ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ১৮ জানুয়ারি ২০২২ ৪ মাঘ ১৪২৮
ই-পেপার মঙ্গলবার ১৮ জানুয়ারি ২০২২
http://www.shomoyeralo.com/ad/Amin Mohammad City (Online AD).jpg

শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়া নিয়ে টালবাহানা কেন
সাগর হোসেন
প্রকাশ: শনিবার, ২০ নভেম্বর, ২০২১, ৯:৩১ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 152

বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। ধীরে ধীরে সর্বক্ষেত্রেই উন্নতি লাভ করছে বাংলাদেশে। কিন্তু যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে দ্রব্যের দাম বাড়াতে হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের কাছে দ্রব্যের দাম বৃদ্ধি যেন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। ভোক্তা পর্যায়ে ডিজেলের মূল্য প্রতিলিটার ৬৫ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৮০ টাকা কার্যকর হয়েছে। যা গণপরিবহনের ভাড়ার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। দূরপাল্লার বাসে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া বৃদ্ধি করে ১ টাকা ৮০ পয়সা এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে চলাচলকারী বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ১৫ পয়সা আর মিনিবাসে ২ টাকা ৫ পয়সা করা হয়েছে। 

পুনঃনির্ধারিত ভাড়া অনুযায়ী বাসযাত্রায় যাত্রীদের গুনতে হচ্ছে সর্বনিম্ন ৮ টাকা এবং মিনিবাসের জন্য গুনতে হচ্ছে ১০ টাকা। এই ভাড়া বৃদ্ধির ফলে সব থেকে বেশি বিপদে পড়েছে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা। কারণ বাস চালক-হেলপাররা নিচ্ছে না স্টুডেন্ট ভাড়া অর্থাৎ হাফ পাস। তারা নির্ধারিত ভাড়ার থেকে বিন্দুমাত্র কম ভাড়া নিতে নারাজ। 

এদিকে শিক্ষার্থীরা হাফ পাসের কথা বললেই তারা হচ্ছে লাঞ্ছিত। তাদের সঙ্গে করা হচ্ছে দুর্ব্যবহার। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তারা আয় রোজগার করে না। প্রায় সবাই পরিবারের টাকায়, কেউবা টিউশনি আবার কেউ পার্টটাইম চাকরি কিংবা অন্য কোনো উপায়ে টাকা ম্যানেজ করে চলে। এই পরিস্থিতি বিবেচনা করেই তো তাদের থেকে হাফ ভাড়া নেওয়া উচিত।

কিন্তু দুঃখের বিষয় হলেও সত্য এই যে, হাফ ভাড়ার কথা বললেই বা দিতে গেলেই কখনও শিক্ষার্থীদের অপমান আবার কখনও বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আবার বর্তমানে বাসগুলোতে চেকার বা ওয়েবিল স্টিস্টেম চালু করে বলছে সামনে চেকার আছে সম্পূর্ণ ভাড়াই দিতে হবে। সঙ্গে এটাও বলা হচ্ছে আমাদের বাসে কোনো ‘হাফ ভাড়া নেই’।

সম্প্রতি, রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় অবস্থিত ধনিয়া কলেজের এক শিক্ষার্থী হাফ ভাড়া দিতে চাওয়ায় বাসের হেলপার তাকে ধাক্কা দিয়ে বাস থেকে ফেলে দেয়। তিতুমীর কলেজের ৪ জন শিক্ষার্থী মিরপুর-গুলিস্তান রুটের সেফটি পরিবহনের একটি বাসে শেওড়াপাড়া থেকে আগারগাঁওয়ে যাওয়ার জন্য ওঠে। আগারগাঁওয়ে বাসটির চেকারকে তারা হাফ ভাড়া কাটতে বললে তা নিয়ে তর্ক-বির্তকের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে বাস থামিয়ে কয়েকটি বাসের চালক-হেলপাররা মিলে তিতুমীর কলেজের চার শিক্ষার্থীকে মারধর করে। 

ঢাকার ইম্পেরিয়াল কলেজের শিক্ষার্থী নাবিল টিকা নিতে রাইদা বাসে করে মালিবাগ যাচ্ছিল। এ সময় ওই পরিবহনের চেকার নির্ধারিত ভাড়ার বেশি দাবি করে। নাবিল এর প্রতিবাদ করলে রাইদা বাসের চেকার তাকে মারধর করে। এ ঘটনায় রাজধানীর রামপুরায় রাইদা পরিবহনের ৫০টির অধিক বাস আটকে রাখে শিক্ষার্থীরা। পরে প্রশাসনের সুষ্ঠু বিচারের আশ্বাসে প্রায় এক ঘণ্টা পর অবোরোধ তুলে নেয় তারা।

ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদ সকালে ‘মিরপুর মেট্রো’ বাসে করে ক্যাম্পাসে যাওয়ার সময় হাফ ভাড়া দিতে চাইলে, ভাড়া নেওয়ার পরিবর্তে তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে বাসের হেলপার। পরে ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা হাফ ভাড়া কার্যকরের দাবিতে কলেজের মূল ফটকের সামনে অবস্থান করে এবং রাস্তায় বিক্ষোভ করে। কলেজ প্রশাসন এবং পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি আদায়ের নিশ্চয়তা দিলে রাস্তা থেকে ফিরে যায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এবং সর্বশেষ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী বাসের হেলপার কর্তৃক গুরুতর আহতের শিকার হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়।

এই হলো আমাদের দেশের হাফ ভাড়ার চিত্র। শিক্ষার্থী হেনস্থা ও মাইরধরের চিত্র। কিন্তু আমরা যদি একটু বাহিরের দেশ সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি। তাহলে আমরা দেখি যে, প্রায় সব দেশেই শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়ার ব্যবস্থা রয়েছে, বাংলাদেশেই শুধু শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়া নিয়ে টালবাহানা হয়। প্রতিবেশী দেশ ভারতে যেমন রয়েছে হাফ ভাড়ার ব্যবস্থা তেমনিভাবে আছে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন কিংবা নেদারল্যান্ডের আমস্টারডামে। এ ছাড়াও মাল্টা-মরিশাসসহ আফ্রিকা-ইউরোপের অনেক দেশেই চালু রয়েছে শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়ার প্রথা।

আমাদের পাশর্^বর্তী দেশ ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের সরকার শিক্ষার্থীদের বিনা ভাড়ায় চলাচলের জন্য বাজেটে রাখছে অর্থ বরাদ্দ। দিল্লিতে ১০০ রুপির (১৩০ টাকা প্রায়) কার্ড দিয়ে সাধারণ বাসে সারা মাস যাতায়াত করতে পারে শিক্ষার্থীরা। আর এসি বাসে অন্য যাত্রীদের মাসে ১ হাজার ২৭৫ রুপির কার্ড লাগে, ছাত্রছাত্রীদের দিতে হয় ২০০ রুপি। ভারতের কেরালা রাজ্যে বাসের সর্বনিম্ন ভাড়া আট রুপি। এর সঙ্গে বাড়তি ১ রুপি দিয়ে ৪০ কিলোমিটার যাতায়াত করতে পারে শিক্ষার্থীরা। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়াসহ ইউরোপ-আফ্রিকার অনেক দেশেও এটা চালু রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো ট্রান্সপোর্ট অথরিটি শিক্ষার্থীদের জন্য কার্ড চালু করেছে, যা দিয়ে বাস ও ট্রেনে অর্ধেক ভাড়ায় যাতায়াত করতে পারে। কিন্তু সমস্যা শুধু বাংলাদেশে। রাজধানীর ২৪৬টি রুটে প্রায় ৮ হাজার বাস চলাচল করে। অথচ এর মধ্যে হাতে গোনা (১৫-১৮টি) কয়েকটি রুটে হাফ ভাড়া নেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধির ফলে কোনো রুটেই নিতে চাচ্ছে না হাফ ভাড়া। 
আবার বেশিরভাগ বাসের দরজায় বা পাশে লিখে দেওয়া হচ্ছে ‘হাফ পাস নেই’।

১৯৬৪ সালে বিআরটিসি চারটি বাস দিয়ে সরকারিভাবে গণপরিবহন সেবা দেওয়া শুরু করে। সেই সময় থেকেই সরকারের নির্দেশে শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়া নেওয়া হতো। কিন্তু এটা ছিল সম্পূর্ণ সরকারি সেবা। পরে যখন সরকারি বাসের পাশাপাশি বেসরকারি বাস গণপরিবহনের সেবা দেওয়া শুরু করে, তখন সরকারি বাসের নিয়মে বেসরকারি বাসেও ছাত্রদের হাফ ভাড়া নেওয়া হতো। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো লিখিত নিয়ম ছিল না। আস্তে আস্তে এটা একটা প্রথা হয়ে দাঁড়ায়, যেটা পরবর্তীতে বেশ কিছুদিন ধরেই চলেছে। কিন্তু লিখিত কোনো নিয়ম না থাকায় আর যেহেতু সরকার বেসরকারি বাস কোম্পানির সঙ্গে হাফ ভাড়া নিয়ে কোনো চুক্তি করে নাই, সেহেতু এই হাফ ভাড়া নিতে তারা বাধ্য নয়।

বিজ্ঞজনদের মতে, সাধারণ যাত্রীদের সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে বেসরকারি গণপরিবহনের সঙ্গে সরকারের যদি চুক্তি থাকত, বিআরটিএ’র নির্ধারিত ভাড়া ছাড়া অতিরিক্ত ভাড়া না নেওয়াসহ ছাত্রদের হাফ ভাড়া বিষয়ে চুক্তি থাকত, তাহলে ভালো হতো এবং এটা নিয়ে এত বেশি তর্ক-বিতর্ক হতো না। তাদের ভাষ্য, বিশে^র প্রায় সব দেশেই বেসরকারি গণপরিবহনের সঙ্গে সরকার চুক্তি করে থাকে। 

সরকারের চুক্তি এবং লিখিত কোনো আইন না থাকায় হাফ ভাড়ায় বাস মালিক-চালক-হেলপাররা দিন দিন অনীহা প্রকাশ করছে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের অভিযোগের বিবেচনায় বেসরকারি কোম্পানির তাদের প্রতি মানবিক হওয়া উচিত। পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারেরও এ বিষয়ে এগিয়ে আসা উচিত। বেসরকারি বাস কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে লিখিতভাবে শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়ার প্রথা পুরোদমে চালু করা। একটা বিষয় সবারই ভাবা উচিত যে শিক্ষার্থীরা এই অতিরিক্ত ভাড়ার বোঝা কীভাবে বহন করবে? আয়-রোজকারহীন একজন শিক্ষার্থীকে ঘর থেকে বের হতেই পরিবারের কাছে হাত পাততে হয় যেখানে, সেখানে ডাবল ভাড়া একটা অভিশাপ স্বরূপ। শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে বাস ভাড়া নৈরাজ্যের দ্রুত সমাধান করতে হবে। শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়া নিশ্চিত করতে হবে।

    সাগর হোসেন
    শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট
    জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]