ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা সোমবার ৬ ডিসেম্বর ২০২১ ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
ই-পেপার সোমবার ৬ ডিসেম্বর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

ঋণখেলাপি সংস্কৃতি থেকে উত্তরণের পথ কোথায়
সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২১, ৯:০২ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 89

এক উদ্যোক্তা ব্যাংক থেকে ঋণ নেবেন বলে আবেদন করেন। আবেদন অনুযায়ী যথারীতি পরিদর্শনে গেলেন সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তারা। পরিদর্শনে গিয়ে দেখেন বিশাল এলাকার মধ্যে মাঝখানে একটি ছোট সাইনবোর্ড ঝুলছে। এই দৃশ্য দেখে ব্যাংকার খুব আশাহত হলেন। কারণ তিনি এই জায়গাটিতে দেখিয়েছিলেন কারখানা রয়েছে। চলতি মূলধনের কারণে কারখানা ঠিকমতো চালু করতে পারছেন না। কিন্তু সেই স্থানে কোনো কারখানা নেই, অথচ তিনি ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল চেয়ে আবেদন করেন। পরে তিনি অবশ্য ঋণ পেয়েছিলেন বিভিন্ন মহলে দেনদরবার করে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তিনি ঋণের টাকা দিয়ে প্রথমে একটি দামি বিলাসী গাড়ি কিনলেন। যৎসামান্য ঋণের টাকা দিয়ে কারখানা শুরু করেও শেষ পর্যন্ত চালু করতে পারেননি। একসময় তিনি হয়ে গেলেন ঋণখেলাপি। এর সঙ্গে যুক্ত হলো- রুগ্ণ শিল্পতে। শিল্প যেখানে চালু হলো না, সেখানে কীভাবে রুগ্ণ হলো সে প্রশ্ন ছিল অনেকের। কিন্তু তিনি কীভাবে যে ম্যানেজ করে নিলেন, তা অনেকের কাছে অজানা রয়ে গেল।

একসময়ের অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান এই খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি নিয়ে অনেক কথা বলেন। কিন্তু কার্যকর তেমন কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেননি। এর অন্যতম কারণ ওপর মহলের চাপ। আবার অনেকে ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে নিজের ঋণের টাকা ফেরত দিতে গড়িমসি করেন। একসময় তিনি যখন ঋণখেলাপি হয়ে পড়েন তখন কোটের শরণাপন্ন হন।

এ কথা সত্য যে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে এই খেলাপি ঋণ। তবে ঋণের মাত্রা থাকে। কোনো কোনো ব্যাংকার মনে করেন, এই সমস্যা শুধু বাংলাদেশের নয়। বিশ্বের সব দেশেই খেলাপি ঋণ আছে। কোথাও বেশি, আবার কোথাও কম। সুদূর মার্কিন মুল্লুকেও খেলাপি ঋণের কেলেঙ্কারির কথা শোনা যায়। কিন্তু বাংলাদেশের যে খেলাপি ঋণ তা কিছুটা ভিন্ন।

খেলাপি ঋণের তদারকি করার দায়িত্ব কার? এই প্রশ্ন অনেকের মনে। বাংলাদেশ ব্যাংক এ ক্ষেত্রে কতখানি ভূমিকা পালন করতে পারছে। আসলে কি বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা আছে কিনা সে বিষয়টি ঘুরেফিরে আসে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) অনেকদিন ধরে সুপারিশ করে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা নিয়ে। যদি স্বাধীনতা পায় তাহলে মনিটরিং ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে পারবে। অনেক সময় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ আসে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর। আর হস্তক্ষেপের কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক অনেক সময় তাদের সময়োচিত পদক্ষেপ নিতে পিছপা হয়ে যায়।

খেলাপি ঋণের মাত্রা যখন ১ লাখ কোটি ছাড়িয়ে যায় তখন অনেকের টনক নড়ে। কীভাবে এই টাকার এত বেশি হলো, এ নিয়ে অনেকে গবেষণা করেন। গবেষণায় ফলাফল যা দাঁড়ায় তা হলো, ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতার যোগসাজশে এই ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। তবে এটাও ঠিক, শুধু বাংলাদেশে নয়, ইউরোপের কোনো কোনো দেশ অনেক পদক্ষেপ নেওয়া সত্তে¡ও ব্যাংকিং খাত এখনও খেলাপি ঋণের সমস্যায় সম্মুখীন হচ্ছে। যে কারণে বিশ্বের অনেক ব্যাংক এখন আর দুটি দেশের ব্যাংকের মধ্যে লেনদেন করার ব্যাপারে তেমন আগ্রহী হয় না।

বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের সমস্যার ধরন একটু ভিন্ন বলে মনে করেন সাবেক কয়েকজন ব্যাংকার। তারা বলেন, এই সমস্যা দীর্ঘদিনের। এই সমস্যা সমাধানে ঋণ গ্রহীতা আর ঋণদাতা একসঙ্গে একমত হতে পারেন না। ফলে অনেক সময় ঋণ গ্রহীতা আদালতে শরণাপন্ন হন। যে কারণে খেলাপি ঋণ পুঞ্জীভূত সমস্যায় পরিণত হয়। অনেকে বলেন, আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাতে এখনও ওভারড্রাফট জনপ্রিয় গ্রাহকের কাছে। বিশেষ করে ঋণদানের ক্ষেত্রে এটি বিশেষ সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এই ওভারড্রাফট খেলাপি ঋণকে আরও উসকে দেয় বলে অনেকে মনে করছেন। আবার ঋণের সুদ ও কিস্তি এই দুটোই নগদে পরিশোধ করা হয় না। এই পদ্ধতি খেলাপি হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হিসেবে কাজ করে।

ছদ্মবেশী খেলাপি ঋণও এ দেশে বড় সমস্যা বলে মনে করা হয়। নানা ধরনের ফাঁকফোকর দিয়ে এই ঋণ তফসিলের সুযোগ এনে দেয় বলে মনে করেন অনেক ব্যাংকার। তবে যে ঋণ হোক না কেন, খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি থেকে বের হওয়ার জন্য যে ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন তা অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল রয়ে গেছে। তা না হলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ কোটি ছাড়াবে কেন।

এ কথা বলার আর অপেক্ষা রাখে না করোনাকালে ঋণখেলাপিদের একের পর এক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। তবে পরিস্থিতির কারণে এই সুবিধা দেওয়া হয়। কিন্তু এই সুবিধাকে অনেকে অনাদিকাল কাজে লাগাতে চান। বাংলাদেশ ব্যাংক একের পর এক সুবিধা দিয়েছে, এরপরও কেন ঋণের পরিমাণ কমছে না, এই প্রশ্ন অনেকের। খেলাপি যেন না হয় সে জন্যই এই সুবিধা দেওয়া হয়। অথচ কোনোভাবেই ঋণের পরিমাণ কমছে না। তবে কি ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায় করার কোনো উদ্যোগ নেই? নাকি আদায় করার ব্যাপারে ভাটা পড়েছে মন মানসিকতায়।

এ কথা ভাবতেই অবাক হতে হয় চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের শেষে ব্যাংকিং খাতের মোট ঋণের পরিমাণ ১২ লাখ ৪৫ হাজার ৩৯১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে রূপান্তরিত হয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। যা মোট ঋণের ৮ দশমিক ১২ শতাংশ। এই খেলাপি ঋণ থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে লাগাম টেনে ধরা এখনই জরুরি হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে মনিটরিং ব্যবস্থায় আরও জোরালো ভূমিকা পালন করা বিশেষ প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় যারা শীর্ষ দায়িত্ব পালন করছেন তাদের এখন নির্মোহ হয়ে কাজ করতে হবে। তা না হলে খেলাপি ঋণের টাকা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবে।

ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে গ্রাহক ও ঋণ গ্রহীতার সম্পর্ককে ভালো রেখেই লেনদেন করা যেমন ব্যাংককিং খাতের জন্য প্রয়োজন। তেমনি প্রয়োজন কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা। যেন কোনোভাবেই একজন ভালো উদ্যোক্তা খেলাপি হয়ে না পড়েন। কারণ অনেক ক্ষেত্রে ঋণ গ্রহীতা সুযোগ খুঁজবেন ঋণের টাকা ফেরত না দেওয়ার। কিন্তু এই মানসিকতার পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনে আইনের সংশোধনের পথে যেতে হবে। বেশ কয়েকবার আইন সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু কালের বিচারে বর্তমান প্রেক্ষাপটে আইনকে আরও আধুনিক ও সময়োপযোগী করা জরুরি হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে খেলাপি সংস্কৃতি থেকে বের হওয়ার পথ বের করতে হবে। এই পথ যেন ঋণ গ্রহীতা ও ঋণদাতার জন্য সুখকর হয়।

লেখক : সাংবাদিক




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]