ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ৩০ নভেম্বর ২০২১ ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
ই-পেপার মঙ্গলবার ৩০ নভেম্বর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

জমি হারিয়ে নিঃস্ব তারা
এসএম মিন্টু হোসেন, গাজীপুর থেকে
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২১, ৮:৫৮ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 67

বুলডোজার দিয়ে ভাঙচুর করে। এ সময় ঘরের মালামাল ও আসবাবপত্র ভেঙে ব্যাপক তাণ্ডব চালায় তারা। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ১৯নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও মহানগর বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক তানভীর আহমেদ, ২০নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর শহিদুল ইসলাম, ২১নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফারুক আহম্মেদ ও ২৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মঞ্জুর মান্নান অনন্ত চারশ লোক নিয়ে এসে ব্যাপকহারে ভাঙচুর চালিয়ে বাড়িঘর ভাঙচুর করেন। 

আফরোজা বেগম জানান, এ সময় হিজড়ারা তাকে ব্যাপক মারধর করে। তিনি বলেন, আমার স্বামী সন্ত্রাসীদের ভয়ের কারণে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে গত বছর মারা যান। তিনি নিজেও স্ট্রোক করেছিলেন বলে জানান আফরোজা বেগম। এ জন্য তিনি জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে ১৭ দিন ভর্তি ছিলেন। 

তিনি বলেন, মেয়র জাহাঙ্গীরের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কাউন্সিলর তানভীর ও তার সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্য অহিদ, রুহুল ও হারুন ২০১৪ সাল থেকে তাদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে আসছে। প্রায়ই তারা চাঁদা দাবি করে থাকে। চলতি বছরের অক্টোবরে জোর করে বাড়িঘর ভেঙে মালামাল লুটপাট করে ট্রাকে করে নিয়ে যায়। 

আফরোজা বেগম জানান, সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে সদর থানায় মামলা করতে গেলে ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, কাউন্সিলরদের সঙ্গে আপনাদের সম্পর্ক ভালো না কেন। আপনারা কাউন্সিলরের কাছে যান। তিনিই সমাধান করবেন। এসব বলে ওসি তাকে থানা থেকে বের করে দেন। 

তিনি বলেন, আমাদের প্রায় ১ কোটি টাকার সম্পত্তি জোর করে দখল করে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে জাহাঙ্গীরের নির্দেশনায়। উচ্চ আদালতে তিনটি মামলার আদেশ দেখানো হলেও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ব্যাপক তাণ্ডব চালায় সন্ত্রাসীরা। 

তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার স্বামী অনেক কষ্ট করে এই জমিটুকু কিনেছিলেন। আমি কাথোরা প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষক হিসেবে চাকরি করতাম। আমার ছেলে ও ছেলের স্ত্রীও শিক্ষক। আমাদের সরকারের কাছে দাবি, জমি অধিগ্রহণ করা হলে আমরা যেন ন্যায্যমূল্য পাই। এটাই আমাদের দাবি।

শুধু আফরোজা নন, গাজীপুরে ৫৭টি ওয়ার্ডে এমনিভাবেই প্রায় ৩২ হাজার পরিবারের সাড়ে ৮ হাজার বিঘা বাড়িঘর ভাঙচুর করে সড়ক নির্মাণের নামে জবরদখল করে নেন জাহাঙ্গীর আলম।

দক্ষিণ সালনার মারিয়ালি সড়কের পাশে হোসনে আরা বেগমের রয়েছে ৫ শতাংশ জমি। স্বামী মারা যাওয়ার আগে এই জমিতে আধাপাকা ঘর নির্মাণ করে যান। এরপর স্বামী মারা যাওয়ার পর এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে কোনোরকমে বসবাস করছিলেন। এরই মধ্যে জাহাঙ্গীরের লোকজন সড়ক নির্মাণের নামে কয়েকবার বাড়িটি ভাঙচুর করতে আসে। একপর্যায়ে ১৯নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর তানভীর আহমেদ প্রায় ৪শ লোকসহ সিটি করপোরেশনের ভেকু নিয়ে আসেন। এ সময় তিনি দুপুরে রান্নার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। হঠাৎ লোকজনের হুমকি পেয়ে কাছে এসে দেখেন তার বাড়ির চারপাশ লোকজনে ভরা। ভেকু দিয়ে বাড়ি ভাঙচুর করতে গেলে তিনি বাধা দেন। একপর্যায়ে কাউন্সিলর তার ভাই শহিদ, আহাদুল্লাহ, রাহাদুল্লাহ, শাহজাহান, সোহেলসহ কয়েকজন বেদম মারধর করেন। একপর্যায়ে তাদের মারধরে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তিন ঘণ্টা পর জ্ঞান ফিরলে দেখেন তার স্বপ্নের বাড়িটি ভেঙে চুরমার করে দেওয়া হয়েছে। এসব তাণ্ডব দেখে তিনি ফের জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। জ্ঞান ফিরলে দেখেন তার সব স্বপ্ন মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। ঘরের মালামালও লুট করে ট্রাকে ভরে নিয়ে যায় তারা। এসব দৃশ্য নীরবে সইতে হয়েছে প্রত্যক্ষদর্শীদের। কেউ কথা বলার সাহসও পাননি ওই সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে।

হোসনে আরা জানান, কাউন্সিলর তানভীর আহমেদের ভাই শহিদ উল্টো তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। তাদের অপরাধ তারা কাউন্সিলর ও শহিদকে হত্যার হুমকি দিয়েছেন। এই মামলায় আসামি করা হয় হোসনে আরা ও প্রতিবেশী জুলহাসসহ চারজনকে। তারা সবাই জামিনে আছেন। 

হোসনে আরা বলেন, আমরা সদর থানায় গিয়েও কোনো প্রতিকার পাইনি। ওসি রফিকুল ইসলাম মামলা না নিয়ে উল্টো ভয়ভীতি দেখিয়ে থানা থেকে বের করে দেন।

গতকাল সরেজমিন হোসনে আরা বেগমের বিধ্বস্ত বাড়ির সামনে গিয়ে দেখা যায় সম্পূর্ণ বাড়িটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। রাস্তার পাশের বাড়িটির দেয়ালে ও জমিতে গাছপালা ও শেকড় দেখা গেছে। এ সময় হোসনে আরা বেগম বাড়ির সামনে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন। 

তিনি বলেন, অনেক কষ্টে বাড়িটি নির্মাণ করা হয়। কিন্তু এক মিনিটেই সেই স্বপ্নের বাড়ি ভেঙে চুরমার করে দেওয়া হয়। বাড়িতে থাকা কোনো মালামালও সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেয়নি মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের সন্ত্রাসীরা। 

গতকাল যখন জাহাঙ্গীর আলমের সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার সংবাদটি শুনেন তখন দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করে বলেন, আল্লাহ তুমি জুলুমকারীর হাত থেকে অনেককে রক্ষা করেছ। 

প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, জাহাঙ্গীরের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। পাশাপাশি তিনি কাউন্সিলর তানভীর আহমেদ ও তার লোকদেরও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। অন্যদিকে অবৈধভাবে বাড়িঘর ভাঙচুর হয়েছে সাংবাদিক, আওয়ামী লীগ নেতা ও অনেক ব্যবসায়ীরও। 

গতকাল জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি মাজহারুল ইসলাম জানান, তার দক্ষিণ সালনার বাড়ি ভাঙচুরের চেষ্টা করে জাহাঙ্গীর আলমের লোকজন। তিনি জানান, এলাকার অনেকেই জমি রক্ষায় উচ্চ আদালত থেকে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে এসেছেন। সেই নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে সাধারণ নিরীহ মানুষের বাড়িঘর ভাঙচুর করে লুটপাট চালানো হয়েছে। 

তিনি জানান, জাহাঙ্গীর আলমের লোকজন প্রায়ই হামলা-ভাঙচুর চালিয়ে থাকে। এ সময় তিনি লোকজন নিয়ে বাধা দিতে গেলে তাকেও জাহাঙ্গীরের লোকজন হত্যার হুমকি দেয়। কিন্তু সেই হুমকি উপেক্ষা করে সাধারণ মানুষের সম্পদ রক্ষা করেন তিনি।

জেলা রিপোর্টার্স ক্লাবের সহসভাপতি সাইফুল ইসলাম জানান, তার বাড়ি দক্ষিণ সালনার মধ্যপাড়া গ্রামে। ওই বাড়িটি ভাঙার জন্য মেয়র পাঁচবার লোকজন পাঠান। তিনি বলেন, আমরা আগে থেকেই আঁচ করতে পেরে উচ্চ আদালত থেকে নিষেধাজ্ঞা করিয়ে নিই। এরপরও বাড়ি ভাঙার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকে। তবে শেষ রক্ষা হয়েছে। 

এখন তিনি সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন তাতেই তিনি খুশি বলে জানান, সাইফুল ইসলাম। পাশেই বসেছিলেন তার প্রতিবেশী বোন হোসনে বানু (৭০)। 
তিনি বলেন, ওই জমির দুপাশের মাঝে সড়ক। জাহাঙ্গীরের লোকজন এসে গাছ কেটে ফেলে দখলের জন্য। এমনকি পারিবারিক কবরস্থানটিও ভেঙে ফেলতে চায়। ছাত্রলীগ নেতা মাজরুল ও সাংবাদিক সাইফুল ইসলামের কারণে তাদের জমিটি রক্ষা পেয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্তদের আরেক নারীর নাম সুইটি বেগম (৪২)। অল্প বয়সে স্বামী হারিয়েছেন তিনি। তার স্বামীর নাম তরীক উদ্দিন। দক্ষিণ সালনার বাঘোল গ্রামে রাস্তার পাশে মাত্র দেড় কাঠার ওপর দুই তলা বাড়ি নির্মাণ করেন। কিন্তু মেয়রের ঘনিষ্ঠ কাউন্সিলর তানভীর আহমেদ ও তার দালাল নামে পরিচিত মাজহার তাকে আশ^াস দেন এক কাঠা জমি দিলে তার ছেলেকে সিটি করপোরেশনে চাকরি দেবেন। এই প্রলোভনে তিনি রাস্তার জন্য জায়গা ছেড়ে দেন। বর্তমানে বাড়িটি অর্ধেকের বেশি ভেঙে ফেলেন। যে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল তার কিছুই করেননি তানভীর আহমেদ।

অভিযোগের বিষয়ে কাউন্সিলর তানভীর আহমেদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সময়ের আলোকে অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ শতভাগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। আফরোজার বাসায় হামলার বিষয়ে বলেন, ২০নং ওয়ার্ড আমার না। সেখানে আমি যাইনি। হোসনে আরার বিষয়ে তিনি বলেন, আদালতের যে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তা এখনও টাঙিয়ে রেখেছেন। সেই নিষেধাজ্ঞা আদালত খারিজ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন. ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতেই তার জমির ওপর রাস্তাটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। 

তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে উল্টো মামলা করেছেন তারা। ওই মামলার তদন্ত পায় পিবিআই। পরে মামলাটির ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া হয়। রিপোর্টে আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগের সত্যতা পায়নি। 

কাউন্সিলর তানভীর আরও বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিক হোসনে আরা ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। আমার কাছে প্রমাণও আছে। 

টঙ্গীর বনমালা রোডের আলিম নামে একজনের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, তার স্বজনদের বাড়িঘর ভেঙে তছনছ করে ফেলেছেন জাহাঙ্গীর আলমের লোকজন। তিনি বলেন, আদালত থেকে নিষেধাজ্ঞা নিয়েও কোনো কাজ হয়নি। টঙ্গীর ৫৬নং ওয়ার্ডের গার্লস স্কুল রোডের বাসিন্দা ওবায়দুল বাবু। তিনি একটি বেসরকারি টেলিভিশনে ঢাকায় রিপোর্টার হিসেবে কর্মরত। দুই মাস আগে তার বাড়ির একাংশ ভেঙে ফেলেন মেয়রের লোকজন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন কাউন্সিলর আবুল হোসেন। 

বাবু বলেন, আমি বান্দরবান যাওয়ার পর সেখানে কোনো নেটওয়ার্ক ছিল না। এই সুযোগে তারা বাড়ির একাংশ ভেঙে ফেলেন। তিনি বলেন, বাড়ি থেকে রাস্তার মাঝে যে পরিমাণ জমি থাকার কথা তার চেয়ে বেশি জমি তিনি রেখেছেন, তবু ভেঙে ফেলা হয় বাড়িটি।


আরও সংবাদ   বিষয়:  গাজীপুর  




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]