ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ৩০ নভেম্বর ২০২১ ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
ই-পেপার মঙ্গলবার ৩০ নভেম্বর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

পরিচ্ছন্নতাকর্মীর হাতে গাড়ি কেন
ফয়সাল খান
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২১, ৮:৪৫ এএম আপডেট: ২৬.১১.২০২১ ৮:৪৯ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 81

নগরীর ময়লা ল্যান্ডফিলে নিয়ে যেতে পরিবহনের জন্য বড় বড় গাড়ি ব্যবহার করছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। দক্ষ চালক নিয়োগ না দিয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও মশককর্মীদের হাতে এসব গাড়ি তুলে দিচ্ছে তারা। আর এই সুযোগে কোনো নিয়মনীতি না মেনেই এসব গাড়ি বেপরোয়াভাবে নগরীর বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে চলেছে। যার ফলশ্রæতিতে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা।

গত দুদিনে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির নিচে চাপা পড়ে দুজন মারা গেছেন। এর আগেও ময়লার গাড়ি চাপায় অনেক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া বা গাড়ি চালানোতে শৃঙ্খলা আনার কথা বলা হলেও এর আগে কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি সিটি করপোরেশন।

অথচ সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য প্রায়ই নানা বক্তব্য দিয়ে থাকেন দুই মেয়র। তাদের একজন ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে গঠিত বাস রুট রেশনালাইজেশন কমিটির আহ্বায়ক, অন্যজন সদস্য সচিব। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চালক ছাড়া পরিচ্ছন্নতা ও মশককর্মী দিয়ে গাড়ি পরিচালনার দায় সিটি করপোরেশন কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। এসব ঘটনায় যে গাড়ি চালিয়েছে বা গাড়িতে যে ছিল শুধু তাকে শাস্তি দিলে অন্যায় হবে। তাদের হাতে যারা গাড়ি তুলে দিয়েছে তাদেরকেও শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চালক সঙ্কট এবং কম টাকায় কর্মী খাটানোর মানসিকতা থেকেই পরিচ্ছন্নতা ও মশককর্মীদের দিয়ে ভারী যানবাহন চালানোর মতো কাজ করায় সিটি করপোরেশন। মাস্টার রোলে নিয়োগপ্রাপ্ত এসব কর্মীর বেশিরভাগেরই ভারী যান চালানোর লাইসেন্স নেই। চালক নিয়োগ না করে যেসব পরিচ্ছন্নতা বা মশককর্মীর হালকা যান চালানোর লাইসেন্স আছে তাদের দিয়েই গাড়ি চালানোর কাজ সেরে নিচ্ছে সংস্থা দুটি। আর জীবন দিয়ে এর মাশুল দিচ্ছেন নাগরিকরা।

সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মোট গাড়ির সংখ্যা ৬০৯টি। অথচ তাদের নিয়োগপ্রাপ্ত চালক আছেন ১৩৭ জন। বাকি গাড়িগুলো সিটি করপোরেশন প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই পরিচ্ছন্নতা ও মশককর্মীদের হাতে তুলে দিচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ডিএসসিসির সাংগঠনিক কাঠামোতে ১৯৩ জন চালকের পদ রয়েছে। বাকি গাড়িগুলো চালানোর জন্য পরিচ্ছন্নতা ও মশককর্মীদের মধ্যে যাদের ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

অন্যদিকে ময়লা পরিবহনের জন্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বড় গাড়ি রয়েছে ১৩৭টি। এসব গাড়ি চালানোর জন্য ড্রাইভার রয়েছে মাত্র ২৫ জন। বাকি গাড়িগুলো মাস্টার রোলে নিয়োগ পাওয়া পরিচ্ছন্নতা ও মশককর্মীরা চালান।

দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, চালক নিয়োগ প্রক্রিয়া একটু জটিল। ভারী গড়ির লাইসেন্স করা চালকও পাওয়া যায় না। তাই সিটি করপোরেশনের স্বাভাবিক গতি ঠিক রাখতে মাস্টার রোলে নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের দিয়ে এ কাজ করানো হয়। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ১২৯টি ওয়ার্ডের বাসাবাড়ির ময়লা বেসরকারি সার্ভিসের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। এরপর তা সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনে রাখা হয়। আবার রাস্তাঘাটের ময়লা-আবর্জনা সিটি করপোরেশনের কর্মীরাই সংগ্রহ করেন। এসব ময়লা পরিবহনের জন্য ছোট ছোট ভ্যান ব্যবহার করা হয়। এরপর সব ময়লা একসঙ্গে করে ল্যান্ডফিলে নিয়ে যাওয়া হয়। মূলত ময়লা-আবর্জনা ল্যান্ডফিলে নিয়ে যাওয়ার জন্যই বড় ট্রাক ব্যবহার করা হয়। 

বুধবার গুলিস্তানে ময়লার যে গাড়িটির নিচে চাপা পড়ে নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসান মারা গেছে, সেই গাড়ির চালক ছিলেন মো. হারুন। তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২১নং ওয়ার্ডের পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে মাস্টার রোলে নিয়োগপ্রাপ্ত। এই গাড়ি চালানোর জন্য সিটি করপোরেশন শহীদ নামে এক পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি আরও দুই বছর আগে গাড়ি চালানোর দায়িত্ব ছেড়ে দেন। পরে হারুনকে গাড়িটি চালাতে দেয় পরিবহন বিভাগ। বুধবার শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর হারুন পালিয়ে যান। পরে ওই গাড়িতে থাকা পরিচ্ছন্নতাকর্মী রাসেলকে আটক করে পুলিশ। 

এমন আরও পাঁচ শতাধিক পরিচ্ছন্নতা ও মশককর্মী রয়েছেন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে। সিটি করপোরেশনের নিয়োগপ্রাপ্ত যেসব চালক রয়েছেন তাদের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের গাড়ি চালান। শ্রমিক নেতাসহ বাকি চালকদের বেশিরভাগই নিজে গাড়ি চালান না। পরিচিত কাউকে নিজস্বভাবে নিয়োগ দিয়ে গাড়ি চালান। তকে সংশ্লিষ্ট ড্রাইভার নিজেই বেতন দেন। গাড়ি না চালিয়েও বেতন তুলে নেন ড্রাইভাররা।

তা ছাড়া ময়লার গাড়ি চালানোর জন্য সিটি করপোরেশনের কোনো ড্রাইভারই রাজি হন না। কাউকে দায়িত্ব দিলে তিনি নিজে অন্য একজনকে নিয়োগ দিয়ে দেন।

অন্যদিকে ময়লার গাড়ির চাপায় শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনায় বৃহস্পতিবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নগর ভবনের সামনে বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীরা। এ সময় তাদের উদ্দেশে সংস্থাটির মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস নটর ডেম কলেজের ছাত্র নাঈম হাসানের হত্যাকারীর বিচারের দাবিসহ ছাত্রদের অন্যান্য দাবির সঙ্গে শুধু একমত পোষণই না, ঘাতক সেই খুনির ফাঁসিও দাবি করেছেন।

মেয়র তাপস বলেন, একজন মেধাবী ছাত্র নাঈম এই সিটি করপোরেশন এলাকার সড়কে আমার করপোরেশনের গাড়ি দ্বারা দুর্ঘটনাকবলিত হয়ে নিহত হবে, সে জন্য আমি রাজনীতিতে আসিনি। আমার কাছে আমার সন্তানের সুখ, সন্তানের হাসি, সন্তানের ভালোবাসা অনেক অনেক মূল্যবান। আমি দাবি করি, এই শহরের সড়কে আর যেন কোনো নাঈমের প্রাণহানি না ঘটে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের সরকারি নীতিমালা-নিয়মকানুন মানতে হয়। মেনে চলতে হয়। সেই নিয়মকানুন মেনেই গাড়িচালকের গাড়ি চালানো দায়িত্ব ছিল। সে সেই দায়িত্ব পালন করেনি। আরেকজন ভাড়াটিয়া গাড়িচালককে দিয়ে গাড়ি চালিয়েছে। সুতরাং সবাইকেই শাস্তি ভোগ করতে হবে। যার দায়িত্ব ছিল তাকে আমরা সাময়িক বরখাস্ত করেছি এবং ইনশাল্লাহ চাকরি থেকে অপসারণ করব। যেই চালক গাড়ি চালানো অবস্থায় ছিল সে খুনি। তার সর্বোচ্চ শাস্তি ইনশাল্লাহ আমরা নিশ্চিত করব। আপনাদের সঙ্গে কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে আমি বলি সেই খুনির ফাঁসি চাই আমি।

অন্যদিকে অবৈধভাবে গাড়ি চালানো ও বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগে পরিচ্ছন্নতাকর্মী মো. হারুন মিয়া এবং আব্দুর রাজ্জাককে চাকরিচ্যুত করেছে ডিএসসিসি। তাদের নিয়মবহির্ভূতভাবে গাড়ি চালাতে দেওয়ার অপরাধে গাড়িচালক মো. ইরান মিয়ার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু ও তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

তবে পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. শামসুল হক মনে করেন, শুধু গাড়িতে থাকা পরিচ্ছন্নতাকর্মীকেই শাস্তি দিলে হবে না। তার হাতে যারা গাড়ি তুলে দিয়েছে তাদেরও শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে সময়ের আলোকে তিনি বলেন, চালক না হয়েও সিটি করপোরেশনের গাড়ি যে চালাচ্ছে শুধু তাকে শাস্তি দেওয়া অযৌক্তিক। এর দায় নিতে হবে সিটি করপোরেশন ও নগরপিতাকেও। কেননা নগরপিতা নাগরিকদের বিভিন্ন পরামর্শ দেন। এখন সিটি করপোরেশন যদি অনিয়ম করে তার কোনো শাস্তি হবে না? তার মানে আমার জন্য আইন নেই, আর সবার জন্য আইন আছে?

তিনি আরও বলেন, গাড়ির চালক নেই, তাও কেন গাড়ি কেনা হচ্ছে। দাতা সংস্থার পক্ষ থেকে অনেক বড় বড় গাড়ি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু এগুলো চালাবে কে তা দেখা হয়নি। গাড়ি নেওয়ার আগেই চিন্তা করা উচিত, সেটা চালাবে কে।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]