ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা  বুধবার ৮ ডিসেম্বর ২০২১ ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
ই-পেপার  বুধবার ৮ ডিসেম্বর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

মালদ্বীপে পর্যটনে বিনিয়োগের সুযোগ ও সম্ভাবনা
জাকারিয়া মন্ডল
প্রকাশ: রোববার, ২৪ অক্টোবর, ২০২১, ১০:৪১ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 430

পর্যটনকে কেন্দ্র করে অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক উন্নয়নের অনন্য নজির গড়েছে দ্বীপদেশ মালদ্বীপ। বর্তমানে বৈদেশিক আয়ের ৬০ শতাংশ এই খাত থেকেই আসে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পর্যটনে সবচেয়ে বেশি বিদেশি বিনিয়োগ আসে দেশটিতে। প্রতিবছর মালদ্বীপ সফরে যান জনসংখ্যার অন্তত তিনগুণ পর্যটক। আরবের ধনকুবের বা বলিউডের সুপারস্টার, সবারই আয়েসি অবসর যাপনের অন্যতম গন্তব্য হয়ে উঠেছে ছোট্ট এই দ্বীপ। আর পর্যটনকে কেন্দ্র করে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়া মালদ্বীপ ছুটছে আরও উন্নতির পথে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত হুমকি মোকাবিলা করে গড়ছে নতুন নতুন দ্বীপ। অন্য দেশ থেকে পলি এনে উন্নত করছে ভূমি। ঘটাচ্ছে পর্যটন অবকাঠামোর উন্নয়ন। মালদ্বীপ তাই পর্যটন খাতে আরও অনেক দেশের মতো বাংলাদেশের কাছেও অনুকরণীয় হয়ে উঠেছে।
 
দেশটির পর্যটনের হালহকিকত, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে সম্প্রতি কথা হয় ঢাকায় নিযুক্ত হাইকমিশনার শিরুজিমাথ সামির এর সঙ্গে। ঢাকাস্থ মালদ্বীপ হাইকমিশনে বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে এক বৈঠকি আড্ডায় তিনি তুলে ধরেন মালদ্বীপ পর্যটনের খুঁটিনাটি। বাংলাদেশ বিষয়েও নানা কথা উঠে আসে তার আলোচনায়। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি আহমেদ ফাজিল। আর অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল ও নির্বাহী সদস্য শাকিল বিন মুশতাকের সঙ্গে ছিলেন এই প্রতিনিধি। এই লেখায় আমরা কিছু প্রাসঙ্গিক তথ্যের সমন্বয়ে মালদ্বীপ হাইকমিশনারের উল্লেখযোগ্য বক্তব্য তুলে ধরব।
 
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন সাজেকের পাঁচ ভাগের এক ভাগও নয় মালদ্বীপের আয়তন। অঙ্কের বিচারে তিনশ বর্গকিলোমিটার মাত্র। কিন্তু ভারত মহাসাগরের ছোট্ট এই দ্বীপ দেশই এখন পৃথিবীর অন্যতম ব্যয়বহুল পর্যটন গন্তব্য। দেশটিতে পর্যটক সমাগমের ব্যাপকতা বোঝাতে বাংলাদেশে নিযুক্ত হাইকমিশনার শিরুজিমাথ সামির বললেন, ‘প্রতিবছর আমাদের দেশে প্রায় দেড় মিলিয়ন পর্যটক আসেন, যা আমাদের জনসংখ্যার (পাঁচ লাখ) তিনগুণ বেশি। এর মধ্যে চার হাজার বাংলাদেশি পর্যটক রয়েছেন।’

পর্যটক প্রবাহ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘কোভিড জর্জরিত চলতি ২০২১ সালেও জনসংখ্যার চেয়ে অধিক পর্যটক মালদ্বীপ সফর করেছেন। আগস্ট পর্যন্ত এ সংখ্যাটা ৭৫৫৯৬৬। এর মধ্যে ১০৫২ জন বাংলাদেশি পর্যটক রয়েছেন।’

প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, পর্যটকের মতো বিনিয়োগেরও অবাধ প্রবাহ রয়েছে সাগর ধোয়া মালদ্বীপে। দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে পর্যটন খাতে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ আসছে মালদ্বীপে। কোভিডের কোপ শুরু হওয়ার পর ২০১৯ সালেও দেশটিতে ৩৭০ কোটি ডলার বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। ২০২০ সালে তাবৎ বিশ্ব যখন করোনায় বিপর্যস্ত, তখনও প্রায় ৩০ কোটি ডলার বিদেশি বিনিয়োগ পেয়েছে মালদ্বীপ। যার উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ পর্যটন খাতে। আর বিনিয়োগকারী দেশগুলোর মধ্যে প্রথম সারিতে আছে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, চীন ও ভারতের মতো দেশ।

এ বিষয়ে আশাবাদী হাইকমিশনারের ভাষায়, ‘মালদ্বীপে বিদেশি বিনিয়োগের অবারিত সুযোগ বাড়ছে।’ কিন্তু, কেন এত বিনিয়োগ? বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রতিক্রিয়ায় সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ক্রমাগত কারণে যে দেশটি অদূর ভবিষ্যতে সাগর গর্ভে তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় আছে, সেখানে বিনিয়োগ বৃদ্ধির কারণ কী? পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, মালদ্বীপের পর্যটন খাতে বিনিয়োগ করে মাত্র বছর দশেকেই পুঁজি পুষিয়ে মুনাফা তোলা যায়। তা ছাড়া দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনা উন্নত করে সাগর পৃষ্ঠের ক্রমবর্ধমান উচ্চতার হুমকিও সফলভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। মালদ্বীপ হয়তো সে পথেই এগোচ্ছে। তাই, বিদেশি বিনিয়োগকে আরও উৎসাহিত করতে জমির লিজ ভাড়া কমিয়ে দিয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে, প্রতি বর্গমিটারে আট ডলার থেকে কমিয়ে চার ডলার করা হয়েছে লিজ ভাড়া। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এ তালিকায় যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন দ্বীপ। বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে সহজ করা হয়েছে পর্যটন আইন। কার্যত, বিনিয়োগকারী ও পর্যটকটের জন্য সবসময়ই বরণডালা সাজিয়ে বসে আছে মালদ্বীপ।

এ বিষয়ে হাইকমিশনার শিরুজিমাথ সামির বলেন, ‘আমরা মালদ্বীপে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করছি। বিশেষ করে, পর্যটন খাতে বিদ্যমান সুযোগ ও সম্ভাবনার কথা বলছি। আমাদের রাজধানী মালে ও ভেলেনা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লাগোয়া হুলহুমালেতে বিনিয়োগের অবারিত সুযোগ আছে। আমাদের পর্যটন ও মৎস্য ছাড়াও নির্মাণ আর কৃষি খাতে বাংলাদেশিদের জন্যও বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।’

হাইকমিশনার বলেন, ‘পর্যটকদের জন্য মালদ্বীপে অন-এরাইভাল ভিসার ব্যবস্থা আছে। কোনো ফি নেই। কেবল মালদ্বীপের উদ্দেশে উড়াল দেওয়ার প্রাক্কালে হোটেল বুকিং দিলেই ছাড়পত্র মিলবে। তবে প্রবাসী কর্মীদের ওয়ার্ক পারমিট নিতে হবে আগে। এজন্য দিতে হবে ওয়ার্ক পারমিট ফি। ব্যবসায়িক ভিসার জন্যও নির্ধারিত ফি গুনতে হবে।’ এক প্রশ্নের উত্তরে মালদ্বীপ হাইকমিশনার বলেন, ‘বর্তমানে মালদ্বীপে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার প্রবাসী রয়েছেন। যার মধ্যে প্রায় দেড় লাখ বাংলাদেশি কর্মী। মালদ্বীপের অর্থনীতিতে তারা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। যদিও ভ্রমণ ও ব্যবসার জন্য অনেকে এখন আসছেন, কিন্তু, অধিকাংশ বাংলাদেশি কাজের উদ্দেশ্যেই মালদ্বীপে এসেছেন। বাংলাদেশের অনেক শিক্ষক ও চিকিৎসক রয়েছেন মালদ্বীপে। তবে শ্রমিক আছে বেশি। আমাদের দেশে প্রায় ৫০ হাজার অননুমোদিত বাংলাদেশি রয়েছেন। উভয় দেশের সরকার তাদের নিয়মিতকরণের জন্য সমঝোতামূলক উদ্যোগ এগিয়ে নিচ্ছে।’

এ তো গেল মালদ্বীপে বাংলাদেশি প্রসঙ্গ। কিন্তু বাংলাদেশে এখন মালদ্বীপের কোনো বিনিয়োগ আছে কি? মালদ্বীপ হাইকমিশনার বলেন, ‘এখানে কিছু এসএমই বিটুবিতে আমাদের অংশগ্রহণ আছে। আমরা মালদ্বীপের ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ করে দিতে চাই। বিশেষ করে কক্সবাজারের মতো শহরে, যেখানে আমরা আমাদের পর্যটন দক্ষতা মেলে ধরতে পারি। মৎস্য খাতে বিনিয়োগ করতে পারি।’ 
বাংলাদেশে এখন জনা পঞ্চাশেক মেডিকেল শিক্ষার্থী রয়েছে জানিয়ে শিরুজিমাথ সামির বলেন, ‘বাংলাদেশে বর্তমানে মালদ্বীপের নাগরিক সংখ্যা মোটামুটি ৭০। কোভিড মহামারি শুরুর আগে এ সংখ্যাটা আরও বেশি ছিল।’

দ্বিপক্ষীয় আমদানি-রফতানি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশে মূলত ময়দা ও মাছের প্যালেট রফতানি করে মালদ্বীপ। আর মরিচ ও হলুদের মতো মসলা, চাল, গরুর মাংস, তৈরি পোশাক ও ওষুধ সামগ্রী আমদানি করে।’ মালদ্বীপের নতুন নতুন দ্বীপের উন্নয়নে পলিমাটি প্রয়োজন। কৃষি কাজেও পলিমাটি লাগে। ক্রমবর্ধন নির্মাণকাজে দরকার হয় বালু। কিন্তু মালদ্বীপের সাগর থেকে আহরিত পলি ও বালু দিয়ে ওসব হয় না। তাই বাংলাদেশের পলি ও বালু রফতানির নতুন গন্তব্য হতে পারে মালদ্বীপ।

বর্তমানে মালদ্বীপিয়ান এয়ারলাইন্সের সরাসরি ফ্লাইট চালু আছে দুদেশের মধ্যে। শিগগিরই ইউএস-বাংলা এ রুটে ফ্লাইট চালু করবে। নিশ্চয়ই আরও ঘনিষ্ঠ হবে বাংলাদেশ-মালদ্বীপের যোগাযোগ। সেই চতুর্দশ শতকে বিশ্বখ্যাত ভূ-পর্যটক ইবনে বতুতা চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সাগর পাড়ি দিয়ে মালদ্বীপে গিয়েছিলেন। একটা যোগসূত্র তো তখনই গাঁথা হয়ে গিয়েছিল। তারপর অগণিত ঢেউ মাথা খুটেছে দুদেশের সৈকতে। বিশ্ব উষ্ণায়নের পাশর্^প্রতিক্রিয়ায় সমুদ্র হয়তো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ভীতি জাগায়। পুরো দেশই জলের তলে তলিয়ে নেওয়ার শঙ্কা জাগায়। কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে বাঁচতে শিখেছে মালদ্বীপ।

মাত্র এক দশকে অর্থনীতির খোলনলচে কীভাবে পাল্টে দিয়ে সমৃদ্ধি অর্জন করতে হয়, তার উদাহরণ মালদ্বীপের মতো আর কেইবা গড়েছে। এই উন্নতিটা ঠিক ফুটবলে উন্নতির মতোই। যে মালদ্বীপ একসময় ৮ গোলে হারত, তারাই পরে বাংলাদেশকে ৫ গোলে হারিয়ে দিতে পারে। তাদের সাক্ষরতার হার এখন শতভাগ ছুঁই ছুঁই। প্রবৃদ্ধি ৫.৭ শতাংশ। মাথাপিছু জিডিপি ২৩৩১২ ডলার। তাদের কাছে বাংলাদেশের এখন অনেক কিছুই শেখার আছে। একইভাবে মালদ্বীপও অনেক কিছু শিখতে পারে বাংলাদেশের কাছে। তাহলে, উভয় দেশের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা বিনিময়ের ক্ষেত্রগুলো কী হতে পারে? হাইকমিশনার শিরুজিমাথ সামির বলেন, ‘বাংলাদেশ ও মালদ্বীপ উভয় দেশই জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি মোকাবিলা করছে। মালদ্বীপ পর্যটন ও মৎস্য খাতে এগিয়ে। বাংলাদেশ জলাবন ব্যবস্থাপনা, কৃষি ও তৈরি পোশাক খাতে বিশেষজ্ঞ। আমরা একে অপরের সঙ্গে দক্ষতা বিনিময় করে উন্নতির পথে এগোতে পারি।’

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]