ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা সোমবার ৬ ডিসেম্বর ২০২১ ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
ই-পেপার সোমবার ৬ ডিসেম্বর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

বাংলা গল্পের অধীশ্বর: বন্দনা করি আপনাকে
মনি হায়দার
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৯ নভেম্বর, ২০২১, ১২:১০ পিএম আপডেট: ১৯.১১.২০২১ ১২:১২ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 87

তিনি তীক্ষ্ণ মনন-মেধায় সমৃদ্ধ এবং অগ্রসর বুদ্ধিভিত্তিক চেতনায় লালিত একজন কিংবদন্তিতুল্য মানুষ। বাংলাদেশে খুব কম লেখক বা শিল্প সংস্কৃতির নিবেদিত প্রাণ কর্মী, বেঁচে বর্তে থাকার সময়ে সরকার ও গণজনগণের মধ্যে সসম্মানে বিরাজিত আছেন। কবিতার মহাপুরুষ শামসুর রাহমান, কবি সুফিয়া কামাল, সব্যসাচী সৈয়দ শামসুল হক- হাতেগোনা কয়েকজন এমন প্রবাদের প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন, অবশ্য দীর্ঘ জীবনের লড়াই শ্রম ও নির্মাণ সুকীর্তির কল্যাণে। 

হাসান আজিজুল হকও বিশুদ্ধ মানুষের মনের চৈতন্যে নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন, সেই ১৯৬০ সালে সাহিত্যের নিষ্ঠাবান সেবক ও সম্পাদক সিকান্দার আবু জাফরের সমকাল পত্রিকায় ‘শকুন’ গল্প প্রকাশের মধ্যে জানান দিয়েছিলেন, আমি আসছি...। আমাকে কেউ রুখতে পারবে না। নিরন্তর তিনি জীবন ঘষে আগুন জ্বালাতে চেষ্টা করেছেন। দেখছেন এই অঞ্চলে নিরন্ন বিপন্ন ক্ষুধার্ত মানুষের দিনরাত্রি যাপন, অনুভব করেছেন সেসব ক্লিষ্ট মানুষের জীবনের দিনে রাতের মর্মযাতনার বাস্তব ছবি এঁকেছেন শব্দের তুলিতে। ফলে, হাসান আজিজুল হকের গল্প বা লেখা- হয়ে উঠেছে বাঙালির হাহাকারের, না পাওয়ার, বিষণ্ন দিনের গানের নির্মম স্বরলিপি। রাঢ়বঙ্গের সন্তান হাসান আজিজুল হক, সেই জন্মভূমির মাটি থেকে উৎখাত হয়ে এই বাংলাদেশে এসে বসবাস করলেই মননের করতলে সবসময় লালন করেছেন রুক্ষ লালরঙের রাঢ়বঙ্গকেই। প্রকৃতপক্ষে শারীরিকভাবে জন্মমাটি থেকে উৎখাত হলেও স্মৃতির ইতিহাস থেকে যায় চোখ ও মনের চাতালে, সেই জায়গা থেকে কখনও উৎখাত করা যায় না কোনো মানুষকে। যেমন ছিলেন আবদুল মান্নান সৈয়দও। 

না, খুব বেশি গল্পও লেখেননি। হাতে গুনে লিখে দিচ্ছি, তার গল্প মাত্র বাষট্টিটি। সেই বাষট্টিটি গল্প নানাভাবে, কুমিরের ছানা দেখানোর মতো করে, প্রকাশকদের পাল্লায় পড়ে, বিবিধ নামে প্রকাশ করতে বাধ্য হন। এতেই বোঝা যায়, গল্পকার হাসান আজিজুল হকের খ্যাতি ও বিড়ম্বনা কোন স্তরে পৌঁছেছে। অথবা এভাবেও লেখা যায়, হাসান আজিজুল হক বাংলা ছোটগল্পের সংসারে কোন উচ্চতায় নিজেকে নিয়ে গেছেন। হাসানের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য’। প্রকাশ হয়েছিল ১৯৬৪ সালে। সেই বইটিতে অসাধারণ কিছু গল্প ছিল। যার মধ্যে ‘শকুন’ একটি। ‘ক্ষুধা’ সেই বইয়ের ভিন্ন মাত্রার একটি গল্প। সবাই বলে ‘মন তার শংখিনী’ হাসানের অন্যরকম একটা গল্প। প্রথম বইটিকে পেছনে ফেলে কিন্তু খ্যাতির চুড়োয় উঠেছে প্রথম নয়, দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’। প্রথমকে ছাড়িয়ে দ্বিতীয় হয়ে উঠেছে অদ্বিতীয়। নিশ্চয়ই মাহাত্ম্য আছে। কী সেই মাহাত্ম্য! 

জানার জন্য বাংলা গল্পের অধীশ্বর হাসান আজিজুল হককে মোবাইলে ফোন করেছিলাম রাজশাহীতে, তার ‘উজান’ গৃহে গত এপ্রিলের ৯ তারিখে, বেলা ১১টায়। কথা বলতে বলতে দরদি কণ্ঠের সৌরভে হাসান আজিজুল হক জানালেন নির্মাণ আর নির্মিতির সেই প্রখর দিনের ঘটনা। অবাক ঘটনা, এত বছর পরও তিনি একটুও ভুলে যাননি, আত্মজাকে ঘিরে এমন নির্মম গল্প লিখার প্রতিটি পাদটীকা, প্রতিটি পল বা মুহূর্ত। 

তিনি বলছিলেন, ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ বিভক্ত হলে আমরাও চলে আসি পূর্ব বাংলায় বা পূর্ব পাকিস্তানে। আমার বড় বোনের স্বামী থাকতেন খুলনায়। তাকে কেন্দ্র করে আমরাও খুলনায় চলে আসি। জায়গাটার নাম ফুলতলা। খুলনা থেকে যশোর যেতে চৌদ্দ-পনেরো কিলোমিটার পরই ফুলতলা। তখন তো এত রাস্তাঘাট, গাড়ি-ঘোড়ার চল ছিল না। সেখানেই আমরা বাড়ি করেছিলাম। বিশাল বড় বাড়ি। বাড়িতে বিরাট পুকুর। 

চারপাশে গাছপালা। দোতলা বাড়ি। সেই বাড়ির ছাদে ১৯৬৬ সালের কোনো দিন, সকালে না বিকালে না দুপুরে ঠিক সময় এখন আর মনে নেই, আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম। ছাদের ওপর বড় একটা আমগাছ ঝুঁকে ছিল। সেই আমগাছের নিচে, ছাদের ওপর ছিল গোল বেতের চেয়ার ও টেবিল। দারুণ ছায়া দিচ্ছিল আমগাছটা। প্রকৃতির এত সৌন্দর্যের মধ্যেও আমার মনের ভেতরে অনেকদিন ধরে একটা যন্ত্রণা বইছিল। যন্ত্রণাটা পোকার মতো কখনও ঝিম মেরে থাকে। আবার সুযোগ বুঝে আমার মনের ভেতরে ঘাই মারে। ফলে আমার ভেতরে রক্তের ধারা বইতেছিল। কারণটা হলো, একবছর আগে ১৯৬৫ সালে একটা দাঙ্গা হয়েছিল। দাঙ্গায় সর্বস্ব হারানো মানুষেরা আমাদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল। ওদের বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছিল বর্বর দাঙ্গাকারীরা। এমনিতে দরিদ্র মানুষ, তার ওপর দাঙ্গা, এই মুমূর্ষু মানুষগুলোর বিষণ্ন-বিপন্ন মুখ আমাকে তাড়া করে ফিরছিল।  ওই বাড়ির পুকুরে যথেষ্ট মাছ পাওয়া যেত। আমি মা বাবা স্ত্রী কন্যা নিয়ে থাকতাম। বুঝলে মনি, আমার এখনও মাঝেমধ্যে ইচ্ছে হয়, ফুলতলার ওই বাড়িতে গিয়ে থাকতে। বড় ভাই ছিল। সব মিলিয়ে জমজমাট ছিল ছবির মতো বাড়িটি। কিন্তু জীবনের কারণে এখানে এসে থিতু হওয়ায় আর যেতে পারছি না। 

সেই সময়ের ঘটনা। চারপাশে এত দরিদ্র মানুষের দঙ্গল, নিজেকে অপরাধী মনে হতো। তো সেই দাঙ্গার পর মানুষের আকাল আরও বেড়ে যায়। বেঁচে থাকার জন্য গ্রামের মধ্যে গোপনে পতিতাবৃত্তি চালু হয়েছিল। এসব আমি নিজের চোখে দেখেছি, শুনেছি। দেশভাগের পর মানুষের এই নৃশংস জীবনের চালচিত্র দেখে, মনে হলো একটা গল্প লিখি। কয়েকটা গল্পের আখ্যান লিখছি, কাটছি, কিন্তু মনের মতো কিছু হচ্ছে না। পুরনো মনে হচ্ছে সবকিছু। হঠাৎ ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ গল্পটা আমার মাথায় আসে। তখন সব ফেলে দিয়ে নিশ্চিত মনে লিখতে বসলাম।’  বাংলা ছোটগল্প হাসান আজিজুল হকের হাতেই পরমায়ু পেয়ে অধিকার করেছে চিরকালের স্থায়িত্ব। 


আরও সংবাদ   বিষয়:  হাসান আজিজুল হক  




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]