ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা রোববার ৫ ডিসেম্বর ২০২১ ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
ই-পেপার রোববার ৫ ডিসেম্বর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

তীব্র হচ্ছে বৈশ্বিক পানি সঙ্কট, বাড়ছে সংঘাতের আশঙ্কা
বাধন অধিকারী ও মাহাদী হাসান
প্রকাশ: রোববার, ২৪ অক্টোবর, ২০২১, ৭:৪৮ এএম আপডেট: ২৫.১০.২০২১ ৪:০৫ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 168

জলবায়ু পরিবর্তনে সৃষ্ট সঙ্কটের কারণে বিশ্বজুড়ে সীমান্ত সংঘাত, পানি ও অভিবাসন সহিংসতা বৃদ্ধি পেতে পারে, বাড়তে পারে অস্থিতিশীলতা যা বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য হুমকি। একাধিক গবেষণা ও তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে বৃহস্পতিবার এ সতর্কবার্তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করেছিলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে সৃষ্ট পানি সঙ্কটসহ অন্যান্য কারণে সংঘাত বাড়বে। আর এ মাসে প্রকাশিত জাতিসংঘভিত্তিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড মেটেরোলজিক্যাল অরগানাইজেশনের (ডব্লিউএমও) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির সাম্প্রতিক প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০৫০ সালে চরম পানি সঙ্কটে পড়বেন বিশ্বের ৫০০ কোটিরও বেশি মানুষ। বিশ্লেষকরা বলছেন, পানি সঙ্কট তীব্র হওয়ার সমান্তরালে এ নিয়ে সংঘাত ক্রমাগত বাড়তে থাকবে। 

বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউস থেকে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে মানবিক ও নিরাপত্তা বিষয়ক ইস্যু উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যেকোনো সময় মানবিক ও নিরাপত্তা ধস নামবে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রতিরক্ষা দফতর থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, বৈশি^ক উষ্ণতা বাড়ায় আগামী ৩০ বছরের মধ্যে পানি নিয়ে সংঘাত শুরু হতে পারে, বাস্তুচ্যুত হতে পারে কোটি কোটি মানুষ। এর প্রভাব পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্রেও। ইতোমধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায় দেশটিতে খরা ও দাবানলের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ‘অশুভ পূর্বাভাসে’ আরও বলা হয়, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার আশঙ্কা নিজেদের রক্ষায় অনেক দেশের মধ্যে বিবাদ তৈরি হতে পারে। বৃহৎ পরিসরে ব্যবহৃত হতে পারে সোলার জিও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কৌশল। 

সোলার জিও ইঞ্জিনিয়ারিং বা সৌর ভূ-প্রকৌশল একটি নতুন ধারণা। গবেষকরা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এই নতুন ধরনের গবেষণা নিয়ে কাজ করছেন। এক্ষেত্রে বাতাসে এমন কিছু কণা ছড়িয়ে দেওয়া যা সূর্যরশ্মিকে প্রতিফলিত করে আবার মহাকাশে পাঠিয়ে দেবে। যেমন, সালফারের কণা। সোলার জিও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা দ্রুত কমে যাবে। তবে একই সময়ে কোনো কোনো এলাকা আরও অনেক শুষ্ক হয়ে যাবে। আর এটা বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। তবে এই গবেষকদের কাছে এখনও সব কিছু চিন্তায় সীমাবদ্ধ। এখনও কোনো পরীক্ষা করা হয়নি। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ সেলসিয়াস বৃদ্ধি ঠেকাতে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে কোনো কোনো দেশ এককভাবে ভূ-প্রকৌশলের আশ্রয় নিতে পারে। 

প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক কোনো সম্মতি ছাড়া এককভাবে এমন প্রযুক্তির ব্যবহার উল্টো ফল নিয়ে আসতে পারে। বড় পরিসরে এই প্রযুক্তি ব্যবহারে বায়ুমণ্ডলের স্বাভাবিক অবস্থা বিঘ্নিত হতে পারে। ফলে আবহাওয়ার প্রকৃতি পাল্টে ভয়াবহ দুর্যোগের আশঙ্কা রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সঙ্কট বেশি হবে। এই ধাক্কা সামলে ওঠা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও অস্থিতিশীলতা শুরু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ মহাসচিব গুতেরেস বলেছিলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবগুলো বিশেষভাবে গভীর হয় যখন তারা ভঙ্গুরতা এবং অতীত বা বর্তমান সংঘাতের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে। উদাহরণ হিসেবে তিনি সোমালিয়ার প্রসঙ্গ টানেন। বলেন, ‘সেখানে ধারাবাহিক ও তীব্র খরা আর বন্যা খাদ্য নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, দুষ্প্রাপ্য সম্পদের ওপর প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি করছে এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলছে যা থেকে আল শাবাবের মতো জঙ্গি সংগঠনগুলো উপকৃত হয়।’

‘দ্য স্টেট অব ক্লাইমেট সার্ভিসেস ২০২১ : ওয়াটার’ শিরোনামে জাতিসংঘভিত্তিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড মেটেরোলজিক্যাল অরগানাইজেশনের (ডব্লিউএমও) প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূপৃষ্ঠের পানির স্তর যে হারে নিচে নেমে যাচ্ছে তা ২০১৮ সালেই টের পেয়েছেন বিশে^র ৩৬০ কোটি মানুষ। ওই বছরে গড়ে অন্তত একমাস তীব্র জলকষ্টে ভুগেছেন তারা। বিশে^র রাষ্ট্রগুলো যদি দ্রুত এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে ২০৫০ সালে পৌঁছানোর পর দেখা যাবে, ভারতীয় উপমহাদেশসহ বিশে^র ৫০০ কোটিরও বেশি মানুষ চরম পানি সঙ্কটে পড়েছেন। তীব্র জলাভাব দেখা দেবে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম অংশ, ভূমধ্যসাগর, উত্তর ও দক্ষিণ আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া, পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ায়। এই সঙ্কটে ভুগবে দক্ষিণ-পূর্ব অস্ট্রেলিয়াও।

নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক সমন্বয় বিষয়ক প্রধান কিটি ভ্যান ডের হেইজডেন গত সেপ্টেম্বরে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘যেখানেই পানির ঘাটতি দেখা দেবে, সেখান থেকেই মানুষ সরে যাওয়ার চেষ্টা করবে।’ বিবিসি বলছে, বিশ্ব জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ মানুষের ওপর পানি সঙ্কটের প্রভাব পড়েছে। জাতিসংঘ আর বিশ্ব ব্যাংকের অনুমান, ২০৩০ সালের মধ্যে ৭০ কোটি মানুষ পানি সঙ্কটের কারণে বাস্তুচ্যুত হবে। হেইজডেন বলেন, ‘যখন পানি সঙ্কট তীব্র হবে, রাজনীতিকরা সেখানে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করবে। আর তখনই এ নিয়ে তারা সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে।’

বিবিসির সেপ্টেম্বরের এক বিশেষ প্রতিবেদনে দেওয়া পরিসংখ্যান বলছে, ২০ শতকে যত মানুষ বেড়েছে, পানির চাহিদা বেড়েছে তার দ্বিগুণেরও বেশি। সে কারণে রোম থেকে কেপটাউন কিংবা চেন্নাই থেকে লিমায় পানির জন্য হাহাকার। 

ওয়ার্ল্ড রিসোর্স ইনস্টিটিউটের বিশ্ব পানি বিষয়ক পরিচালক চার্লস আইসল্যান্ড বলছেন, ‘জনসংখ্যা বৃদ্ধি আর অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যাপকভাবে পানির চাহিদা বাড়িয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে পানি সরবরাহ কমে যাচ্ছে।’

সেই ২০১২ সাল থেকে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রভাবজনিত ঝুঁকি তালিকার শীর্ষ ৫ উপাদানের একটি পানি। ২০১৭ সালে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সবথেকে বড় মানবিক সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে খরা। আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের ২ কোটি মানুষ খরাজনিত খাদ্য সঙ্কট ও সংঘাতের কারণে বাস্ত্যুচ্যুত হয়। 

অকল্যান্ডভিত্তিক প্যাসিফিক ইনস্টিটিউটের প্রধান পিটার গ্লেইক ৩ দশকজুড়ে কাজ করছেন পানি সঙ্কট, সংঘাত আর অভিবাসন নিয়ে। তিনি মনে করেন, পানির জন্য সংঘাত ক্রমাগত বাড়ছে। ‘বিরল ব্যতিক্রম ছাড়া, আক্ষরিক অর্থে তৃষ্ণার্ত হয়ে কেউ মরে না। তবে বহু বহু মানুষ দূষিত পানি পান করে অথবা পানিজনিত সংঘাতের কারণে প্রাণ হারায়।’

/এমএইচ/




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]