ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ৩০ নভেম্বর ২০২১ ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
ই-পেপার মঙ্গলবার ৩০ নভেম্বর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

বাংলার প্রকৃতি ও কবিতায় হেমন্ত
কুশল ভৌমিক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২১, ১২:০৯ পিএম আপডেট: ২৬.১১.২০২১ ১:২৪ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 93

শস্য-শ্যামল পল্লী বাংলার অবারিত মাঠ-ঘাট, দিগন্তের নিঃসীম বিস্তার, রুপালি নদী আর তারই সঙ্গে মিশে থাকা সহজ-সরল মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, মিলন-বিচ্ছেদ- ভিন্নরূপ ও মাধুর্য নিয়ে হাজির হয় ছয়টি ভিন্ন ঋতুতে। এই ঋতুচক্র নিয়ে কবিদের আদিখ্যেতাও কম নয়। প্রতিটি ঋতু কবির কলমে উঠে এসেছে ভিন্ন ব্যঞ্জনায়, ভিন্ন রূপ, সুর ও ঐশ্বর্য নিয়ে। গ্রীষ্মের খরতাপ আর রুদ্র কালবৈশাখির পর ‘বরিষ ধরা মাঝে শান্তির বারি’ আমাদের প্রশান্ত করে। 

তারপর কদম আর কাশবনের রোমাঞ্চ নিয়ে হাজির হয় শরৎ। শরতের শারদ আবহ ধীরে ধীরে কেটে যাওয়ার পর প্রকৃতিতে আসে হেমন্ত। ভোর থেকে হেমন্তের কুয়াশা নেমেছে মাঠে। বিন্দু বিন্দু শিশির জমে আছে ধানগাছের বয়স্কপাতায়। ক্ষেতের ওপর ওড়াউড়ি করছে গঙ্গাফড়িংয়ের দল। পাকা ধানের শীষে সোনা রঙের ঔজ্জ্বল্য, মুগ্ধ হয়ে অলস বসে আছে সাদা রঙ প্রজাপতি আর ঘাসফড়িং। বিন্দু বিন্দু শিশিরে ওদের ডানা ভেজা। ভেজা ডানায় ওরা ওড়ার ক্ষমতা হারিয়েছে। সোনালি ধানের ক্ষেত ডিঙিয়ে পূর্বদিগন্ত রাঙিয়ে উঠছে ভোরের সূর্য। হালকা শীত শীত ভোরের ভেতর মিষ্টি রোদের ওম, ইশারায় শিস দিয়ে ডাকছে হেমন্ত- কার্তিক ও অগ্রহায়ণ। 

বাংলার পথঘাট এবং জলহাওয়ায় আসে পরিবর্তন। বর্ষার স্রোতস্বিনী নদী কিছুটা জলশূন্য হয়ে স্পষ্ট করে সর্পিল দেহভঙ্গিমা। কুয়াশাসিক্ত ভোর ও সন্ধ্যা কেমন ঘোরলাগা সৌন্দর্য নিয়ে হাজির হয় আমাদের সামনে। এভাবেই সন্তর্পণে প্রকৃতির কোলজুড়ে আশ্রয় নেয় ‘ঋতুকন্যা’ হেমন্ত। এ সময় আবহাওয়া বেশ উপভোগ্য- না শীত, না গরম। 

পৌরাণিক তথ্য মতে, কার্তিক ও অগ্রহায়ণ এ দুটি মাসের নাম রাখা হয়েছে ‘কৃত্তিকা’ ও ‘আর্দ্রা’ নামক নক্ষত্রের নাম অনুযায়ী। আমাদের এখানে হেমন্তের যে বৈশিষ্ট্য তার সিংহভাগই মিলে যায় পশ্চিমের অটামের সঙ্গে। ইংরেজ কবি জন কিটস তো তার বিখ্যাত ‘টু অটাম’ কবিতায় এই ঋতুকে বলে দিয়েছেন ফুল ও রসাল ফলের ঋতু। ধানক্ষেতে ক্লান্ত কৃষক ঘুমিয়ে পড়েছে, ফসলের গন্ধে মাতোয়ারা শালিকের কিচিরমিচির। মাথায় বোঝা নিয়ে ছোট্ট নদী পার হচ্ছে কৃষক, শোনা যাচ্ছে রবিন পাখির শিসের আওয়াজ, ঝিঁঝি ডাকা পড়ন্ত বিকাল আর ঘরে ফেরা মেষদের ডাক। এ তো বাংলাদেশের অগ্রহায়ণের দৃশ্যকল্পই যেন! 

হেমন্ত, বাংলা সাহিত্যে বিশেষত বাংলা কবিতায় এসেছে বহুমাত্রিক সৌন্দর্য ও সৌরভ নিয়ে। মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলিতে হেমন্ত এসেছে নতুন ধান্যের সুঘ্রাণে। বৈষ্ণব পদকর্তা লোচন দাস, কবি কংকন মুকুন্দ রাম চক্রবর্তী হেমন্তের ঐশ^র্য বর্ণনা করেছেন তাদের কবিতায়।

রবীন্দ্রনাথের অসংখ্য গান ও কবিতায় উঠে এসেছে হেমন্ত। রবি ঠাকুরের ‘নৈবদ্য’ কাব্যে হেমন্ত যেন অপার স্নিগ্ধতা এবং অবারিত শান্তির প্রতীক।
কাজী নজরুল ইসলামের ‘অঘ্রানের সওগাত’ কবিতায় হেমন্ত আসে খুশি, আনন্দ আর আশীর্বাদের বার্তা নিয়ে। এ সময় নতুন ধানের গন্ধে মৌ মৌ করে চারপাশ আর বাড়িতে বাড়িতে চলে পিঠাপুলি আর ফিরনির রান্নার ধুম। গ্রাম বাংলার এই অসাধারণ সংস্কৃতি চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে এই কবিতায়।

বর্ষায় যে ধান বোনা হয় তা হেমন্ত ঋতুতে পরিপক্বতা লাভ করে। পাকা আমন ও আউশ ধানের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে চৌদিকে। পাকা ধানের গন্ধে কৃষকের মন পুলকিত হয়। শুরু হয় নবান্ন উৎসব। এই উৎসবের কথা বাংলা কবিতায় উঠে এসেছে বারবার। হেমন্তের কামিনী, ছাতিম, রজনিগন্ধা, গন্ধরাজ গাঁদা ফুলের ঘ্রাণে মন ভরে যায়। এ সময় সংবেদনশীল মানুষের মন স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ে। হেমন্ত ঋতুর এই বিস্ময় জাগানিয়া অনুভব নিয়ে কবি সুফিয়া কামাল লিখেছেন-
‘সবুজ পাতার খামের ভেতর
হলুদ গাঁদা চিঠি লিখে
কোন্ পাথারের ওপার থেকে
আনল ডেকে হেমন্তকে?’
হেমন্তে পল্লীজীবন ও প্রকৃতির নিখাদ রূপবৈচিত্র্য আভাসিত হয় জসীমউদ্দীনের কবিতায়-
‘আশি^ন গেল, কার্তিক মাসে পাকিল খেতের ধান
সারা মাঠ ভরি গাহিছে কে যেন হলদি কোটার গান’। 

‘হেমন্ত’, ‘কার্তিক’, ‘অগ্রহায়ণ’ এই শব্দগুলো বারবার যার কবিতায় উঠে এসেছে তিনি নির্জনতার কবি, রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ। কেমন উদাস এক হাহাকার নিয়ে তিনি এঁকেছেন হেমন্তকে-
‘যখন ঝরিয়া যাবো হেমন্তের ঝড়ে, পথের পাতার মতো তুমিও তখন আমার বুকের পরে শুয়ে রবে?’

যে যেভাবেই আঁকুক না কেন এ দেশে হেমন্তের আগমন উৎসব আর পার্বণের আনন্দরথে। ফসল কাটার সঙ্গে সঙ্গেই বাঙালির ঘরে ঘরে শুরু হয়ে যায় নবান্ন উৎসব। ‘আমন ধানের সুঘ্রাণে ভরা’ চালের গুঁড়ি দিয়ে বানানো হরেক রকমের পিঠেপুলি, চিড়ে, মুড়ি, খই, নতুন জামাই আর মেয়েকে নিমন্ত্রণ দেওয়া, নানা উপহার দিয়ে তাদের খুশি করা এসবই হেমন্ত ঋতুকে ঘিরে বাংলার মানুষের ভিন্নতর আনন্দ আয়োজন। আবহমান বাঙালি সংস্কৃতির এক নান্দনিক প্রকাশ, যা চলে শীতকাল পর্যন্ত।

এখানে উল্লেখ্য, আমাদের দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যেও নতুন ফসল তোলাকে ঘিরে নবান্ন উৎসবের প্রচলন আছে। সাঁওতালরা বাঙালিদের মতো ফসল তোলার শুরুতে নয়, নবান্ন উৎসব আয়োজন করে ফসল তোলা শেষ হলে। এ উপলক্ষে তারা সাত দিন সাত রাত নাচ-গান আর বিশেষ খাওয়াদাওয়ারও আয়োজন করে। গারো নৃগোষ্ঠীরাও এভাবে নাচ-গান আর পান-ভোজনের মাধ্যমে নবান্নের উৎসব পালন করে। মরু জাতি গোষ্ঠীর মানুষেরা নবান্ন উৎসব উপলক্ষে দেবতার উদ্দেশে মুরগি বলি দেয় এবং নতুন চালের ভাত আর সেই মুরগির মাংস দিয়ে আত্মীয়স্বজনকে আপ্যায়ন করে।
হেমন্ত ঋতুর আরেক শোভা মাঠে মাঠে রবিশস্যের সমাহার। বিশেষ করে মন মাতানো হলুদ ফুলের সরিষা, বিভিন্ন জাতের কলাই, তিল-তিশি, ছোলার তরতাজা বাড়ন্ত ঝাড় আর সবুজে সবুজে ভরা গমের ক্ষেত প্রকৃতির রূপ শোভা যেমন বাড়িয়ে দেয়, তেমনি মানুষের স্বপ্ন পূরণেরও প্রতীক সেগুলো। হেমন্তের প্রাকৃতিক শোভাকে আরও বাড়িয়ে দেয় নানা জাতের ফুল- জুঁই, শাপলা, গোলাপ, কুমুদ বা পদ্ম, ম্যাগনোলিয়া, করবী, বোগেনভেলিয়া প্রভৃতি। এ সময় নদী-খাল-বিলে পাওয়া যায় হরেক রকমের মাছ। শীতের নানা ধরনের সবজিও উঠতে শুরু করেছে বাজারে। সব মিলিয়ে হেমন্ত আমাদের সামনে হাজির হয় ভিন্নধর্মী বৈশিষ্ট্য আর মেজাজ নিয়ে। 

প্রকৃতির পর্বান্তরের ভেতর দিয়ে মানুষ অব্যাহত রাখে তার অভিযাত্রা। জন্মলগ্ন থেকে মানুষ প্রকৃতিকে অবলোকন করে, অবলম্বন করে বাঁচে। আমার মত সামান্য অখ্যাত এক কবিও তাই ঋতুচক্রের এই ডাক অস্বীকার করতে পারে না। ‘আদিগন্ত ফসলের কবিতা’ তাই ফুটিয়ে তোলে অগ্রহায়ণ মাসের ভিন্ন ব্যঞ্জনা-
‘অগ্রহায়ণে তিনি তার সোনালী কবিতাগুলো 
কাঁধে বয়ে এনে ঠাকুমার হাতে তুলে দিতেন
ঠাকুমা পরম যত্নে কবিতার গন্ধ শুঁকতেন, স্পর্শ করতেন রৌদ্র মাখিয়ে রেখে দিতেন গোলা ঘরের নান্দনিক মলাটে’।

এভাবেই যুগে যুগে, কালে কালে হেমন্ত কবির কলমে উঠে এসেছে যাবতীয় সুরসঙ্গীত ও সৌন্দর্য নিয়ে। প্রকৃতির নিয়মেই হেমন্ত নিয়ে আসে হিম হিম মৃদু কুয়াশা। চারদিকে নতুন ধানের মিষ্টি গন্ধ। সঙ্গে শীতের আগমনি বার্তা। কৃষিনির্ভর জনজীবনে হেমন্ত সৃষ্টির আনন্দ-উল্লাসের কবিতার মতো। কবিতার হেমন্তে মুখরিত হোক আমাদের সাহিত্যাঙ্গন।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]