ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শনিবার ২৯ জানুয়ারি ২০২২ ১৪ মাঘ ১৪২৮
ই-পেপার শনিবার ২৯ জানুয়ারি ২০২২
http://www.shomoyeralo.com/ad/Amin Mohammad City (Online AD).jpg

বিজয়ের ৫০ বছর
কমলগঞ্জে পালিয়ে যায় পাকিস্তানি সেনারা
কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) ও উজিরপুর (বরিশাল) প্রতিনিধি
প্রকাশ: রোববার, ৫ ডিসেম্বর, ২০২১, ৮:৫৮ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 115

স্বাধীনতার ঊষালগ্নে ১৯৭১ সালের ৫ ডিসেম্বর হানাদারমুক্ত হয় মৌলভীবাজারের সীমান্তবর্তী কমলগঞ্জ উপজেলা। মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্র বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানের মুখে বিপর্যস্ত হয়ে কমলগঞ্জের দখলদারিত্ব ছেড়ে পালিয়ে যায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর মুক্ত কমলগঞ্জের মাটিতে স্বাধীনতার পতাকা ওড়ায় বাঙালিরা। একই দিনে হানাদারমুক্ত হয় বরিশালের উজিরপুর।

কমলগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার জয়নাল আবেদীন জানান, প্রকৃতপক্ষে ৫ ডিসেম্বরই কমলগঞ্জ হানাদারমুক্ত হয়। পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কমলগঞ্জে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর থেকেই এখানে শুরু হয় সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রস্তুতি। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অনুগত ৬০ জনের একটি দল তৈরি করে উপজেলার শমসেরনগর বিমানঘাঁটিতে প্রশিক্ষণ চলতে থাকে। ১০ মার্চ ক্যাপ্টেন গোলাম রসুলের নেতৃত্বে এক দল পাকিস্তানি সেনা মৌলভীবাজারে অবস্থান নেয়। ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে তৎকালীন ছাত্রনেতা নারায়ণ পাল ও আবদুর রহিম পাকিস্তানি পতাকা পোড়ানোর দায়ে গ্রেফতার হন। 

পরে জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। তিনি জানান, কমলগঞ্জ ছিল বামপন্থিদের সুদৃঢ় ঘাঁটি। তারা মওলানা ভাসানী ও হক-তোহায়া গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনালগ্নে নকশালপন্থিদের নির্মূল করার অজুহাতে মেজর খালেদ মোশাররফকে কমলগঞ্জে পাঠানো হয়। তিনি ছিলেন বাঙালি সেনা কর্মকর্তা। ২৫ মার্চ রাতে ঢাকা গণহত্যা শুরু হলে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে জনতার কাতারে শামিল হন।

ঢাকায় এ গণহত্যার প্রতিবাদে ২৬ মার্চ কমলগঞ্জে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে মিছিল বের হয়। পাকিস্তানি সেনারা সেই মিছিলে গুলি চালালে সিরাজুল ইসলাম নামে এক বৃদ্ধ শহীদ হন। এই হত্যাকাণ্ডে উপজেলাবাসীর মনে জ্বলে ওঠে প্রতিশোধের আগুন। স্থানীয় বাঙালি ইপিআর ও পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরাও একাত্মতা ঘোষণা করে সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে। ২৮ মার্চ শমসেরনগর পুলিশ ফাঁড়ির সব অস্ত্র উঠিয়ে আনা হয়। মালগাড়ির বগি দিয়ে ভানুগাছ-শমসেরনগর-মৌলভীবাজার রাস্তায় ব্যারিকেড দেওয়া হয়। ২৯ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী খবর পেয়ে আবারও কমলগঞ্জে আসে। সন্ধ্যায় পাকিস্তানি সেনারা ভানুগাছ থেকে শমসেরনগরে এলে মুক্তিসেনাদের অতর্কিত আক্রমণে ক্যাপ্টেন গোলাম রসুলসহ নয়জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। স্বাধীনতার ঊষালগ্নের এই প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধে প্রচুর অস্ত্র-গোলাবারুদসহ পাকিস্তানিদের দুটি গাড়ি মুক্তিযোদ্ধাদের হস্তগত হয়।

স্বাধীনতা যুদ্ধে সর্বপ্রথম এই বিজয় লাভের পরদিনই কমলগঞ্জে মুক্তিপাগল জনতার এক বিরাট সমাবেশে গঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা পরিষদ। এরপর থেকেই নিয়মিত চলতে থাকে দলে দলে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ। ২৮ মার্চের পর পাকিস্তানি বাহিনী জল, স্থল ও আকাশপথে কমলগঞ্জে ব্যাপক আক্রমণ শুরু করে। মুক্তিবাহিনী তাদের অত্যাধুনিক অস্ত্র মোকাবিলায় অসীম সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করে।

এ উপজেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তিনটি ঘটনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হচ্ছে- পাত্রখোলা, ধলাই ও ভানুগাছের যুদ্ধ। ন্যাপর নেতা মফিজ আলী, ক্যাপ্টেন মোজাফফর আহমদ, আওয়ামী লীগ নেতা এমএ গফুর, ময়না মিয়া, ক্যাপ্টেন সাজ্জাদুর রহমান প্রমুখের সাহসী নেতৃত্বে কমলগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধারা অসীম সাহসিকতার সঙ্গে লড়েন। এখানকার বিভিন্ন রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেন মুক্তিবাহিনী ও সেনাবাহিনী প্রধান এমএজি ওসমানী, বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহি হামিদুর রহমান, মেজর খালেদ মোশাররফ, ব্রিগেডিয়ার আমিন আহম্মদ ও মেজর জিয়াউর রহমানসহ অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধা। 

উপজেলার বিভিন্ন রণাঙ্গনে যুদ্ধ করে শহীদ হয়েছেন বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহি হামিদুর রহমান, ল্যান্স নায়েক জিল্লুর রহমান, সিপাহি মিজানুর রহমান, সিপাহি আবদুর রশিদ, সিপাহি শাহজাহান মিয়াসহ নাম না জানা অনেকেই।

ক্যাপ্টেন মোজাফফর আহমেদের নেতৃত্বে পরিচালিত বিভিন্ন গেরিলা অপারেশনের লোমহর্ষক পর্যায়গুলো শুধু দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকাসহ বিভিন্ন বেতার মাধ্যম থেকে তার ওপর মন্তব্যও করা হয়েছে বহুবার। সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে শমসেরনগর মুক্ত করেছেন তিনি। শমসেরনগর যুদ্ধের আরও এক অগ্রসেনানি ছিলেন সৈয়দ মতিউর রহমান। ডিসেম্বরের ৩ তারিখ শমসেরনগর মুক্ত হওয়ার প্রাক্কালে তার অসম সাহসী যুদ্ধ পরিচালনা দেখে চমৎকৃত হয়েছিলেন শমসেরনগর ডাকবাংলোয় অবস্থানকারী তৎকালীন সময়ের মিত্রবাহিনীর ক্যাপ্টেন চাতওয়াল সিং।

মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ৩ ডিসেম্বর শমসেরনগর এলাকা শত্রুমুক্ত করে ৫ ডিসেম্বরে ভানুগাছ এলাকায় মুক্তি বাহিনী ও হানাদার বাহিনীর মধ্যে প্রচণ্ড যুদ্ধের পর কমলগঞ্জ সদর থেকে পাকিস্তানিরা পিছুহটে মৌলভীবাজারের দিকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। কামুদপুরসহ গোটা কমলগঞ্জ উপজেলা হানাদারমুক্ত হয়। মুক্তিযোদ্ধারা কমলগঞ্জের মাটিতে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন ৫ ডিসেম্বর।
অন্যদিকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে সারা দেশের চূড়ান্ত বিজয়ের ১১ দিন আগে ১৯৭১ সালের ৫ ডিসেম্বর বরিশালের উজিরপুরকে শত্রুমুক্ত করেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা। স্বাধীনতা লাভের ১৯ বছর পর উজিরপুরে গড়ে ওঠে মুক্তিযোদ্ধা মিলনকেন্দ্র। অথচ উজিরপুরমুক্ত দিবসে সেখানে নেই কোনো কর্মসূচি। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও স্বীকৃতি মেলেনি মুক্তিযোদ্ধা মিলনকেন্দ্রটির।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২৬টি উপজেলার একমাত্র যুদ্ধকালীন ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ৯নং সেক্টরের হেডকোয়ার্টার বড়াকাঠোর দরগাবাড়ী। এই সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন উজিরপুরের কৃতী সন্তান মেজর এমএ জলিল। তাই হানাদার বাহিনীর মূল টার্গেট ছিল উজিরপুর। বিজয়ের প্রায় ২ মাস আগে ১৭ অক্টোবর দরগাবাড়ী মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটিতে আক্রমণ চালাতে গিয়ে ওই এলাকার আশপাশে ২১টি গ্রামে নারকীয় তাণ্ডব চালায় ঘাতকরা। পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের দোসররা উজিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় অগণিত মানুষকে হত্যা করে। তাদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি মায়ের কোলে থাকা দেড় মাসের ফুটফুটে শিশু আনারকলিও। মায়ের কোল থেকে তাকে কেড়ে নিয়ে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনীর নরপশুরা। একই দিন ৭১ জন গ্রামবাসীকে হত্যা করে এবং ঐতিহ্যবাহী ধামুড়া বন্দরসহ বেশ কয়েকটি বাজার আগুন দিয় পুড়িয়ে দেয় এবং অসংখ্য নারীর ওপর চালায় পাশবিক নির্যাতন।

যুদ্ধের এক পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের মুখে বেঁচে যাওয়া ৫৫ জন পাকিস্তানি সেনা এবং ৩৫ জন রাজাকার-আলবদর ওইদিন কাকডাকা ভোরে বেইজ কমান্ডার আবদুল ওয়াদুদ সরদারের কাছে আত্মসমর্পণ করে। বীর মুক্তিযোদ্ধারা আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা করে উজিরপুরকে শত্রুমুক্ত করেন। আত্মসমর্পণকারী রাজাকারদের কয়েকদিন পর কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা বরিশালে হস্তান্তর করেন।

এদিকে ১৯৯০ সাল প্রথমবারের মতো বড়াকোঠা দরগাবাড়ী মুক্তিযোদ্ধা মিলনকেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি পওয়ার জন্য মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিন মানিক বীরপ্রতীক, শহীদুল ইসলাম ফকির, আ. ওয়াদুদ সরদার, এনায়েত হাসান চৌধুরী মিলে মুক্তিযোদ্ধা মিলনকেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

প্রথমদিকে দুয়েক বছর ৫ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের মিলনমেলা হলেও পরে আর কোনো কর্মসূচি পালিত হয়নি। সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর এলেই স্বজনহারাদের আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে এই এলাকাগুলো। ভিত্তিপ্রস্তর মিলনকেন্দ্রের একমাত্র অবলম্বন। স্বাধীনতার ৫০ বছর অতিবাহিত হলেও নবম সেক্টরের একমাত্র ঘাঁটি উজিরপুরর বড়াকাঠো দরগাবাড়ী মিলনকেন্দ্রের অবকাঠামোর তেমন কোনো উন্নতি হয়নি।

এ ব্যাপারে মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের ডেপুটি কমান্ডার হারুন-অর-রশিদ জানান, করোনার কারণে উজিরপুরমুক্ত দিবস উপলক্ষে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কোনো কর্মসূচি দেওয়া হয়নি। তবে মুক্তিযোদ্ধা মিলনকেন্দ্র উন্নয়নের কাজ চলমান রয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রণতি বিশ্বাস জানান, উজিরপুরমুক্ত দিবস উপলক্ষে আমাদের পক্ষ থেকে কোনো কর্মসূচি নেই। তবে সব শহীদ মুক্তিযোদ্ধার রূহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া, মোনাজাত ও আলোচনা সভা করতে বলেছি তাদের।

/জেডও/


আরও সংবাদ   বিষয়:  বিজয়গাথা   বিজয়ের ৫০ বছর  




http://www.shomoyeralo.com/ad/BD Sports News.gif

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]