ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ৩০ নভেম্বর ২০২১ ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
ই-পেপার মঙ্গলবার ৩০ নভেম্বর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

হেমন্তের হৈম হাওয়া
টোকন ঠাকুর
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২১, ১২:১৩ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 71

এত ভোরে, এই নদীক‚লে এসে এখন কী দেখতে পাচ্ছি? কী দেখতে পাচ্ছি নদীর ওপারে থমকে থাকা কুয়াশার ভেতর দিয়ে? নদীজল ও শূন্যতায় জমে থাকা কুয়াশাকে আলাদা করা যাচ্ছে না। ফলে, নদীর ওপারে কী আছে, কী নেই ধরাই যাচ্ছে না। এ নদীর নাম কী? জানা নেই। এ নদী ‘কোথা হইতে আসিয়াছে’ এবং কোথায় যাচ্ছে- তাও ঠিক ঠাহর করা মুশকিল। ভোরের প্রথম রোদে নদী দেখব- এটা কোনো ব্যাপক তাৎপর্য বহন করে না। নাকি করে? নদীপাড়ে এত শীত, এত শীত। নিশ্চয়ই শীত সংগ্রহ করতে আসিনি আমি! নিশ্চয়ই কুয়াশা কুড়োতে আসিনি! কী কুড়োতে এসেছি তবে? কী পেতে এসেছি তবে পৌষালি ভোরের নদীপাড়ে? যদি কবিতায় নদী ধরতে চাই, তাহলে তা ঘরে বসেই ধরা যায়। একটি সাদা পৃষ্ঠায় লিখে দিলেই হয়ে যায়, নদীর মধ্যে ঝাঁপ দিচ্ছে এক জলপিপি, বলে যাই, আমি জলপাখিটার যমজ ভাই। 

যদি কবিতায় কুয়াশা লিখাতে চাই, লিখতাম, কুয়াশাকে আপন বলে জানি, উতলা কুয়াশার মাকেও আমি চিনি, চিনতাম সেই সাদা থান পরা বুড়িকেও, যে কুয়াশার নানি। নিশ্চয়ই ভোর ভোর বলে কোনো ঘোরও আমাকে আজ, এখন, এই শীতের নদীর কূলে আপ্যায়নে ডাকেনি! নাকি ডেকেছে? প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যাচ্ছে, উত্তর মিলছে না। প্রশ্নের পতাকা উড়ছে হাওয়ায়, হাওয়া বড্ড হৈম, এই হৈম হাওয়া আমাকে ডেকেছে? তবে আর এসেছি কেন?

ভোর-কুয়াশার ঝাপসাতিঝাপসা দৃশ্য-বাস্তবতার মধ্যেই দুয়েকটি পাখি, কী পাখি? তারা ঝুপ করে উড়ে গিয়ে নদীজল থেকে মাছ ধরে নিয়ে উড়ে যাচ্ছে। যন্ত্র-সভ্যতার কতদূরে এই নদীভোর? মনে হলো, ঠিক এ সময়ই দূরে ভেসে যাচ্ছে রেল-হুইসেল নয়, ওটা কি আমার শ্রæতি-কল্পনা? নিকটে-দূরে তো কোনো রেললাইনই নেই, হুইসেল আসবে কোত্থেকে? তবে কি আমার মনের মধ্যে কোনো রেললাইন চলে গেছে? মনের মধ্যেই প্রতিবিম্বিত আছে এক পুরনো দিনের ইস্টিশন? মনে-মনের সেই রেল চলে গেল, এ সময়? নাকি কুরোসাওয়ার ‘কাক’ চিত্রে গমক্ষেতের মধ্যে যখন ভ্যানগগ হাঁট ছিলেন ইজেল-ক্যানভাস, রঙতুলি সরঞ্জাম নিয়ে, আর তক্ষুনি গমক্ষেতের ওপর দিয়ে কা কা করতে করতে উড়ে এলো একদল কাক, আর সে সময়ই তীব্র শব্দে হুইসেল বাজিয়ে গেল একটি রেলগাড়ি, নিজের বন্দুকের গুলি আর্টিস্ট নিজের মাথায় চালিয়ে দিয়েছেন। এই ভোরে, শীতনদীর ক‚লে আমার মাথায় কি সেই শব্দ ঝাপটানি দিয়ে গেল? কিংবা এরকমও কি পরে মনে হবে যে, ভোরের নদীপাড়ে কুয়াশায় প্লাবিত একটি ভোর, এরকম সাবজেক্টের একটি ওয়াটির কালার চিত্রের সামনে আমি দাঁড়িয়ে আছি। 

সেই চিত্র শাসন করেছে সময়, পরিপার্শ্ব, আমাকেও? আরে না! তা হয় কী করে? আমি তো নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছি কুয়াশা, কুয়াশার ভেতর দিয়ে পুব আকাশের আভা। আমি তো নিজের কানেই শুনতেই পাচ্ছি শব্দ, জলপিপিদের ডানার ঝাপটানি। নিশ্চয়ই এ মাধুর্য মিথ্যে নয়, এই লাবণ্য মায়া নয়, সত্য। তাহলে কি সেই সত্য, যার জন্য আমি এত ভোরে আজ এই নদীকূলে ঘোরে পাওয়া মানুষের মতো একাকী এসেছি? জেনে-বুঝে এসেছি? পথ চিনে এসেছি? সারারাত হাঁটতে হাঁটতে নদীপাড়ে এসে এসব দেখছি?

সারারাত হাঁটতে হাঁটতে এসেছি, মানে কী? রাতে মানুষ হাঁটে নাকি? ঘুমোয়। তাহলে আমি ঘুমোইনি? না-ঘুমোনো মানুষের দলে আমি! কেন? ঘুমোইনি কেন? নাকি ঘুমোতে পারিনি? কেন ঘুমোতে পারিনি? কত রাত ঘুমোইনি? কত রাত আমি নির্ঘুম জানালার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে জানালার ভেতর দিয়ে আয় ঘুম আয় ঘুম ডাকতে ডাকতে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছি চিন্তা ধরেছি নামতা পড়েছি ঘুম ঘুম ঘুম আয় ঘুম ঘুম ঘুম হিম-মৌসুম পাড়ি দিয়ে দিয়ে কত কী দৃশ্য দেখতে দেখতে কত কী স্বপ্ন ভাবতে ভাবতে কত কী টপ্ন আঁকতে আঁকতে দাঁড়ি-কমাহীন দীর্ঘ বাক্য হেঁটে ফেলেছি। এবার একটু থামি। কোথায় থামব? কোথায় থামব না, সেও এক ব্যক্তিগত নির্দেশের ব্যাপার। আমার ব্যক্তিগত নির্দেশক কে? কে আমাকে নির্দেশ করে এই ভোরনদীর বারান্দায় নিয়ে এসেছে? কার নির্দেশে আমি অনিদ্রিত, জানালা ফুঁড়ে বেরিয়ে পড়েছি! কার নির্দেশে আমি রাস্তার মোড়ের সেলুনঘরে ঢুকে পড়ি? আয়নায় তাকিয়ে কেন দেখে নিই, চুলগুলো ঠিক আছে কিনা! শার্টের কলারটা ভাঁজ ভাঙা ছিল। কার নির্দেশে সেলুন থেকে বেরিয়ে পোস্ট অফিসের পেছনে কামিনীগাছের গলি দিয়ে কোনো কারণ ছাড়াই দিনে তিন-চারবার ঘোরাঘুরি করি? আসলেই। ব্যাপারটার নির্দেশক কে?

‘তুমি’ তো তুমিই। তুমি আবার কেমন হবে? তোমায় যেমন ভাবি আমি, তুমি কি ঠিক সেই রকমই তুমি। তোমার নির্দেশেই না আমি পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা সাদা শূন্যতায় ছড়িয়ে দিয়েছি ‘সাতটি তারার তিমির’! এই কে, কয়েক বছর আগে মানিকগঞ্জের পিরাইলে সর্ষেফুলের মাঠে গিয়ে হলুদের ওপর আছাড়ি-বিছাড়ি করে ব্যাপক ছবি-টবি তোলা হলো, কেন? কেন বারবার সমুদ্রে গেলাম। কেন? আমি কি মাছধরা জেলে, নাকি জাহাজের নাবিক? আসলে তো আমি তেমন কেউ না, সমুদ্র কেন, ছোটখাটো নদীর একটা ঢেউও না, তাহলে আমি সমুদ্রে যাই কেন? এমন সম্ভাবনা তো আমি মোটেও দেখছি না যে, আমি বঙ্গোপসাগর লিজ নিয়ে চীন ঠেকাতে আমেরিকান বন্দর বানাব, কিচ্ছু না, তাহলে আমার সমুদ্রগমনের উদ্দেশ্য কী? কবিতা লেখার জন্য যে সমুদ্র দরকার, তা তো পুরনো কবিতা পড়তে গিয়েই পেয়ে গেছি। তাহলে? আমি তো সন্তু লারমা বা ইউপিডিএফের কেউ না। 

আমি ভ্যাটিকান পোপের প্রতিনিধিও না। যদি তাই হয়, তাহলে তো আমি পাহাড়ে যেতে পারি না। আমি বুদ্ধ বা অতীশ দীপঙ্করের ডিরেক্ট স্টুডেন্টও না। তারপরও, ‘পাহাড় আমাকে ডাকছে’ বলে একটি ছুঁতো বের করেই বান্দরবান-বগা লেক! কেওকারাডংয়ের চুড়ো! তেমনিভাবে, আমার জঙ্গলে যাওয়ার কথাও নয়। কোনো বনভ‚মিই আমার ব্লাড কানেকটেড নয়। তবু যাই। হিসেব-নিকেশ না করেই আমি যাই। খেয়াল থাকে না, খেয়াল রাখতেও চাই না যে, কোথায় যাচ্ছি/ খেয়াল যে রাখব, খেয়াল রাখার জায়গাই তো নেই।’হেমন্তের হিম হিম হাওয়ায় ভাসিয়ে দিলাম গদ্য। এই গদ্য যেখানে পৌঁছে দেওয়ার দিক, চলে যাব। হেমন্তের জানালা দিয়ে শীত আসছে। শীতের অপেক্ষায় আছি।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]