহতি বিনষ্ট করার জন্য তৎকালীণ গভর্ণর মোনায়েম খানের সরাসরি তত্বাবধায়নে আইয়ুব খানের কৌশল হিসেবে ১৯৬৪সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয় বলে ঐতিহাসিক মতবাদ রয়েছে। এই দাঙ্গা প্রথমে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা এবং পরবর্তীতে বাঙালি-বিহারিতে রূপান্তরিত হয়। পূর্ব বাংলার সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকে নিজ ভূমি ছেড়ে ভারতের শরণার্থী হয়। 

বলা বাহুল্য ১৯৬৪সালে সংঘটিত সেই দাঙ্গার উৎপত্তি হয়েছিলো ভারত অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীর থেকে। পাকিস্তানের দৈনিক পত্রিকা ‘ডন’এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাশ্মীরে অবস্থিত হজরতবাল মসজিদে সংরক্ষিত হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর চুল অপহরণের ঘটনা কেন্দ্র করে।

প্রত্যক্ষদর্শী এক গোয়ালার সাক্ষ্য এরকম যে, সেই রাতে ৭জন দুর্বৃত্ত ভারতীয় সেনাবাহিনীর গাড়িতে মসজিদে আসে এবং মহানবীর চুল অপসারণের পর সেনাবাহিনীর গাড়িতেই পালিয়ে গিয়েছিলো। দুর্বৃত্তদের মধ্যে কাশ্মীরের ন্যাশনাল কানফারেন্সের সাধারণ সম্পাদক বখশী আব্দুর রশীদও ছিলেন। সেই ঘটনার প্রতিবাদে প্রায় ২লাখ মুসলিম রাস্তায় নেমে এসেছিল।বিক্ষুব্ধ জনতার উদ্দেশ্যে বখশী আব্দুর রশীদ চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘তোমাদের বাড়িতে কি খাবারের অভাব পড়েছে। চলে যাও। এটা চেঁচামেচি কেন করছো? এটা তোমাদের চিন্তার বিষয় না। খুঁজে বের করা আমাদের দায়িত্ব। যেভাবে এটা অদৃশ্য হয়ে গেছে সেভাবেই এটার পুনরাবির্ভাব ঘটবে।’ 

আব্দুর রশীদের সেই বক্তব্য শোনার পর জনতা আর বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে এবং পুলিশ স্টেশন ঘেরাও করে। পুলিশ ঘটনা সামলাতে গুলি চালায়। এতে চলমান রাজনীতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের সূচনা হয়।

সাপ্রদায়িক দাঙ্গা একটু প্রণোদনা বা উসকানিতেই ঘটে যাবে এমন হবার নয়। উসকানিতে উত্তেজিত হওয়ার জন্য মানুষ কতটুকু প্রস্তুত সেটা আগে দেখা দরকার। কী ভাবে বাংলার দুই সম্প্রদায়কে আজ প্রস্তুত করা হচ্ছে, তা এক বহুমাত্রিক প্রশ্ন, যা বহুমাত্রিক উত্তর দাবি করে। তাকে এড়িয়ে গেলে আমাদেরই সমস্যায় পড়তে হবে।

১৯৩৯ থেকে ১৯৪৬ সালের মধ্যে কলকাতার জনসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছিলো। সেই চরম কালোবাজারির দিনে সরকারি বাঁধা দামে জিনিস ক্রয় করতে পারছিলেন শুধুমাত্র কলকাতার সাবেক বাসিন্দারা, সরকারি খাতায় যাঁদের নাম রয়েছে। কলকাতা তখন বাঁচার একমাত্র আশ্রয়, কোনও মতে শহরের উপর একটু দখল নেওয়ার জন্য শুরু হয়েছিলো হুড়োহুড়ি। ১৯৪৬ সালের মধ্যে যে পরিস্থিতি তৈরি হল কলকাতায়, তা হিংসার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

সমাজ বাস্তবতায় পারস্পারিক হিংসা কি কি খাতে জমা হচ্ছে, সেগুলো দেখা দরকার। অমর্ত্য সেন, তার স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছেন হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার প্রধান শিকার দরিদ্ররা। ভারতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ভয়াবহতা বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক শ্রেণি বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে অমর্ত্য সেনের খুব বয়স হওয়া লাগেনি বলেও উল্লেখ করেছেন।

অমর্ত্য সেনের ভাষায়, ‘১৯৪০-এর দশকে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় নিহত মানুষের অধিকাংশেরই একটি শ্রেণিপরিচয় রয়েছে (তারা এসেছে শ্রমজীবী বা বাস্তুচ্যুত পরিবার থেকে), যদিও তাদের ভিন্ন ধর্মীয় বা সম্প্রদায়গত (হয় মুসলিম বা হিন্দু) পরিচয় রয়েছে।... সত্যিকার অর্থে, আমরা যদি ধর্মীয় সম্প্রদায়কেই প্রধান হিসেবে বিবেচনা করি, তাহলে মানুষ হিসেবে যে অনন্য পরিচিতি, তা মানুষকে শুধু মুসলিম বা শুধু হিন্দু বা এ রকম কোনো পরিচয়ে দেখার মধ্যেই শেষ হবে ’

অথচ আমরা একটি নাম জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হতে চাইছি ব্যক্তি ‘হিন্দু’ নাকি ‘মুসলিম’। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে পার্থক্য ছাড়া মানুষে মানুষে আর কি পার্থক্য থাকতে পারে।

লেখক : কবি ও গল্পকার





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]