ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা সোমবার ৬ ডিসেম্বর ২০২১ ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
ই-পেপার সোমবার ৬ ডিসেম্বর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

লাল ঘোড়া ও সাতটি গল্প
জহিরুল ইসলাম
প্রকাশ: শনিবার, ২০ নভেম্বর, ২০২১, ৯:৫৮ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 125

আমাদের দেশে এখন হাজার হাজার মানুষ ক্রিকেট খেলে। কিন্তু তার মধ্যে বলে বলে চার-ছক্কা হাঁকাতে পারে কজন? খেলা ছেড়ে দেওয়ার পরে এদের মধ্যে কজনের কথা মানুষ মনে রাখে? সংখ্যাটা কিন্তু হাতে গোনা। তেমনি সব কালেই একেকটি দেশের হাজার হাজার মানুষ সাহিত্যচর্চা করেছেন। কিন্তু তাদের অনেককেই পরে আর মানুষ মনে রাখেনি। কিন্তু এই হাজার হাজার মানুষের মাঝেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীনের মতো হাতে গোনা কয়েকজন লেখককে যুগ যুগ ধরে মানুষ মনে রাখছে। তারা বেঁচে না থাকলেও তাদের লেখাগুলো মানুষ পড়ছে, সেই লেখার সূত্র ধরেই তারা বেঁচে আছেন মানুষের মনে। আজ তোমাদেরকে এমন একজন মানুষের কথাই বলব, যিনি শুধু তার লেখার জন্যই যুগ যুগ ধরে মানুষের মাঝে বেঁচে থাকবেন। এই লোকটির নাম হাসান আজিজুল হক। তিনি ছিলেন একজন ঔপন্যাসিক ও ছোটগল্পকার। জন্মেছিলেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ১৯৩৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি। আর মারা গেছেন গত ১৫ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজশাহীতে। 

ছোটদের জন্য খুব বেশি লেখেননি হাসান আজিজুল হক। কিন্তু যতটুকু লিখেছেন তার প্রায় সবই পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। সাতটি গল্প আর একটি উপন্যাস তিনি রচনা করেছেন ছোটদের জন্য। এগুলো সবই শিশুসাহিত্যের জন্য অমূল্য সম্পদ। উপন্যাসটির নাম ‘লাল ঘোড়া আমি’ আর গল্পগুলো হলো : ফুটবল থেকে সাবধান, হেমাপ্যাথি অ্যালাপ্যাথি, ভূতে বিশ্বাস নেই, গজভুক্তকপিত্থ, লড়াই মানে ফাইট, চরু ও ব্যাঘ্রবধের ব্যাপার।

ফুটবল থেকে সাবধান গল্পটির শুরুটা এভাবে : “ভল্টু বিষম খিদে নিয়ে সকালে বিছানায় উঠে বসল। যাকে বলে হেঁটে-চলে বেড়াবার তাকত, তা তার নেই। গতকাল বিকেলেই ব্যাপারটা ঘটে গেল। পল্টু ওদিক থেকে বলটা ধরে ফটুকে কাটিয়ে ভল্টুকে পাস দিয়েছে। ভল্টুর সামনে কেউ নেই, গোল পর্যন্ত একদম ফাঁকা- খালি গোল্কি রামু ভয়ে তলপেট চেপে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক অমনি সময়েÑ যাকে বলে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো কোথা থেকে লেদু এসে ধাঁই করে একটা চার্জ কষল। ভল্টু পশ্চিম মুখে দাঁড়িয়ে ছিল, পায়ের পাতাও কাজেই পশ্চিম দিকেই ছিল। কচাৎ করে একটা আওয়াজ হলো, আর তার পায়ের পাতাটা সিম্পলি উত্তর দিকে ঘুরে গেল।” তোমরা যারা পাড়ার মাঠে ফুটবল খেলো তারা বলতে পারবে, এ যেন একদম জীবন থেকে নেওয়া। এমন গল্প ছোটদের ভালো না লেগে কি পারে!

হাসান আজিজুল হকের ‘চরু’ গল্পের চরু একটি হরিণছানার নাম। চরুর মা লোভী মানুষের গুলিতে মারা যায়। আর তাদের জালে ধরা পড়ে চরু। খাওয়ার উপযুক্ত না হওয়ায় তারা চরুকে বড় করতে থাকে। সেই বাড়ির একটি ছোট্ট ছেলে হয় চরুর খেলার সাথি। একদিন সেই ছেলেটি বুঝতে পারে চরুকে জবাই করা হবে। ছেলেটি চরুকে খালপাড়ে বাঁধা ছোট্ট নৌকায় উঠিয়ে ওপারে পৌঁছে যায়। তারপর তার গলার দড়িটা খুলে দেয়। চরুকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়ার তৃপ্তিতে ছেলেটির মুখ হাসিতে ভরে ওঠে। এ গল্পে একটি হরিণছানার প্রতি একটি ছোট্ট শিশুর ভালোবাসার কথা উঠে এসেছে সুন্দর বর্ণনায়।

‘হেমাপ্যাথি অ্যালাপ্যাথি’ গল্পটি এমন : 
“তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছর আগে আমাদের গাঁয়ে দুজন ডাক্তার ছিলেন। একজন হোমিওপ্যাথি আর একজন অ্যালোপ্যাথি। গাঁয়ের লোক ঠিক ঠিক বলতে পারত না। একজনকে বলত হেমাপ্যাথি আর একজনকে বলত অ্যালাপ্যাথি।” ব্যস শুরু হয়ে গেল গল্প। এমন গল্প কারও ভালো না গেলে পারে!
‘লাল ঘোড়া আমি’ আসলে একটি ঘোড়ার আত্মকাহিনি। উপন্যাসটির শুরু এভাবে : “সে অনেক আগের কথা, তখন আমার চার বছর বয়স। আজ আমি বুড়ো হতে চলেছি, এক কুড়ি বছর বয়স হলো। মানুষদের এক কুড়ি বছর বয়স কিছুই না। কিন্তু আমাদের জাতেরÑ মানে ঘোড়াদের এক কুড়ি অনেক বয়স। আর ক’বছর পরেই থুরথুরে বুড়ো হয়ে যাব। এখনই তো ভালো 

চলতে-ফিরতে পারি না। চার পায়েই বাত হয়েছে। পেছনের দুপায়ের হাঁটু ফুলে ওলকপির মতো হয়ে গেছে। অমাবস্যা আর পূর্ণিমায় চার হাঁটুতে এমন রস জমে যে, দাঁড়াতে পর্যন্ত পারি না। আমাকে শুয়েই থাকতে হয়। অথচ মানুষ বলে, ভালো ঘোড়া নাকি কোনো দিন শোয় না। দাঁড়িয়ে ঘুমায়। তা কথাটা একেবারে মিথ্যে নয়। অল্প বয়সে আমি কোনো দিন মাটিতে শুয়ে ঘুমাইনি। সব সময় তিন ঠ্যাঙে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমিয়েছি। কিন্তু কী আর করব এখন? বয়সের ওপর তো কারও হাত নেই।”

শুরুটা একটু করুণ তাই না? কিন্তু একটু সামনের দিকে গেলেই দেখতে পাবে ঘোড়া তার সুন্দর দিনগুলোর কথা বলতে শুরু করেছে। যেমন : “চার বছর বয়সে কী সুন্দর দেখতে ছিলাম আমি! গায়ের রঙ টকটকে লাল। তবে কপালটা আর কান দুটো ছিল ধবধবে সাদা। হাঁটুর নিচে থেকে পা চারটেও সাদা। লাল রঙটা যেমন চোখে পড়ে, সাদা রঙটা দূর থেকে চোখে পড়ে না। পায়ের রঙ সাদা ছিল বলে যখন দৌড়োতাম লোকে ভাবত আমি বুঝি শূন্যে ভেসে যাচ্ছি।”

লাল ঘোড়ার বর্ণনা কিন্তু তার নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, ঘুরেফিরে এসেছে মানুষের কথা, আমাদের সমাজের নানা সঙ্গতি ও অসঙ্গতির কথা। মানুষ সম্পর্কে লাল ঘোড়া বলছে : “কেমন খারাপ স্বভাব দ্যাখো এই মানুষ জাতের! নিজেদের মধ্যে মারামারি কাটাকাটি করবে তাও আমাদের পিঠের উপর চড়ে।”

উপন্যাসটি শেষ হয় এভাবে : “মৃত্যু ঘনিয়ে আসছে আমার। চোখে আর তেমন দেখতে পাচ্ছি না। আমার অন্ধকার ঘরটা আরও অন্ধকার লাগছে। যে মেঝেতে শুয়ে আছি, সে মেঝে ঠান্ডা। মাটির গোয়ালের ভিতরে আসছে গা-জুড়ানো বাতাস। কানে আসছে পাখির ডাক। একটুও ভয় করছে না আমার। ঘাড়টা লম্বা করে দিয়ে চেয়ে রয়েছি। চোখ বন্ধ করে আমি যেন আমার মাকে দেখতে পাচ্ছি। আহঃ কী শান্তি! আমি এখন মারা যাচ্ছি...”

মৃত্যু ঘনিয়ে আসছে জেনেও লাল ঘোড়ার একটু ভয় হয় না। মৃত্যু তার কাছে শান্তির মনে হয়। কারণ সে জানে, জীবনে সে কোনো অন্যায় করেনি। লেখক এখানে বোঝাতে চেয়েছেন, মানুষের জীবনও যদি হতো লাল ঘোড়ার মতো গ্লানিহীন, তবে মানুষও মৃত্যু নিয়ে এত চিন্তিত হতো না। মৃত্যুকে এত ভয়াল মনে হতো না। মনে হতো শান্তির পথে যাত্রা।


আরও সংবাদ   বিষয়:  হাসান আজিজুল হক  




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]